ঢাকা ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এআই সুপারপাওয়ার হওয়ার দৌড়: আলুর রাজধানী থেকে তৈরি হচ্ছে চীনের ‘ডিজিটাল সাম্রাজ্য’

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৩১:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৬৯ বার

চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার উলাঙ্কাব অঞ্চলটি এতদিন পরিচিত ছিল দেশের “আলুর রাজধানী” হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে বিস্তৃত সেই আলু ক্ষেতের পাশেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে সারি সারি বিশালাকার রেক্ট্যাঙ্গুলার ভবন—যেগুলো চীনকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিশ্বে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।

উলাঙ্কাবের বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে এখন শুধুই কর্মচাঞ্চল্য। শত শত নির্মাণ শ্রমিক ভারী যন্ত্রপাতি বহন করছেন, আর আকাশে উড়ছে বিশাল সব ক্রেন। কাজের গতি দেখে এক প্রকৌশলী হাসতে হাসতে বললেন, “এটাই চীনের গতি (China Speed)। আমরা তো অবকাঠামো তৈরির পাগল!” ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৯৯ শতাংশ শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনে এআই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার যে বিশাল পরিকল্পনা করেছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, এই ডেটা সেন্টারগুলো তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাত ও প্রযুক্তির লড়াই
উলাঙ্কাব, নিংশিয়া, গ্যানসু এবং গুইঝৌ-এর মতো অপেক্ষাকৃত শীতল ও কম জনবহুল অঞ্চলগুলোতে হুয়াওয়ে, বাইটড্যান্স এবং ডিপসিকের মতো টেক জায়ান্টদের জন্য শত শত ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই অবকাঠামোগত বিপ্লব ঘটছে, যখন ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এআই নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা নিয়ে বৈঠকে বসছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের ভয়, চীন যেভাবে এআই ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তা তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের এই আশঙ্কাকে “স্নায়ুযুদ্ধের পুরোনো মানসিকতা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বেইজিং এখন শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে দৌড়াচ্ছে না, বরং একটি ভিন্ন মডেল দাঁড় করাচ্ছে—ওপেন-সোর্স এআই, যা কম খরচে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন দেশ নিজেদের মতো ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে মার্কিন চিপ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন দ্রুত উদ্ভাবন নিশ্চিত করতে পারছে।

মেধার প্রত্যাবর্তন ও সবুজ শক্তির ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এখন অনেক তরুণ চীনা গবেষক ও প্রকৌশলী আমেরিকা ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে আসছেন। ইয়েল ও কেমব্রিজে পড়াশোনা করা চীনা গবেষক জ্যাক ঝাং বলেন, “বিদেশে কাজের সম্পদ বা সরকারের সরাসরি সহায়তা পাওয়া কঠিন। চীনে সেই সুযোগ অনেক বেশি।” চীন প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ সায়েন্স ও টেকনোলজি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ।

এছাড়া এসব ডেটা সেন্টারের বিশাল বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বাতাস ও সৌরশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এখনও অনেক জায়গায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা রয়েছে এবং পানির সংকট নিয়ে কিছু পরিবেশগত উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
প্রযুক্তির এই জোয়ারে যেমন স্বপ্ন আছে, তেমনি রয়েছে একশ্রেণীর মানুষের সংশয়। ডেটা সেন্টারের জন্য অনেককে বসতভিটা ছাড়তে হলেও স্থানীয়রা সরাসরি কোনো সুবিধা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ অনেকের।

আলু ক্ষেতে কর্মরত ঝাং নামের এক প্রবীণ কৃষক গর্ব করে বলেন, “চীন এখন বিশ্বের শীর্ষে। আমার সন্তানরা এখানে কাজ পেয়েছে।” কিন্তু ভেড়া চড়াতে যাওয়া অন্য এক বয়স্ক কৃষক ক্ষোভের সাথে বলেন, “বিগ ডেটা বা এআই—এসব সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসে না। আমার ভাঙা ফোনে ইন্টারনেটের দাম দেওয়া ছাড়া কোনো পরিবর্তন আসেনি।”

সব মিলিয়ে, চীনের অর্থনীতি বর্তমানে কিছুটা ধীরগতির হলেও এবং সাধারণ জনগণের এক অংশের মাঝে হতাশা থাকলেও, শি জিনপিংয়ের বিশ্বজয়ের এই প্রযুক্তি-সংগ্রাম দমানো কঠিন। উলাঙ্কাবের এই বিশাল ডেটা সেন্টারগুলোই বলে দিচ্ছে—ভবিষ্যতের এআই দুনিয়ায় চীন তার আধিপত্য ধরে রাখতে পুরোপুরি প্রস্তুত। সূত্র: বিবিসি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

