ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাউ ৩ টাকা, তবুও পচছে মাঠেই

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪১:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
  • ১৬ বার

কখনো যে লাউ বিক্রি হতো ৩০ থেকে ৪০ টাকায়, সেই লাউ এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩ টাকায়। তাতেও মিলছে না ক্রেতা। উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, অনেক কৃষকের উঠছে না পরিবহণ খরচও।

বাধ্য হয়ে কেউ জমির পাশের সড়কে লাউ সাজিয়ে বিক্রি করছেন, আবার ক্রেতার অপেক্ষায় থেকে কেউ মাঠেই পচতে দেখছেন নিজের কষ্টের ফসল। ধারদেনা আর পুঁজি হারিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

এমন চিত্র কুড়িগ্রামের লাউ চাষিদের। ভালো দাম পাওয়ার আশায় জমি ভাড়া নিয়ে, সার-বীজ, কীটনাশক ও মাচা তৈরিতে হাজার হাজার টাকা বিনিয়োগ করে এখন চরম লোকসানে পড়েছেন তারা। অনেক কৃষকের নতুন করে অন্য ফসল আবাদ করার সামর্থ্যও নেই।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের শিবরাম গ্রামের কৃষক ফিরোজ আলমের ২০ শতক জমিতে লাউ চাষ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। জমি চাষ, চারা সংগ্রহ, সার, কীটনাশক ও মাচা তৈরিতে এই অর্থ ব্যয় করেছেন তিনি। অথচ এ পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ২০০ টাকা।

নিজের লোকসানের চিত্র তুলে ধরে ফিরোজ আলম বলেন, কয়েক দিন আগে কুড়িগ্রাম জিয়া বাজারের আড়তে ৩৬টি লাউ বিক্রি করেছেন মাত্র ১১০ টাকায়। এতে কোনোরকমে পরিবহণ খরচ মিটলেও যাতায়াত খরচ ওঠেনি। তার ধারণা, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লাউয়ের আবাদ বেশি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম পড়ে গেছে।

একই গ্রামের কৃষক খন্দকার এনামুল হকের লোকসানের চিত্র আরও ভয়াবহ। ৮০ শতক জমিতে লাউ চাষ করতে লক্ষাধিক টাকা খরচ করে এ পর্যন্ত বিক্রি করেছেন মাত্র চার হাজার টাকার লাউ। পাইকারি বাজারে প্রতি পিস লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে ৩ থেকে ৪ টাকায়।

পরিবহণ খরচ বাঁচাতে এখন জমির পাশের সড়কে লাউ তুলে রেখে প্রতি পিস পাঁচ টাকা দরে বিক্রির চেষ্টা করছেন তিনি। পথচারীদের কেউ কেউ কিনলেও চাহিদা নেই বললেই চলে। অবিক্রীত লাউ পড়ে থেকে পচে যাচ্ছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এনামুল বলেন, আমার পুঁজি সব শেষ। ধারদেনা আছে। তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারছি না। আমার কী হবে জানি না।

রাজারহাট উপজেলার দেবালয় গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়ার অবস্থাও একই। তিনি জানান, গত বছর জমি থেকেই প্রতি পিস লাউ ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করেছেন। সেই আশায় এবার ৩০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেন; কিন্তু এবার উৎপাদিত লাউ কেনার মতো ক্রেতাই পাচ্ছেন না।

একই গ্রামের সুরুজ মিয়াসহ অনেক কৃষক পড়েছেন লোকসানের মুখে। প্রতি একর জমি ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করেছেন অনেকে; কিন্তু উৎপাদিত ফসলের দাম না পাওয়ায় এখন ঋণগ্রস্ত তারা। লাউ চাষ শেষে আগাম আলু আবাদ করার পরিকল্পনা থাকলেও পুঁজি হারিয়ে অনেকের সেই স্বপ্নও থমকে গেছে।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিঠু চন্দ্র অধিকারী বলেন, গত বছর লাউয়ের দাম বেশি পাওয়ায় এ বছর কৃষকরা বেশি পরিমাণে লাউ চাষ করেছেন। এ কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম কমে গেছে। ভালো দাম পাওয়ার জন্য কৃষকদের আগাম সবজি চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

একদিকে খেতজুড়ে ফলন, অন্যদিকে বাজারে ক্রেতার অভাব—এই দুইয়ের চাপে কৃষকের ঘরে ফসল উঠলেও ফিরছে না বিনিয়োগের টাকা। যে লাউ তাদের আয়ের উৎস হওয়ার কথা, সেই লাউই এখন হয়ে উঠেছে লোকসানের বোঝা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

