ঢাকা ০১:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে চলছে ঈদের প্রস্তুতি সড়ক-রেল-নৌপথে ঘরমুখো মানুষের চাপ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৫৭:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬
  • ২ বার

‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকীদ’ (কাজী নজরুল ইসলাম)। সত্যিই রমজান শেষে এবার ভয়মুক্ত পরিবেশে খুশির ঈদ সমাগত। ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ, উৎসব। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় এই উৎসব উপলক্ষে সরকারি ছুটি শুরু হয়ে গেছে গত মঙ্গলবার। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে চলছে ঈদের প্রস্তুতি। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে ছুটছেন লাখো কর্মজীবী মানুষ। এবার যেমন ভয়বাধাহীন পরিবেশ; তেমনি ধনী-গরীব সবার হাতে অর্থপ্রবাহ। ঈদ উদযাপনে তারা নিজেদের মতো করেই কেনাকাটা করছেন।

ঈদের আনন্দ ও উৎসব উদযাপনের জন্য ধর্মীয়ভাবে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিগত দেড় দশক দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে আনন্দ-উৎসব করতে পারেননি। গণতান্ত্রিক দেশে ভোটের অধিকার হারানো মানুষের মাথার উপর জগদ্দল পাথরের মতো বসেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারেননি। ওই সব পরিবারে ঈদের খুশি ছিল না।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নানান অনিশ্চয়তার মধ্যে ঈদ পার হয়েছে। নির্বাচন হবে কিনা এবং দেশে স্থিতিশীলতা আসবে কিনা তা নিয়ে মানুষের মধ্যে ছিল সন্দেহ সংশয়। এবার নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর পালিত হচ্ছে। ফলে এবারে এক মাস সিয়াম সাধনার পর যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করবেন দেশের মুসলমান সম্প্রদায়। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকায় ঈদের খুশির জোয়ারে ভাসছে দেশ। ঢাকার কর্মজীবী মানুষের গ্রামে ফেরার কথা বিবেচনা করে সরকার এবার আগেভাগেই সরকারি অফিস ছুটি দিয়েছে। ফলে ঘরমুখো মানুষকে সড়ক, নৌ, বিমান ও রেলপথে অতীতের মতো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না। রাজধানীর মার্কেটগুলোতে ঈদের নতুন কাপড় কেনাকাটায় অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ দেখা গেছে। রাজধানীর মার্কেট ও বিপনিবিতানগুলোর ক্রেতাবিক্রেতা সবার মধ্যে খুশিখুশি ভাব লক্ষ্য করা গেছে। ট্রেন, বাস, লঞ্চ সবপথেই যাত্রীরা নির্বিঘেœ ঘরে ফিরেছে। যারা গরীব ও নিম্নবিত্ত তারাও দারুণ খুশি। ইসলামের বিধান অনুযায়ী বিত্তবানরা ফেতরা, জাকাতের অর্থ তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। এতে তারাও খুশি এবং নিজেদের মতো করে কেনাকাটা করে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।

শুধু কী তাই, এবার গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকায় এবং নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ এলাকায় ঈদ উৎসব পালন করায় দেশের গ্রাম-গঞ্জের অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে। নেতারা গ্রামে যাওয়ায় জেলা শহরের বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। পাশাপাশি পরিবহন, মোবাইল আর্থিক সেবা, ব্যাংকিং খাত এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঈদ কেন্দ্র করে এবার অর্থনীতিতে বিশাল অঙ্কের অতিরিক্ত লেনদেন যুক্ত হচ্ছে; যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজার থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে। মানুষ খেয়াল খুশিমতো নিজেরা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করছেন, অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছেন।

এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশে মুসলমানদের ঘরে ঘরে ঈদের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদ-উল-ফিতর। ঈদ উদযাপনেরও প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে। রমজান মাসের হিসাব অনুযায়ী আজ বৃহস্পতিবার ২৯ রমজান। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদের নামাজ আদায় করা হবে। তবে ইতোমধ্যে সারাদেশে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ঈদ কেনাকাটাও প্রায় শেষের পথে। ক্রেতারা এখন শেষ সময়ের কেনাকাটা করছেন। ছুটির প্রথম দিন গত মঙ্গলবার থেকেই মানুষের ঘরে ফেরার ঢল শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বিঘেœ ঘরে ফিরছেন অনেকেই। ঘরমুখো কর্মজীবীদের কেউ কেউ পথেই রয়েছেন। প্রতিবারের মতো এবার ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের জন্য পথে পথে যানবাহনের চাপ থাকলেও ভোগান্তি আগের মতো নেই। কমলাপুর রেল স্টেশন, সদরঘাট ও বসিলা স্টীমার ঘাট এবং গাবতলী, মহাখালি ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রতিবারের মতো টিকেট সংকট নেই। তবে কিছু কিছু দূর পাল্লার বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের খবর পাওয়া গেলেও তা অতীতের যে কোনো ঈদের সময়ের চেয়ে কম। উচ্চবিত্ত যারা এখন আকাশ পথে যাতায়াত করতে অভ্যস্ত তারাও নির্বিঘেœ আকাশ পথে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের ইরানে যুদ্ধের কারণে ‘জ্বালানি সংকট’ গুজব ছড়ানো হলেও সরকার তেলের সংকটের সুরাহা করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের পাম্পগুলোতে জ্বালানি বিক্রী স্বাভাবিকভাবে চলছে। ফলে জ্বালানির সংকটের কারণে বাসভাড়া বৃদ্ধির সুযোগ পায়নি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কোনা অসাধু চক্র। তবে দূরপাল্লার বাসগুলোতে ভাড়া কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।

রাজধানীর বিপণিবিতান ও মার্কেটগুলো সরেজমিন ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদ উপলক্ষে এবার দেশি কাপড়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এবার পাকিস্তান থেকে কাপড়, সেলাওয়ার-কামিজ এলেও সেগুলোর দাম বেশি হওয়ায় মধ্যবিত্তের আগ্রহ কম। আর ভারত থেকে কাপড় এসেছে খুবই কম। ফলে দেশের তৈরি কাপড় এবারের ঈদের সবচেয়ে বেশি বিক্রী হচ্ছে। নিউমার্কেটে একাধিক ক্রেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় এবার আগেভাগেই ঈদের ছুটি দিয়েছে। যার জন্য কর্মজীবী মানুষ সময় নিয়ে কেনাকাটা করছেন, প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে ঘরে ফিরছেন। নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, বসুন্ধরা মার্কেট, ইস্টার্ণ প্লাজার কয়েকটি দোকানের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেনাকাটায় এবার মানুষের মধ্যে আনন্দ বেশি। মানুষ নির্বিঘেœ কেনাকাটা করছেন। বিপণিবিতান ও মার্কেটের পাশাপাশি রাজধানীর ফুটপাতগুলোতে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ঈদের কাপড়।

রাজধানীর বড় বিপণিবিতান ও মার্কেটগুলোতে প্রায় দুই সাপ্তাহ থেকে ঈদের কেনাকাটা জমে উঠেছে। নিউমার্কেট, গাউছিয়া, হাজারীবাগ লেদার মার্কেট, গুলিস্তান, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্ক, মিরপুর ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা যায়Ñ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতাদের উপস্থিতি কয়েকগুণ বেশি। বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের আগে শেষ দুই সপ্তাহই তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বছরের মোট বিক্রির বড় অংশই এই সময়েই হয়ে থাকে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা শহরের হাটবাজারগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতোই। কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় মানুষ নির্বিঘেœ ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে; পাশাপাশি এমপি-মন্ত্রী ও নেতারা নিজ নিজ এলাকার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে আথিক ভাবে সহায়তা করায় তারাও সেমাই-রুটির ও মাছ গোশতের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদের জামা-কাপড় ক্রয় করছেন।

