ঢাকা ০১:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্দরজটে তেল সঙ্কট

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:২৭:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার

চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের রীতিমত জট সৃষ্টি হলেও তেল খালাস চলছে গৎবাধা নিয়মে। কোন কোন জাহাজ তেল খালাসের জন্য ছয়দিন ধরে বহির্নোঙরে অপেক্ষায় আছে। এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানিবাহী ১১টি জাহাজ এসেছে। তার মধ্যে ১০টিতে রয়েছে ডিজেল ও বিমান জ্বালানি জেট ফুয়েল। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানির চরম সঙ্কটের মধ্যে একযোগে এতো বেশি সংখ্যক তেলের জাহাজ আসলেও খালাস দ্রুত শেষ করতে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির।

এক্ষেত্রে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঠিক গাইডলাইনের অভাব তথা সীমাহীন ব্যর্থতা ও নির্লিপ্ততায় সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে এ চরম সঙ্কট মুহূর্তে চড়াদামে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল খালাসকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ছিল জরুরি। পরিস্থিতি বিবেচনায় সার্বক্ষণিক খালাস প্রক্রিয়া বজায় রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তার কোনটিই করা হয়নি। সরকারের তরফে জ্বালানি তেলের সঙ্কট মোকাবেলায় নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে একটি সংসদীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে। অথচ জ্বালানি তেল আমদানি ও খালাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সমন্বিত কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিপিসির তেল খালাসের তিনটি জেটি সার্বক্ষণিক চালু রাখারও কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এর ফলে দুর্যোগকালীন সময়েও জ¦ালানি তেল নিয়ে আসা জাহাজগুলোকে বহির্নোঙ্গরে অলস সময় কাটাতে হচ্ছে।
দেশে জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের জন্য হাহাকার চলছে। ডিজেল সঙ্কটে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প কারখানায় উৎপাদন, নৌপথে পণ্য পরিবহন, সেচ এবং পরিবহন খাতে সঙ্কট চলছে। এ সঙ্কট নিরসনে ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেই। সঙ্কটকালীন সময়েও পুরোনো পথে হাঁটছে বিপিসি। এ কারণে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল কিনেও তার সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত দুই মাসে দেশে ক্রুড অয়েলের কোন চালান আসেনি। অপরিশোধিত তেলের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ণ রিফাইনারি। এ প্রতিষ্ঠানটি দিনে চার হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে আসছিল। পরিশোধন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাহিদার পুরো জ¦ালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় জ্বালানি তেল মজুদ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উচ্চমূল্যে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়িয়েছে সরকার। গত এক সপ্তাহ ধরে অকটেন, পেট্রোল এবং ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর কারণে সারা দেশে তেলের সঙ্কট কিছুটা হলেও কমেছে। চাহিদার ৮০ শতাংশ পেট্রোল এবং অকটেন দেশে উৎপাদন হয়। ফলে এ দুটি জ্বালানি পণ্য নিয়ে সরকারের চিন্তা কম। কিন্তু মূল উদ্বেগ ডিজেল নিয়ে। অথচ সাগরে ট্যাঙ্কার ভর্তি ডিজেল অলস পড়ে রয়েছে।

জ্বালানি তেল খালাসে বিপিসির এমন উদাসীনতার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোন কর্মকর্তা মুখ খুলতে রাজি হননি। বিপিসির চেয়ারম্যানসহ একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন করেও কোন সাড়া মেলেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, জরুরি প্রয়োজনে বিপিসির তেল খালাসের কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেই। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একসঙ্গে দুটির বেশি জাহাজ থেকে তেল খালাস করা সম্ভব হয় না। এরপরও পরিস্থিতি সামাল দিতে ডলফিন জেটির তিনটিতেই বর্তমানে তেল খালাস চলছে।
জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি (ব্যাকবোন ফুয়েল) হচ্ছে ডিজেল। সরকারি তথ্য মতে দেশে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা ৬৫ লাখ থেকে ৬৮ লাখ টন। এরমধ্যে ডিজেলের একক চাহিদা বছরে প্রায় ৪৪ লাখ টন। অর্থাৎ মোট আমদানি জ্বালানি তেলের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই ডিজেল প্রয়োজন। সর্বাধিক ব্যবহৃত জ্বালানি এই ডিজেল বর্তমানে মজুত আছে প্রায় এক লাখ টন; যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন তলানিতে ঠেকেছে। এতে মাত্র এক সপ্তাহ কিংবা তার চেয়েও কম সময়ে ফুরিয়ে যাবে ডিজেল।

