আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ঘিরে তৎপরতা, প্রশ্নের মুখে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা
হাওর বার্তা, বিশেষ প্রতিবেদনঃ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো কি আবারও রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ আর তদবিরের কাছে জিম্মি হতে যাচ্ছে? অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে জনপ্রশাসনে এমনই নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়া এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত একাধিক কর্মকর্তা এবার পদোন্নতি নিশ্চিত করতে প্রভাবশালী মহলে জোর তদবির চালাচ্ছেন।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন এমন কর্মকর্তারাও, যাঁদের অতীত দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এবং সম্পদের বিবরণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের কেউ কেউ পদোন্নতির দৌড়ে এগিয়ে থাকতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ ও আধা সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) ওপর নির্ভর করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলো কি রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে বণ্টিত হবে, নাকি সততা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বই হবে পদোন্নতির একমাত্র মানদণ্ড?
ডিও লেটারে পদোন্নতির সুপারিশ, আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রশ্ন
স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব পরিমল সরকারকে ঘিরে পদোন্নতির তদবিরের একটি ঘটনা ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন পর্যায়ে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পদোন্নতির একটি প্রক্রিয়ায় তিনি বাদ পড়েন।
এবার অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেতে তাঁর পক্ষে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর কাছে পাঠানো একটি আধা সরকারি পত্রে পরিমল সরকারকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
ওই পত্রে তাঁকে সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, ২০০১ সাল থেকে তিনি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নেও তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৭ আগস্ট ওই পত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধসংবলিত মন্তব্য দেওয়া হয় বলে প্রাপ্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই সুপারিশকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি নিয়ে।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০ ধারায় চাকরিসংক্রান্ত কোনো দাবি আদায়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো বহিঃপ্রভাব খাটানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই বিধিমালার ২০ ধারায় নিজের পক্ষে হস্তক্ষেপের জন্য সংসদ সদস্য বা অন্য কোনো বেসরকারি ব্যক্তিকে অনুরোধ জানানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৫৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সরকারি স্মারকেও চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের কাছে তদবিরের বিরুদ্ধে নির্দেশনা রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি নিজের পদোন্নতির জন্য রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না?
পদোন্নতি কি যোগ্যতার পুরস্কার, নাকি ক্ষমতার পুরোনো সম্পর্কের প্রতিদান?
জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। অন্যদিকে দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন।
এখন সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বিপরীতে যদি পুরোনো রাজনৈতিক বলয়ের কর্মকর্তারা আবারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, তাহলে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম খান, আবুল বাশার, রওনক জাহান, উর্মি তামান্না ও মো. এনামুল হকের নাম আলোচনায় এসেছে। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের সদস্য অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকলেই তা অনিয়মের প্রমাণ নয়; পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও কর্মরেকর্ড আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
এ ছাড়া দিলারা বেগম, শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, এ কে এম শওকত আলম মজুমদার, গাজী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান কবির, মাহফুজা আখতার, আয়েশা হক, রিয়াসাত আল ওয়াসিফ, মো. শফিউল আলম, মো. ওসমান গনি, কাজী হাসান, তনিমা তাসমিন ও ড. মাহে আলমের নামও বিভিন্ন অভিযোগ ও অতীত দায়িত্ব পালনের সূত্রে আলোচনায় এসেছে।
এঁদের কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে প্রশ্ন ওঠার বিষয় থাকলে তা সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
জেলা প্রশাসক ছিলেন ৩০ কর্মকর্তা, ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের প্রায় ৩০ কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সময়ে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা তিন কর্মকর্তার নামও সামনে এসেছে। তাঁরা হলেন—সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক এম কাজী এমাদুল ইসলাম, ঢাকার সাবেক জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম এবং ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, এমন কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. আবদুল মতিন, কবীর মাহমুদ, মোহাম্মদ এনামুল হক, মাহমুদুল আলম, হারুন অর রশীদ, মামুনুর রশীদ, ড. সাবিনা ইয়াসমিন, ড. আতাউল গনি, আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন, প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস, জোহর আলী, শাহিদা সুলতানা, ড. ফারুক আহম্মদ, মোহাম্মদ কামরুল হাসান, হায়াত উদ দৌলা খান, দিলসাদ বেগম, এস এম মোস্তফা কামাল, আবু জাফর, মোস্তাইন বিল্লাহ, অতুল সরকার, মনিরুজ্জামান তালুকদার, আনজুমান আরা ও আসিব আহসানসহ আরও কয়েকজন।
অন্যদিকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের মধ্যেও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ এনামুল হক, আহমদ কবীর, আবু আলী মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, জাহিদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ কামরুল হাসান।
তবে শুধু জেলা প্রশাসক কিংবা একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তাঁদের দায়িত্ব পালনের সময়কার সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী ভূমিকা, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
পদোন্নতির আগে চাই কঠোর যাচাই
জনপ্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব পদটি কেবল একটি পদোন্নতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এ পদে যাঁরা আসবেন, তাঁদের সততা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়।
তাই অতীত সরকারের রাজনৈতিক আনুকূল্যে কেউ সুবিধা পেয়েছেন কি না, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে বিতর্কিত ভূমিকা ছিল কি না, দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে কি না এবং চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘন করে তদবির করেছেন কি না—এসব বিষয় যাচাই না করে পদোন্নতি দেওয়া হলে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সরকারের কাছে জনস্বার্থে কয়েকটি জরুরি দাবি
১. অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির আগে প্রত্যেক কর্মকর্তার সম্পূর্ণ চাকরির রেকর্ড, বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন, সততা, দক্ষতা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড যাচাই করতে হবে।
২. বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদায়ন, পদোন্নতি কিংবা বিশেষ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা নথিভিত্তিকভাবে তদন্ত করতে হবে।
৩. দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদোন্নতি বিষয়ে সতর্ক ও আইনসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
৪. চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিক তদবির বা ডিও লেটারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আচরণবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ নয়—যোগ্যতা, সততা, জ্যেষ্ঠতা ও কর্মদক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, প্রশাসনও কোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পুরস্কার বিতরণের ক্ষেত্র হতে পারে না। অতীতে যে কর্মকর্তারা রাজনৈতিক আনুকূল্যে সুবিধা পেয়েছেন, তাঁদের সবাইকে অযোগ্য কিংবা দুর্নীতিবাজ বলার সুযোগ নেই। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া হলে তা হবে প্রশাসনিক জবাবদিহির সঙ্গে আপস।
সরকারের কাছে প্রশ্ন—প্রশাসন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কি কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি এবার সত্যিকার অর্থেই যোগ্য, সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হবে?
প্রশাসনে পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাবের পুনর্বাসন নয়, চাই মেধা, সততা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পদোন্নতি। রাষ্ট্রের প্রশাসনকে দুর্নীতি ও তদবিরের বলয় থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
Reporter Name 





















