উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। কোথাও ধানের শীষ বের হয়েছে, কোথাও আবার পাকার অপেক্ষায়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি বোরো মৌসুমে আরেকটি বাম্পার ফলনের আশা করছেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা। তবে শেষ মুহূর্তের ডিজেল, সার ও বিদ্যুৎ সংকট এবং সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কৃষকদের মনে দানা বাঁধছে উৎকণ্ঠা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর বিপরীতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬৮ মেট্রিক টন। তথ্য বলছে, ২০০৮ সাল থেকে দেশে বোরোর ধারাবাহিক বাম্পার ফলন হচ্ছে, যার বড় একটি অংশ আসে উত্তরবঙ্গ থেকে।
রাজশাহী অঞ্চলে এবার ৩ লাখ ৭৬ হাজার ১১০ হেক্টর এবং রংপুর বিভাগে ৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ১৬ জেলা মিলিয়ে এবার ৬৫ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন ধান পাওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকেই আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হবে, তবে মূল উৎসব শুরু হবে মে মাসের শুরু থেকে। বাম্পার ফলনের হাতছানি থাকলেও মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের অভিযোগের শেষ নেই। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে বাজারে ডিজেল ও পেট্রোলের কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে ছোট-বড় সেচ স্কিমগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও নীলফামারীর কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় সার সংকটের খবর পাওয়া গেছে।
কৃষি গবেষণা বিভাগের সদ্য বিদায়ী জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জুলফিকার হায়দার প্রধান বলেন, বোরো ক্ষেতে আগামী এক মাস পানি সেচ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাবে।
বোরো মৌসুমে উত্তরবঙ্গে কৃষি শ্রমিকদের কদর আকাশচুম্বী। কৃষকেরা জানান, ধান কাটার শ্রমিকদের এখন রীতিমতো ‘জামাই আদরে’ খাওয়াতে হয়। শুধু বাড়তি মজুরি দিলেই চলে না, ভালো খাবারের পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য ওয়াইফাই সুবিধার মতো আবদারও মেটাতে হচ্ছে গেরস্তদের।
অন্যদিকে, কিছু এলাকায় সেচ পাম্পের মালিকেরা কৃষকদের জিম্মি করে কম মূল্যে অগ্রিম ধান কিনে নিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী চাষিদের দাবি, নতুন সরকারের আমলে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে যেন অতীতের মতো জালিয়াতি না হয় এবং কৃষি কার্ডের সুবিধা যেন প্রকৃত কৃষকেরা পায়।
চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরুতে উত্তরাঞ্চলে কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টির প্রকোপ বাড়ে। কষ্টে বোনা স্বপ্ন যেন এক ঝটকায় চুরমার না হয়ে যায়, সেই প্রার্থনা নিয়ে দিন কাটছে চাষিদের। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, দেশের মোট চালের চাহিদার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ যোগান দেয় এই উত্তর জনপদ, অথচ এই অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন বরাবরই অবহেলিত থেকে গেছে।
Reporter Name 