তবে চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজেলবাহী জাহাজের সারি কিছুটা আশার আলো দেখালেও খালাস প্রক্রিয়ায় ধীরগতিতে উদ্বেগ বাড়ছে। বন্দরের বহির্নোঙ্গরে ডিজেল নিয়ে জাহাজের অপেক্ষা বাড়ছে। যদিও বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে, জ্বালানি তেলবাহী জাহাজে কোন জট নেই বলে দাবি করা হচ্ছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ডলফিন জেটিতে তিনটি এবং বহির্নোঙ্গরে সাতটি মিলে এ মুহূর্তে ১০টি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ রয়েছে। বহির্নোঙ্গরে মাদার ট্যাঙ্কার থেকে লাইটারিং করে জ্বালানি তেল খালাস হচ্ছে। একসাথে বন্দরের জেটি এবং বহির্নোঙ্গরে বেশ কয়েকটি জাহাজ থাকলেও জাহাজ জট নেই দাবি করে তিনি বলেন, কোন জাহাজ অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করছে এরকম কোন রিপোর্ট আমাদের কাছে নেই। এ পর্যন্ত জ্বালানিবাহী যতগুলো জাহাজ বন্দরে এসেছে সবগুলোকে বার্থিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বন্দরের তথ্য বলছে, গত ১৭ এপ্রিল থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বন্দরে জ্বালানিবাহী ১১টি ট্যাঙ্কার ভিড়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ডিজেলবাহী এবং একটি জেট ফুয়েলবাহী ট্যাঙ্কার রয়েছে। জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোর লোকাল এজেন্ট প্রাইড শিপিংয়ের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিনে আসা জ¦ালানিবাহী ট্যাঙ্কারের মধ্যে দুটি লাইটারেজ ট্যাঙ্কার আর বাকিগুলো মাদার ট্যাঙ্কার। এর মধ্যে কয়েকটি মাদার ট্যাঙ্কার জ্বালানি তেল খালাস শেষে চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করেছে। আরও কয়েকটি বন্দরে অবস্থান করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরপর তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিএসপি, ইউনিপ্যাক এবং ভিটল বেশ কয়েকটি তেলের পার্সেল (জাহাজ) বাতিল বা সরবরাহের সূচি পরিবর্তন করে। ওই তিনটি কোম্পানি পার্সেলগুলো সরবরাহ দিচ্ছে। এ কারণে এখন একসঙ্গে তেলবাহী আটটি জাহাজ এসেছে। যার মধ্যে সাতটি চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে এবং একটি বুধবার নোঙ্গর করবে। প্রায় আড়াই লাখ টন জ্বালানি তেলবোঝাই সাতটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে কোনো কোনো জাহাজ তেল খালাসের জন্য ছয় দিন ধরে বহির্নোঙরে অপেক্ষায় আছে।

