সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারদলীয় জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট একমত হয়েছে। এ নিয়ে দুই জোটের পক্ষ থেকে স্পিকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আজ সংসদ অধিবেশনে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান নিয়ে গতকাল বিরোধীদলীয় নেতার দেওয়া নোটিসের ওপর সংসদে বাহাস হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের এমপিদের মধ্যে এ বাহাস হয়। যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে তাঁরা এ নিয়ে উত্থাপিত নোটিসের ওপর আলোচনায় অংশ নেন। সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার করতে একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে শর্ত দিয়ে ওই প্রস্তাবে একমত পোষণ করা হয়েছে। তাদের শর্তে বলা হয়েছে, যে কমিটি গঠনের প্রস্তাব সরকারি দল দিয়েছে তাতে উভয় জোটের সমসংখ্যক সদস্য রাখতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে স্পিকারকে দুই জোটের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়।
গতকাল স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে দুই ঘণ্টার এ আলোচনায় দুই জোটের ১০ জন এমপি অংশ নেন। তাঁরা হলেন সরকারদলীয় সদস্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান, শফিকুল ইসলাম মাসুদ, সাইফুল আলম মিলন, নাজিবুর রহমান ও নূরুল ইসলাম বুলবুল, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)।
এর আগে বিষয়টি নিয়ে নোটিস দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। নোটিসের বিষয় ছিল জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নং ০১, ২০২৫)-এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের আহ্বান। এর আগে গত রবিবার নোটিসটি সংসদে উত্থাপন করেন তিনি। এ নিয়ে ওই দিন দুই জোটের এমপিদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ও হট্টগোল হয়। পরে স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার নোটিসটি আমলে নিয়ে মঙ্গলবার (গতকাল) দুই ঘণ্টা আলোচনা হবে বলে সিদ্ধান্ত জানান।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারি দলের মনোযোগ নেই বলে অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ পাশ কাটিয়ে চলতে চায় বলে মন্তব্য করেন তাঁরা। অন্যদিকে সরকারি জোটের এমপিরা পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ‘আমরাও জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে। কিন্তু এর বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী জোটের প্রস্তাবের পক্ষে নয়।’ জুলাই আন্দোলন শুধু বিরোধী জোট করেছে এমন দাবি করাটা অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সংসদের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ওই প্রস্তাবকে সমর্থন জানান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বিশেষ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের সমসংখ্যক সদস্য রাখার দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হলে সেখানে বিরোধী দলের মতামতের কোনো মূল্যায়ন হবে না এবং শেষ পর্যন্ত তা ‘যে লাউ সেই কদু’-তেই আটকে যাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর শর্তের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু এক লাইনে চলতে থাকলাম, এটার সমাধান কীভাবে হবে তা আমরা সবাই বুঝি। আমরাও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান চাই। সংস্কার পরিষদের ওপর যে আলোচনা হলো, তাকে একটি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে সেখানে আমাদের আহ্বান থাকবে সরকারি ও বিরোধী দল, দুই দিক থেকেই সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি গঠন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দেশ এবং জাতির জন্য সংবিধান এবং এই সংসদ। আমরা কে সরকারি বেঞ্চে আর কে বিরোধী বেঞ্চে, এটা কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। স্বাধীন বাংলাদেশে যাঁরা একসময় ওখানে বসতেন, আজ তাঁরা কোথাও নেই। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমরা দলের নয়, জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান জানাতে এখানে এসেছি।’
পার্লামেন্টে নিজেকে ‘চার দিনের শিশু’ আখ্যা দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আইন বা সংবিধান মানুষের জন্য, জনগণের জন্য; মানুষ বা জনগণ আইন কিংবা সংবিধানের জন্য নয়। এ সময় সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই মহান সংসদে ওই বিষয়ে সময় নষ্ট করার কোনো দরকার ছিল না। মহৎ লক্ষ্যে কাজ করতে গেলে এমন সংকট নিরসন করা সরকারেরই দায়িত্ব ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সরকারকে গঠনমূলক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রথম দিনই বলেছিলাম, আমরা একটি গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। বিরোধিতার খাতিরে কোনো বিরোধিতা নয়; বরং যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন সেখানে সহযোগিতা করব এবং জাতির অধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনে বিরোধিতা করব।’
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জনগণের বৃহত্তর রায়কে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার এড়িয়ে সংসদে যেকোনো ইস্যুতে একটি সমতাভিত্তিক সমাধানে পৌঁছাতে তিনি স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, যে নোটিসটি বিরোধীদলীয় নেতা উত্থাপন করেছেন, তার মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিষদের অধিবেশন কেন রাষ্ট্রপতি আহ্বান করলেন না? এই আদেশটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অন্তহীন প্রতারণার দলিল।
রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা ও আইনি বৈধতা নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির আর আদেশ জারির ক্ষমতা রইল না। তারপরও রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করলেন কীভাবে? যেই আদেশের জন্মই বৈধ হলো না, সেই আদেশ লিগ্যাল ল্যাঙ্গুয়েজে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ সূচনা থেকেই অবৈধ। এই আদেশটি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ না হওয়ার কারণে সংসদের প্রথম দিনে উপস্থাপন করা হয়নি।
গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে তিনি বলেন, সারা জাতির মধ্যে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে বিএনপি সংস্কার চায় না বা বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে ছিলাম এবং আছি। এই সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আমরা ধারণ করি। কিন্তু যে আদেশটি (সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ) নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, সেটি আমরা মানছি না কারণ এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
গণভোটের ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল এবং জনগণকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই চারটির মধ্যে তিনটি প্রশ্নের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের মিল আছে, কিন্তু একটির সঙ্গে নেই। আপনি জাতিকে এভাবে জোর করে কোনো আইন গেলাতে পারেন না। তিনি বলেন, অস্তিত্বহীন একটি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো আইনি বিধান ছিল না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই শপথের ফর্ম সংসদে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন না। এটি সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সর্বশেষ, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার প্রতিপালনের আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমরা সরকারি দল, বিরোধী দল সবাইকে নিয়ে মহান জাতীয় সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধনী আনতে চাই। তাই আমি সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) পক্ষে প্রস্তাব রাখছি, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। ওই কমিটিতে সবার আলোচনার ভিত্তিতে একটি সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান সংসদে উত্থাপন ও গ্রহণ করা হোক।
বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে, বিএনপি সংস্কার চায় না বা জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। কিন্তু আমরা ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য ধারণ করি। আমরা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিলের ভিত্তিতে সংস্কার চাই, কোনো অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে নয়। এ সময় তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দেশের জনগণ বিএনপিকে ৫১ শতাংশ ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক (৫০-৫০) সদস্য রাখার জোর দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কোনো কমিটি গঠন করা হলে সেখানে বিরোধী দলের মতামতের কোনো মূল্যায়ন হবে না এবং শেষ পর্যন্ত তা ‘‘যে লাউ সেই কদু’’-তেই আটকে যাবে। আমরাও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান চাই। তাই সরকারি ও বিরোধী দল, দুই দিক থেকেই সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি গঠন করতে হবে।’ তবে বিরোধীদলীয় নেতার এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, বিরোধী দলের নেতাও তা ইনডিরেক্টলি গ্রহণ করে বলেছেন সদস্য সংখ্যা ৫০-৫০ হলে ভালো হয়। মাননীয় স্পিকার, বিচার মানেই তাল গাছটা আমার এটা তো হতে পারে না। সংসদে ২১৯ জন সংসদ সদস্যের প্রতিনিধিরা পাবেন ৫০ শতাংশ, আর ৭৭ জনের প্রতিনিধিরা পাবেন ৫০ শতাংশ এটা পৃথিবীর কোন জায়গায় আছে? এটা কি বৈষম্য নয়? এটা কোন আইনে আছে? এরপর আইনমন্ত্রী স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনি একটি কমিটি গঠন করে দিন। এই সংসদ একটি কমিটি গঠন করুক, সেখানে আমরা সবকিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জুলাই সনদের পথ ধরে এমন একটি সংশোধনী আনব, যা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে।’
যারা বিদ্যমান সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চান তাদের কড়া সমালোচনা করেন ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন? এই সংবিধানে এত গাত্রদাহ কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল?’ তিনি বলেন, জুলাই নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়া নিয়ে। আপনারা যদি সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে বানাতে চাইতেন, তবে সেই সময় রেভল্যুশনারি (বিপ্লবী) বা ট্রানজিশনাল সরকার করলেন না কেন? একটি সাধারণ সরকারে থেকে, পুরোনো সংবিধানে থেকে আপনারা সংবিধান বাতিল করতে চাচ্ছেন, এটা আসলে হয় না। সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন? এতে এত গাত্রদাহ কেন? আমরা চাইলে তো পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারি। এর জন্য ছুড়ে ফেলার তো দরকার নেই।
যৌক্তিক প্রশ্ন তুললেই ‘জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তি’ বানানোর চেষ্টার সমালোচনা করেন পার্থ। তিনি বলেন, ‘কেউ কথা বললেই তাকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর একটা পাঁয়তারা দেখতে পাচ্ছি। এটা আমাকে আওয়ামী লীগ সরকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন আমরা তেলের দাম নিয়ে কথা বললেও বলা হতো, ওরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। এখন আমি সেই একই আচরণ দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, শুনেন, আপনারা শেষ ৬ বলে ১২ রান করেছেন, কিন্তু এর আগের ৩০০ রান আমরা সবাই মিলে করেছি। সুতরাং আপনারা এমন কথা বলবেন না যাতে দেশবাসী বিভ্রান্ত হয়, যেন জুলাইয়ে আমাদের কোনো কন্ট্রিবিউশনই নাই! ১৭ বছর আমরা কষ্ট করেছি, জেলে গিয়েছি। যেদিন আবু সাঈদ শহীদ হয়েছিল, সেদিন চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরামও কিন্তু শহীদ হয়েছে। অবদান কারও কম নয়। তিনি বলেন, আপনারা গণভোটে চারটি বিষয় দিয়েছেন। কিন্তু কোনো ভোটার যদি একটি বিষয়ে একমত না হয়, তবে সে কী করবে? হ্যাঁ-তে ভোট দেবে নাকি না-তে? আপনারা তো ভোটারদের বাধ্য করেছেন। সনদের বাকি বিষয়গুলো কেন গণভোটে দিলেন না?
