ঢাকা ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
দেশে নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান পর্যটন মন্ত্রীর আমরা মালিক নই, ১৮ কোটি জনগণের সেবক : ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল ঢাকার চারপাশে নৌপথ চালু ও দূষণ রোধের সিদ্ধান্ত টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা যেভাবে বানাবেন এক কাপ ‘পারফেক্ট’ দুধ চা বিশ্বজয়ী আন্ডারওয়াটার ড্রোন নির্মাতাদের পাশে থাকার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ ফুটবল লিগে খেলতে তিন ক্লাবকে ‘আমন্ত্রণ’ বাফুফের মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব বাংলাদেশের ৩৬ জুলাই উদ্‌যাপনে কনসার্ট ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ রাজনীতি বিভেদ বাড়ায়, আমরা সম্প্রীতির সমাজ চাই: মির্জা ফখরুল

মুদি দোকানে কিউআর কোডে পেমেন্ট, ধারণা নেই সাধারণ মানুষের

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৫৭:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ বার

দেশের আর্থিক খাতকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে গত কিছু বছরে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো শক্তিশালী করা, আন্তঃব্যাংক তাৎক্ষণিক লেনদেন সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোর একটি হলো সর্বজনীন ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য (Interoperable) “বাংলা কিউআর” চালু করা।

গত ১ জুলাই থেকে দেশের সব ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করার ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন একজন গ্রাহক বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা যেকোনো ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে একই কিউআর কোড স্ক্যান করেই মূল্য পরিশোধ করতে পারেন।

প্রযুক্তিগতভাবে এটি বড় অগ্রগতি হলেও বাস্তবতা বলছে, দেশের অধিকাংশ মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, ফার্মেসি, চায়ের দোকান কিংবা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখনো নগদ টাকার দাপটই বেশি। দোকানে বাংলা কিউআর ঝুলছে, কিন্তু অনেক গ্রাহক জানেনই না সেটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। ফলে ডিজিটাল লেনদেনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা খুচরা বাজার এখনো প্রত্যাশিতভাবে ডিজিটাল হয়নি।

প্রযুক্তি এসেছে, ব্যবহার শেখা হয়নি

বাংলাদেশে বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। প্রতিদিন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। মানুষ টাকা পাঠান, মোবাইল রিচার্জ করেন, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল পরিশোধ করেন।

কিন্তু একই অ্যাপের ভেতরে থাকা “স্ক্যান করে পেমেন্ট” সুবিধাটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়—সেই বিষয়ে সাধারণ মানুষের বড় অংশের স্পষ্ট ধারণা নেই।

ফলে দোকানে কিউআর কোড থাকলেও অধিকাংশ ক্রেতা এখনো নগদ টাকা বের করেই মূল্য পরিশোধ করেন।

ব্যাংকারদের মতে, প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৌঁছেছে, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এখনো সবার কাছে পৌঁছায়নি।

কেন জনপ্রিয় হচ্ছে না বাংলা কিউআর?

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলা কিউআরের প্রসারে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে।

প্রথমত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা লেনদেন মাশুল অন্যতম বড় সমস্যা। বর্তমানে লেনদেনের ওপর ভ্যাটসহ প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ ব্যবসায়ীদের দিতে হয়। একজন মুদি দোকানি যদি ১ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত কেটে যেতে পারে। স্বল্প মুনাফার ব্যবসায় এটি অনেকের কাছেই বড় চাপ।

ফলে অনেক ব্যবসায়ী কিউআর ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার এই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, অনেক ছোট ব্যবসায়ীর জন্য মার্চেন্ট হিসাব খোলার প্রক্রিয়া এখনো সহজ নয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, হিসাব পরিচালনা এবং প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন।

তৃতীয়ত, গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা, স্মার্টফোন ব্যবহারের সীমিত সুযোগ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

প্রযুক্তিভীতি এখনো কাটেনি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন নিয়ে এখনো মানসিক দ্বিধা রয়েছে।

অনেকেই মনে করেন ভুল কিউআর স্ক্যান করলে টাকা অন্যের হিসাবে চলে যেতে পারে। আবার কেউ আশঙ্কা করেন, টাকা কেটে গেলেও দোকানদার হয়তো পাবেন না।

বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ এবং প্রযুক্তিতে অনভ্যস্তদের মধ্যে এই ভয় অনেক বেশি।

ফলে নগদ লেনদেনই তাদের কাছে এখনো সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ মনে হয়।

পুরোনো অভ্যাসও বড় বাধা

বাংলাদেশের খুচরা বাজার দীর্ঘদিন ধরেই নগদনির্ভর। বাজারে গিয়ে হাতে টাকা দিয়ে পণ্য কেনার সংস্কৃতি এখনো খুব শক্তিশালী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করলেই মানুষের আচরণ বদলে যায় না। নতুন অভ্যাস তৈরি করতে সময়, আস্থা, প্রচারণা এবং ধারাবাহিক অনুশীলন প্রয়োজন।

তাই ২০, ৫০ কিংবা ১০০ টাকার ছোট ছোট কেনাকাটায় কিউআর ব্যবহার শুরু হলে মানুষ দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন।

ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুযোগ

বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একজন হতে পারেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

আগে একটি দোকানে বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকের আলাদা আলাদা কিউআর কোড ঝুলিয়ে রাখতে হতো। এখন একটি বাংলা কিউআরই যথেষ্ট। এতে ব্যবসায়ীদের ঝামেলা কমছে। প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।

এই রেকর্ড ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা কিংবা অন্যান্য আর্থিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একইসঙ্গে নগদ অর্থ সংরক্ষণ, বহন এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার ঝুঁকিও কমে।

স্বচ্ছতা বাড়বে, নগদের ব্যবহার কমবে

বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম লক্ষ্য হলো অর্থনীতিতে নগদের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো।

ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে জাল নোটের ঝুঁকি কমবে, খুচরা টাকার সংকট হ্রাস পাবে, অর্থ বহনের ঝুঁকি কমবে এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে।

একইসঙ্গে কর প্রশাসন আরও কার্যকর হবে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আসবে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করতে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলা কিউআর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের আলাদা কিউআর কোড ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দূর হয়েছে। এখন যেকোনও ব্যাংক বা এমএফএসের অ্যাপ দিয়ে একই কিউআর স্ক্যান করে সহজেই পেমেন্ট করা যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়াবে। তবে মার্চেন্ট চার্জ, প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের ঘাটতি, দুর্বল ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার সীমাবদ্ধতা দ্রুত সমাধান করতে হবে।”

তার মতে, “এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা গেলে বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “বাংলা কিউআরের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য একটি অভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন যেকোনও অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা এমএফএসের অ্যাপ দিয়ে একই কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট করা সম্ভব।”

তিনি বলেন, “সেবাটি আরও জনপ্রিয় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে। বর্তমানে লেনদেন মাশুল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ব্যবসায়ীবান্ধব নীতিমালা নিয়েও কাজ চলছে। ভবিষ্যতে লেনদেনের পরিমাণ বাড়লে সেবার খরচ কমানোর সুযোগও তৈরি হবে।”

তিনি আরও বলেন, “ডিজিটাল অর্থনীতির স্বার্থে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্ব দিচ্ছে।”

সামনে যে পথ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট জনপ্রিয় করতে শুরুতে ব্যবসায়ীদের জন্য কম বা শূন্য হারে চার্জ, ক্যাশব্যাক এবং বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল।

ভারতের ইউপিআই, থাইল্যান্ডের প্রম্পটপে, মালয়েশিয়ার ডুইটনাউসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যবহারকারী বাড়ার পর ধীরে ধীরে টেকসই ফি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য শুরুতে কম বা শূন্য মাশুল, সহজে মার্চেন্ট হিসাব খোলার সুযোগ, দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তি, বিরোধ সমাধান ব্যবস্থা এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন বাংলা কিউআর শুধু একটি নতুন পেমেন্ট প্রযুক্তি নয়; এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অবকাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ব্যাংক ও এমএফএসকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

তবে প্রযুক্তি চালু করাই শেষ কথা নয়। এর সফলতা নির্ভর করবে মানুষের আস্থা, ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ, যৌক্তিক লেনদেন মাশুল, সহজ প্রযুক্তি, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং সর্বোপরি ডিজিটাল সচেতনতার ওপর।

যদি এসব চ্যালেঞ্জ সময়মতো সমাধান করা যায়, তাহলে খুব বেশি দিন নয়—মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, চায়ের দোকান, ফার্মেসি থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি খুচরা ব্যবসায় বাংলা কিউআর হবে স্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যম। আর তখনই সত্যিকার অর্থে নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের যাত্রা আরও বেগবান হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশে নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান পর্যটন মন্ত্রীর

মুদি দোকানে কিউআর কোডে পেমেন্ট, ধারণা নেই সাধারণ মানুষের

আপডেট টাইম : ১১:৫৭:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

দেশের আর্থিক খাতকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে গত কিছু বছরে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো শক্তিশালী করা, আন্তঃব্যাংক তাৎক্ষণিক লেনদেন সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোর একটি হলো সর্বজনীন ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য (Interoperable) “বাংলা কিউআর” চালু করা।

গত ১ জুলাই থেকে দেশের সব ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করার ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন একজন গ্রাহক বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা যেকোনো ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে একই কিউআর কোড স্ক্যান করেই মূল্য পরিশোধ করতে পারেন।

প্রযুক্তিগতভাবে এটি বড় অগ্রগতি হলেও বাস্তবতা বলছে, দেশের অধিকাংশ মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, ফার্মেসি, চায়ের দোকান কিংবা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এখনো নগদ টাকার দাপটই বেশি। দোকানে বাংলা কিউআর ঝুলছে, কিন্তু অনেক গ্রাহক জানেনই না সেটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। ফলে ডিজিটাল লেনদেনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা খুচরা বাজার এখনো প্রত্যাশিতভাবে ডিজিটাল হয়নি।

প্রযুক্তি এসেছে, ব্যবহার শেখা হয়নি

বাংলাদেশে বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। প্রতিদিন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। মানুষ টাকা পাঠান, মোবাইল রিচার্জ করেন, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল পরিশোধ করেন।

কিন্তু একই অ্যাপের ভেতরে থাকা “স্ক্যান করে পেমেন্ট” সুবিধাটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়—সেই বিষয়ে সাধারণ মানুষের বড় অংশের স্পষ্ট ধারণা নেই।

ফলে দোকানে কিউআর কোড থাকলেও অধিকাংশ ক্রেতা এখনো নগদ টাকা বের করেই মূল্য পরিশোধ করেন।

ব্যাংকারদের মতে, প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৌঁছেছে, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এখনো সবার কাছে পৌঁছায়নি।

কেন জনপ্রিয় হচ্ছে না বাংলা কিউআর?

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলা কিউআরের প্রসারে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে।

প্রথমত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা লেনদেন মাশুল অন্যতম বড় সমস্যা। বর্তমানে লেনদেনের ওপর ভ্যাটসহ প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ ব্যবসায়ীদের দিতে হয়। একজন মুদি দোকানি যদি ১ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত কেটে যেতে পারে। স্বল্প মুনাফার ব্যবসায় এটি অনেকের কাছেই বড় চাপ।

ফলে অনেক ব্যবসায়ী কিউআর ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার এই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, অনেক ছোট ব্যবসায়ীর জন্য মার্চেন্ট হিসাব খোলার প্রক্রিয়া এখনো সহজ নয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, হিসাব পরিচালনা এবং প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন।

তৃতীয়ত, গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা, স্মার্টফোন ব্যবহারের সীমিত সুযোগ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

প্রযুক্তিভীতি এখনো কাটেনি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন নিয়ে এখনো মানসিক দ্বিধা রয়েছে।

অনেকেই মনে করেন ভুল কিউআর স্ক্যান করলে টাকা অন্যের হিসাবে চলে যেতে পারে। আবার কেউ আশঙ্কা করেন, টাকা কেটে গেলেও দোকানদার হয়তো পাবেন না।

বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ এবং প্রযুক্তিতে অনভ্যস্তদের মধ্যে এই ভয় অনেক বেশি।

ফলে নগদ লেনদেনই তাদের কাছে এখনো সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ মনে হয়।

পুরোনো অভ্যাসও বড় বাধা

বাংলাদেশের খুচরা বাজার দীর্ঘদিন ধরেই নগদনির্ভর। বাজারে গিয়ে হাতে টাকা দিয়ে পণ্য কেনার সংস্কৃতি এখনো খুব শক্তিশালী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করলেই মানুষের আচরণ বদলে যায় না। নতুন অভ্যাস তৈরি করতে সময়, আস্থা, প্রচারণা এবং ধারাবাহিক অনুশীলন প্রয়োজন।

তাই ২০, ৫০ কিংবা ১০০ টাকার ছোট ছোট কেনাকাটায় কিউআর ব্যবহার শুরু হলে মানুষ দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন।

ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুযোগ

বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একজন হতে পারেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

আগে একটি দোকানে বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকের আলাদা আলাদা কিউআর কোড ঝুলিয়ে রাখতে হতো। এখন একটি বাংলা কিউআরই যথেষ্ট। এতে ব্যবসায়ীদের ঝামেলা কমছে। প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।

এই রেকর্ড ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা কিংবা অন্যান্য আর্থিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একইসঙ্গে নগদ অর্থ সংরক্ষণ, বহন এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার ঝুঁকিও কমে।

স্বচ্ছতা বাড়বে, নগদের ব্যবহার কমবে

বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম লক্ষ্য হলো অর্থনীতিতে নগদের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো।

ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে জাল নোটের ঝুঁকি কমবে, খুচরা টাকার সংকট হ্রাস পাবে, অর্থ বহনের ঝুঁকি কমবে এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে।

একইসঙ্গে কর প্রশাসন আরও কার্যকর হবে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আসবে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করতে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলা কিউআর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের আলাদা কিউআর কোড ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দূর হয়েছে। এখন যেকোনও ব্যাংক বা এমএফএসের অ্যাপ দিয়ে একই কিউআর স্ক্যান করে সহজেই পেমেন্ট করা যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়াবে। তবে মার্চেন্ট চার্জ, প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের ঘাটতি, দুর্বল ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার সীমাবদ্ধতা দ্রুত সমাধান করতে হবে।”

তার মতে, “এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা গেলে বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “বাংলা কিউআরের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য একটি অভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন যেকোনও অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা এমএফএসের অ্যাপ দিয়ে একই কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট করা সম্ভব।”

তিনি বলেন, “সেবাটি আরও জনপ্রিয় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে। বর্তমানে লেনদেন মাশুল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ব্যবসায়ীবান্ধব নীতিমালা নিয়েও কাজ চলছে। ভবিষ্যতে লেনদেনের পরিমাণ বাড়লে সেবার খরচ কমানোর সুযোগও তৈরি হবে।”

তিনি আরও বলেন, “ডিজিটাল অর্থনীতির স্বার্থে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্ব দিচ্ছে।”

সামনে যে পথ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট জনপ্রিয় করতে শুরুতে ব্যবসায়ীদের জন্য কম বা শূন্য হারে চার্জ, ক্যাশব্যাক এবং বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল।

ভারতের ইউপিআই, থাইল্যান্ডের প্রম্পটপে, মালয়েশিয়ার ডুইটনাউসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যবহারকারী বাড়ার পর ধীরে ধীরে টেকসই ফি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য শুরুতে কম বা শূন্য মাশুল, সহজে মার্চেন্ট হিসাব খোলার সুযোগ, দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তি, বিরোধ সমাধান ব্যবস্থা এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন বাংলা কিউআর শুধু একটি নতুন পেমেন্ট প্রযুক্তি নয়; এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অবকাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে সব ব্যাংক ও এমএফএসকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

তবে প্রযুক্তি চালু করাই শেষ কথা নয়। এর সফলতা নির্ভর করবে মানুষের আস্থা, ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ, যৌক্তিক লেনদেন মাশুল, সহজ প্রযুক্তি, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং সর্বোপরি ডিজিটাল সচেতনতার ওপর।

যদি এসব চ্যালেঞ্জ সময়মতো সমাধান করা যায়, তাহলে খুব বেশি দিন নয়—মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, চায়ের দোকান, ফার্মেসি থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি খুচরা ব্যবসায় বাংলা কিউআর হবে স্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যম। আর তখনই সত্যিকার অর্থে নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের যাত্রা আরও বেগবান হবে।