জানা গেছে, মাদার ট্যাঙ্কারগুলো ধারণক্ষমতার চেয়ে কম তেল নিয়ে বহির্নোঙ্গরে আসে। এসব জাহাজ ডলফিন জেটিতে নোঙ্গর করার সুযোগ না থাকায় ছোট জাহাজে লাইটারিং করে সেই তেল ডলফিন জেটিতে বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা-মেঘনা-যমুনার ডিপোতে খালাস করা হচ্ছে। এতে তেল খালাসে বেশি সময় লাগছে। যে কয়টি ছোট জাহাজ তেল নিয়ে এসেছে সেগুলো সরাসরি ডলফিন জেটিতে তেল খালাস করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ভিটলের জাহাজ এমটি কুইটা ২৩ এপ্রিল ৩৩ হাজার ৪০০ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে বন্দরে ভিড়ে। এটিকে বার্থিং করা হয় ২৫ এপ্রিল। ভিটলের আরও একটি জাহাজ এমটি প্রিভি এনজেল ৩৫ হাজার ৫৫ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে ২৪ এপ্রিল বহির্নোঙরে আসে। এ দুটি থেকে লাইটারেজের মাধ্যমে তেল খালাস করা হচ্ছে। ভিটলের আরও একটি পার্সেল এমটি লিয়ান সন-হু ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেল নিয়ে ১৭ এপ্রিল দেশের নৌসীমায় আসে। এর সব তেল এমটি গ্রেড প্রিন্সেস নামে অন্য একটি জাহাজে লোড করে রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে বার্থিং করা হয়। এখন সেই জাহাজ থেকে তেল খালাস করা হচ্ছে।

জানা গেছে, বিপিসিতে তেল সরবরাহকারী ইন্দোনেশিয়ান প্রতিষ্ঠান বিএসপির জাহাজ এমটি এফপিএমসি ৩৪ হাজার ৩৫৩ টন ডিজেল নিয়ে ২০ এপ্রিল বন্দরের বহির্নোঙ্গরে আসে। এ জাহাজ থেকে কবে নাগাদ তেল খালাস করা হবে তার সময় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এমটি হাফনিয়া চিটাম ৩৩ হাজার ৪০৫ টন ডিজেল নিয়ে ২১ এপ্রিল বহির্নোঙ্গরে আসে। এ জাহাজ থেকেও তেল খালাসের তারিখ নির্ধারণ হয়নি বলে জানা গেছে। বিএসপির ৯ হাজার ৯৭৪ টন ডিজেল নিয়ে আরও একটি জাহাজ এমটি হাফনিয়া মারলিন বহির্নোঙ্গরে আসবে আজ। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভিটলের ২৬ হাজার ৫১৮ টনের অকটেনবাহী জাহাজ বহির্নোঙ্গরে ভিড়বে আগামীকাল।

এদিকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডিজেলের জন্য হাহাকার চলছে। দেশে ডিজেলের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন। তদুপরি ইরি-বোরো সেচযন্ত্র চালানোসহ বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বিভিন্ন খাতে এপ্রিল মাসেই ডিজেলের চাহিদা সারা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পায়। যার পরিমাণ অন্তত চার লাখ টন। এ মাসে ডিজেল ক্রয়-বিক্রয় গতবছরের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি না পেয়ে মজুত সঙ্কটে বরং কমেছে। বর্তমানে ডিজেলের নিরাপদ মজুত দূরের কথা; বাফার স্টক এমনকি আপৎকালীন মজুতও কমে গেছে। বন্দরে খালাস প্রক্রিয়া ধীরগতির ফলে ডিজেলের সরবরাহ চেইন বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে ভরা গ্রীষ্ম ও শুষ্ক মৌসুমে বৈশাখের তীব্র তাপদাহ, খরার কবলে ফল-ফসলি জমি ফেটে ইতঃমধ্যে চৌচির হয়ে গেছে। ইরি-বোরোর উঠতি ফসলি জমিতে পানি সেচের জন্য ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র চালাতে ডিজেলের চাহিদা পূরণে কৃষকরা মুখিয়ে আছেনÑ কবে মিলবে সেই কাক্সিক্ষত ডিজেল। গত ১৯ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে সরকার বিভিন্ন গ্রেডের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বা সমন্বয় কার্যকর করে। তাতে ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি আগের একশ’ টাকা থেকে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকায় ধার্য্য হয়েছে। বাড়তি দামেও ডিজেল না পাওয়ায় লাইটারেজ জাহাজসহ নৌপথে পণ্য পরিবহন বিঘিœত হচ্ছে। বিপিসির তরফে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত দেশে ২৬টি জাহাজে আট লাখ ২৩ হাজার ১৭০ টন ডিজেল আমদানি হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বন্দরজটে তেল সঙ্কট

