ঢাকা ০১:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কেন হাজার কোটি টাকার লোকসানে ইসলামী ব্যাংক

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪৬:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ বার

একসময় দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও আস্থাভাজন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করা এই ব্যাংক এখন নজিরবিহীন আর্থিক সংকটের মুখে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটি ১ হাজার ৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সমন্বিত লোকসান করেছে। মাত্র একবছর আগেও একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একবছরের ব্যবধানে প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকার এই নেতিবাচক পরিবর্তন শুধু একটি ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থাই নয়, দেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের এই লোকসান কোনও একদিনের ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে বিতর্কিত ঋণ বিতরণ, খেলাপি বিনিয়োগের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ব্যাংকের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

আয় নেই, কিন্তু আমানতের মুনাফা দিতেই হচ্ছে

ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো—আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থ ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে বিতরণ করা এবং সেখান থেকে আয় করা। সেই আয় থেকেই আমানতকারীদের মুনাফা বা সুদ দেওয়া হয় এবং পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে ব্যাংক লাভ করে।

কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক চক্রটি ভেঙে পড়েছে। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই বিপুল অর্থের মধ্যে কার্যকরভাবে মাত্র ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো সম্পদ থেকে আয় আসছে। বাকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বড় অংশই এমন বিনিয়োগ বা ঋণে আটকে আছে, যেখান থেকে কোনও অর্থ আদায় হচ্ছে না।

ফলে একদিকে ব্যাংকের হাতে নগদ আয় কমছে, অন্যদিকে আমানতকারীদের নিয়মিত মুনাফা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বহাল রয়েছে। অর্থাৎ আয় না থাকলেও ব্যয় থেমে নেই। এই বৈপরীত্যই লোকসানের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এস আলম গ্রুপের ঋণই কি সবচেয়ে বড় কারণ?

ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরাসরি জানিয়েছেন, সংকটের বড় কারণ হলো—এস আলম গ্রুপকে দেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ। তাদের দাবি, অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া এসব ঋণের বড় অংশ এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ঋণ থেকে কোনও কিস্তি বা মুনাফা আদায় করা যাচ্ছে না। ফলে যে সম্পদ থেকে ব্যাংকের নিয়মিত আয় হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন অলস সম্পদে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যাংকের বড় অংশের সম্পদ যদি অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ব্যাংকের জন্য মুনাফা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতিও ঠিক সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরছে।

দ্বিতীয় প্রান্তিকেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা

আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বছরের প্রথম তিন মাসে ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ছিল ২৮৮ কোটি টাকা। কিন্তু এপ্রিল থেকে জুন— এই তিন মাসেই লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মোট লোকসানের প্রায় ৭৮ শতাংশই হয়েছে দ্বিতীয় প্রান্তিকে। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি দ্রুতগতিতে ঘটছে।

পাঁচ বছরের মুনাফা এক ধাক্কায় থেমে গেলো

অথচ কিছু দিন আগেও ইসলামী ব্যাংক ছিল ধারাবাহিকভাবে মুনাফাকারী একটি ব্যাংক। বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী—২০২৩ সালে মুনাফা ছিল ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে মুনাফা ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে মুনাফা ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর আগে আরও কয়েক বছর ব্যাংকটি লাভে ছিল। সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে ২০২৬ সালে রেকর্ড লোকসানে পড়া ব্যাংকটির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খেলাপি বিনিয়োগ যত বাড়ছে, আয় তত কমছে

ইসলামী ব্যাংক নিজেই জানিয়েছে, খেলাপি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে তাদের বিনিয়োগ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একইসঙ্গে অন্যান্য ব্যাংকে রাখা অর্থ থেকেও আগের তুলনায় কম আয় এসেছে। অন্যদিকে আমানত ধরে রাখতে তুলনামূলক বেশি হারে মুনাফা দিতে হয়েছে। ফলে আয়ের চেয়ে ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় লোকসান আরও গভীর হয়েছে।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রভাব

ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় আদায় না হওয়া অর্থকে আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। এসব অর্থ ‘সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে’ রাখা হয়। ফলে কাগজে-কলমে ব্যাংকের আয় আরও কমে যায়। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যদি আটকে থাকা অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়, তাহলে ব্যাংকের মুনাফাও দ্রুত বাড়তে পারে।

সংকট থেকে বের হওয়ার পথ কী?

