ঢাকা ০৫:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাওরের কান্না, হাওরের সম্ভাবনা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:০৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
  • ৯ বার

‘হাওর’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই মানুষের মনে বিচ্ছিন্ন এক ভাসমান ভূখণ্ডের কথা উদিত হয়, যেখানে জনগণ অতিকষ্টে জীবনযাপন করেন। কিন্তু একটু অন্যভাবে ভাবলেই দেখা যাবে, হাওর মানে সম্পদের খনি, হাওর মানে সম্ভাবনার পাহাড়। এখানে দু-এক মাস পরপরই সৌন্দর্যের ধারা বদলায়। বর্ষায় ঢেউয়ের পরে ঢেউ, আর শীত ও বসন্তে সবুজের সমারোহ- ধানের ক্ষেত, বিল, খাল, মাটির পথ আর জনপদ। এই অনন্য ভূপ্রকৃতির নাম হাওর।

কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া; উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের এই সাত জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে হাওরজীবনের বিস্তার। বাংলাদেশের হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলাকে হাওরাঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

হাওর শুধু একটি ভূপ্রকৃতি নয়; এটি একটি জীবনব্যবস্থা। এ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধান, মাছ, নৌকা, পাখি, বৃষ্টি, ঢেউ, গান, লোকসংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক দীর্ঘ সহাবস্থান। কিন্তু এই জীবন একই সঙ্গে অনিশ্চয়তায় ভরা। হাওরের মানুষের কাছে পানি কখনও আশীর্বাদ, কখনও অভিশাপ।

হাওরাঞ্চলের অর্থনীতির একটি বড় অংশ বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। বছরের একটি মাত্র প্রধান ফসল ঘরে তুলতে না পারলে কৃষকের ঘরে নেমে আসে অনিশ্চয়তা ও অনাহারের চাবুক। হাওরের মানুষ তাই শুধু কৃষক নন; তারা একই সঙ্গে মৎস্যজীবী, নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও নানা মৌসুমি পেশার সঙ্গে যুক্ত। মাছ হাওরের আরেকটি বড় সম্পদ। কিন্তু জলাভূমির পরিবেশ নষ্ট হওয়া, অতিরিক্ত আহরণ, মাছের প্রজননক্ষেত্রের ক্ষতি ও জলাশয়ে পলি জমার মতো কারণে মৎস্যসম্পদের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। হাওরাঞ্চল একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল; এখানে বিপুলসংখ্যক দেশি মাছ ও পরিযায়ী পাখির বিচরণ রয়েছে। অর্থাৎ হাওরের সংকট শুধু কৃষকের সংকট নয়; এটি খাদ্য, মৎস্য, পরিবেশ, জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতির সংকট।

হাওরের মানুষের আরেকটি বড় সমস্যা যাতায়াত। বর্ষায় যে পথ দিয়ে নৌকা চলে, শুষ্ক মৌসুমে সেখানে হয়তো হাঁটা যায়। আবার অনেক এলাকায় বছরের একটি বড় সময় যাতায়াতব্যবস্থা হয়ে পড়ে অত্যন্ত কঠিন। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার, প্রশাসনিক সেবা- সবকিছুতেই বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হয়। হাওরের জন্য সমতলের উন্নয়ন পরিকল্পনা হুবহু প্রয়োগ করলে সব সময় কাজ হয় না। এখানে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট কিংবা বাঁধ নির্মাণের সময় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, মাছের চলাচল, জলজ উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। হাওর উন্নয়নের মূল দর্শন হওয়া উচিত- প্রকৃতিকে পরাজিত করা নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের জীবনকে সহজ করা।

হাওর মানে শুধু সমস্যা নয়। সেখানে রয়েছে সম্ভাবনার নানা দিক। কৃষি ও মৎস্যের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হতে পারে পর্যটন। বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটের চা-বাগানের পরিচিতি অনেক বেশি। কিন্তু হাওর পর্যটন এখনও তুলনামূলকভাবে নতুন। অথচ এর নিজস্ব আকর্ষণ একেবারেই আলাদা।