আপডেট টাইম : ১২:২৭:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের রীতিমত জট সৃষ্টি হলেও তেল খালাস চলছে গৎবাধা নিয়মে। কোন কোন জাহাজ তেল খালাসের জন্য ছয়দিন ধরে বহির্নোঙরে অপেক্ষায় আছে। এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানিবাহী ১১টি জাহাজ এসেছে। তার মধ্যে ১০টিতে রয়েছে ডিজেল ও বিমান জ্বালানি জেট ফুয়েল। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানির চরম সঙ্কটের মধ্যে একযোগে এতো বেশি সংখ্যক তেলের জাহাজ আসলেও খালাস দ্রুত শেষ করতে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির।

এক্ষেত্রে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঠিক গাইডলাইনের অভাব তথা সীমাহীন ব্যর্থতা ও নির্লিপ্ততায় সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে এ চরম সঙ্কট মুহূর্তে চড়াদামে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল খালাসকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ছিল জরুরি। পরিস্থিতি বিবেচনায় সার্বক্ষণিক খালাস প্রক্রিয়া বজায় রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তার কোনটিই করা হয়নি। সরকারের তরফে জ্বালানি তেলের সঙ্কট মোকাবেলায় নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে একটি সংসদীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে। অথচ জ্বালানি তেল আমদানি ও খালাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সমন্বিত কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিপিসির তেল খালাসের তিনটি জেটি সার্বক্ষণিক চালু রাখারও কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এর ফলে দুর্যোগকালীন সময়েও জ¦ালানি তেল নিয়ে আসা জাহাজগুলোকে বহির্নোঙ্গরে অলস সময় কাটাতে হচ্ছে।
দেশে জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেলের জন্য হাহাকার চলছে। ডিজেল সঙ্কটে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প কারখানায় উৎপাদন, নৌপথে পণ্য পরিবহন, সেচ এবং পরিবহন খাতে সঙ্কট চলছে। এ সঙ্কট নিরসনে ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেই। সঙ্কটকালীন সময়েও পুরোনো পথে হাঁটছে বিপিসি। এ কারণে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল কিনেও তার সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত দুই মাসে দেশে ক্রুড অয়েলের কোন চালান আসেনি। অপরিশোধিত তেলের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ণ রিফাইনারি। এ প্রতিষ্ঠানটি দিনে চার হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে আসছিল। পরিশোধন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাহিদার পুরো জ¦ালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় জ্বালানি তেল মজুদ এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উচ্চমূল্যে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়িয়েছে সরকার। গত এক সপ্তাহ ধরে অকটেন, পেট্রোল এবং ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর কারণে সারা দেশে তেলের সঙ্কট কিছুটা হলেও কমেছে। চাহিদার ৮০ শতাংশ পেট্রোল এবং অকটেন দেশে উৎপাদন হয়। ফলে এ দুটি জ্বালানি পণ্য নিয়ে সরকারের চিন্তা কম। কিন্তু মূল উদ্বেগ ডিজেল নিয়ে। অথচ সাগরে ট্যাঙ্কার ভর্তি ডিজেল অলস পড়ে রয়েছে।

জ্বালানি তেল খালাসে বিপিসির এমন উদাসীনতার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোন কর্মকর্তা মুখ খুলতে রাজি হননি। বিপিসির চেয়ারম্যানসহ একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন করেও কোন সাড়া মেলেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, জরুরি প্রয়োজনে বিপিসির তেল খালাসের কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেই। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একসঙ্গে দুটির বেশি জাহাজ থেকে তেল খালাস করা সম্ভব হয় না। এরপরও পরিস্থিতি সামাল দিতে ডলফিন জেটির তিনটিতেই বর্তমানে তেল খালাস চলছে।
জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি (ব্যাকবোন ফুয়েল) হচ্ছে ডিজেল। সরকারি তথ্য মতে দেশে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা ৬৫ লাখ থেকে ৬৮ লাখ টন। এরমধ্যে ডিজেলের একক চাহিদা বছরে প্রায় ৪৪ লাখ টন। অর্থাৎ মোট আমদানি জ্বালানি তেলের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই ডিজেল প্রয়োজন। সর্বাধিক ব্যবহৃত জ্বালানি এই ডিজেল বর্তমানে মজুত আছে প্রায় এক লাখ টন; যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন তলানিতে ঠেকেছে। এতে মাত্র এক সপ্তাহ কিংবা তার চেয়েও কম সময়ে ফুরিয়ে যাবে ডিজেল।

