প্রায় দেড় যুগের মতো সময় যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে সময় সেখানের নগর ব্যবস্থা, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দেখেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই তিনি একাধিক অনুষ্ঠানে সেই উদাহরণও তুলে ধরেছেন। রাজধানীর ঢাকার মানুষকেও তিনি সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। সে লক্ষ্যেই রাজধানীর ফুটপাতগুলোকে পথচারীবান্ধব করে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছেন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছ্বেদ করা হয়েছে। সেগুলোতে যেন নগরবাসী নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নির্দেশনাও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের।
পাশাপাশি উচ্ছ্বেদ হওয়া হকাররাও যেন নির্ধারিত স্থানে পুনর্বাসনের সুযোগ পায় সে বিষয়েও দিয়েছেন নির্দেশনা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন ইতোমধ্যে তিনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যানকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে দুই সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে আর যাতে কোনোভাবে ফুটপাত দখল না হয় এবং সেগুলো যেন পথচারী চলাচলের উপযোগী থাকে সে বিষয়েও দিয়েছেন নির্দেশনা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু উচ্ছ্বেদ উচ্ছ্বেদ খেলা চললে ফুটপাত কখনোই পথচারীবান্ধব হবে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক পদক্ষেপ। কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদ্যোগে যেন ফুটপাত দখলে না যায় সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে হকার উচ্ছেদের পর তাদের পুনর্বাসনের সামগ্রিক উদ্যোগ নিলে সেটিও হিতে বিপরীত ফল হতে পারে।
রাজধানীর উচ্ছ্বেদকৃত কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযানের পর আবারো অবৈধ দোকানপাট বসানো হচ্ছে। এতে রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে। চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। তবে এর নেপথ্যে রয়েছে টাকার খেলা। উচ্ছেদের পর ফুটপাত বা রাস্তায় নতুন করে দোকান পেতে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। লাইন ম্যান ও চাঁদা আদায়কারীদের মাধ্যমে ওই অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। লাইন ম্যানদের একটি দোকানের জন্য প্রতিদিন ২শ’ থেকে ৫শ’ টাকা দিতে হয় এলাকা ভিত্তিতে। তবে অবৈধভাবে বসা দোকানের বিদ্যুৎ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পানির ব্যবস্থা করে থাকেন চাঁদার টাকা আদায়ের সাথে জড়িতরাই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর হকার পুনর্বাসন বা অন্যত্র সরানোর বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এ বিপুলসংখ্যক হকারের পুনর্বাসন বা অন্যত্র বসানো বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তা সফল হবে না। বেকারত্ব নিরসন, দারিদ্র্যদূরীকরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে হকারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ছিন্নমূল এসব মানুষকে যদি ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করা হয়, তবে তাদের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কলকাতার মতো একটি বৃহৎ নগরীকে সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে হকার সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে। কিন্তু আমরা অবহেলিত হকার শ্রেণির জন্য নীতিমালা প্রণয়ন ও পুনর্বাসন করতে পারছি না। উচ্ছেদকৃত হকারদের পুনর্বাসন জন্য মার্কেট করা হলেও সবাইকে দোকান দেয়া সম্ভব হয় না। কারণ প্রচুর হকার্স করার মতো স্থান ও অর্থ আমাদের নেই। রাজধানীতে কোনো লোক জীবিকার জন্য এসে যেন হকারি করতে না হয়। অর্থাৎ নতুন হকারের সংখ্যা যেন বৃদ্ধি না পায়, এ জন্যে দেশ জুড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। মোটকথা, হকারদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। রাজধানীতে হকার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নতুনরূপে সাজাতে হবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নগর-মহানগরগুলো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফুটপাত দখলের পেছনে সব থেকে বড় শক্তি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা। পুলিশ প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারাও আছেন এর সঙ্গে। ফুটপাতের দখলদারদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার সিন্ডিকেটের সদস্য। হকার উচ্ছেদের আগে যারা হকার বসায় বিশেষ করে লাইনম্যান, পুলিশ প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী চাঁদার ভাগ পায়, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো সরকারই এ সিন্ডিকেট ভাঙতে তৎপর হয়নি; বরং বারবার আঘাত নেমে এসেছে হকারদের ওপরই। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরীর নিম্ন আয়ের মানুষ। একবার উচ্ছেদ হলে উপরের কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজের নামে বাড়ানো হয় চাঁদার টাকা। স্থানীয়রা বলেছেন, একদিকে অভিযান চলে। ম্যাজিস্ট্রেট এসে জেল-জরিমানা করেন। অভিযানের টিম চলে যাবার সাথে সাথেই আবার দোকান খুলে বসেন হকারা। অনেকের ধারণা পজিশন রক্ষার জন্য হকাররা বারবার দোকান খুলেন। তারা মনে করছেন, অভিযান হয়তো এক সময় থেমে যাবে। কিন্তু দোকানের পজিশন হাত ছাড়া হলে সেটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ইনকিলাবকে বলেন, প্রতিবারই হকারদের উচ্ছেদের পর তারা আবার ফিরে আসে। তাহলে এ উচ্ছেদ অভিযানের মানে কী? একটা উচ্ছেদ অভিযানের পেছনে সরকারের অনেক টাকা যায়। গত ২০ বছরে সরকার কতগুলো উচ্ছেদ অভিযান করেছে, সরকারের কত টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মূলত হকারদের যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা লাইনম্যান, প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মার্কেটের মালিক তারাই যোগসাজশ করে হকারদের বসায়। হকারদের থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা নেয়। সরকার কি কখনো কোনো লাইনম্যানকে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছে? হকারদের টাকা যে পুলিশ, এসআই, অফিসার ইনচার্জ, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তার পকেটে গেছে তাদের ব্যাপারে কোনো তদন্ত হয়েছে? তাদের কোনো তালিকা আছে? এটা তো খুব সহজ কাজ। কারা টাকা ওঠায় এটা সবাই জানে। কাদের পকেটে টাকা যায় এটাও সবাই জানে। তাহলে তাদের না ধরে বারবার হকারদের উচ্ছেদ অভিযান করে তো ফল পাওয়া যাবে না। পুলিশের একজন কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, শ্যামলি টিবি হাসপাতালের সামনের ফুটপাত ও রাস্তা হকারমুক্ত করতে কয়েকজন হকারকে হাসপাতালে কাজ দেয়া হয়। কিন্তু পরের দিনই দেখা গেছে নতুন হকাররা দ্রুত সেসব স্থান দখল করে নিচ্ছে। স্থায়ী ব্যবস্থা না করে কেবল উচ্ছেদ করার মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব নয়।
উচ্ছেদ প্রসঙ্গে গুলিস্তানের হকার আরিফ আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, কিছুদিন পরপর সরকারের পক্ষ থেকে এসে আমাদের উচ্ছেদ করার হুমকি দেয়। তখন লাইনম্যানরা এসে নিয়মিত টাকার বাইরে আলাদা করে থোক টাকা নিয়ে যায়। এভাবেই আমরা ব্যবসা করে যাচ্ছি। যখন উচ্ছেদ হয়, তখন আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হই। কয়েকদিন পর দোকান শুরু করার জন্য আবার থোক টাকা দিতে হয়।
রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বছিলা সড়কটি সরেজমিনে দেখা গেছে, আল্লাহ করিম জামে মসজিদ থেকে তিনরাস্তা মোড় পর্যন্ত উভয় পাশেই সারি সারি ভ্যানে করে বিভিন্ন ধরনের সবজি, পণ্য ও মাছ বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়কের ওপরে রেখেই বিক্রি করছেন কেউ কেউ।
পুলিশের উচ্ছেদ অভিযানের পরও কেন বসেছেন জানতে চাইলে ভ্রাম্যমাণ ওই ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। সড়কটির ফুটওভারব্রিজের নিচে খলিল নামে এক ব্যক্তি ভ্যানে করে তরমুজ বিক্রি করছিলেন। কিছু তরমুজ তিনি ফুটপাতেও রেখেছেন। জানতে চাইলে খলিল বলেন, পুলিশ এলে মহল্লায় যাই, চলে গেলে আবার আসি। সারা পৃথিবীতেই এই ফুটপাতে ব্যবসা হয়, আমরা করলে দোষ কী? খলিল আরো বলেন, এখানে কেউ মাগনা (ফ্রি) বসে না। ময়লার বিল, বিদ্যুৎ বিল এবং জায়গার বিল দিই। কেউ তো নিজে নিজে এসে বসে না, কেউ না কেউ বসায়, তারাই সব বুঝবে। আমাদের কোনো চিন্তা নেই। প্রতিটি ভ্যান থেকে দেড়শ’ থেকে দুশ’ টাকা তোলা হয়। সেই টাকা যারা নেয়, তারাই বুঝবে। তারাই সব দেখবে।’ অভিযানের পর কীভাবে এটি করছেন, জানতে চাইলে খলিল বলেন, ‘এত ঝামেলার পরও টাকা নেয়া বন্ধ হয়নি। উল্টো এখন বেশি ঝামেলার কথা বলে বেশি টাকা নেয়ার কথা বলছে। খরচ বাড়ছে নাকি, সে জন্য টাকাও বাড়াতে চায়।’ চা-দোকানি মোতালেব বলেন, সকালে দোকান কম থাকে, বিকালে সড়কে পাঁচ সারি পর্যন্ত দোকান বসে। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বেড়িবাঁধ তিনরাস্তা পর্যন্ত দু’পাশে ৪০০-৫০০ দোকান বসে। যারা আসে তারা টাকা দিলেই বসতে পারে। কাউকে না করা হয় না।
রোববার বেলা ৩টার পর দৈনিক বাংলা, পল্টন, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তান মার্কেট ও গুলিস্তান মাজারের আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকায় আগের মতোই ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পেতে আছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকার। গুরুত্বপূর্ণ এলাকা গুলিস্তানের কোথাও কোথাও প্রধান সড়ক দখল করার দৃশ্যও চোখে পড়েছে। মতিঝিলেও রাস্তা দখল করে জুতাসহ দোকান দেখা গেছে। মতিঝিলে শুধু ফুটপাতই নয়, রাস্তা দখল করে রাখা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা সকালে বসি না, বেলা ২টার পর বসি। এরপরও মাঝে মধ্যেই ম্যাজিস্ট্রেট এসে জরিমানা করেন। আমাদের দৌড়ের ওপর থাকতে হয়।
গুলিস্তান আন্ডারপাশের উত্তর পাশে ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তার ওপর পাটি বিছিয়ে অনেককেই দোকান খুলতে দেখা গেছে। সেখানকার অন্তত জনা বিশেক হকারের সাথে কথা হয়। তারা বলেন, ভাসমান হকার হলেও তারা চৌকি পেতে এর আগে গভীর রাত পর্যন্ত বেঁচাকেনা করেছেন। কিন্তু এখন হঠাৎই অভিযান শুরু হয়। বাধ্য হয়ে মালামাল গুটিয়ে দ্রুত পাশের গলিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। তবে অনেকেই বলেছেন, অভিযানের আগেই তাদের কানে খবর চলে আসে। যে কারণে মালামালসহ তারা সরে যাবার সময় পান। এছাড়া পুলিশ এসেও বারবার দোকান না বসাতে সতর্ক করে যাচ্ছেন। তারাও অভিযানের বিষয়টি অবহিত করেন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এবং সুন্দরবন মার্কেটের আশপাশের চিত্রও একই। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, যতবার বসবে ততবার তুলে দেয়া হবে। আমরা স্থানীয়দের সহযোগিতা চাই। যাতে তারা এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে জনসচেতনতা সৃষ্টি করেন। পুলিশের কেউ টাকা নেয়ার সাথে জড়িত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Reporter Name 





















