শেরপুরে হাইব্রিড ব্রি-৯৬ ধানের নামে নকল বীজ বিক্রির অভিযোগে বোরো মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক কৃষক। ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর ও নলকুড়া ইউনিয়নের অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০ কৃষক প্রায় ৮০ থেকে ৯০ একর বা তারও বেশি জমিতে এ বীজ আবাদ করে এখন ফলনহীন মাঠ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, ঝিনাইগাতী বাজারের মেসার্স নুরুল এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সাব্বির বীজ ভান্ডার থেকে মধুপুরের ‘মিরন সিড কোম্পানি’র নামে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ব্রি-৯৬ বীজ কিনে আবাদ করেছিলেন তারা। কিন্তু ধানগাছে শিষ আসার সময় হলেও অধিকাংশ জমিতে শিষ বের হচ্ছে না, কোথাও বা বের হলেও তা শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে গত বৃহস্পতিবার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।
রোববার (২০ এপ্রিল) দুপুরে ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের দিঘিরপাড়, চতল বন্দভাটপাড়া ও রামনগর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ ধানের মাঠে স্বাভাবিক সময়ের মতো শিষ আসেনি। কোথাও গাছ নষ্ট হচ্ছে, কোথাও আংশিক শিষ বের হয়ে তা মরে যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি একরে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে চাষ করা এসব জমিতে এবার ধান ঘরে তোলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
দিঘিরপাড় গ্রামের কৃষক মুসলিম উদ্দিন (আন্তা) বলেন, ব্রি-৯৬ বীজ কিনে দেড় একর জমিতে আবাদ করেছি। এতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন ধান হওয়ার সময় হলেও উল্টো ফসল নষ্ট হচ্ছে। এক একর জমিতে যেখানে ১০০ মণ ধান হয়, সেখানে এবার ১ মণও পাবো না। আমাদের অবস্থা এখন মরা ছাড়া উপায় নেই।
একই গ্রামের নওশাদ মিয়া বলেন, আড়াই একর জমিতে এই ধান চাষ করেছি। ভালো বীজ বলে বিক্রি করেছে দোকানদার। এখন ধানই বের হচ্ছে না। কৃষি অফিসে গেলে বলে, সময় লাগবে, আবার কেউ বলে ওষুধ দিতে হবে। গাছ নিচ থেকে শুকিয়ে যাচ্ছে। আমরা এর ক্ষতিপূরণ চাই।
চতল বন্দভাটপাড়া গ্রামের কৃষক আজাদ মিয়া বলেন, আমরা নতুন কৃষক না। বছরের পর বছর ধান চাষ করি। কিন্তু এবার ব্রি-৯৬ বীজ আবাদ করে আমাদের খুন করার মতো অবস্থা হয়েছে। মাঠে দাঁড়িয়ে মরার মতো অবস্থা।
রামনগর গ্রামের কৃষক সোহেল রানা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের গ্রামের প্রায় সব জমির ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে আসেন না। আমরা এর সঠিক তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ চাই।
এমন অভিযোগ রয়েছে আরও অনেক কৃষকের। ভাটপাড়া গ্রামের সুরুজ জামান, বিল্লাল মিয়া, রাংটিয়া গ্রামের আব্দুল হক, রামনগরের চান মিয়া ও হোসেন আলীসহ অসংখ্য কৃষক একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স নুরুল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. নুরুল আমিন বলেন, আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত বীজই বিক্রি করেছি। বীজের মোড়কে কোনো অনিয়ম থাকলে সেটা কোম্পানির বিষয়। আমরা শুধু বিক্রি করেছি। এ বছর প্রথম এ বীজ এনেছিলাম, অল্প লাভে বিক্রি করেছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না।
মধুপুরের মিরন সিড কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেন, এ ধরনের ঘটনার কথা শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন এলাকা থেকে হাইব্রিড ব্রি-৯৬ বীজ নিয়ে অভিযোগ পাচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্রি-৯৬-এর পরিবর্তে অন্য জাতের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বীজ উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে আগামী আমন মৌসুমে প্রণোদনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাখাওত হোসেন বলেন, ঝিনাইগাতীতে একজন বিএডিসি ডিলারের মাধ্যমে ব্রি-৯৬ নামে বীজ বিক্রির অভিযোগ পেয়েছি। এখনো ধানের শীষ বের হয়নি। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত ডিলারকে শোকজ করা হয়েছে। ধানের গুণগতমান যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, চলতি মৌসুমে শেরপুর জেলায় মোট ৯১ হাজার ৮১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে যাবেন বলে আশঙ্কা করছেন।
Reporter Name 

























