সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বুধবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মধু আহরণের মৌসুম শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে মধু সংগ্রহের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন মৌয়ালরা। তবে বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাঘ ও কুমিরের চেয়েও বর্তমানে বনজীবীরা দস্যুদের ভয় বেশি পাচ্ছেন। এদিকে, গাছে গাছে ফুটেছে খলিশা, গরান, পশুরসহ নানা প্রজাতির ফুল।
জানা গেছে, বুধবার (১ এপ্রিল) সকালে সুন্দরবনের মধু আহরণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। একই সঙ্গে মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুন্দরবনে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযানেরও সূচনা করবেন তিনি। এই ঘোষণার পর উপকূলীয় অঞ্চলের মৌয়ালদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।
নদীতে কুমির আর জঙ্গলে বাঘের ভয় উপেক্ষা করে জীবনবাজি রেখে সুন্দরবনের মূল্যবান মধু সংগ্রহ করেন মৌয়ালরা। এতদিন এই প্রাকৃতিক বিপদই ছিল তাদের প্রধান শঙ্কা। কিন্তু এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে বনদস্যু আতঙ্ক।
মৌয়ালরা জানান, সুন্দরবনের গহিনে বর্তমানে কয়েকটি বনদস্যু গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। তারা বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। দাবি অনুযায়ী টাকা না পেলে শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হতে হচ্ছে। এ কারণে এবার অনেকেই মধু আহরণে যেতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের একাধিক মৌয়াল জানান, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সুন্দরবনে দস্যুদের হাতে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে। পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা বনে যাওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, মৌয়ালরা জঙ্গলে যাওয়ার সময় বাঘ-কুমিরকে তেমন ভয় পেতেন না। কিন্তু এখন বনদস্যু আতঙ্ক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একবার দস্যুদের হাতে ধরা পড়লে রক্ষা পাওয়া কঠিন। তাই ভয়ে এবার অনেকেই মধু কাটা বাদ দিয়ে দিনমজুরের কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জের মৌখালী গ্রামের মৌয়াল আক্কাস আলী জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাপ-দাদার পেশা হিসেবে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করে আসছি। কখনো পিছপা হইনি। বিগত কয়েক বছর বনদস্যুদের উৎপাত ছিল না, নির্বিঘ্নে মধু ও মোম সংগ্রহ করা গেছে। কিন্তু এবার দস্যুতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বনে যেতে চাইছেন না।
উপকূলীয় অঞ্চলের বনজীবীদের আয়ের প্রধান উৎস সুন্দরবন। পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেকেই দাদন বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে জঙ্গলে যান। কিন্তু বনদস্যুদের হাতে পড়লে মুক্তিপণ দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়তে হয় তাদের। ফলে ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যায়।
এদিকে, বনদস্যু আতঙ্কে মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবার মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই মৌসুম চলবে টানা দুই মাস। এ বছর সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, ২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে, ২০২৩ সালে হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মধু আহরণ প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে যায়। এর প্রভাব পড়েছে মৌয়ালদের সংখ্যাতেও। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল কাজ করতেন, ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ৫ হাজারে নেমে আসে।
মৌয়ালরা এ সময় বনে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঝে মধ্যে চালানো অভিযানে স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বনদস্যু নির্মূলে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
তবে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান জানান, মৌয়ালদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ড যৌথভাবে টহল জোরদার করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।
Reporter Name 














