গত ২১ মাসে রাজধানী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এমন ২৩টি ভয়ংকর সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর বেশির ভাগই ঘটিয়েছে পেশাদার শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। ২৩টির মধ্যে ৭টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এর মধ্যে ছয়টিই ঘটেছে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে। ভয়ংকর অপরাধকেন্দ্রিক এই ২৩ ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর ধানমণ্ডি, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর, আদাবর, এলিফ্যান্ট রোড, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, গুলশান, বাড্ডা, মগবাজার, হাতিরঝিল ও মতিঝিল অঞ্চলে। তবে সমগ্র নগরীতে এই সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর দাপট রয়েছে সমান মাত্রায়। ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে, ওদের অপরাধমূলক তৎপরতা প্রতিরোধের তো প্রশ্নই আসে না।
ইতোমধ্যে পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম ও টেলিভিশন মিডিয়ার রিপোর্টে এসব হত্যাকাণ্ডসহ সব অপরাধ কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে জোর কোনো অ্যাকশন তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। সরকারের শীর্ষ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কার্যত পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
এটা স্বীকার করতেই হবেÑ আমাদের পুলিশ বাহিনী সেই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ে বিদ্রোহীদের প্রতিরোধের মুখে যে চূড়ান্ত অসংগঠিত রূপে চলে গিয়েছিল, তা থেকে তারা মুক্তি পায়নি এবং শতভাগ সংগঠিত রূপে ফিরে আসার কোনো উদ্যোগ এখনও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে বিশৃঙ্খল দশায় পতিত হয়েছিল সেখান থেকে তাদের পুনরুদ্ধার ও নতুন উদ্যমে সুসংগঠিত করার কাজটি একেবারেই এগোতে পারেনি। উল্টোদিকে সারাদেশে লুটের আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ইত্যাদি ছড়িয়েছে ব্যাপক হারে, বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র চোরাকারবারিদের বিপুল অপরাধমূলক আগ্নেয়াস্ত্র চোরাকারবার চলছে অবিরাম। এসব তৎপরতায় এতটুকু কমতি নেই, বরং প্রতিদিন তা বেড়ে চলেছে। কিন্তু সেসব অবৈধ অস্ত্র-গুলি উদ্ধার এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচারে অ্যাকশন কর্মকাণ্ড যে মাত্রায় পরিচালনা করা দরকার ছিল তা-ও সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তা নিজেদের দায়িত্ব এড়ানোর মাধ্যমে এসব বাহিনীর কর্মকাণ্ডের মাত্রা-মান নিয়ে অসত্য তথ্য দিয়ে পুরো জাতিকে বিভ্রান্ত করছেনÑ এটা দশকের পর দশক ধরে চলেছে, এটা তো সবারই জানা।
সত্য অকপটে স্বীকার করে তৎপরতা চালাতে হবে দক্ষতার সঙ্গে। আঠারো কোটি জনসংখ্যার এই দেশে এখন এমন পুলিশ বাহিনী দরকার যার ২৫ শতাংশও আমাদের নেই। অভাব-অনটন আর বেকারত্বের সমাজে অপরাধ ও অপরাধী বাড়বে অবিরাম তাতে তো কোনো অন্যথা হবেই না। দুর্ভাগ্যজনক সত্য, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রবাসী নাগরিকদের চাহিদা অনুসারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংখ্যা ও তাদের প্রতিদিনকার কর্মকাণ্ড যতখানি বাড়ানো দরকার সে সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল এমন প্রমাণ দিতে ব্যর্থ। স্বীকার্য যে, রাষ্ট্রের সীমিত আর্থিক সামর্থ্যরে মধ্যে কাউকে বিশাল দোষী সাব্যস্ত করার কোনো মন্তব্য ও বিশ্লেষণমূলক মতামত প্রতিষ্ঠার দরকার নেই।
প্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার সরকার পুলিশ বাহিনীকে সতেরো বছর ধরে নিজেদের কবজায় রেখে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে নিয়ে পুরো একটি দৈত্যবাহিনীর কায়দায়, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর কায়দায় গড়ে তুলেছিলেন। পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে খোদ প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য সমর্থন করেছেন এবং পুলিশ বাহিনীকে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের দশা থেকে বের করে আনার আশ্বাস দিয়েছেন।
আসা যাক অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে। অভাব-অনটনের পরিবারগুলোতে অবিরাম পারিবারিক অশান্তি লেগেই আছে, যার ফলে অনেক পরিবারে হঠাৎ স্বামী বা স্বামীর স্বজনদের দ্বারা গৃহকর্ত্রী খুন বা মারাত্মক নিপীড়ন, এমনকি স্ত্রী বা তার স্বজন দ্বারা স্বামী হত্যা বা নির্যাতন হরদম বেড়ে চলেছে। আর জমিজমার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে পারিবারিক কলহ এবং তা থেকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও হত্যাকাণ্ড-নিপীড়ন ইত্যাদি ঘটনা অবিরাম বাড়ছে। আর পরিবারে পরিবারে স্বার্থান্ধতার দ্বন্দ্ব অবিরাম ক্রমবর্ধমান। সামাজিক সালিশি-মিটমাটও স্বার্থান্ধ গোষ্ঠীর হাতের মুঠোয় এখন।