ব্যাংকটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি) গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি কার্যকর হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এই প্রতিষ্ঠান সমস্যাগ্রস্ত ঋণ কিনে নিলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের ওপর চাপ কমবে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বিশেষ নীতিগত সুবিধা দিয়ে এসব মন্দ ঋণকে সাময়িকভাবে আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেয়, তাহলেও ব্যাংকটি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, ইতোমধ্যে নতুন করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আমানত এসেছে। নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে করপোরেট গ্রাহকদের আস্থা আরও বাড়বে বলেও তারা আশা করছেন।

শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, সংকটে পুরো খাত

একই সময়ে আইএফআইসি ব্যাংকও ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার বেশি লোকসানের কথা জানিয়েছে। ব্যাংকটির নিট সম্পদমূল্যও ঋণাত্মক হয়ে গেছে। দুই বড় ব্যাংকের এই ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতি নির্ভরতা এবং সম্পদের মানের অবনতি এখন আর বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়—এটি পুরো খাতের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নতুন মূলধন জোগান দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে না। বিতর্কিত ঋণের দ্রুত নিষ্পত্তি, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি ছাড়া পরিস্থিতির টেকসই উন্নতি সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন শুধু একটি ব্যাংকের লোকসানের হিসাব নয়, এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তব সংকটের একটি স্পষ্ট বার্তা। আয়ের প্রধান উৎস যখন বন্ধ হয়ে যায়, অথচ আমানতের দায় বহাল থাকে, তখন হাজার কোটি টাকার লোকসান কেবল সময়ের অপেক্ষা— ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই বাস্তবতারই সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

কেন হাজার কোটি টাকার লোকসানে ইসলামী ব্যাংক

আপডেট টাইম : ১১:৪৬:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

একসময় দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও আস্থাভাজন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করা এই ব্যাংক এখন নজিরবিহীন আর্থিক সংকটের মুখে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটি ১ হাজার ৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সমন্বিত লোকসান করেছে। মাত্র একবছর আগেও একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একবছরের ব্যবধানে প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকার এই নেতিবাচক পরিবর্তন শুধু একটি ব্যাংকের আর্থিক দুরবস্থাই নয়, দেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের এই লোকসান কোনও একদিনের ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে বিতর্কিত ঋণ বিতরণ, খেলাপি বিনিয়োগের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ব্যাংকের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

আয় নেই, কিন্তু আমানতের মুনাফা দিতেই হচ্ছে

ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো—আমানত সংগ্রহ করে সেই অর্থ ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে বিতরণ করা এবং সেখান থেকে আয় করা। সেই আয় থেকেই আমানতকারীদের মুনাফা বা সুদ দেওয়া হয় এবং পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে ব্যাংক লাভ করে।

কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক চক্রটি ভেঙে পড়েছে। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই বিপুল অর্থের মধ্যে কার্যকরভাবে মাত্র ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো সম্পদ থেকে আয় আসছে। বাকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বড় অংশই এমন বিনিয়োগ বা ঋণে আটকে আছে, যেখান থেকে কোনও অর্থ আদায় হচ্ছে না।

ফলে একদিকে ব্যাংকের হাতে নগদ আয় কমছে, অন্যদিকে আমানতকারীদের নিয়মিত মুনাফা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বহাল রয়েছে। অর্থাৎ আয় না থাকলেও ব্যয় থেমে নেই। এই বৈপরীত্যই লোকসানের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এস আলম গ্রুপের ঋণই কি সবচেয়ে বড় কারণ?

ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরাসরি জানিয়েছেন, সংকটের বড় কারণ হলো—এস আলম গ্রুপকে দেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ। তাদের দাবি, অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া এসব ঋণের বড় অংশ এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ঋণ থেকে কোনও কিস্তি বা মুনাফা আদায় করা যাচ্ছে না। ফলে যে সম্পদ থেকে ব্যাংকের নিয়মিত আয় হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন অলস সম্পদে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যাংকের বড় অংশের সম্পদ যদি অকার্যকর হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ব্যাংকের জন্য মুনাফা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতিও ঠিক সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরছে।

দ্বিতীয় প্রান্তিকেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা

আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বছরের প্রথম তিন মাসে ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ছিল ২৮৮ কোটি টাকা। কিন্তু এপ্রিল থেকে জুন— এই তিন মাসেই লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মোট লোকসানের প্রায় ৭৮ শতাংশই হয়েছে দ্বিতীয় প্রান্তিকে। এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি দ্রুতগতিতে ঘটছে।

পাঁচ বছরের মুনাফা এক ধাক্কায় থেমে গেলো

অথচ কিছু দিন আগেও ইসলামী ব্যাংক ছিল ধারাবাহিকভাবে মুনাফাকারী একটি ব্যাংক। বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী—২০২৩ সালে মুনাফা ছিল ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে মুনাফা ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে মুনাফা ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর আগে আরও কয়েক বছর ব্যাংকটি লাভে ছিল। সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে ২০২৬ সালে রেকর্ড লোকসানে পড়া ব্যাংকটির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খেলাপি বিনিয়োগ যত বাড়ছে, আয় তত কমছে

ইসলামী ব্যাংক নিজেই জানিয়েছে, খেলাপি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে তাদের বিনিয়োগ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একইসঙ্গে অন্যান্য ব্যাংকে রাখা অর্থ থেকেও আগের তুলনায় কম আয় এসেছে। অন্যদিকে আমানত ধরে রাখতে তুলনামূলক বেশি হারে মুনাফা দিতে হয়েছে। ফলে আয়ের চেয়ে ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় লোকসান আরও গভীর হয়েছে।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের প্রভাব

ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় আদায় না হওয়া অর্থকে আয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। এসব অর্থ ‘সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে’ রাখা হয়। ফলে কাগজে-কলমে ব্যাংকের আয় আরও কমে যায়। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যদি আটকে থাকা অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়, তাহলে ব্যাংকের মুনাফাও দ্রুত বাড়তে পারে।

সংকট থেকে বের হওয়ার পথ কী?

ব্যাংকটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি) গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি কার্যকর হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এই প্রতিষ্ঠান সমস্যাগ্রস্ত ঋণ কিনে নিলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের ওপর চাপ কমবে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বিশেষ নীতিগত সুবিধা দিয়ে এসব মন্দ ঋণকে সাময়িকভাবে আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেয়, তাহলেও ব্যাংকটি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, ইতোমধ্যে নতুন করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আমানত এসেছে। নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে করপোরেট গ্রাহকদের আস্থা আরও বাড়বে বলেও তারা আশা করছেন।

শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, সংকটে পুরো খাত

একই সময়ে আইএফআইসি ব্যাংকও ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার বেশি লোকসানের কথা জানিয়েছে। ব্যাংকটির নিট সম্পদমূল্যও ঋণাত্মক হয়ে গেছে। দুই বড় ব্যাংকের এই ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতি নির্ভরতা এবং সম্পদের মানের অবনতি এখন আর বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়—এটি পুরো খাতের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নতুন মূলধন জোগান দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে না। বিতর্কিত ঋণের দ্রুত নিষ্পত্তি, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি ছাড়া পরিস্থিতির টেকসই উন্নতি সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন শুধু একটি ব্যাংকের লোকসানের হিসাব নয়, এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তব সংকটের একটি স্পষ্ট বার্তা। আয়ের প্রধান উৎস যখন বন্ধ হয়ে যায়, অথচ আমানতের দায় বহাল থাকে, তখন হাজার কোটি টাকার লোকসান কেবল সময়ের অপেক্ষা— ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই বাস্তবতারই সবচেয়ে বড় উদাহরণ।