লাউ ৩ টাকা, তবুও পচছে মাঠেই

আপডেট টাইম : ১১:৪১:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

কখনো যে লাউ বিক্রি হতো ৩০ থেকে ৪০ টাকায়, সেই লাউ এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩ টাকায়। তাতেও মিলছে না ক্রেতা। উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, অনেক কৃষকের উঠছে না পরিবহণ খরচও।

বাধ্য হয়ে কেউ জমির পাশের সড়কে লাউ সাজিয়ে বিক্রি করছেন, আবার ক্রেতার অপেক্ষায় থেকে কেউ মাঠেই পচতে দেখছেন নিজের কষ্টের ফসল। ধারদেনা আর পুঁজি হারিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

এমন চিত্র কুড়িগ্রামের লাউ চাষিদের। ভালো দাম পাওয়ার আশায় জমি ভাড়া নিয়ে, সার-বীজ, কীটনাশক ও মাচা তৈরিতে হাজার হাজার টাকা বিনিয়োগ করে এখন চরম লোকসানে পড়েছেন তারা। অনেক কৃষকের নতুন করে অন্য ফসল আবাদ করার সামর্থ্যও নেই।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের শিবরাম গ্রামের কৃষক ফিরোজ আলমের ২০ শতক জমিতে লাউ চাষ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। জমি চাষ, চারা সংগ্রহ, সার, কীটনাশক ও মাচা তৈরিতে এই অর্থ ব্যয় করেছেন তিনি। অথচ এ পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ২০০ টাকা।

নিজের লোকসানের চিত্র তুলে ধরে ফিরোজ আলম বলেন, কয়েক দিন আগে কুড়িগ্রাম জিয়া বাজারের আড়তে ৩৬টি লাউ বিক্রি করেছেন মাত্র ১১০ টাকায়। এতে কোনোরকমে পরিবহণ খরচ মিটলেও যাতায়াত খরচ ওঠেনি। তার ধারণা, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লাউয়ের আবাদ বেশি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম পড়ে গেছে।

একই গ্রামের কৃষক খন্দকার এনামুল হকের লোকসানের চিত্র আরও ভয়াবহ। ৮০ শতক জমিতে লাউ চাষ করতে লক্ষাধিক টাকা খরচ করে এ পর্যন্ত বিক্রি করেছেন মাত্র চার হাজার টাকার লাউ। পাইকারি বাজারে প্রতি পিস লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে ৩ থেকে ৪ টাকায়।

পরিবহণ খরচ বাঁচাতে এখন জমির পাশের সড়কে লাউ তুলে রেখে প্রতি পিস পাঁচ টাকা দরে বিক্রির চেষ্টা করছেন তিনি। পথচারীদের কেউ কেউ কিনলেও চাহিদা নেই বললেই চলে। অবিক্রীত লাউ পড়ে থেকে পচে যাচ্ছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে এনামুল বলেন, আমার পুঁজি সব শেষ। ধারদেনা আছে। তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারছি না। আমার কী হবে জানি না।

রাজারহাট উপজেলার দেবালয় গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়ার অবস্থাও একই। তিনি জানান, গত বছর জমি থেকেই প্রতি পিস লাউ ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করেছেন। সেই আশায় এবার ৩০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেন; কিন্তু এবার উৎপাদিত লাউ কেনার মতো ক্রেতাই পাচ্ছেন না।

একই গ্রামের সুরুজ মিয়াসহ অনেক কৃষক পড়েছেন লোকসানের মুখে। প্রতি একর জমি ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করেছেন অনেকে; কিন্তু উৎপাদিত ফসলের দাম না পাওয়ায় এখন ঋণগ্রস্ত তারা। লাউ চাষ শেষে আগাম আলু আবাদ করার পরিকল্পনা থাকলেও পুঁজি হারিয়ে অনেকের সেই স্বপ্নও থমকে গেছে।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিঠু চন্দ্র অধিকারী বলেন, গত বছর লাউয়ের দাম বেশি পাওয়ায় এ বছর কৃষকরা বেশি পরিমাণে লাউ চাষ করেছেন। এ কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম কমে গেছে। ভালো দাম পাওয়ার জন্য কৃষকদের আগাম সবজি চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

একদিকে খেতজুড়ে ফলন, অন্যদিকে বাজারে ক্রেতার অভাব—এই দুইয়ের চাপে কৃষকের ঘরে ফসল উঠলেও ফিরছে না বিনিয়োগের টাকা। যে লাউ তাদের আয়ের উৎস হওয়ার কথা, সেই লাউই এখন হয়ে উঠেছে লোকসানের বোঝা।