এবার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিরাও নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ঈদ উৎযাপন ধুমধাম করে করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিগত দেড় যুগ ফ্যাসিস্ট সরকারের দখলে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা’ থাকায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ছিলেন নিষ্পেষিত। কারাগার, আদালত আর পলাতক জীবনই ছিল তাদের নিয়তি। ফলে পরিবারের সঙ্গে লাখো রাজনৈতিক নেতাকর্মী বছরের পর বছর ঈদ উদযাপন করতে পারেননি। বিগত দেড় বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলুম-নির্যাতন না থাকলেও নির্বাচন নিয়ে ছিল মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। ফলে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আগের চাপ তথা ভীতি-আতঙ্ক নেই। নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রীরা এবার নিজ নিজ এলাকায় ঈদ উদযাপন করতে চলে গেছেন। ফলে তারা দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ কিছু মানুষকে নানাভাবে আর্থিক সহায়তা করেছেন। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত এমপি এবং যারা বিগত নির্বাচনে ভোট করেছেন তারা নিজ নিজ কর্মীবাহিনীর মধ্যে ‘ঈদ উপহার’ বিলাচ্ছেন। ফলে বহু বছর পর এবার পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ সবার মধ্যে।

ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশে শত শত কোটি টাকা হাতবদল হচ্ছে। যদিও ঈদ উৎসবের মোট অর্থনৈতিক প্রভাবের সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব পাওয়া যায় না। তারপরও কেনাকাটা, পরিবহন, ইলেকট্রনিকস পণ্য, মিষ্টি, প্রসাধনী, বিভিন্ন উপহারসামগ্রী, খাওয়া দাওয়াসহ প্রতিটি সেক্টরে বিপুল অর্থপ্রবাহ চলছে। ঈদ কেন্দ্র করে বোনাস ও বিভিন্ন উৎস থেকে আসা অর্থও বাজারে প্রবাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ঈদ বোনাস পেয়েছেন। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় দেড় কোটি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষের বোনাসও ঈদবাজারে যুক্ত হয়েছে। জাকাত ও ফিতরার বিপুল অঙ্কের অর্থ বাজারে হাতবদল হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, এবারের ঈদবাজারে দুই লাখ কোটি থেকে তিন লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য এবং লেনদেন হতে পারে। এর মধ্যে শুধু পোশাকের বাজারেই লেনদেন হতে পারে ৮০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এ ছাড়া বাড়তি লেনদেন হচ্ছে।
মূলত দীর্ঘ দেড় যুগ পর এবার গণতান্ত্রিক দেশে মুক্ত পরিবেশে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে চলছে ঈদের প্রস্তুতি সড়ক-রেল-নৌপথে ঘরমুখো মানুষের চাপ

আপডেট টাইম : ১২:৫৭:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬

‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকীদ’ (কাজী নজরুল ইসলাম)। সত্যিই রমজান শেষে এবার ভয়মুক্ত পরিবেশে খুশির ঈদ সমাগত। ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ, উৎসব। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় এই উৎসব উপলক্ষে সরকারি ছুটি শুরু হয়ে গেছে গত মঙ্গলবার। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে চলছে ঈদের প্রস্তুতি। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে ছুটছেন লাখো কর্মজীবী মানুষ। এবার যেমন ভয়বাধাহীন পরিবেশ; তেমনি ধনী-গরীব সবার হাতে অর্থপ্রবাহ। ঈদ উদযাপনে তারা নিজেদের মতো করেই কেনাকাটা করছেন।

ঈদের আনন্দ ও উৎসব উদযাপনের জন্য ধর্মীয়ভাবে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিগত দেড় দশক দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে আনন্দ-উৎসব করতে পারেননি। গণতান্ত্রিক দেশে ভোটের অধিকার হারানো মানুষের মাথার উপর জগদ্দল পাথরের মতো বসেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারেননি। ওই সব পরিবারে ঈদের খুশি ছিল না।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নানান অনিশ্চয়তার মধ্যে ঈদ পার হয়েছে। নির্বাচন হবে কিনা এবং দেশে স্থিতিশীলতা আসবে কিনা তা নিয়ে মানুষের মধ্যে ছিল সন্দেহ সংশয়। এবার নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর পালিত হচ্ছে। ফলে এবারে এক মাস সিয়াম সাধনার পর যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করবেন দেশের মুসলমান সম্প্রদায়। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকায় ঈদের খুশির জোয়ারে ভাসছে দেশ। ঢাকার কর্মজীবী মানুষের গ্রামে ফেরার কথা বিবেচনা করে সরকার এবার আগেভাগেই সরকারি অফিস ছুটি দিয়েছে। ফলে ঘরমুখো মানুষকে সড়ক, নৌ, বিমান ও রেলপথে অতীতের মতো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না। রাজধানীর মার্কেটগুলোতে ঈদের নতুন কাপড় কেনাকাটায় অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ দেখা গেছে। রাজধানীর মার্কেট ও বিপনিবিতানগুলোর ক্রেতাবিক্রেতা সবার মধ্যে খুশিখুশি ভাব লক্ষ্য করা গেছে। ট্রেন, বাস, লঞ্চ সবপথেই যাত্রীরা নির্বিঘেœ ঘরে ফিরেছে। যারা গরীব ও নিম্নবিত্ত তারাও দারুণ খুশি। ইসলামের বিধান অনুযায়ী বিত্তবানরা ফেতরা, জাকাতের অর্থ তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। এতে তারাও খুশি এবং নিজেদের মতো করে কেনাকাটা করে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।

