ঢাকা ০১:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লোডশেডিং-ডিজেল সংকটে কপাল পুড়ছে কৃষকের

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০৯:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির খবরে জ্বালানি বাজারে স্বস্তির আভাস মিললেও এর কোনো প্রতিফলন নেই পাবনার কৃষিখাতে। তীব্র রোদ ও গরমে লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ডিজেল। এতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আবার লোডশেডিংয়ে বিদ্যুৎচালিত পাম্পেও দেওয়া যাচ্ছে না সেচ। ফলে বোরো ধান, পাটসহ মৌসুমী ফসলের উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে জেলার হাজারো কৃষকের।

জানা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে জেলা ও উপজেলা শহরের পাম্পগুলোতে বড় বোতল ও বিভিন্ন পাত্র নিয়ে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান কৃষকরা। তবে সবাই তেল পান না। আবার যারা পান, সেটিও চাহিদার তুলনায় অর্ধেক। এতে এই খরায় জমিতে ঠিকভাবে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা।

চর সদিরাজপুরের কৃষক রতন হোসেন বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে পাবনা শহরের অনন্ত ও টার্মিনাল এলাকার বিভিন্ন তেল পাম্পে ঘুরেছি। ডিজেল মিলছে না। পাম্পে ২-৩ ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি। সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতেই সামনে থেকে জানানো হয়- তেল শেষ।’

উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার ২-৩টা গাড়ি ডিজেলের অভাবে চালানো যাচ্ছে না। জমিতে ঠিকভাবে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে তীব্র খরা। এভাবে কতদিন চলবে, এর সমাধান কোথায়?’

ভাঁড়ারা গ্রামের কৃষক কামরুল হাসান বলেন, ‘আমাদের ৩-৪টা শ্যালো ইঞ্জিন, দুইটি ট্রাক্টর। এগুলো চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ছে। ডিজেল সংকটে ধানের অবস্থাও খারাপ। এর সঙ্গে পাট আবাদ নিয়েও বিপাকে আছি। আবাদে পিছিয়ে পড়েছি। জমিতে সেচ দিতে পারছি না। এভাবেতো ধান বা পাট কিছুই হয় না।’

লোডশেডিং-ডিজেল সংকটে কপাল পুড়ছে কৃষকের

সেচ দেওয়ার জন্য পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে কৃষকদের/ ছবি: জাগো নিউজ

এদিকে সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সেচ ব্যয় কমাতে ১৯৯২ সালে খাল খনন করে ৩৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সেচ প্রকল্প চালু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে এর সুফলও পাচ্ছেন না কৃষকরা। ১৮ হাজার হেক্টর জমি এই সেচের আওতায় থাকলেও সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিও পাচ্ছে না এর সুবিধা। অধিকাংশ খাল অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে ধান ও অন্যান্য ফসল আবাদ শুরু করেছেন কৃষকরা। তবে ডিজেল সংকটে সেখানেও ভোগান্তির শেষ নেই।

সাঁথিয়া উপজেলার বাওইকোলা গ্রামের কৃষক হাসান আলী বলেন, ‘তিন বিঘা বোরো আবাদ করেছি। অতিরিক্ত ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ জেনেও শ্যালো ইঞ্জিনে সেচ দিচ্ছি। এখন তেল পাচ্ছি না। শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে ডিজেল সংকটে আরও বিপাকে পড়েছি। যেখানে ১০ থেকে ১৫ লিটার ডিজেল লাগবে সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ লিটার। এই সংকটে শুধু ধান নয়, নষ্ট হচ্ছে মাঠের তিল, পাট, কাঁচা সবজি ও অন্যান্য ফসল।’

এ ভোগান্তি শুধু জেলার সদর, সাঁথিয়া বা বেড়া উপজেলায় নয়, বরং পুরো জেলাজুড়েই ডিজেল প্রাপ্তিতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন কৃষকরা। ডিজেলের অভাবে ঠিকভাবে এ সংশ্লিষ্ট যান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

এছাড়া বিদ্যুৎচালিত পাম্পে সেচেও ভোগান্তির শেষ নেই কৃষকের। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ঠিকমতো পাম্প চালানো যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন কৃষকরা।

চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়ালের কৃষক হাসেম বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ গ্রামে প্রচুর লোডশেডিং হয়েছে। এতে আমরা সেচ নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। এর মধ্যে ডিজেল সংকটতো আছেই। তবে গত দুদিন ধরে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ডিজেলের সংকটও যদি কমে যেতো তাহলে সেচে আরও সুবিধা হতো।’

পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল আমিন চৌধুরী বলেন, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, ঈশ্বরদীর একাংশ ও সদর উপজেলার একাংশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর অধীনে। ২৬ তারিখ থেকে এসব এলাকার লোডশেডিং কমেছে। বর্তমানে চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ রয়েছে। এর বাইরে লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন হলেও ফসলি জমিতে সেচ এলাকায় আমরা লোডশেডিং কমিয়ে দেই। তবে আপাতত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। আশা করছি এই ধারাবাহিকতা থাকবে। এতে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি থাকবে না।

লোডশেডিং-ডিজেল সংকটে কপাল পুড়ছে কৃষকের

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, একটু কষ্ট হলেও কৃষক তেল পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তাদের ক্ষেত্রে আমরা অগ্রাধিকার রেখেছি। তাছাড়া জেলার অনেক জায়গায় দুই সপ্তাহের মধ্যে ধান উত্তোলন শুরু হবে। ফলে সেচে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়বে না। এর বাইরে পাট বা অন্যান্য ফসলে সেচ লাগবে। কৃষকরা যেন প্রয়োজনীয় তেল পায় সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।

পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজন ছাড়াই অনেকে কৃষক সেজে তেল নিচ্ছেন। এতে সমস্যা আরও বাড়ছে। কৃষকদের ভোগান্তিও বাড়ছে। কৃষকদের ভোগান্তি লাঘবে স্থানীয় কৃষক ও প্রশাসনকে সমন্বয় করে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষি ও কৃষকদের স্বার্থে আমরা কাজ করছি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

লোডশেডিং-ডিজেল সংকটে কপাল পুড়ছে কৃষকের

আপডেট টাইম : ১২:০৯:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির খবরে জ্বালানি বাজারে স্বস্তির আভাস মিললেও এর কোনো প্রতিফলন নেই পাবনার কৃষিখাতে। তীব্র রোদ ও গরমে লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ডিজেল। এতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আবার লোডশেডিংয়ে বিদ্যুৎচালিত পাম্পেও দেওয়া যাচ্ছে না সেচ। ফলে বোরো ধান, পাটসহ মৌসুমী ফসলের উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে জেলার হাজারো কৃষকের।

জানা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে জেলা ও উপজেলা শহরের পাম্পগুলোতে বড় বোতল ও বিভিন্ন পাত্র নিয়ে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান কৃষকরা। তবে সবাই তেল পান না। আবার যারা পান, সেটিও চাহিদার তুলনায় অর্ধেক। এতে এই খরায় জমিতে ঠিকভাবে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা।

চর সদিরাজপুরের কৃষক রতন হোসেন বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে পাবনা শহরের অনন্ত ও টার্মিনাল এলাকার বিভিন্ন তেল পাম্পে ঘুরেছি। ডিজেল মিলছে না। পাম্পে ২-৩ ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি। সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতেই সামনে থেকে জানানো হয়- তেল শেষ।’

উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার ২-৩টা গাড়ি ডিজেলের অভাবে চালানো যাচ্ছে না। জমিতে ঠিকভাবে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে তীব্র খরা। এভাবে কতদিন চলবে, এর সমাধান কোথায়?’

ভাঁড়ারা গ্রামের কৃষক কামরুল হাসান বলেন, ‘আমাদের ৩-৪টা শ্যালো ইঞ্জিন, দুইটি ট্রাক্টর। এগুলো চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ছে। ডিজেল সংকটে ধানের অবস্থাও খারাপ। এর সঙ্গে পাট আবাদ নিয়েও বিপাকে আছি। আবাদে পিছিয়ে পড়েছি। জমিতে সেচ দিতে পারছি না। এভাবেতো ধান বা পাট কিছুই হয় না।’

লোডশেডিং-ডিজেল সংকটে কপাল পুড়ছে কৃষকের

সেচ দেওয়ার জন্য পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে কৃষকদের/ ছবি: জাগো নিউজ

এদিকে সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সেচ ব্যয় কমাতে ১৯৯২ সালে খাল খনন করে ৩৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সেচ প্রকল্প চালু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে এর সুফলও পাচ্ছেন না কৃষকরা। ১৮ হাজার হেক্টর জমি এই সেচের আওতায় থাকলেও সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিও পাচ্ছে না এর সুবিধা। অধিকাংশ খাল অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে ধান ও অন্যান্য ফসল আবাদ শুরু করেছেন কৃষকরা। তবে ডিজেল সংকটে সেখানেও ভোগান্তির শেষ নেই।

সাঁথিয়া উপজেলার বাওইকোলা গ্রামের কৃষক হাসান আলী বলেন, ‘তিন বিঘা বোরো আবাদ করেছি। অতিরিক্ত ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ জেনেও শ্যালো ইঞ্জিনে সেচ দিচ্ছি। এখন তেল পাচ্ছি না। শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে ডিজেল সংকটে আরও বিপাকে পড়েছি। যেখানে ১০ থেকে ১৫ লিটার ডিজেল লাগবে সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ লিটার। এই সংকটে শুধু ধান নয়, নষ্ট হচ্ছে মাঠের তিল, পাট, কাঁচা সবজি ও অন্যান্য ফসল।’

এ ভোগান্তি শুধু জেলার সদর, সাঁথিয়া বা বেড়া উপজেলায় নয়, বরং পুরো জেলাজুড়েই ডিজেল প্রাপ্তিতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন কৃষকরা। ডিজেলের অভাবে ঠিকভাবে এ সংশ্লিষ্ট যান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

এছাড়া বিদ্যুৎচালিত পাম্পে সেচেও ভোগান্তির শেষ নেই কৃষকের। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ঠিকমতো পাম্প চালানো যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন কৃষকরা।

চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়ালের কৃষক হাসেম বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ গ্রামে প্রচুর লোডশেডিং হয়েছে। এতে আমরা সেচ নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। এর মধ্যে ডিজেল সংকটতো আছেই। তবে গত দুদিন ধরে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ডিজেলের সংকটও যদি কমে যেতো তাহলে সেচে আরও সুবিধা হতো।’

পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল আমিন চৌধুরী বলেন, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, ঈশ্বরদীর একাংশ ও সদর উপজেলার একাংশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর অধীনে। ২৬ তারিখ থেকে এসব এলাকার লোডশেডিং কমেছে। বর্তমানে চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ রয়েছে। এর বাইরে লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন হলেও ফসলি জমিতে সেচ এলাকায় আমরা লোডশেডিং কমিয়ে দেই। তবে আপাতত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। আশা করছি এই ধারাবাহিকতা থাকবে। এতে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি থাকবে না।

লোডশেডিং-ডিজেল সংকটে কপাল পুড়ছে কৃষকের

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, একটু কষ্ট হলেও কৃষক তেল পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তাদের ক্ষেত্রে আমরা অগ্রাধিকার রেখেছি। তাছাড়া জেলার অনেক জায়গায় দুই সপ্তাহের মধ্যে ধান উত্তোলন শুরু হবে। ফলে সেচে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়বে না। এর বাইরে পাট বা অন্যান্য ফসলে সেচ লাগবে। কৃষকরা যেন প্রয়োজনীয় তেল পায় সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।

পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজন ছাড়াই অনেকে কৃষক সেজে তেল নিচ্ছেন। এতে সমস্যা আরও বাড়ছে। কৃষকদের ভোগান্তিও বাড়ছে। কৃষকদের ভোগান্তি লাঘবে স্থানীয় কৃষক ও প্রশাসনকে সমন্বয় করে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষি ও কৃষকদের স্বার্থে আমরা কাজ করছি।