ঢাকা ০৫:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বুড়ো আঙুলের রাজনীতি, আচরণবিধির প্রশ্ন ও প্রশাসনের মুখোমুখি রুমিন ফারহানা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:১৭:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩৬ বার

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। সেই উত্তাপ শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; প্রশাসন, আইন ও আচরণবিধির সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল–আশুগঞ্জ–বিজয়নগর একাংশ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রকাশ্য বাগ্‌বিতণ্ডা সেই সংঘর্ষেরই এক নগ্ন উদাহরণ। ঘটনাটি শুধু একটি উঠান বৈঠক বা ৪০ হাজার টাকার জরিমানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বড় প্রশ্নগুলো সামনে এনে দিয়েছে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে উদ্দেশ করে একজন প্রার্থী বলছেন— “আপনি পারলে থামাই দেন… নেক্সট টাইম কিন্তু ভদ্রতা দেখাব না।” আরও এগিয়ে গিয়ে প্রশাসনকে কার্যত হুমকির ভাষায় বলা হয়, “আমি যদি না বলি, এখান থেকে বাইর হইতে পারবেন না।” এই বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘বুড়ো আঙুল’ প্রদর্শনের প্রতীকী রাজনীতি—যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

প্রশ্ন হলো, এটি কি শুধুই আবেগতাড়িত এক প্রার্থীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, নাকি প্রশাসনের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ?

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরিচিত কোনো নাম নন। অক্সফোর্ডশিক্ষিত, ইংরেজিতে সাবলীল, টক শোতে যুক্তিনির্ভর বক্তব্যে পরিচিত এই রাজনীতিক একসময় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ছিলেন, সংরক্ষিত আসনের এমপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বরাবরই ‘আধুনিক, প্রগতিশীল ও স্পষ্টভাষী’ হিসেবে পরিচিত। ঠিক এই ইমেজের কারণেই তাঁর আচরণ আরও বেশি করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

কারণ, প্রশাসনের সঙ্গে প্রকাশ্য তর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা আচরণবিধি প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে কার্যত “বুড়ো আঙুল” দেখানো কোনোভাবেই আধুনিক রাজনীতির দৃষ্টান্ত হতে পারে না। বরং এটি ক্ষমতার বাইরে থেকেও ক্ষমতাসুলভ আচরণের এক বিপজ্জনক নজির।

অবশ্য রুমিন ফারহানার অভিযোগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও নেই। তিনি বলছেন, তাঁর প্রতিপক্ষ প্রতিদিন স্টেজ করে, সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও প্রশাসন সেখানে নীরব। অথচ তিনি শুধু হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করায় বারবার বাধা পাচ্ছেন, জরিমানা দিচ্ছেন। প্রশাসনের এই “দ্বৈত মানদণ্ড” যদি সত্য হয়, তাহলে সেটিও সমানভাবে গুরুতর অভিযোগ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকলেই কি একজন প্রার্থী আচরণবিধি অমান্য করতে পারেন? বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া কি কোনোভাবেই ন্যায্য হতে পারে?

গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো—আইনের শাসন। সেই আইনের শাসন ভাঙে তখনই, যখন কেউ নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে। নির্বাচনী মাঠে প্রশাসন অনেক সময় বিতর্কিত ভূমিকা রাখে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তার প্রতিবাদ হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক পথে—লিখিত অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন, আদালত কিংবা গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক বক্তব্যের মাধ্যমে। ক্যামেরার সামনে ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘ওয়ার্নিং’ দেওয়া বা সমর্থকদের উসকানি দেওয়া গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ভাষা নয়।

এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। একই এলাকায় যদি এক পক্ষ বারবার আচরণবিধি ভঙ্গ করেও ছাড় পায়, আর অন্য পক্ষকে একের পর এক জরিমানা গুনতে হয়, তাহলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ জাগবেই। নির্বাচন কমিশনের অধীন মাঠ প্রশাসনের কাজ শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং আস্থা তৈরি করাও। সেই আস্থার ঘাটতিই এই ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, সেখানে সহানুভূতির পাল্লা খুব একটা রুমিন ফারহানার দিকে ঝুঁকছে না। বরং অনেকেই বলছেন—তিনি নিজেই বিএনপির সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, এখন প্রশাসনকে চাপ দিয়ে ‘ভিকটিম’ সাজতে চাইছেন। কেউ কেউ আরও কঠোর ভাষায় বলছেন—টেলিভিশনের আলোতে যে ভাষা শোভন মনে হয়, মাঠ রাজনীতিতে তার বাস্তবতা আলাদা।

এই বিতর্কে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে রাজনীতির ভাবমূর্তির। একজন শিক্ষিত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত নারী রাজনীতিক যখন আচরণবিধি রক্ষাকারী কর্মকর্তার সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে জড়ান, তখন তা তরুণদের জন্য কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয় না। বরং এটি প্রমাণ করে, আমাদের রাজনীতিতে এখনো সহনশীলতা ও শিষ্টাচারের সংকট প্রকট।

নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই নয়; এটি নৈতিকতারও পরীক্ষা। প্রশাসন যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি প্রার্থীরাও যদি আইনকে অবজ্ঞা করেন, তাহলে সেই নির্বাচন আর গণতান্ত্রিক থাকে না—তা হয়ে ওঠে শক্তির প্রদর্শনী।

রুমিন ফারহানা হয়তো মনে করছেন, তাঁকে টার্গেট করা হচ্ছে। প্রশাসন হয়তো বলছে, আইন সবার জন্য সমান। এই দ্বন্দ্বের সত্য কোথায়—তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো, এই প্রশ্নের উত্তর—আমরা কি এমন একটি নির্বাচন চাই, যেখানে প্রার্থীরা প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখায়, আর প্রশাসন নির্বিকার থাকে?

উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে এই ঘটনাকে শুধু ব্যক্তিগত আচরণ হিসেবে নয়, বরং নির্বাচনী সংস্কারের একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত। কারণ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি আইনের শাসন, রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার সমন্বিত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় কোনো পক্ষই যদি সীমা লঙ্ঘন করে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোই। ঠিক এই বাস্তবতাকেই মনে করিয়ে দেন রাষ্ট্রচিন্তক জন লক—“যেখানে আইনের শাসন শেষ হয়, সেখানেই স্বৈরশাসনের শুরু।”— জন লক (John Locke), রাষ্ট্রচিন্তক ও আধুনিক গণতান্ত্রিক চিন্তার পথিকৃৎ।
নইলে বুড়ো আঙুল একদিন শুধু প্রশাসনকে নয়, পুরো গণতন্ত্রকেই চোখ দেখাতে পারে।

নিয়াজ মাহমুদ লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

বুড়ো আঙুলের রাজনীতি, আচরণবিধির প্রশ্ন ও প্রশাসনের মুখোমুখি রুমিন ফারহানা

আপডেট টাইম : ১১:১৭:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। সেই উত্তাপ শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; প্রশাসন, আইন ও আচরণবিধির সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল–আশুগঞ্জ–বিজয়নগর একাংশ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রকাশ্য বাগ্‌বিতণ্ডা সেই সংঘর্ষেরই এক নগ্ন উদাহরণ। ঘটনাটি শুধু একটি উঠান বৈঠক বা ৪০ হাজার টাকার জরিমানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বড় প্রশ্নগুলো সামনে এনে দিয়েছে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে উদ্দেশ করে একজন প্রার্থী বলছেন— “আপনি পারলে থামাই দেন… নেক্সট টাইম কিন্তু ভদ্রতা দেখাব না।” আরও এগিয়ে গিয়ে প্রশাসনকে কার্যত হুমকির ভাষায় বলা হয়, “আমি যদি না বলি, এখান থেকে বাইর হইতে পারবেন না।” এই বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘বুড়ো আঙুল’ প্রদর্শনের প্রতীকী রাজনীতি—যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

প্রশ্ন হলো, এটি কি শুধুই আবেগতাড়িত এক প্রার্থীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, নাকি প্রশাসনের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ?

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরিচিত কোনো নাম নন। অক্সফোর্ডশিক্ষিত, ইংরেজিতে সাবলীল, টক শোতে যুক্তিনির্ভর বক্তব্যে পরিচিত এই রাজনীতিক একসময় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ছিলেন, সংরক্ষিত আসনের এমপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বরাবরই ‘আধুনিক, প্রগতিশীল ও স্পষ্টভাষী’ হিসেবে পরিচিত। ঠিক এই ইমেজের কারণেই তাঁর আচরণ আরও বেশি করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

কারণ, প্রশাসনের সঙ্গে প্রকাশ্য তর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা আচরণবিধি প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে কার্যত “বুড়ো আঙুল” দেখানো কোনোভাবেই আধুনিক রাজনীতির দৃষ্টান্ত হতে পারে না। বরং এটি ক্ষমতার বাইরে থেকেও ক্ষমতাসুলভ আচরণের এক বিপজ্জনক নজির।

অবশ্য রুমিন ফারহানার অভিযোগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও নেই। তিনি বলছেন, তাঁর প্রতিপক্ষ প্রতিদিন স্টেজ করে, সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও প্রশাসন সেখানে নীরব। অথচ তিনি শুধু হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করায় বারবার বাধা পাচ্ছেন, জরিমানা দিচ্ছেন। প্রশাসনের এই “দ্বৈত মানদণ্ড” যদি সত্য হয়, তাহলে সেটিও সমানভাবে গুরুতর অভিযোগ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকলেই কি একজন প্রার্থী আচরণবিধি অমান্য করতে পারেন? বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া কি কোনোভাবেই ন্যায্য হতে পারে?

গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো—আইনের শাসন। সেই আইনের শাসন ভাঙে তখনই, যখন কেউ নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে। নির্বাচনী মাঠে প্রশাসন অনেক সময় বিতর্কিত ভূমিকা রাখে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তার প্রতিবাদ হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক পথে—লিখিত অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন, আদালত কিংবা গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক বক্তব্যের মাধ্যমে। ক্যামেরার সামনে ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘ওয়ার্নিং’ দেওয়া বা সমর্থকদের উসকানি দেওয়া গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ভাষা নয়।

এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। একই এলাকায় যদি এক পক্ষ বারবার আচরণবিধি ভঙ্গ করেও ছাড় পায়, আর অন্য পক্ষকে একের পর এক জরিমানা গুনতে হয়, তাহলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ জাগবেই। নির্বাচন কমিশনের অধীন মাঠ প্রশাসনের কাজ শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং আস্থা তৈরি করাও। সেই আস্থার ঘাটতিই এই ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, সেখানে সহানুভূতির পাল্লা খুব একটা রুমিন ফারহানার দিকে ঝুঁকছে না। বরং অনেকেই বলছেন—তিনি নিজেই বিএনপির সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, এখন প্রশাসনকে চাপ দিয়ে ‘ভিকটিম’ সাজতে চাইছেন। কেউ কেউ আরও কঠোর ভাষায় বলছেন—টেলিভিশনের আলোতে যে ভাষা শোভন মনে হয়, মাঠ রাজনীতিতে তার বাস্তবতা আলাদা।

এই বিতর্কে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে রাজনীতির ভাবমূর্তির। একজন শিক্ষিত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত নারী রাজনীতিক যখন আচরণবিধি রক্ষাকারী কর্মকর্তার সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে জড়ান, তখন তা তরুণদের জন্য কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয় না। বরং এটি প্রমাণ করে, আমাদের রাজনীতিতে এখনো সহনশীলতা ও শিষ্টাচারের সংকট প্রকট।

নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই নয়; এটি নৈতিকতারও পরীক্ষা। প্রশাসন যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি প্রার্থীরাও যদি আইনকে অবজ্ঞা করেন, তাহলে সেই নির্বাচন আর গণতান্ত্রিক থাকে না—তা হয়ে ওঠে শক্তির প্রদর্শনী।

রুমিন ফারহানা হয়তো মনে করছেন, তাঁকে টার্গেট করা হচ্ছে। প্রশাসন হয়তো বলছে, আইন সবার জন্য সমান। এই দ্বন্দ্বের সত্য কোথায়—তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো, এই প্রশ্নের উত্তর—আমরা কি এমন একটি নির্বাচন চাই, যেখানে প্রার্থীরা প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখায়, আর প্রশাসন নির্বিকার থাকে?

উত্তর যদি ‘না’ হয়, তবে এই ঘটনাকে শুধু ব্যক্তিগত আচরণ হিসেবে নয়, বরং নির্বাচনী সংস্কারের একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত। কারণ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি আইনের শাসন, রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার সমন্বিত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় কোনো পক্ষই যদি সীমা লঙ্ঘন করে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোই। ঠিক এই বাস্তবতাকেই মনে করিয়ে দেন রাষ্ট্রচিন্তক জন লক—“যেখানে আইনের শাসন শেষ হয়, সেখানেই স্বৈরশাসনের শুরু।”— জন লক (John Locke), রাষ্ট্রচিন্তক ও আধুনিক গণতান্ত্রিক চিন্তার পথিকৃৎ।
নইলে বুড়ো আঙুল একদিন শুধু প্রশাসনকে নয়, পুরো গণতন্ত্রকেই চোখ দেখাতে পারে।

নিয়াজ মাহমুদ লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com