মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। দীর্ঘদিনের শত্রুতা এখন এক চূড়ান্ত ও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে ইসরায়েলের হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত তেল আবিব এবং পবিত্র নগরী জেরুজালেম গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকির পর পুরো অঞ্চলে যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, এবারের সংঘাত কেবল সীমান্ত সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এক মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ তাদের দূরপাল্লার রকেট ও ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েলের গহীন অভ্যন্তরে হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে। আইডিএফ মুখপাত্র জানিয়েছেন, উত্তর ইসরায়েলের গণ্ডি পেরিয়ে এবার হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সাইরেন বেজে ওঠার জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ এবং ‘ডেভিডস স্লিং’-কে প্রস্তুত রাখা হয়েছে সম্ভাব্য যে কোনো মিসাইল বৃষ্টি ঠেকানোর জন্য।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক জরুরি বার্তায় জানিয়েছেন, লেবাননে কোনো প্রকার যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আপাতত নেই। তিনি বলেন, যতক্ষণ না আমাদের উত্তর সীমান্তের বাসিন্দারা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারছে, ততক্ষণ হিজবুল্লাহর ওপর হামলা থামবে না। নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরায়েলি বাহিনীর বিশেষ অভিযানে হিজবুল্লাহ বর্তমানে দিশেহারা এবং তাদের কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়েছে। তবে যুদ্ধের ময়দান বলছে ভিন্ন কথা হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ক্রমাগত রকেট হামলা ইসরায়েলি বাহিনীর দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়। এর আগে ২০০৬ সালে দুই পক্ষের মধ্যে ৩৪ দিনের এক প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধ হয়েছিল, যা লেবানন এবং উত্তর ইসরায়েলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। সেই যুদ্ধ অনিষ্পন্নভাবে শেষ হলেও হিজবুল্লাহর শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। গত দুই দশক ধরে হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েল এক ছায়া যুদ্ধে লিপ্ত। সিরিয়া এবং ইয়েমেনের সংঘাতেও এই দুই পক্ষ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। গত অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধের সমান্তরালে লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। হিজবুল্লাহর দাবি, তারা গাজার ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে।
এই সংঘাতের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, ইসরায়েল যদি লেবানেনে তাদের অভিযান বন্ধ না করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন উৎক্ষেপণ প্যাডে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সামান্য উস্কানিতেই তারা সরাসরি ইসরায়েলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
লেবানন এবং ইসরায়েল—উভয় দেশেই সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল এখন কার্যত জনশূন্য। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যদি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
Reporter Name 























