ঢাকা ১২:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০১:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
  • ১ বার

আজ বৃহস্পতিবার ২৬ মার্চ। বাংলাদেশের ৫৫তম স্বাধীনতা দিবস। তবে এবারের স্বাধীনতা দিবস সম্পূর্ণ নতুন এবং ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে হাজির হয়েছে। মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের ২ বছরের সেনা নিয়ন্ত্রিত শাসন এবং শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারÑ মোট সাড়ে ১৭ বছরের স্বৈরাচারের অবসানের পর মুক্ত অবাধ পরিবেশে স্বাধীনতা দিবস পালিত হচ্ছে। এছাড়া শেখ হাসিনার ৩টি তামাশার নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) ও ২০০৮ সালের ইন্দো-মার্কিন-মঈনের সেনাশাসন সমর্থিত নির্বাচনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অত্যন্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পর একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে স্বাধীনতা দিবস এসেছে আজ। গত নির্বাচনের সাড়ে ১৭ বছর পর গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রার বছর। সব মিলিয়ে এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে জনগণের স্বাধীনতা দিবস হিসাবে, উদযাপিত হচ্ছে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্বাধীনতা দিবস হিসাবে। ২০২৪ সালের আগেও এই ইনকিলাবের বিশেষ সংখ্যায় অনেক লেখা লিখেছি। কিন্তু কোনো দিন মন খুলে লিখতে পারিনি। হাত খুলে লিখতে পারিনি। আজ মন খুলে প্রাণ খুলে লিখতে পারছি।

মুক্ত উদার গণতন্ত্রে শুধুমাত্র স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করলেই চলবে না। সেই সাথে এই অবাধ স্বাধীনতা সরকারসহ জনগণের উপরেও চাপিয়েছে এক গুরু দায়িত্ব। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে দিল্লীতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশের জনগণের ওপর অর্পিত হয়েছিলো এক গুরু দায়িত্ব। কারণ, জুলাই বিপ্লব কোনো দল বিশেষ বা ছাত্র সংগঠন বিশেষের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। ছাত্ররা চাকরির কোটা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল সত্য, কিন্তু বুলেট দিয়ে সেই আন্দোলনকে হাসিনা মোকাবেলা করতে গিয়ে প্রথমে ছাত্র, পরে সমগ্র জনতার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। ছাত্র-জনতার চ্যালেঞ্জ ছিলো শেখ হাসিনাকে হটাতেই হবে। আর শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ ছিলো, যতো রক্ত ঝরে ঝরুক, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতেই হবে। অবশেষে ১৪শ’ শহীদ এবং ২৬ হাজার মানুষের যখমের বিনিময়ে পালিয়ে যেতে হলো শেখ হাসিনাকে।

একথা ঠিক যে, ছাত্রদের নেতৃত্বে জনতা বিপ্লব সংঘটিত করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনাকে হটিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে তারা মনে মনে পোষণ করেছে এক বিরাট প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা নতুন কিছু নয়। সেই প্রত্যাশা ঘোষিত হয়েছে ৫৫ বছর আগে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিব নগরে গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। সেই ঘোষণাপত্রে অঙ্গীকার করা হয়েছে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা হবে।
এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু জনগণের সেই সামাজিক সুবিচার এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হলো না। শেখ মুজিব গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে স্বাধীনতার পর ক্ষমতা পেয়ে প্রথম সেই গণতন্ত্রকেই হত্যা করে এক দলীয় বাকশাল কায়েম করেন। দুর্নীতি যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি অভাব অনটনও বাড়তে থাকে। শেখ মুজিবের প্রায় ৭ বছর পর দেশে এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন। ৯০ সালে জনগণ আবার রাস্তায় নামে। এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদকে সরিয়ে দিলেও জনগণের সেই আশা আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেনি।

দুই
জেনারেল জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবের বাকশাল বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। একদল বিপথগামী সেনা অফিসার তাকে হত্যা করার পর বেগম খালেদা জিয়া দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রেসিডেনিশয়াল বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। জিয়া এবং বেগম জিয়া শেখ মুজিবের অনুসৃত ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির বদলে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেন। বেগম জিয়ার আমলেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সময় গড়িয়ে যায়। ভূরাজনীতিও বদলে যায়। ২০০৬ সালের শেষের দিকে বেগম জিয়ার মেয়াদ অবসান হওয়ার পর থেকেই রাজনীতি চক্রান্তের চোরাগলি পথে প্রবেশ করে। নেমে আসে ১/১১ এর কালো অধ্যায়। দেশ ইন্দো-মার্কিন বিশেষ করে ভারতের তল্পি বহন শুরু করে। আগেই বলেছি যে, পাতানো এক নির্বাচনে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার পর বাংলাদেশের ওপর নেমে আসে সব ধরনের গর্দিশ। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসন, দুঃশাসন, লুণ্ঠন এবং গণহত্যার পর জনগণ রুখে দাঁড়ায় এবং সংঘটিত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।

তিন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে জনগণের সার্বভৌম আকাক্সক্ষা ও সার্বভৌম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে গঠিত হয় ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার বা ইন্টারিম সরকার এতই সাম্প্রতিক যে সেসম্পর্কে আর নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। তবে কয়েকটি কাজ ড. ইউনূসের সরকার জনগণনের অভিপ্রায় অনুযায়ী করেছে। ভারতের গোলামী থেকে দেশকে বের করে এনেছেন। তার ১৮ মাসের শাসনামলে রাজনৈতিক কারণে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি, কোনো নতুন আয়নাঘর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনৈতিক কারণে কোনো গুম বা খুন বা বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকা- সংঘটিত হয়নি। জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রজু করা অনেকগুলো গণহত্যার মামলার একটিতে শেখ হাসিনা ও তার আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ফাঁসির দ- হয়েছে। আরো অনেক মামলা তাদের বিরুদ্ধে চলমান। কর্তৃত্ববাদ এবং একনায়কত্ববাদের প্রতীক শেখ মুজিবের চিহ্ন এবং স্মৃতি মুছে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কাগুজি মুদ্রাসহ সব ধরনের মুদ্রা থেকে শেখ মুজিবের ছবি অপসারণ করা হয়েছে।

এমন পটভূমিতে এসেছে বিএনপির নির্বাচিত সরকার। সাড়ে ১৫ বছরের নির্যাতনের পর দলটি যেমন ক্ষমতায় এসেছে, তেমনি সাড়ে ১৫ বছরের নির্যাতনের পর মাঠ এবং সংসদ উভয় ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ সরকারি দল বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতÑ উভয়ের নিকট থেকে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আশা করে। ঘৃণা এবং সহিংসতার ওপর শেখ হাসিনা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিলেন সেই সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন চায় জনগণ। শেখ হাসিনার আমলে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে ছিলো সাপে নেউলে সম্পর্ক।

সরকারি দল বিরোধী দলের মুখ পর্যন্ত দর্শন করতো না। এখন সেই পরিস্থিতি অনেকটা বদলে গেছে। এর সূচনা করেছেন ব্যক্তিগতভাবে ড. ইউনূস। তিনি মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সংবিধান সংস্কার কমিশন। সংবিধান সংস্কারের জন্য ৩৩টি রাজনৈতিক দলকে একসাথে বসানোর বিরল কাজটি সাধিত করেছেন ড. ইউনূস।

এ ব্যাপারে তার দক্ষিণ হাত ছিলেন মার্কিন ইলিনয় বিশ^বিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইসড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ। ঐকমত্য কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ৯ মাস ধরে ড. ইউনূসের তরফ থেকে তিনি ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক করেন। ওইসব ধারাবাহিক বৈঠকের ফলে হলো জুলাই জাতীয় সনদ। আর জুলাই জাতীয় সনদের অধীন জারি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫। ওই আদেশের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি এক দিনে ২টি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। একটি হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর একটি হলো সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অনুষ্ঠান। ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে হ্যাঁ সূচক ভোট দিয়েছেন।

চার
বর্তমান জাতীয় সংসদ পার্লামেন্টারি প্রথা অনুযায়ী বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদ হিসেবে কাজ শুরু করেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ এবং মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করেছে। ১৬ মার্চ দিনাজপুরে খাল খননের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন যে, এর মাধ্যমে দেশ গঠনের কাজ তার সরকার শুরু করলো। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র ১ মাস ৯ দিন সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। তার পারফর্মেন্স সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। অনুরূপভাবে বিরোধী দলের পারফর্মেন্স সম্পর্কেও মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেমন বলেছেন, তার সরকার গণতান্ত্রিক পথে চলবে, তেমনি প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমানও বলেছেন, তারা সংসদের ভেতরে এবং বাইরে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবেন। তারা উভয়েই বলেছেন যে, অতীতের মতো ঘৃণা ও সহিংসতাভিত্তিক রাজনীতি থেকে তারা সরে আসবেন। গড়ে তুলবেন গঠনমূলক এবং সহযোগিতামূলক এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

শেষ করার আগে একটি বিষয়ের প্রতি সকলের নজর আকৃষ্ট করতে চাই। জন্মের পর ২৪ বছরেও পাকিস্তান তার সব প্রদেশ এবং সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র চালু করতে না পারায় পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ। বাস্তবতা হলো এই যে, যদি সাম্য ও ইনসাফভিত্তিক শাসনতন্ত্র পাকিস্তানের সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হতো তাহলে হয়তো দেশটির ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

একই কথা বলতে চাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। আমরা ৫৫ বছরে এলাম। এই ৫৫ বছরেও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য কোনো সংবিধান উপহার দেওয়া সম্ভব হয়নি। এবারেও সংবিধান সংস্কার নিয়ে, অর্থাৎ জুলাই সনদ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ দেখা যাচ্ছে। এই বিরোধ অনেক দূর যেতে পারে। আবার সদিচ্ছা থাকলে আলোচনার টেবিলেও একটি সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে। স্বাধীনতার এই ৫৫তম দিবসে আমরা দেখতে চাই এক ঐক্যবদ্ধ জাতি। এ জাতি গণতন্ত্রে বিশ^াস করে। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে। কিন্তু সেই মতভেদ, বিরোধ, সংঘাত, সহিংসতায় পরিণত হবে না, জাতি সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকবে। যে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে সেটি আলোচনার টেবিলে ফয়সালা করা হবে, এটিই দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা

আপডেট টাইম : ১১:০১:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

আজ বৃহস্পতিবার ২৬ মার্চ। বাংলাদেশের ৫৫তম স্বাধীনতা দিবস। তবে এবারের স্বাধীনতা দিবস সম্পূর্ণ নতুন এবং ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে হাজির হয়েছে। মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের ২ বছরের সেনা নিয়ন্ত্রিত শাসন এবং শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারÑ মোট সাড়ে ১৭ বছরের স্বৈরাচারের অবসানের পর মুক্ত অবাধ পরিবেশে স্বাধীনতা দিবস পালিত হচ্ছে। এছাড়া শেখ হাসিনার ৩টি তামাশার নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) ও ২০০৮ সালের ইন্দো-মার্কিন-মঈনের সেনাশাসন সমর্থিত নির্বাচনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অত্যন্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পর একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে স্বাধীনতা দিবস এসেছে আজ। গত নির্বাচনের সাড়ে ১৭ বছর পর গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রার বছর। সব মিলিয়ে এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে জনগণের স্বাধীনতা দিবস হিসাবে, উদযাপিত হচ্ছে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্বাধীনতা দিবস হিসাবে। ২০২৪ সালের আগেও এই ইনকিলাবের বিশেষ সংখ্যায় অনেক লেখা লিখেছি। কিন্তু কোনো দিন মন খুলে লিখতে পারিনি। হাত খুলে লিখতে পারিনি। আজ মন খুলে প্রাণ খুলে লিখতে পারছি।

মুক্ত উদার গণতন্ত্রে শুধুমাত্র স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করলেই চলবে না। সেই সাথে এই অবাধ স্বাধীনতা সরকারসহ জনগণের উপরেও চাপিয়েছে এক গুরু দায়িত্ব। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে দিল্লীতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশের জনগণের ওপর অর্পিত হয়েছিলো এক গুরু দায়িত্ব। কারণ, জুলাই বিপ্লব কোনো দল বিশেষ বা ছাত্র সংগঠন বিশেষের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। ছাত্ররা চাকরির কোটা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল সত্য, কিন্তু বুলেট দিয়ে সেই আন্দোলনকে হাসিনা মোকাবেলা করতে গিয়ে প্রথমে ছাত্র, পরে সমগ্র জনতার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। ছাত্র-জনতার চ্যালেঞ্জ ছিলো শেখ হাসিনাকে হটাতেই হবে। আর শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ ছিলো, যতো রক্ত ঝরে ঝরুক, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতেই হবে। অবশেষে ১৪শ’ শহীদ এবং ২৬ হাজার মানুষের যখমের বিনিময়ে পালিয়ে যেতে হলো শেখ হাসিনাকে।

একথা ঠিক যে, ছাত্রদের নেতৃত্বে জনতা বিপ্লব সংঘটিত করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনাকে হটিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে তারা মনে মনে পোষণ করেছে এক বিরাট প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা নতুন কিছু নয়। সেই প্রত্যাশা ঘোষিত হয়েছে ৫৫ বছর আগে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিব নগরে গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে। সেই ঘোষণাপত্রে অঙ্গীকার করা হয়েছে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা হবে।
এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু জনগণের সেই সামাজিক সুবিচার এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হলো না। শেখ মুজিব গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে স্বাধীনতার পর ক্ষমতা পেয়ে প্রথম সেই গণতন্ত্রকেই হত্যা করে এক দলীয় বাকশাল কায়েম করেন। দুর্নীতি যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি অভাব অনটনও বাড়তে থাকে। শেখ মুজিবের প্রায় ৭ বছর পর দেশে এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন। ৯০ সালে জনগণ আবার রাস্তায় নামে। এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদকে সরিয়ে দিলেও জনগণের সেই আশা আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেনি।

দুই
জেনারেল জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবের বাকশাল বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। একদল বিপথগামী সেনা অফিসার তাকে হত্যা করার পর বেগম খালেদা জিয়া দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রেসিডেনিশয়াল বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। জিয়া এবং বেগম জিয়া শেখ মুজিবের অনুসৃত ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির বদলে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেন। বেগম জিয়ার আমলেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সময় গড়িয়ে যায়। ভূরাজনীতিও বদলে যায়। ২০০৬ সালের শেষের দিকে বেগম জিয়ার মেয়াদ অবসান হওয়ার পর থেকেই রাজনীতি চক্রান্তের চোরাগলি পথে প্রবেশ করে। নেমে আসে ১/১১ এর কালো অধ্যায়। দেশ ইন্দো-মার্কিন বিশেষ করে ভারতের তল্পি বহন শুরু করে। আগেই বলেছি যে, পাতানো এক নির্বাচনে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার পর বাংলাদেশের ওপর নেমে আসে সব ধরনের গর্দিশ। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসন, দুঃশাসন, লুণ্ঠন এবং গণহত্যার পর জনগণ রুখে দাঁড়ায় এবং সংঘটিত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।

তিন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে জনগণের সার্বভৌম আকাক্সক্ষা ও সার্বভৌম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে গঠিত হয় ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার বা ইন্টারিম সরকার এতই সাম্প্রতিক যে সেসম্পর্কে আর নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন পড়ে না। তবে কয়েকটি কাজ ড. ইউনূসের সরকার জনগণনের অভিপ্রায় অনুযায়ী করেছে। ভারতের গোলামী থেকে দেশকে বের করে এনেছেন। তার ১৮ মাসের শাসনামলে রাজনৈতিক কারণে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি, কোনো নতুন আয়নাঘর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনৈতিক কারণে কোনো গুম বা খুন বা বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকা- সংঘটিত হয়নি। জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রজু করা অনেকগুলো গণহত্যার মামলার একটিতে শেখ হাসিনা ও তার আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ফাঁসির দ- হয়েছে। আরো অনেক মামলা তাদের বিরুদ্ধে চলমান। কর্তৃত্ববাদ এবং একনায়কত্ববাদের প্রতীক শেখ মুজিবের চিহ্ন এবং স্মৃতি মুছে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কাগুজি মুদ্রাসহ সব ধরনের মুদ্রা থেকে শেখ মুজিবের ছবি অপসারণ করা হয়েছে।

এমন পটভূমিতে এসেছে বিএনপির নির্বাচিত সরকার। সাড়ে ১৫ বছরের নির্যাতনের পর দলটি যেমন ক্ষমতায় এসেছে, তেমনি সাড়ে ১৫ বছরের নির্যাতনের পর মাঠ এবং সংসদ উভয় ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ সরকারি দল বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতÑ উভয়ের নিকট থেকে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আশা করে। ঘৃণা এবং সহিংসতার ওপর শেখ হাসিনা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিলেন সেই সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন চায় জনগণ। শেখ হাসিনার আমলে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে ছিলো সাপে নেউলে সম্পর্ক।

সরকারি দল বিরোধী দলের মুখ পর্যন্ত দর্শন করতো না। এখন সেই পরিস্থিতি অনেকটা বদলে গেছে। এর সূচনা করেছেন ব্যক্তিগতভাবে ড. ইউনূস। তিনি মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সংবিধান সংস্কার কমিশন। সংবিধান সংস্কারের জন্য ৩৩টি রাজনৈতিক দলকে একসাথে বসানোর বিরল কাজটি সাধিত করেছেন ড. ইউনূস।

এ ব্যাপারে তার দক্ষিণ হাত ছিলেন মার্কিন ইলিনয় বিশ^বিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইসড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ। ঐকমত্য কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ৯ মাস ধরে ড. ইউনূসের তরফ থেকে তিনি ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক করেন। ওইসব ধারাবাহিক বৈঠকের ফলে হলো জুলাই জাতীয় সনদ। আর জুলাই জাতীয় সনদের অধীন জারি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫। ওই আদেশের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি এক দিনে ২টি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। একটি হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আর একটি হলো সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অনুষ্ঠান। ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে হ্যাঁ সূচক ভোট দিয়েছেন।

চার
বর্তমান জাতীয় সংসদ পার্লামেন্টারি প্রথা অনুযায়ী বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদ হিসেবে কাজ শুরু করেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ এবং মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করেছে। ১৬ মার্চ দিনাজপুরে খাল খননের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন যে, এর মাধ্যমে দেশ গঠনের কাজ তার সরকার শুরু করলো। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র ১ মাস ৯ দিন সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। তার পারফর্মেন্স সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। অনুরূপভাবে বিরোধী দলের পারফর্মেন্স সম্পর্কেও মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেমন বলেছেন, তার সরকার গণতান্ত্রিক পথে চলবে, তেমনি প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমানও বলেছেন, তারা সংসদের ভেতরে এবং বাইরে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবেন। তারা উভয়েই বলেছেন যে, অতীতের মতো ঘৃণা ও সহিংসতাভিত্তিক রাজনীতি থেকে তারা সরে আসবেন। গড়ে তুলবেন গঠনমূলক এবং সহযোগিতামূলক এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

শেষ করার আগে একটি বিষয়ের প্রতি সকলের নজর আকৃষ্ট করতে চাই। জন্মের পর ২৪ বছরেও পাকিস্তান তার সব প্রদেশ এবং সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র চালু করতে না পারায় পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ। বাস্তবতা হলো এই যে, যদি সাম্য ও ইনসাফভিত্তিক শাসনতন্ত্র পাকিস্তানের সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হতো তাহলে হয়তো দেশটির ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

একই কথা বলতে চাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। আমরা ৫৫ বছরে এলাম। এই ৫৫ বছরেও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য কোনো সংবিধান উপহার দেওয়া সম্ভব হয়নি। এবারেও সংবিধান সংস্কার নিয়ে, অর্থাৎ জুলাই সনদ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ দেখা যাচ্ছে। এই বিরোধ অনেক দূর যেতে পারে। আবার সদিচ্ছা থাকলে আলোচনার টেবিলেও একটি সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে। স্বাধীনতার এই ৫৫তম দিবসে আমরা দেখতে চাই এক ঐক্যবদ্ধ জাতি। এ জাতি গণতন্ত্রে বিশ^াস করে। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে। কিন্তু সেই মতভেদ, বিরোধ, সংঘাত, সহিংসতায় পরিণত হবে না, জাতি সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকবে। যে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে সেটি আলোচনার টেবিলে ফয়সালা করা হবে, এটিই দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।