বর্ষায় হাওর হয়ে ওঠে এক বিশাল জলাভূমি। নৌকায় বসে চারদিকে শুধু জলরাশি, দূরের গ্রাম, কোথাও মাছ ধরার নৌকা, কোথাও বৃষ্টি-মেঘ, কোথাও সূর্যাস্ত- এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অন্য কোনো পর্যটন অঞ্চলের সঙ্গে সহজে তুলনা করা যায় না। শীতকালে আবার হাওরের চরিত্র বদলে যায়। বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, ধানের খেত, বিলের পানি এবং পরিযায়ী পাখির সমাবেশ তৈরি করে আরেক ধরনের সৌন্দর্য।

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এ সম্ভাবনার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি এবং রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত। বর্ষায় এর বিস্তীর্ণ জলরাশি, শীতকালে সবুজ প্রান্তর ও পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনও টাঙ্গুয়ার হাওরকে সুনামগঞ্জের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে পর্যটন উন্নয়নের অর্থ যদি হয় শুধু বেশিসংখ্যক নৌকা, বড় বড় স্থাপনা এবং বেশি পর্যটক- তাহলে তা হাওরের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপও হতে পারে। টাঙ্গুয়ার মতো সংবেদনশীল জলাভূমিতে পর্যটন হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব, নিয়ন্ত্রিত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক। মৌলভীবাজার ও সিলেটের হাকালুকি হাওরও পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা বহন করে। এটিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর বিস্তীর্ণ জলাভূমি, বিল, মাছ ও পাখির বৈচিত্র?্য বর্ষা ও শীত- দুই ঋতুতেই ভিন্ন ভিন্ন পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও নিকলী এবং নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মদন, কলমাকান্দা ও মোহনগঞ্জ এলাকাকে ঘিরে যে হাওরভূমি, তার পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিস্তৃতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌ-ভ্রমণকে পর্যটনের আকর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরের বিশেষত্ব হলো- ঢাকার তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় এখানে স্বল্পমেয়াদি পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। একদিনের নৌভ্রমণ, দুই দিনের হাওরভ্রমণ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা, স্থানীয় খাবার, মাছ ধরা দেখা, গ্রামীণ জীবন প্রত্যক্ষ করা- এসবকে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি হতে পারে। এছাড়া হাওরের মাছ কেনা বা অষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনির কিনে ঢাকায় ফেরা হতে পারে অনেকের জন্য হাওর ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণ।

পর্যটন উন্নয়নের জন্য হাওরে একটি বড় চিন্তার সুযোগ রয়েছে। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি ‘হাওর পর্যটন সার্কিট’ হিসেবে উন্নত করা যেতে পারে।

সুনামগঞ্জে টাঙ্গুয়ার হাওর, মৌলভীবাজারে হাকালুকি, কিশোরগঞ্জে ইটনা-মিঠামইন-নিকলী- এসব হতে পারে পরিচিতি কেন্দ্র। এর সঙ্গে হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপযুক্ত হাওর, নদী, বিল, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ যুক্ত করা যেতে পারে। এসব এলাকায় হাওরকে ঘিরে নানাবিধ কৃষিজ ও লোকজ পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা, স্থানীয়ভাবে সারিগান, জারিগান, পালাগান, নাটক, লাঠিখেলা, পুতুল নাচ, পুথিপাঠ, কিসসা বলা ইত্যাদি প্রাচীন ঐতিহ্য ধারণ করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে বৈচিত্র সম্পন্ন খাবারেরও আয়োজন করা যেতে পারে। এসব থেকে হস্তশিল্পও বাদ যাবে না। তাহলে একজন পর্যটক শুধু একটি হাওর দেখে ফিরে যাবেন না। তিনি কয়েক দিনের একটি ভ্রমণ পরিকল্পনায় বিভিন্ন জেলার ভিন্ন ভিন্ন হাওর, নদী, খাবার, লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতি উপভোগ করতে পারবেন এবং কেনাকাটা করতে পারবেন। এতে পর্যটনের অর্থ শুধু হোটেল ব্যবসায়ীর কাছে যাবে না। উপকারভোগী হতে পারেন নৌকার মাঝি, স্থানীয় রেস্তোরাঁ, কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হস্তশিল্পী, তরুণ গাইড, সংস্কৃতিকর্মী এবং স্থানীয় পরিবহন মালিকরাও। বিশ্বব্যাংকের পর্যটনবিষয়ক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, পরিকল্পিত প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন স্থানীয় পরিবহন, খাবার, আবাসন, সাংস্কৃতিক সেবা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে আয় ছড়িয়ে দিতে পারে।

পর্যটন বাড়াতে গিয়ে হাওরের প্রকৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। হাওরে পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যদি প্লাস্টিকের বর্জ্য বাড়ে, পাখির আবাসস্থল নষ্ট হয়, মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অতিরিক্ত শব্দে জলজ প্রাণী ও পাখির জীবন ব্যাহত হয় কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে ওঠে, তাহলে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই হাওর পর্যটনের ভিত্তি হওয়া উচিত ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ করে পর্যটন।’

প্রতিটি পর্যটন এলাকায় নির্দিষ্ট নৌপথ, নির্দিষ্ট নোঙরস্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, সৌরবিদ্যুৎ, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড থাকা প্রয়োজন। নৌযানেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি নৌকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট রাখতে হবে এবং এগুলো ব্যবহার করতে পর্যটকদের বাধ্য করতে হবে।

হাওরের জন্য বড় বড় প্রকল্প দরকার হতে পারে। বাঁধ দরকার, যোগাযোগ দরকার, বাজার দরকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দরকার। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে থাকতে হবে হাওরের মানুষ। পর্যটন সেবা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের মালিকানায় অংশীদার করতে হবে। একজন স্থানীয় যুবক যদি পর্যটকদের নৌকায় নিয়ে গাইড করতে পারেন, একজন নারী যদি স্থানীয় খাবার বা হস্তশিল্প বিক্রি করতে পারেন, একজন জেলে যদি মাছ ধরার পাশাপাশি পর্যটনসেবায় যুক্ত হতে পারেন, একজন কৃষক যদি নিজের উৎপাদিত খাবার পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতে পারেন- তাহলে পর্যটন কেবল দর্শনীয় স্থান দেখানোর ব্যবসা থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে স্থানীয় অর্থনীতির নতুন ভিত্তি।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় হাওরকে এতদিন অনেকাংশে দেখা হয়েছে বন্যা, বাঁধ, কৃষি ও দারিদ্র্যের সমস্যা হিসেবে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো প্রয়োজন। হাওর অবশ্যই সংকটের জায়গা। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের জলজসম্পদের ভাণ্ডার, মৎস্যসম্পদের প্রাণকেন্দ্র, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল, কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এবং অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। বিশেষ করে পর্যটনের ক্ষেত্রে হাওরের সম্ভাবনা এখনও অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। আমরা হাওরের এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারব, যদি আমরা হাওরকে সম্পদ হিসেবে দেখি। সেক্ষেত্রে আমাদের নীতি হবে সংরক্ষণ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নকেন্দ্রিক।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি হাওর, যেখানে কৃষক তার ফসল নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকবেন, জেলে মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হবেন, শিশুরা বর্ষায়ও শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না এবং তরুণরা কাজের সন্ধানে শহরে ছুটে যেতে বাধ্য হবেন না। আর সেই হাওরে পর্যটক আসবেন- হাওরের প্রকৃতি দেখতে, নৌকায় ভাসতে, পাখি দেখতে, স্থানীয় খাবার খেতে, হাওরের মানুষের জীবন জানতে। তখন হাওরের জলরাশি শুধু কান্নার প্রতীক হবে না; হয়ে উঠবে সম্ভাবনারও প্রতীক। হাওরকে তাই আর বাংলাদেশের প্রান্তিক সমস্যা হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ভাণ্ডার হিসেবে দেখতে হবে।

মাহফুজুর রহমান : লেখক, প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

হাওরের কান্না, হাওরের সম্ভাবনা

আপডেট টাইম : ০১:০৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

‘হাওর’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই মানুষের মনে বিচ্ছিন্ন এক ভাসমান ভূখণ্ডের কথা উদিত হয়, যেখানে জনগণ অতিকষ্টে জীবনযাপন করেন। কিন্তু একটু অন্যভাবে ভাবলেই দেখা যাবে, হাওর মানে সম্পদের খনি, হাওর মানে সম্ভাবনার পাহাড়। এখানে দু-এক মাস পরপরই সৌন্দর্যের ধারা বদলায়। বর্ষায় ঢেউয়ের পরে ঢেউ, আর শীত ও বসন্তে সবুজের সমারোহ- ধানের ক্ষেত, বিল, খাল, মাটির পথ আর জনপদ। এই অনন্য ভূপ্রকৃতির নাম হাওর।

কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া; উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের এই সাত জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে হাওরজীবনের বিস্তার। বাংলাদেশের হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলাকে হাওরাঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

হাওর শুধু একটি ভূপ্রকৃতি নয়; এটি একটি জীবনব্যবস্থা। এ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধান, মাছ, নৌকা, পাখি, বৃষ্টি, ঢেউ, গান, লোকসংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক দীর্ঘ সহাবস্থান। কিন্তু এই জীবন একই সঙ্গে অনিশ্চয়তায় ভরা। হাওরের মানুষের কাছে পানি কখনও আশীর্বাদ, কখনও অভিশাপ।

হাওরাঞ্চলের অর্থনীতির একটি বড় অংশ বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। বছরের একটি মাত্র প্রধান ফসল ঘরে তুলতে না পারলে কৃষকের ঘরে নেমে আসে অনিশ্চয়তা ও অনাহারের চাবুক। হাওরের মানুষ তাই শুধু কৃষক নন; তারা একই সঙ্গে মৎস্যজীবী, নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও নানা মৌসুমি পেশার সঙ্গে যুক্ত। মাছ হাওরের আরেকটি বড় সম্পদ। কিন্তু জলাভূমির পরিবেশ নষ্ট হওয়া, অতিরিক্ত আহরণ, মাছের প্রজননক্ষেত্রের ক্ষতি ও জলাশয়ে পলি জমার মতো কারণে মৎস্যসম্পদের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। হাওরাঞ্চল একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল; এখানে বিপুলসংখ্যক দেশি মাছ ও পরিযায়ী পাখির বিচরণ রয়েছে। অর্থাৎ হাওরের সংকট শুধু কৃষকের সংকট নয়; এটি খাদ্য, মৎস্য, পরিবেশ, জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতির সংকট।

হাওরের মানুষের আরেকটি বড় সমস্যা যাতায়াত। বর্ষায় যে পথ দিয়ে নৌকা চলে, শুষ্ক মৌসুমে সেখানে হয়তো হাঁটা যায়। আবার অনেক এলাকায় বছরের একটি বড় সময় যাতায়াতব্যবস্থা হয়ে পড়ে অত্যন্ত কঠিন। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার, প্রশাসনিক সেবা- সবকিছুতেই বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হয়। হাওরের জন্য সমতলের উন্নয়ন পরিকল্পনা হুবহু প্রয়োগ করলে সব সময় কাজ হয় না। এখানে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট কিংবা বাঁধ নির্মাণের সময় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, মাছের চলাচল, জলজ উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। হাওর উন্নয়নের মূল দর্শন হওয়া উচিত- প্রকৃতিকে পরাজিত করা নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের জীবনকে সহজ করা।

হাওর মানে শুধু সমস্যা নয়। সেখানে রয়েছে সম্ভাবনার নানা দিক। কৃষি ও মৎস্যের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হতে পারে পর্যটন। বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটের চা-বাগানের পরিচিতি অনেক বেশি। কিন্তু হাওর পর্যটন এখনও তুলনামূলকভাবে নতুন। অথচ এর নিজস্ব আকর্ষণ একেবারেই আলাদা।

বর্ষায় হাওর হয়ে ওঠে এক বিশাল জলাভূমি। নৌকায় বসে চারদিকে শুধু জলরাশি, দূরের গ্রাম, কোথাও মাছ ধরার নৌকা, কোথাও বৃষ্টি-মেঘ, কোথাও সূর্যাস্ত- এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অন্য কোনো পর্যটন অঞ্চলের সঙ্গে সহজে তুলনা করা যায় না। শীতকালে আবার হাওরের চরিত্র বদলে যায়। বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, ধানের খেত, বিলের পানি এবং পরিযায়ী পাখির সমাবেশ তৈরি করে আরেক ধরনের সৌন্দর্য।

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এ সম্ভাবনার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি এবং রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত। বর্ষায় এর বিস্তীর্ণ জলরাশি, শীতকালে সবুজ প্রান্তর ও পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনও টাঙ্গুয়ার হাওরকে সুনামগঞ্জের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে পর্যটন উন্নয়নের অর্থ যদি হয় শুধু বেশিসংখ্যক নৌকা, বড় বড় স্থাপনা এবং বেশি পর্যটক- তাহলে তা হাওরের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপও হতে পারে। টাঙ্গুয়ার মতো সংবেদনশীল জলাভূমিতে পর্যটন হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব, নিয়ন্ত্রিত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক। মৌলভীবাজার ও সিলেটের হাকালুকি হাওরও পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা বহন করে। এটিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর বিস্তীর্ণ জলাভূমি, বিল, মাছ ও পাখির বৈচিত্র?্য বর্ষা ও শীত- দুই ঋতুতেই ভিন্ন ভিন্ন পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও নিকলী এবং নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মদন, কলমাকান্দা ও মোহনগঞ্জ এলাকাকে ঘিরে যে হাওরভূমি, তার পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিস্তৃতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌ-ভ্রমণকে পর্যটনের আকর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরের বিশেষত্ব হলো- ঢাকার তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় এখানে স্বল্পমেয়াদি পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। একদিনের নৌভ্রমণ, দুই দিনের হাওরভ্রমণ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা, স্থানীয় খাবার, মাছ ধরা দেখা, গ্রামীণ জীবন প্রত্যক্ষ করা- এসবকে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি হতে পারে। এছাড়া হাওরের মাছ কেনা বা অষ্টগ্রামের বিখ্যাত পনির কিনে ঢাকায় ফেরা হতে পারে অনেকের জন্য হাওর ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণ।

পর্যটন উন্নয়নের জন্য হাওরে একটি বড় চিন্তার সুযোগ রয়েছে। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি ‘হাওর পর্যটন সার্কিট’ হিসেবে উন্নত করা যেতে পারে।

সুনামগঞ্জে টাঙ্গুয়ার হাওর, মৌলভীবাজারে হাকালুকি, কিশোরগঞ্জে ইটনা-মিঠামইন-নিকলী- এসব হতে পারে পরিচিতি কেন্দ্র। এর সঙ্গে হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপযুক্ত হাওর, নদী, বিল, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ যুক্ত করা যেতে পারে। এসব এলাকায় হাওরকে ঘিরে নানাবিধ কৃষিজ ও লোকজ পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা, স্থানীয়ভাবে সারিগান, জারিগান, পালাগান, নাটক, লাঠিখেলা, পুতুল নাচ, পুথিপাঠ, কিসসা বলা ইত্যাদি প্রাচীন ঐতিহ্য ধারণ করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে বৈচিত্র সম্পন্ন খাবারেরও আয়োজন করা যেতে পারে। এসব থেকে হস্তশিল্পও বাদ যাবে না। তাহলে একজন পর্যটক শুধু একটি হাওর দেখে ফিরে যাবেন না। তিনি কয়েক দিনের একটি ভ্রমণ পরিকল্পনায় বিভিন্ন জেলার ভিন্ন ভিন্ন হাওর, নদী, খাবার, লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতি উপভোগ করতে পারবেন এবং কেনাকাটা করতে পারবেন। এতে পর্যটনের অর্থ শুধু হোটেল ব্যবসায়ীর কাছে যাবে না। উপকারভোগী হতে পারেন নৌকার মাঝি, স্থানীয় রেস্তোরাঁ, কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হস্তশিল্পী, তরুণ গাইড, সংস্কৃতিকর্মী এবং স্থানীয় পরিবহন মালিকরাও। বিশ্বব্যাংকের পর্যটনবিষয়ক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, পরিকল্পিত প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন স্থানীয় পরিবহন, খাবার, আবাসন, সাংস্কৃতিক সেবা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে আয় ছড়িয়ে দিতে পারে।

পর্যটন বাড়াতে গিয়ে হাওরের প্রকৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। হাওরে পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যদি প্লাস্টিকের বর্জ্য বাড়ে, পাখির আবাসস্থল নষ্ট হয়, মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অতিরিক্ত শব্দে জলজ প্রাণী ও পাখির জীবন ব্যাহত হয় কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে ওঠে, তাহলে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই হাওর পর্যটনের ভিত্তি হওয়া উচিত ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ করে পর্যটন।’

প্রতিটি পর্যটন এলাকায় নির্দিষ্ট নৌপথ, নির্দিষ্ট নোঙরস্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, সৌরবিদ্যুৎ, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড থাকা প্রয়োজন। নৌযানেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি নৌকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট রাখতে হবে এবং এগুলো ব্যবহার করতে পর্যটকদের বাধ্য করতে হবে।

হাওরের জন্য বড় বড় প্রকল্প দরকার হতে পারে। বাঁধ দরকার, যোগাযোগ দরকার, বাজার দরকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দরকার। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে থাকতে হবে হাওরের মানুষ। পর্যটন সেবা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের মালিকানায় অংশীদার করতে হবে। একজন স্থানীয় যুবক যদি পর্যটকদের নৌকায় নিয়ে গাইড করতে পারেন, একজন নারী যদি স্থানীয় খাবার বা হস্তশিল্প বিক্রি করতে পারেন, একজন জেলে যদি মাছ ধরার পাশাপাশি পর্যটনসেবায় যুক্ত হতে পারেন, একজন কৃষক যদি নিজের উৎপাদিত খাবার পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতে পারেন- তাহলে পর্যটন কেবল দর্শনীয় স্থান দেখানোর ব্যবসা থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে স্থানীয় অর্থনীতির নতুন ভিত্তি।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় হাওরকে এতদিন অনেকাংশে দেখা হয়েছে বন্যা, বাঁধ, কৃষি ও দারিদ্র্যের সমস্যা হিসেবে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো প্রয়োজন। হাওর অবশ্যই সংকটের জায়গা। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের জলজসম্পদের ভাণ্ডার, মৎস্যসম্পদের প্রাণকেন্দ্র, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল, কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এবং অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। বিশেষ করে পর্যটনের ক্ষেত্রে হাওরের সম্ভাবনা এখনও অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। আমরা হাওরের এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারব, যদি আমরা হাওরকে সম্পদ হিসেবে দেখি। সেক্ষেত্রে আমাদের নীতি হবে সংরক্ষণ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নকেন্দ্রিক।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি হাওর, যেখানে কৃষক তার ফসল নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকবেন, জেলে মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হবেন, শিশুরা বর্ষায়ও শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না এবং তরুণরা কাজের সন্ধানে শহরে ছুটে যেতে বাধ্য হবেন না। আর সেই হাওরে পর্যটক আসবেন- হাওরের প্রকৃতি দেখতে, নৌকায় ভাসতে, পাখি দেখতে, স্থানীয় খাবার খেতে, হাওরের মানুষের জীবন জানতে। তখন হাওরের জলরাশি শুধু কান্নার প্রতীক হবে না; হয়ে উঠবে সম্ভাবনারও প্রতীক। হাওরকে তাই আর বাংলাদেশের প্রান্তিক সমস্যা হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ভাণ্ডার হিসেবে দেখতে হবে।

মাহফুজুর রহমান : লেখক, প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক