দুই দশকেরও বেশি আগে যখন ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির কথা আন্তর্জাতিক মহলে জানাজানি হয়, তখন তেহরান জোর দিয়ে বলেছিল, তাদের উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এমনকি ইসলামি বিধান অনুযায়ী পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করে একটি ‘ফতোয়া’ জারি করেছিলেন।
কিন্তু গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে তার মৃত্যুর পর, খামেনির সেই ফতোয়া পুনর্বিবেচনা করার জন্য দেশটির কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পথ প্রশস্ত হতে পারে। ইরানের জনমতও এখন সেই দিকেই ধাবিত হচ্ছে। খবর সিএনএনের।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফ্ট-এর ত্রিতা পার্সি এ প্রসঙ্গে সিএনএন-কে বলেন, পারমাণবিক ফতোয়া এখন অকার্যকর। এ বিষয়ে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মতামত নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। এটি আশ্চর্যজনক নয়, কারণ দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ আলোচনার মাঝপথেই ইরানকে দুবার হামলা করেছে।
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পরও খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভ্যন্তরীণ চাপ রুখে দিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা একে খামেনির ‘কৌশলগত ধৈর্য’ বলে অভিহিত করতেন। তিনি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে এগিয়ে নিলেও কখনোই বোমা তৈরির চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেননি।
মোজতবা খামেনির অবস্থান এখনো অস্পষ্ট
গত বছর ইসরায়েলি অভিযানে বেশ কয়েকজন সামরিক ও পারমাণবিক নেতার মৃত্যু এবং সম্প্রতি ট্রাম্পের নির্দেশে তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার পর আণবিক বোমা তৈরির দাবি আরও জোরালো হয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালেই আইআরজিসি’র পারমাণবিক স্থাপনা রক্ষা ইউনিটের কমান্ডার আহমদ হকতালাব বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক নীতির পরিবর্তন এখন সম্ভব এবং তা ভাবা যেতে পারে।
ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়নি। তবে তাদের কাছে ৪০০ কেজির বেশি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। খামেনির ছেলে ও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যদি তার বাবার ফতোয়া বাতিল করেন, তবে এই ইউরেনিয়াম দিয়ে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। মোজতবা বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনা চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তিনি নতুন নেতার রাজনৈতিক বা ফতোয়া সংক্রান্ত অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত নন।
‘আত্মসংযমের কারণগুলো শেষ হয়ে গেছে’
বিশেষজ্ঞ সিনা আজোদি বলেন, এতদিন ইরান যে আত্মসংযম দেখিয়েছিল তার অন্যতম কারণ ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ভয়। কিন্তু এখন যেহেতু তারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে, তাই তাদের আর হারানোর কিছু নেই। এই যুদ্ধ সব সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

আজোদি মনে করেন, ইরান এখন অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী অস্ত্রের বদলে একটি প্রাথমিক বা অপরিপক্ক পারমাণবিক ডিভাইস তৈরি করতে পারে। এর সামরিক উপযোগিতা কম হলেও রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম; এটি মূলত ইরানের সক্ষমতা প্রদর্শন এবং বিশ্বকে সতর্ক করার জন্য একটি ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের পাল্লা?
তবে এই পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করলেই যে ইরান নিরাপদ হবে, তা নিশ্চিত নয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না এবং ৫০টি ওয়ারহেড দিয়ে ৫ হাজার পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশকে ঠেকানো সম্ভব নয়। আজোদি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি বোমার পথে হাঁটে, তবে সৌদি আরবও দ্রুত সেই পথ অনুসরণ করবে। ২০১৮ সালেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘নিঃসন্দেহে ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তবে আমরাও যত দ্রুত সম্ভব তাই করব।’
Reporter Name 
