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্যের শেষে পার্থ বলেন, সংবিধানের ওপর আমাদের শ্রদ্ধা থাকতে হবে, একই সঙ্গে জুলাইয়ের স্পিরিটকেও তুলে ধরতে হবে। আমরা সবাই মিলে বসে আলাপ করি। কিন্তু কোনো সদস্যের বক্তব্যে যেন জুলাইকে আন্ডারমাইন করা না হয়। আসুন আমরা পজিটিভ কিছু নিয়ে আসি।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’কে ‘জামায়াত জেনারেশন’ হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, আপনারা জেন-জিকে রিপ্রেজেন্ট করেন। দয়া করে ‘জামায়াত জেনারেশন’ হয়ে যাইয়েন না। রাজনীতিকরা ‘জুলাই সনদের’ বিরুদ্ধে নয়, বরং সংবিধান পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
জামায়াতের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে বিজেপি চেয়ারম্যান বলেন, সারা জীবন ভারতের বিরুদ্ধে রাজনীতি করে এখন ভারতের সঙ্গে মিটিং করছেন। আবার সারা জীবন ইসলামের নামে রাজনীতি করে ভোটের জন্য শেষে এসে বলছেন, আমরা শরিয়া আইন চাই না। প্রবলেম কী? আমার কথাগুলো একটু ম্যানুভার করেন। আপনারা পজিটিভ পলিটিক্স নিয়ে আসেন।
জনগণের প্রয়োজনে এই সংবিধান যেকোনো সময় সংশোধন বা সংস্কার করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, সংবিধান তো কোনো কোরআনের বাণী নয়, কোনো ওহী নয়। জনগণের জন্য সংবিধান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। কাজেই জনগণের প্রয়োজনে সংবিধান সংস্কার করায় কোনোই অসুবিধা থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমরা যদি আবার সুযোগ পাই, এই সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দেব। ওনার কথা কি একেবারেই অমূলক ছিল? সংবিধানের কথা বলে বিরোধী দলের ওপর যে জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা আমাদের স্পষ্ট মনে আছে।
যারা বিদ্যমান সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চান, তাদের ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, যদি আমরা এই সংবিধানকে আক্ষরিকভাবে মেনে চলি, তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতাই তো প্রশ্নবিদ্ধ হয়। গত ৬ আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে তাকে নিয়োগ দেওয়ার কথা। সেদিন কোন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তা অ্যাটর্নি জেনারেল জানাবেন কি? তখনকার প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান তখন কোথায় ছিলেন? তিনি বলেন, এই সংবিধানকে যদি বাইবেল বা গসপেল ধরে নিই এবং ভ্যাটিকান সিটির মতো দেশ চালাতে চাই, তবে ৬ আগস্ট বেগম জিয়া জেল থেকে বের হতে পারতেন না। তিনি জেল থেকে বের হয়েছিলেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও জনরায়ের ভিত্তিতে, বিদ্যমান সংবিধানের ভিত্তিতে নয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের রক্ত, শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে হাসিনার পতন হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, অনেকে গণভোটের আদেশকে আইন নয়, অসাংবিধানিক বলছেন। জনগণ যেখানে গণভোটের মধ্য দিয়ে এই আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে সেখানে জনগণের রায়কে অসাংবিধানিক বলা হলে এই সংসদকে কলঙ্কিত করা হবে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫২ নম্বর আর্টিকেলের মধ্যে একটা আদেশও যে আইন হতে পারে। সেই ব্যাপারে সেখানে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। তারা বলছেন, আদেশ তো আইন নয়, অসাংবিধানিক। এটা ধৃৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য, জনগণ যেখানে গণভোটের মধ্য দিয়ে এই আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেখানে জনগণের রায়কে অসাংবিধানিক বলা এই সংসদকে কলঙ্কিত করা। তিনি বলেন, অধ্যাদেশ অনুযায়ী যে গণভোট হয়েছে, সেটাকে অবৈধ বলার কোনো সুযোগ নেই।
বিরোধীদলীয় সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, এখন আমরা দেখছি, আমাদের নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে আমরা আবার ‘জুলাই সনদ’টাকেই ভুলিয়ে দিতে বসেছি। আমাদের সন্তানেরা বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে, পা হারিয়ে, চোখ হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি প্লাকার্ডে লিখেছিল যে, ‘আমরা একটা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দাঁড়িয়েছি? তারা লিখেছিল রাস্তা সংস্কারের কাজ নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সংস্কারের পরিবর্তে এখন সংশোধনীর দিকে যাচ্ছি।’
বাংলাদেশ প্রতিদিন
Reporter Name 