সড়ক দুর্ঘটনা কেন বাড়ছে এটা তো সবারই জানা। প্রধান সমস্যা চালকদের আইন মানানো যাচ্ছে না, একই সঙ্গে পথচারী-যাত্রীরাও আইন লঙ্ঘন করতে উসকানি দিচ্ছে অবিরাম। এটাও যথাযথ আইন প্রয়োগের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যথার্থ সদিচ্ছা থাকে।
তরুণসমাজকে ধ্বংস করছে মাদকদ্রব্যের অবাধ প্রাপ্তি এবং সেসবের ফ্রিস্টাইল ব্যবহার। প্রায় আশি লাখ তরুণ-যুবা (এর মধ্যে বয়স্কও রয়েছে) নিয়মিত মাদকাসক্ত এখন এ দেশে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সন্ত্রাসী জেনারেলদের উদ্যোগে এ দেশে অবিরাম শত শত কোটি টাকার মাদকদ্রব্য ঢুকছে। অভিযোগ রয়েছে, বছরে বিশ্বব্যাপী যে ২০-২২ লাখ কোটি টাকার মাদক চোরাকারবার চলে তার মধ্যে বাংলাদেশকে ‘পাচারের রুট দেশ’ ধরে চলে বার্ষিক প্রায় চার লাখ কোটি টাকার। এর বড়-অংশই আসে মিয়ানমার হয়ে। এই মাদক চোরাকারবারে কেবল মাদকাসক্তি নয়, এর সঙ্গে হত্যাকাণ্ড, নারী ধর্ষণ, নারী পাচার চলে অবিরাম। লোভী আদম পাচারকারী ও নারী পাচারকারী গোষ্ঠী বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার জঘন্য ও নিষ্ঠুর কারবার করে নারী, শিশু পাচার, আদম পাচারের মধ্যমে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্য এসব অবৈধ কারবার ও মারাত্মক অপরাধের অংশীদারÑ এটা নিতান্তই ‘ওপেন সিক্রেট’।
সাইবার ক্রাইম আর নারী নিপীড়নের হাজার রকম অপরাধ, নারী ধর্ষণ, দলগত ধর্ষণ, নারী ও শিশু বলাৎকার, পাড়ায় পাড়ায়, রাস্তায় ইভটিজিং, সাইবার ক্রাইম (শত রকমের) বাড়ছে। নারী, বিশেষ করে কিশোরী স্কুল-কলেজ ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করতে করতে আত্মহত্যায় বাধ্য করা ইত্যাদি কমছে না, কিশোরীদের স্কুল-কলেজ অবধি চলাচলে বাধা দিচ্ছে মারাত্মকভাবে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ‘বাগাড়ম্বর’-এর মতো লাগে ভুক্তভোগীদের কাছে।
বাজে মানের চলচ্চিত্র, যাত্রার নামে অশ্লীলতার প্রচার, আর কম্পিউটারের ইন্টারনেটের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ, পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। এসব অপসংস্কৃতির মাধ্যমে, সাইবার ক্রাইমের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ কর্মকাণ্ডের প্রধান শিকার নারী ও শিশু, প্রধানত কিশোরী ও কিশোরসমাজের সদস্যরা।
বড় বড় সন্ত্রাসী, শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর পাশাপাশি কিশোর গ্যাং ছড়িয়ে পড়েছে শত শত। তাদের উৎপাতে সবাই দিশাহারা, কিন্তু প্রতিকার ও প্রতিরোধ অতি সামান্য। এখন বিকল্প খুঁজতে হবে, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভরসায় বসে থাকলে চলবে না। বিএনপি সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল, দলের প্রধান নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কিছু নতুন ও কার্যক্ষম উদ্যোগ ছাড়া বিকল্প নেই। দলটির দুই লাখ কর্মীর একটি সুশৃঙ্খল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে সক্রিয় করে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ও অপরাধী গ্রেপ্তারে দ্রুত শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ আয়োজন করা যেতে পারে। সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ডভিত্তিক এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে সুসংগঠিত কৌশলে কাজে লাগানো সম্ভব। এবং তারা কেউই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না, গ্রুপে ভাগ হয়ে গ্রাম, পাড়া-মহল্লা পাহারা দেবে এবং অপরাধীদের হাতেনাতে আটক করতে পুলিশ ও অন্য সব বাহিনীকে সরাসরি সহায়তাদান করবে। তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে বিচারব্যবস্থা সক্রিয় করতে হবে। আরেকটি ব্যাপার, প্রকৃত সন্ত্রাসীরা সবারই চেনাজানাÑ এদের জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অত্যন্ত সতর্ক হতে পারছেন না? সন্ত্রাসী ধরা পড়ার পরেই দ্রুত জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেলে তারা বাইরে বেরিয়ে আবার অপরাধ করতে শুরু করে। তাতে কার্যকর আইন প্রয়োগ দারুণভাবে ব্যাহত হয়Ñ এটা বুঝতে আইন বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়ে না।
খায়রুল কবির খোকন : বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, জাতীয় সংসদ সদস্য, ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক
Reporter Name 

























