খাদ্য বিভাগে কর্মরত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলাকারী দিনাজপুর কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারের (সিএসডি) সহকারী ব্যবস্থাপক মো. দেলোয়ার হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।
দেলোয়ার ফ্যাসিস্ট সরকারের খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ‘সাধন সিন্ডিকেট’-এর অন্যতম হোতা। সে ছাত্রজীবনে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার তাকে সবচেয়ে বড় সিএসডির সহকারী ব্যবস্থাপক পদে পদায়ন দেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করেই দেলোয়ার এতদিন ধরে সেই পদেই বহাল ছিলেন। অবশেষে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে মামলায় পুলিশ গ্রেপ্তার করলে তাকে আজ সোমবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আবুল হাছানাত হুমায়ূন কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতে মামলার কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হলে আইন অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে হয়। সে কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ ধরনের একজন অপরাধী কি করে এতদিন এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে ডিজি বলেন, ‘আমি তো নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। তাদের চিনি না। কিন্তু অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তো এসব বিষয় জানত। তারাও কেন এ বিষয়ে নীরব ছিল সেটাই বড় প্রশ্ন।
খাদ্যভবনে এদের প্রত্যেকের এক-একজন গডফাদার রয়েছে।’বরখাস্তের আদেশে বলা হয়—‘কিশোরগঞ্জ জেলাধীন কুলিয়ারচর থানার, এফআইআর নং-১৫, তারিখ ৩০.০৮.২০২৪, ধারা-১৪৩/৩২৩/৪২৭/৩৮০/১১৪ The Penal Code, 1860 তৎসহ৩/A/4(a) The Explosive Substances Act, 1908 এর প্রেক্ষিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হয়েছেন। এ ছাড়া উক্ত মামলার পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত গ্রেফতারকৃত দেলোয়ার হোসেনকে জেলহাজতে আটক রাখতে বিজ্ঞ আদালত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করেছেন। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কোনো কর্মচারী দেনার দায়ে কারাগারে আটক অথবা কোনো ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হলে বা তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গৃহীত হলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ আটক, গ্রেপ্তার বা অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন হতে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে। যেহেতু দেলোয়ার হোসেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেহেতু তাকে তার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে প্রশাসনিক কারণে নিরাপত্তা কর্মকর্তা, মোংলা, বাগেরহাট হিসেবে বদলি করা হলো।
বর্ণিত কর্মকর্তাকে অদ্য ২৯.১২.২০১৫ তারিখে বর্তমান কর্মস্থল হতে তাৎক্ষণিক অবমুক্তকরণ (stand release) করা হলো। একই সঙ্গে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী সরকারি চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।অভিযোগ আছে, খাদ্য বিভাগের বদলি বাণিজ্যের সমন্বয়ক ছিলেন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্রের ভাতিজা রাজেশ মজুমদার। যিনি খাদ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে বসতেন মন্ত্রণালয়ে। এ ছাড়া বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন মন্ত্রীর একসময়ের একান্ত সচিব (পিএস) সাধন চন্দ্রের জামাতা আবু নাসের বেগ (মাগুরার সাবেক ডিসি) ও মন্ত্রীর ছোট মেয়ে তৃণা মজুমদার, মন্ত্রীর ভাই মনা মজুমদার, নওগাঁ মিল মালিক সমিতির সভাপতি চন্দন সাহা। তাঁদের সহযোগী ছিলেন খাদ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাসহ দিনাজপুর সিএসডির সহকারী ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা রেশনিংয়ের এরিয়া রেশনিং কর্মকর্তা (ডি-৭) তৌফিকে ই এলাহী, নরসিংদী এলএসডির ব্যবস্থাপক শিখা, লীনাসহ খাদ্য বিভাগের বেশ কিছু কর্মকর্তা। টাকার বিনিময়ে দপ্তরের যেকোনো পদায়ন-বদলি সামলাতেন তাঁরা। এসব বদলি বাণিজ্যের লেনদেন হতো বেইলি রোডে মন্ত্রীর সরকারি বাসায়। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ওই বাসা সরগরম হয়ে উঠত।