শুধু কী তাই, এবার গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকায় এবং নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ এলাকায় ঈদ উৎসব পালন করায় দেশের গ্রাম-গঞ্জের অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে। নেতারা গ্রামে যাওয়ায় জেলা শহরের বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। পাশাপাশি পরিবহন, মোবাইল আর্থিক সেবা, ব্যাংকিং খাত এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঈদ কেন্দ্র করে এবার অর্থনীতিতে বিশাল অঙ্কের অতিরিক্ত লেনদেন যুক্ত হচ্ছে; যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজার থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে। মানুষ খেয়াল খুশিমতো নিজেরা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করছেন, অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছেন।

এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশে মুসলমানদের ঘরে ঘরে ঈদের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদ-উল-ফিতর। ঈদ উদযাপনেরও প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে। রমজান মাসের হিসাব অনুযায়ী আজ বৃহস্পতিবার ২৯ রমজান। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদের নামাজ আদায় করা হবে। তবে ইতোমধ্যে সারাদেশে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ঈদ কেনাকাটাও প্রায় শেষের পথে। ক্রেতারা এখন শেষ সময়ের কেনাকাটা করছেন। ছুটির প্রথম দিন গত মঙ্গলবার থেকেই মানুষের ঘরে ফেরার ঢল শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বিঘেœ ঘরে ফিরছেন অনেকেই। ঘরমুখো কর্মজীবীদের কেউ কেউ পথেই রয়েছেন। প্রতিবারের মতো এবার ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের জন্য পথে পথে যানবাহনের চাপ থাকলেও ভোগান্তি আগের মতো নেই। কমলাপুর রেল স্টেশন, সদরঘাট ও বসিলা স্টীমার ঘাট এবং গাবতলী, মহাখালি ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রতিবারের মতো টিকেট সংকট নেই। তবে কিছু কিছু দূর পাল্লার বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের খবর পাওয়া গেলেও তা অতীতের যে কোনো ঈদের সময়ের চেয়ে কম। উচ্চবিত্ত যারা এখন আকাশ পথে যাতায়াত করতে অভ্যস্ত তারাও নির্বিঘেœ আকাশ পথে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের ইরানে যুদ্ধের কারণে ‘জ্বালানি সংকট’ গুজব ছড়ানো হলেও সরকার তেলের সংকটের সুরাহা করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের পাম্পগুলোতে জ্বালানি বিক্রী স্বাভাবিকভাবে চলছে। ফলে জ্বালানির সংকটের কারণে বাসভাড়া বৃদ্ধির সুযোগ পায়নি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কোনা অসাধু চক্র। তবে দূরপাল্লার বাসগুলোতে ভাড়া কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।

রাজধানীর বিপণিবিতান ও মার্কেটগুলো সরেজমিন ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদ উপলক্ষে এবার দেশি কাপড়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এবার পাকিস্তান থেকে কাপড়, সেলাওয়ার-কামিজ এলেও সেগুলোর দাম বেশি হওয়ায় মধ্যবিত্তের আগ্রহ কম। আর ভারত থেকে কাপড় এসেছে খুবই কম। ফলে দেশের তৈরি কাপড় এবারের ঈদের সবচেয়ে বেশি বিক্রী হচ্ছে। নিউমার্কেটে একাধিক ক্রেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় এবার আগেভাগেই ঈদের ছুটি দিয়েছে। যার জন্য কর্মজীবী মানুষ সময় নিয়ে কেনাকাটা করছেন, প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে ঘরে ফিরছেন। নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, বসুন্ধরা মার্কেট, ইস্টার্ণ প্লাজার কয়েকটি দোকানের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেনাকাটায় এবার মানুষের মধ্যে আনন্দ বেশি। মানুষ নির্বিঘেœ কেনাকাটা করছেন। বিপণিবিতান ও মার্কেটের পাশাপাশি রাজধানীর ফুটপাতগুলোতে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ঈদের কাপড়।

