ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানোর পাশাপাশি দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নিতে নতুন পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এদিকে ইরান দাবি করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও তারা অন্তত আরও ছয় মাস তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
তেহরানে তেল স্থাপনায় হামলার পর সৃষ্টি ‘আগুনের নদী’
ইসরায়েলি বিমান হামলার ফলে তেহরান ও আশপাশের অঞ্চলের কয়েকটি তেল সংরক্ষণাগার ও জ্বালানি ডিপোতে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ডিপো থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বের হয়ে শহরের পয়ঃনিষ্কাশন নালা বা ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। পরে সেই তেলের সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে শহরের কিছু রাস্তার পাশে আগুন প্রবাহিত হতে দেখা যায়। স্থানীয়রা একে ‘আগুনের নদী’ বলে বর্ণনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ড্রেনের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ এলাকায় আগুনের শিখা প্রবাহিত হচ্ছে। তেহরানভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ‘লিভিং ইন তেহরান’ এই ভিডিওটি প্রকাশ করে।
ইরানের তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেহরানের পশ্চিমে আলবোর্জ প্রদেশের কারাজসহ অন্তত তিনটি স্থানের তেল ডিপোতে বিমান হামলা হয়েছে। হামলার ফলে এসব স্থাপনায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরান ও আলবোর্জ অঞ্চলের চারটি জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং একটি তেল স্থানান্তর কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত চারজন ট্যাঙ্কার চালক নিহত হয়েছেন।
ইসফাহান প্রদেশে বিমান হামলায় হতাহত
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশ ইসফাহানেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে কয়েকটি উৎপাদন কারখানা, ওয়ার্কশপ এবং একটি ঘোড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এই হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত এবং আরও অনেকেই আহত হয়েছেন।
ইসফাহান প্রদেশের অন্তত আটটি শহর এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব শহরের মধ্যে রয়েছে প্রাদেশিক রাজধানী ইসফাহান, নাজাফাবাদ, আরান, বিদগোল, বারখার, খোমেনি শহর, শাহরেজা, ফালাভারজান এবং মোবারাকেহ।
ইরানের যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি ইসরায়েলের
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইসফাহান বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের কয়েকটি এফ-১৪ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিমান শনাক্তকারী রাডার সিস্টেমেও আঘাত হানা হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী আরও দাবি করেছে, এই হামলাটি তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে চালানো আগের একটি অভিযানের ধারাবাহিকতা। সেই অভিযানে ইরানের কুদস ফোর্সের অন্তত ১৬টি বিমান ধ্বংস করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটিতে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নামের একটি সংস্থা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে। এই পরিষদের কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, নতুন নেতা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে এবং একটি সম্ভাব্য নামের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে।
তারা আশা করছেন, খুব শিগগিরই এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতার দাবি আইআরজিসির
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও ইরান অন্তত ছয় মাস তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি বলেন, এখন পর্যন্ত ইরান মূলত প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত এবং দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে।
তার মতে, ইরানের হাতে এমন কিছু উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যেগুলো এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়নি।
ইউরেনিয়াম দখলে কমান্ডো অভিযান পরিকল্পনা
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দখল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিশেষ বাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
ধারণা করা হচ্ছে, যখন নিশ্চিত হবে যে ইরানের সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে, তখনই এই অভিযান চালানো হতে পারে।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪০০ কেজির বেশি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পর্যায়ের খুব কাছাকাছি।
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, যদি বিশ্বের কোথাও আমেরিকান নাগরিকদের হত্যা করা হয় বা তাদের হুমকি দেওয়া হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হামলাকারীদের খুঁজে বের করে হত্যা করবে। এই বার্তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বোমা হামলার ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে।
কুয়েত বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাংক লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শত্রুপক্ষের একাধিক ড্রোন আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে এবং সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করছে সেনাবাহিনী।
তবে হামলায় কতটা ক্ষতি হয়েছে বা কারা হামলা চালিয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
চীনের শান্তি আহ্বান
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান হওয়া উচিত ছিল না। তার মতে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি যুদ্ধ বন্ধ করে দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কাতারের সতর্ক অবস্থান
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, ইরানের হামলার মুখে কাতার নিজের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না।
বৈরুতে ইরানি বাহিনীর ওপর হামলা
ইসরায়েল দাবি করেছে, লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের কুদস ফোর্সের কয়েকজন কমান্ডারকে লক্ষ্য করে তারা একটি নির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন সেনা আটকের দাবি
ইরানের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর কয়েকজন মার্কিন সেনাকে আটক করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবিকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ট্রাম্পের দাবি—ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এক সপ্তাহের অভিযানে ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার দাবি, বহু যুদ্ধজাহাজ ও বিমান ধ্বংস করা হয়েছে এবং ড্রোন ও মিসাইল তৈরির সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
Reporter Name 
