তবে চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজেলবাহী জাহাজের সারি কিছুটা আশার আলো দেখালেও খালাস প্রক্রিয়ায় ধীরগতিতে উদ্বেগ বাড়ছে। বন্দরের বহির্নোঙ্গরে ডিজেল নিয়ে জাহাজের অপেক্ষা বাড়ছে। যদিও বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে, জ্বালানি তেলবাহী জাহাজে কোন জট নেই বলে দাবি করা হচ্ছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ডলফিন জেটিতে তিনটি এবং বহির্নোঙ্গরে সাতটি মিলে এ মুহূর্তে ১০টি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ রয়েছে। বহির্নোঙ্গরে মাদার ট্যাঙ্কার থেকে লাইটারিং করে জ্বালানি তেল খালাস হচ্ছে। একসাথে বন্দরের জেটি এবং বহির্নোঙ্গরে বেশ কয়েকটি জাহাজ থাকলেও জাহাজ জট নেই দাবি করে তিনি বলেন, কোন জাহাজ অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করছে এরকম কোন রিপোর্ট আমাদের কাছে নেই। এ পর্যন্ত জ্বালানিবাহী যতগুলো জাহাজ বন্দরে এসেছে সবগুলোকে বার্থিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বন্দরের তথ্য বলছে, গত ১৭ এপ্রিল থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বন্দরে জ্বালানিবাহী ১১টি ট্যাঙ্কার ভিড়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ডিজেলবাহী এবং একটি জেট ফুয়েলবাহী ট্যাঙ্কার রয়েছে। জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোর লোকাল এজেন্ট প্রাইড শিপিংয়ের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, গত কয়েকদিনে আসা জ¦ালানিবাহী ট্যাঙ্কারের মধ্যে দুটি লাইটারেজ ট্যাঙ্কার আর বাকিগুলো মাদার ট্যাঙ্কার। এর মধ্যে কয়েকটি মাদার ট্যাঙ্কার জ্বালানি তেল খালাস শেষে চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করেছে। আরও কয়েকটি বন্দরে অবস্থান করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরপর তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিএসপি, ইউনিপ্যাক এবং ভিটল বেশ কয়েকটি তেলের পার্সেল (জাহাজ) বাতিল বা সরবরাহের সূচি পরিবর্তন করে। ওই তিনটি কোম্পানি পার্সেলগুলো সরবরাহ দিচ্ছে। এ কারণে এখন একসঙ্গে তেলবাহী আটটি জাহাজ এসেছে। যার মধ্যে সাতটি চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে এবং একটি বুধবার নোঙ্গর করবে। প্রায় আড়াই লাখ টন জ্বালানি তেলবোঝাই সাতটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে কোনো কোনো জাহাজ তেল খালাসের জন্য ছয় দিন ধরে বহির্নোঙরে অপেক্ষায় আছে।