রাজধানীর বড় বিপণিবিতান ও মার্কেটগুলোতে প্রায় দুই সাপ্তাহ থেকে ঈদের কেনাকাটা জমে উঠেছে। নিউমার্কেট, গাউছিয়া, হাজারীবাগ লেদার মার্কেট, গুলিস্তান, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্ক, মিরপুর ও উত্তরা এলাকার বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা যায়Ñ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতাদের উপস্থিতি কয়েকগুণ বেশি। বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের আগে শেষ দুই সপ্তাহই তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বছরের মোট বিক্রির বড় অংশই এই সময়েই হয়ে থাকে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা শহরের হাটবাজারগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতোই। কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় মানুষ নির্বিঘেœ ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে; পাশাপাশি এমপি-মন্ত্রী ও নেতারা নিজ নিজ এলাকার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে আথিক ভাবে সহায়তা করায় তারাও সেমাই-রুটির ও মাছ গোশতের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদের জামা-কাপড় ক্রয় করছেন।

এবার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিরাও নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ঈদ উৎযাপন ধুমধাম করে করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিগত দেড় যুগ ফ্যাসিস্ট সরকারের দখলে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা’ থাকায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ছিলেন নিষ্পেষিত। কারাগার, আদালত আর পলাতক জীবনই ছিল তাদের নিয়তি। ফলে পরিবারের সঙ্গে লাখো রাজনৈতিক নেতাকর্মী বছরের পর বছর ঈদ উদযাপন করতে পারেননি। বিগত দেড় বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলুম-নির্যাতন না থাকলেও নির্বাচন নিয়ে ছিল মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। ফলে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আগের চাপ তথা ভীতি-আতঙ্ক নেই। নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রীরা এবার নিজ নিজ এলাকায় ঈদ উদযাপন করতে চলে গেছেন। ফলে তারা দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ কিছু মানুষকে নানাভাবে আর্থিক সহায়তা করেছেন। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত এমপি এবং যারা বিগত নির্বাচনে ভোট করেছেন তারা নিজ নিজ কর্মীবাহিনীর মধ্যে ‘ঈদ উপহার’ বিলাচ্ছেন। ফলে বহু বছর পর এবার পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ সবার মধ্যে।

ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশে শত শত কোটি টাকা হাতবদল হচ্ছে। যদিও ঈদ উৎসবের মোট অর্থনৈতিক প্রভাবের সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব পাওয়া যায় না। তারপরও কেনাকাটা, পরিবহন, ইলেকট্রনিকস পণ্য, মিষ্টি, প্রসাধনী, বিভিন্ন উপহারসামগ্রী, খাওয়া দাওয়াসহ প্রতিটি সেক্টরে বিপুল অর্থপ্রবাহ চলছে। ঈদ কেন্দ্র করে বোনাস ও বিভিন্ন উৎস থেকে আসা অর্থও বাজারে প্রবাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ঈদ বোনাস পেয়েছেন। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় দেড় কোটি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষের বোনাসও ঈদবাজারে যুক্ত হয়েছে। জাকাত ও ফিতরার বিপুল অঙ্কের অর্থ বাজারে হাতবদল হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, এবারের ঈদবাজারে দুই লাখ কোটি থেকে তিন লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য এবং লেনদেন হতে পারে। এর মধ্যে শুধু পোশাকের বাজারেই লেনদেন হতে পারে ৮০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এ ছাড়া বাড়তি লেনদেন হচ্ছে।
মূলত দীর্ঘ দেড় যুগ পর এবার গণতান্ত্রিক দেশে মুক্ত পরিবেশে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে।