ঢাকা ০১:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্ধু আর আব্বুকে নিয়ে ব্রাজিলের খেলা দেখতেই বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় এসেছি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৪৫:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
  • ০ বার

ফুটবল বোঝার পর আমার প্রথম বিশ্বকাপ ছিল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ। মজার ব্যাপার হলো, সেই বিশ্বকাপও যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছিল। বাবা ছিলেন ব্রাজিলের একনিষ্ঠ সমর্থক। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে খেলা হওয়ায় ম্যাচগুলো আমাদের দেশে গভীর রাতে হতো। মাঝরাতে প্রায়ই আমার ঘুম ভেঙে যেত, দেখতাম টেলিভিশনের সামনে বসে খেলা দেখছেন বাবা। আমিও গিয়ে আব্বুর কোলে বসে খেলা দেখতাম। একটি ম্যাচে ব্রাজিলের লিওনার্দো লাল কার্ড পেয়েছিলেন। কেন জানি না, ঘটনাটি আমাকে খুব কাঁদিয়েছিল। সম্ভবত সেখান থেকেই ব্রাজিলের প্রতি আমার ভালোবাসা শুরু।

চাচা, চাচি আর অনেক কাজিনের সঙ্গে যৌথ পরিবারে আমার ছোটবেলা কেটেছে। বাবা–চাচাদের দেখাদেখি আমরা ভাই-বোনেরা সবাই ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার ভক্ত হয়ে উঠি। একটু বড় হয়ে পাওয়া বিশ্বকাপগুলোতে পুরো পরিবার মিলে রাত জেগে খেলা দেখতাম। আজও সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়লে অন্য রকম এক অনুভূতি কাজ করে।

৩২ বছর পর আবার যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরল বিশ্বকাপ, তখন একদিন ছোট ভাইকে (অর্ণব ওয়ারেস খান) বললাম, ‘আব্বুকে নিয়ে যদি এবার বিশ্বকাপ দেখতে যাই, কেমন হয়?’ সে এক কথায় রাজি।

স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে লেখকের সেলফিতে বাবা খায়রুল খান (ডানে), চাচা (বাঁয়ে) ও দুই চাচাতো ভাইছবি: আসিফ ওয়ারেস খানের সৌজন্যে

পরে জার্মানিপ্রবাসী চাচা (মামুন আহসান খান) আর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী চাচাতো ভাইদের (সুমিত ওয়ারেস খান ও তানভীর ওয়ারেস খান) সঙ্গে কথা বললাম। সবাই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম—এবার টেলিভিশনের সামনে নয়, স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপ দেখা হবে।

বাংলাদেশ থেকে আমরা, জার্মানি থেকে চাচা আর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্বজনেরা—সবাই মিলে ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলোকে আবার জীবন্ত করে তুলতে চাইলাম।

সেদিন থেকেই শুরু হলো পরিকল্পনা। প্রথমেই কাটা হলো বিমানের টিকিট। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ম্যাচের টিকিট। প্রায় ৩৬টি টিকিটের জন্য আবেদন করে আমরা পেয়েছিলাম মাত্র দুটি। তখন সিদ্ধান্ত হলো, ওই দুটি টিকিট আব্বু ও চাচাকে দেওয়া হবে। আমরা বিকল্প খুঁজতে থাকি। পরে অনেক বেশি দামে ফিফার সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে মোটা অঙ্কের টাকায় নিজেদের টিকিট সংগ্রহ করি। অর্থের হিসাবে সেটি মোটেও সামান্য ছিল না। কিন্তু আমরা জানতাম, টাকা আবার উপার্জন করা যাবে; এই সময়, এই মুহূর্ত, এই স্মৃতি আর বাবা–চাচার সঙ্গ কখনো ফিরে আসবে না।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে নতুন মার্কিন ভিসা-সংক্রান্ত নিয়মের কারণে আমার ছোট ভাই শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে আসতে পারল না। তবে দূরে থেকেও সে প্রতিনিয়ত আমাদের খোঁজ নিয়েছে, আমাদের আনন্দে অংশ নিয়েছে।

আরেকটি বিশেষ প্রাপ্তি ছিল পারিবারিক বন্ধু শুভ কামালের উপস্থিতি। শুধু আমাদের সঙ্গে খেলা দেখার জন্য মিশিগান থেকে প্রায় ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে সে এসেছে।

১৪ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচ আমরা একসঙ্গে দেখেছি। যে স্টেডিয়ামে আমরা ম্যাচটি দেখেছি, সেখানেই অনুষ্ঠিত হবে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল। ব্যক্তিগতভাবে এটি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে। কিছু স্মৃতির মূল্য অর্থে মাপা যায় না। এটি তেমনই একটি স্মৃতি।

কয়েক বছর পর হয়তো ব্রাজিল–মরক্কো ম্যাচের ফলাফল অনেকটাই ঝাপসা হয়ে যাবে। কিন্তু এই যাত্রা, পরিবারের মানুষদের সঙ্গে কাটানো সময়, আর ছোটবেলার একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অনুভূতি—এসব স্মৃতি আজীবন আমাদের সঙ্গে থাকবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বন্ধু আর আব্বুকে নিয়ে ব্রাজিলের খেলা দেখতেই বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় এসেছি

আপডেট টাইম : ১২:৪৫:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

ফুটবল বোঝার পর আমার প্রথম বিশ্বকাপ ছিল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ। মজার ব্যাপার হলো, সেই বিশ্বকাপও যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছিল। বাবা ছিলেন ব্রাজিলের একনিষ্ঠ সমর্থক। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে খেলা হওয়ায় ম্যাচগুলো আমাদের দেশে গভীর রাতে হতো। মাঝরাতে প্রায়ই আমার ঘুম ভেঙে যেত, দেখতাম টেলিভিশনের সামনে বসে খেলা দেখছেন বাবা। আমিও গিয়ে আব্বুর কোলে বসে খেলা দেখতাম। একটি ম্যাচে ব্রাজিলের লিওনার্দো লাল কার্ড পেয়েছিলেন। কেন জানি না, ঘটনাটি আমাকে খুব কাঁদিয়েছিল। সম্ভবত সেখান থেকেই ব্রাজিলের প্রতি আমার ভালোবাসা শুরু।

চাচা, চাচি আর অনেক কাজিনের সঙ্গে যৌথ পরিবারে আমার ছোটবেলা কেটেছে। বাবা–চাচাদের দেখাদেখি আমরা ভাই-বোনেরা সবাই ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার ভক্ত হয়ে উঠি। একটু বড় হয়ে পাওয়া বিশ্বকাপগুলোতে পুরো পরিবার মিলে রাত জেগে খেলা দেখতাম। আজও সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়লে অন্য রকম এক অনুভূতি কাজ করে।

৩২ বছর পর আবার যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরল বিশ্বকাপ, তখন একদিন ছোট ভাইকে (অর্ণব ওয়ারেস খান) বললাম, ‘আব্বুকে নিয়ে যদি এবার বিশ্বকাপ দেখতে যাই, কেমন হয়?’ সে এক কথায় রাজি।

স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে লেখকের সেলফিতে বাবা খায়রুল খান (ডানে), চাচা (বাঁয়ে) ও দুই চাচাতো ভাইছবি: আসিফ ওয়ারেস খানের সৌজন্যে

পরে জার্মানিপ্রবাসী চাচা (মামুন আহসান খান) আর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী চাচাতো ভাইদের (সুমিত ওয়ারেস খান ও তানভীর ওয়ারেস খান) সঙ্গে কথা বললাম। সবাই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম—এবার টেলিভিশনের সামনে নয়, স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপ দেখা হবে।

বাংলাদেশ থেকে আমরা, জার্মানি থেকে চাচা আর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্বজনেরা—সবাই মিলে ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলোকে আবার জীবন্ত করে তুলতে চাইলাম।

সেদিন থেকেই শুরু হলো পরিকল্পনা। প্রথমেই কাটা হলো বিমানের টিকিট। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ম্যাচের টিকিট। প্রায় ৩৬টি টিকিটের জন্য আবেদন করে আমরা পেয়েছিলাম মাত্র দুটি। তখন সিদ্ধান্ত হলো, ওই দুটি টিকিট আব্বু ও চাচাকে দেওয়া হবে। আমরা বিকল্প খুঁজতে থাকি। পরে অনেক বেশি দামে ফিফার সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে মোটা অঙ্কের টাকায় নিজেদের টিকিট সংগ্রহ করি। অর্থের হিসাবে সেটি মোটেও সামান্য ছিল না। কিন্তু আমরা জানতাম, টাকা আবার উপার্জন করা যাবে; এই সময়, এই মুহূর্ত, এই স্মৃতি আর বাবা–চাচার সঙ্গ কখনো ফিরে আসবে না।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে নতুন মার্কিন ভিসা-সংক্রান্ত নিয়মের কারণে আমার ছোট ভাই শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে আসতে পারল না। তবে দূরে থেকেও সে প্রতিনিয়ত আমাদের খোঁজ নিয়েছে, আমাদের আনন্দে অংশ নিয়েছে।

আরেকটি বিশেষ প্রাপ্তি ছিল পারিবারিক বন্ধু শুভ কামালের উপস্থিতি। শুধু আমাদের সঙ্গে খেলা দেখার জন্য মিশিগান থেকে প্রায় ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে সে এসেছে।

১৪ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচ আমরা একসঙ্গে দেখেছি। যে স্টেডিয়ামে আমরা ম্যাচটি দেখেছি, সেখানেই অনুষ্ঠিত হবে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল। ব্যক্তিগতভাবে এটি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে। কিছু স্মৃতির মূল্য অর্থে মাপা যায় না। এটি তেমনই একটি স্মৃতি।

কয়েক বছর পর হয়তো ব্রাজিল–মরক্কো ম্যাচের ফলাফল অনেকটাই ঝাপসা হয়ে যাবে। কিন্তু এই যাত্রা, পরিবারের মানুষদের সঙ্গে কাটানো সময়, আর ছোটবেলার একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অনুভূতি—এসব স্মৃতি আজীবন আমাদের সঙ্গে থাকবে।