জানা গেছে, মাদার ট্যাঙ্কারগুলো ধারণক্ষমতার চেয়ে কম তেল নিয়ে বহির্নোঙ্গরে আসে। এসব জাহাজ ডলফিন জেটিতে নোঙ্গর করার সুযোগ না থাকায় ছোট জাহাজে লাইটারিং করে সেই তেল ডলফিন জেটিতে বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা-মেঘনা-যমুনার ডিপোতে খালাস করা হচ্ছে। এতে তেল খালাসে বেশি সময় লাগছে। যে কয়টি ছোট জাহাজ তেল নিয়ে এসেছে সেগুলো সরাসরি ডলফিন জেটিতে তেল খালাস করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ভিটলের জাহাজ এমটি কুইটা ২৩ এপ্রিল ৩৩ হাজার ৪০০ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে বন্দরে ভিড়ে। এটিকে বার্থিং করা হয় ২৫ এপ্রিল। ভিটলের আরও একটি জাহাজ এমটি প্রিভি এনজেল ৩৫ হাজার ৫৫ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে ২৪ এপ্রিল বহির্নোঙরে আসে। এ দুটি থেকে লাইটারেজের মাধ্যমে তেল খালাস করা হচ্ছে। ভিটলের আরও একটি পার্সেল এমটি লিয়ান সন-হু ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেল নিয়ে ১৭ এপ্রিল দেশের নৌসীমায় আসে। এর সব তেল এমটি গ্রেড প্রিন্সেস নামে অন্য একটি জাহাজে লোড করে রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে বার্থিং করা হয়। এখন সেই জাহাজ থেকে তেল খালাস করা হচ্ছে।

জানা গেছে, বিপিসিতে তেল সরবরাহকারী ইন্দোনেশিয়ান প্রতিষ্ঠান বিএসপির জাহাজ এমটি এফপিএমসি ৩৪ হাজার ৩৫৩ টন ডিজেল নিয়ে ২০ এপ্রিল বন্দরের বহির্নোঙ্গরে আসে। এ জাহাজ থেকে কবে নাগাদ তেল খালাস করা হবে তার সময় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এমটি হাফনিয়া চিটাম ৩৩ হাজার ৪০৫ টন ডিজেল নিয়ে ২১ এপ্রিল বহির্নোঙ্গরে আসে। এ জাহাজ থেকেও তেল খালাসের তারিখ নির্ধারণ হয়নি বলে জানা গেছে। বিএসপির ৯ হাজার ৯৭৪ টন ডিজেল নিয়ে আরও একটি জাহাজ এমটি হাফনিয়া মারলিন বহির্নোঙ্গরে আসবে আজ। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভিটলের ২৬ হাজার ৫১৮ টনের অকটেনবাহী জাহাজ বহির্নোঙ্গরে ভিড়বে আগামীকাল।

এদিকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডিজেলের জন্য হাহাকার চলছে। দেশে ডিজেলের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন। তদুপরি ইরি-বোরো সেচযন্ত্র চালানোসহ বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বিভিন্ন খাতে এপ্রিল মাসেই ডিজেলের চাহিদা সারা বছরের অন্য সময়ের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পায়। যার পরিমাণ অন্তত চার লাখ টন। এ মাসে ডিজেল ক্রয়-বিক্রয় গতবছরের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি না পেয়ে মজুত সঙ্কটে বরং কমেছে। বর্তমানে ডিজেলের নিরাপদ মজুত দূরের কথা; বাফার স্টক এমনকি আপৎকালীন মজুতও কমে গেছে। বন্দরে খালাস প্রক্রিয়া ধীরগতির ফলে ডিজেলের সরবরাহ চেইন বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে ভরা গ্রীষ্ম ও শুষ্ক মৌসুমে বৈশাখের তীব্র তাপদাহ, খরার কবলে ফল-ফসলি জমি ফেটে ইতঃমধ্যে চৌচির হয়ে গেছে। ইরি-বোরোর উঠতি ফসলি জমিতে পানি সেচের জন্য ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র চালাতে ডিজেলের চাহিদা পূরণে কৃষকরা মুখিয়ে আছেনÑ কবে মিলবে সেই কাক্সিক্ষত ডিজেল। গত ১৯ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে সরকার বিভিন্ন গ্রেডের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বা সমন্বয় কার্যকর করে। তাতে ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি আগের একশ’ টাকা থেকে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকায় ধার্য্য হয়েছে। বাড়তি দামেও ডিজেল না পাওয়ায় লাইটারেজ জাহাজসহ নৌপথে পণ্য পরিবহন বিঘিœত হচ্ছে। বিপিসির তরফে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত দেশে ২৬টি জাহাজে আট লাখ ২৩ হাজার ১৭০ টন ডিজেল আমদানি হয়েছে।