এআই সুপারপাওয়ার হওয়ার দৌড়: আলুর রাজধানী থেকে তৈরি হচ্ছে চীনের ‘ডিজিটাল সাম্রাজ্য’

আপডেট টাইম : ১১:৩১:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার উলাঙ্কাব অঞ্চলটি এতদিন পরিচিত ছিল দেশের “আলুর রাজধানী” হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে বিস্তৃত সেই আলু ক্ষেতের পাশেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে সারি সারি বিশালাকার রেক্ট্যাঙ্গুলার ভবন—যেগুলো চীনকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিশ্বে শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।

উলাঙ্কাবের বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে এখন শুধুই কর্মচাঞ্চল্য। শত শত নির্মাণ শ্রমিক ভারী যন্ত্রপাতি বহন করছেন, আর আকাশে উড়ছে বিশাল সব ক্রেন। কাজের গতি দেখে এক প্রকৌশলী হাসতে হাসতে বললেন, “এটাই চীনের গতি (China Speed)। আমরা তো অবকাঠামো তৈরির পাগল!” ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৯৯ শতাংশ শিল্প ও দৈনন্দিন জীবনে এআই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার যে বিশাল পরিকল্পনা করেছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, এই ডেটা সেন্টারগুলো তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাত ও প্রযুক্তির লড়াই
উলাঙ্কাব, নিংশিয়া, গ্যানসু এবং গুইঝৌ-এর মতো অপেক্ষাকৃত শীতল ও কম জনবহুল অঞ্চলগুলোতে হুয়াওয়ে, বাইটড্যান্স এবং ডিপসিকের মতো টেক জায়ান্টদের জন্য শত শত ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই অবকাঠামোগত বিপ্লব ঘটছে, যখন ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এআই নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা নিয়ে বৈঠকে বসছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের ভয়, চীন যেভাবে এআই ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, তা তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের এই আশঙ্কাকে “স্নায়ুযুদ্ধের পুরোনো মানসিকতা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বেইজিং এখন শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে দৌড়াচ্ছে না, বরং একটি ভিন্ন মডেল দাঁড় করাচ্ছে—ওপেন-সোর্স এআই, যা কম খরচে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন দেশ নিজেদের মতো ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে মার্কিন চিপ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন দ্রুত উদ্ভাবন নিশ্চিত করতে পারছে।

মেধার প্রত্যাবর্তন ও সবুজ শক্তির ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এখন অনেক তরুণ চীনা গবেষক ও প্রকৌশলী আমেরিকা ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে আসছেন। ইয়েল ও কেমব্রিজে পড়াশোনা করা চীনা গবেষক জ্যাক ঝাং বলেন, “বিদেশে কাজের সম্পদ বা সরকারের সরাসরি সহায়তা পাওয়া কঠিন। চীনে সেই সুযোগ অনেক বেশি।” চীন প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ সায়েন্স ও টেকনোলজি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ।

এছাড়া এসব ডেটা সেন্টারের বিশাল বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বাতাস ও সৌরশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এখনও অনেক জায়গায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা রয়েছে এবং পানির সংকট নিয়ে কিছু পরিবেশগত উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
প্রযুক্তির এই জোয়ারে যেমন স্বপ্ন আছে, তেমনি রয়েছে একশ্রেণীর মানুষের সংশয়। ডেটা সেন্টারের জন্য অনেককে বসতভিটা ছাড়তে হলেও স্থানীয়রা সরাসরি কোনো সুবিধা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ অনেকের।

আলু ক্ষেতে কর্মরত ঝাং নামের এক প্রবীণ কৃষক গর্ব করে বলেন, “চীন এখন বিশ্বের শীর্ষে। আমার সন্তানরা এখানে কাজ পেয়েছে।” কিন্তু ভেড়া চড়াতে যাওয়া অন্য এক বয়স্ক কৃষক ক্ষোভের সাথে বলেন, “বিগ ডেটা বা এআই—এসব সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসে না। আমার ভাঙা ফোনে ইন্টারনেটের দাম দেওয়া ছাড়া কোনো পরিবর্তন আসেনি।”

সব মিলিয়ে, চীনের অর্থনীতি বর্তমানে কিছুটা ধীরগতির হলেও এবং সাধারণ জনগণের এক অংশের মাঝে হতাশা থাকলেও, শি জিনপিংয়ের বিশ্বজয়ের এই প্রযুক্তি-সংগ্রাম দমানো কঠিন। উলাঙ্কাবের এই বিশাল ডেটা সেন্টারগুলোই বলে দিচ্ছে—ভবিষ্যতের এআই দুনিয়ায় চীন তার আধিপত্য ধরে রাখতে পুরোপুরি প্রস্তুত। সূত্র: বিবিসি।