জলবায়ু সহিষ্ণুতা গুরুত্ব দিয়ে মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলমান প্রকল্পটির কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। এখন আরও এক বছর সময় বাড়ানোর পাশাপাশি প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পটিতে বিদেশে প্রশিক্ষণ, লোকবল বৃদ্ধি এবং ধানক্ষেতে মাছ চাষ প্রদর্শনীর মতো বেশ কয়েকটি নতুন খাত ও কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব খাতে নতুন করে ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে। বিষয়গুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে খোদ পরিকল্পনা কমিশন।
জানা গেছে, সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২১ সালের আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। শুরুতে ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের কথা ছিল মৎস্য অধিদফতরের। পরে প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয় এবং ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৯০ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
এখন দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় আরও ২৪ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়িয়ে মোট ১১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, বিশ্বব্যাংকের ঋণ ৯৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
প্রকল্পটি মূলত উপকূলীয় ও নদী অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য নেওয়া হয়েছে। দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় এটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। সরকারের ভাষ্য, বন্যা, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি ও খরার কারণে কৃষি ও মৎস্য খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু সহিষ্ণু মৎস্যচাষ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জীবিকায়ন বাড়াতে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।
মৎস্য অধিদফতরের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে শুধু মাছের উৎপাদনই বাড়বে না; স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কৃষি-মৎস্য-প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নও হবে। পাশাপাশি ডেল্টা অঞ্চলে বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বাড়বে।
তবে প্রকল্পটির অগ্রগতি ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৬৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা সংশোধিত ব্যয়ের ৭১ দশমিক ১১ শতাংশ। অথচ বাস্তব অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৮০ শতাংশ। ফলে প্রশ্ন উঠেছেÑ কাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, তখন কেন আবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দ্বিতীয় সংশোধনীতে নতুন করে ধানক্ষেতে মাছ চাষ প্রদর্শনী, পুকুরে গলদা চিংড়ির পিএল উৎপাদন, মাছের খাদ্য তৈরির মেশিন এবং প্যাডল হুইল বিতরণ যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্যও নতুন খাত সংযোজন করা হয়েছে।
কিন্তু এসব নতুন কার্যক্রম প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এতদিন পর কেন সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছেÑ সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
এ ছাড়া প্রকল্প থেকে জিপ, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ইনসুলেটেড ভ্যান বিতরণসহ আটটি খাত বাদ দেওয়া হলেও পেট্রোল, ওয়েল ও লুব্রিকেন্ট, অর্থাৎ জ্বালানি খাতে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পে জনবল বাড়ানো নিয়েও আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মী (লিফ) ৫৮৮ জন থেকে বাড়িয়ে ৮২৮ জন এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মী ৩৬ জন থেকে ১২৫ জন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের ভাতাও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পরামর্শক সেবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবও এসেছে।
প্রকল্পটিতে মিনি ফিশ প্রসেসিং ইউনিট নির্মাণে প্রথম সংশোধনীতে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ওই খাতে কোনো ব্যয় হয়নি। এরপরও দ্বিতীয় সংশোধনীতে আরও চারটি ইউনিট যুক্ত করে অতিরিক্ত ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, একটি প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ একাধিক নতুন কার্যক্রম যুক্ত করা, জনবল বাড়ানো এবং ব্যয় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাবি করে। বিশেষ করে যেসব খাতে এখনও কোনো ব্যয় হয়নি, সেখানে আবার বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তবে মৎস্য অধিদফতরের দাবি, প্রকল্প এলাকার ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নতুন কিছু কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে, যাতে মাছ উৎপাদন ও জীবিকা উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
ব্যয় ও সময় বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য অধিদফতরের বাস্তবায়ন শাখার সহকারী পরিচালক ড. মাহফুজা বেগম সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের মৎস্য বিভাগের কাজ প্রায় শেষ। কিন্তু পানি উন্নয়ন বিভাগের কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। যেহেতু এটি একটি আমব্রেলা প্রকল্প, তাই কৃষি সেক্টরসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কাজ শেষ না হলে পুরো প্রকল্প সমাপ্ত করা যাচ্ছে না। সে কারণেই সময় বাড়ানো হয়েছে।
তবে নতুন খাত সৃষ্টি ও ব্যয় বাড়ানোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এসব বিষয় নিয়ে অনেক সভা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও মন্ত্রণালয়ের সম্মতিতেই ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মাহমুদুল হোসাইন খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
Reporter Name 

























