ঢাকা ০৪:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিলুপ্তির পথে দেশীয় ধান

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:১৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১০৭ বার

‘নতুন ধানের গন্ধে ঘরভর্তি সোনা ঝরছে রে!’ যে গন্ধ মায়ের গায়ের গন্ধের মতো, আগুনে পোড়া ধোঁয়ার মতো। কিন্তু বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে মাঠ ভরা ধান থাকলেও, নেই শুধু সেই ধানের ঘ্রান। বর্তমানে হাইব্রিড আর বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি জাতের ঐতিহ্যবাহী ধান। বেশি ফলনের আশায় কৃষকরা ঝুঁকছেন হাইব্রিড ধান চাষাবাদের দিকে।
এক সময় উৎসব মানেই ছিল বিন্নি, কালোজিরা, নাজিরশাইল, কাটারিভোগ, তুলশীমালা, ইন্দ্রশাইল, পাটনাই। যেন একটি মৌসুম জুড়ে খাবার নয়, একটি সংস্কৃতির জন্ম নিত। অথচ সেই পিঠা পার্বন উৎসব সবই চলে গেছে বিশেষ অনুষ্ঠানে, কমিউনিটি সেন্টারে আর পিঠা মেলায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এ অঞ্চলে দেশীয় ধানের জাত সংরক্ষণ জীবন ও জীবিকা রক্ষার এক অপরিহার্য লড়াই। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ধান চাষকে এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। একসময় এ অঞ্চল বহু স্থানীয় ধানের বৈচিত্রে সমৃদ্ধ ছিলো, বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল হাইব্রিড এবং উফশী (উচ্চ ফলনশীল) জাতের উপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের ঐতিহ্যের প্রতীক বহু স্থানীয় জাত এখন বিলুপ্তির পথে। খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্যে স্থানীয় জাত রক্ষা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ দেশীয় জাতগুলো হাজার বছর ধরে এ প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করেছিল। জলাবদ্ধতা সহনশীলতা, লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা, রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধ এবং কম সার প্রয়োজনÑএগুলোই স্থানীয় ধানের সবচেয়ে বড় গুনাগুন।
সূত্রমতে, উপকূল বিধৌত বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের ঐতিহ্য ছিল আমন আবাদে। দেশি জাতের ধান রোপণের পর তেমন কোনো যতœ করতে হতো না। এমনকি সার ও কীটনাশকও দেওয়া হতো না। মাঠ ভরা গবাদি পশুর অবাধ বিচারণ ছিল। যে কারণে ফসলের মাঠে পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব্য সারের যোগান থাকতো। তাছাড়া দেশি জাতের সবকটি ধান জলবায়ু সহিষ্ণু ছিল। জমিতে সেচেরও প্রয়োজন হতো না। এদিকে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীল হাইব্রিড জাতের ধান চাষাবাদের কারণে মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ফসলী মাঠ এখন এগ্রো, ধানীগোল্প, আগমনী, এরাইজ-৭০০৬, সুরচী-১, ব্র্যাক হাইব্রিড, ব্রি-হাইব্রিড-৬ সহ উচ্চ ফলনশীল বহু জাতের ধানের দখলে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে আমন মৌসুমে।
সূত্রমতে, চলতি রোপা আমন মৌসুমে খুলনার নয়টি উপজেলা ও খুলনা মেট্রোতে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ করা হয়েছে। অর্জিত হয়েছে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে রূপসা উপজেলায় চার হাজার হেক্টর, তেরখাদায় এক হাজার হেক্টর, দিঘলিয়ায় দেড় হাজার হেক্টর, বটিয়াঘাটায় ১৮ হাজার ৫২০ হেক্টর, দাকোপে ২০ হাজার হেক্টর, পাইকগাছায় ১৮ হাজার হেক্টর, ডুমুরিয়ায় ১৫ হাজার ৯০০ হেক্টর, কয়রায় ১৬ হাজার ২৩৫ হেক্টর, ফুলতলায় এক হাজার ৪৩০ হেক্টর, দৌলতপুরে ৪৫ হেক্টর ও লবনচরায় ৪৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ করা হয়। এ পর্যন্ত ৯০ পার্সেন্ট ধান কর্তন করা হয়েছে। হাইব্রিড জাতের ধান হেক্টর প্রতি সাত থেকে সাড়ে সাত টন পর্যন্ত ফলন হয়েছে এবং উপসী জাতের ধান হেক্টর প্রতি সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় মেঃ টন ফলন হয়েছে। স্থানীয় জাতের ধানে ফলন কম হওয়ায় এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির কারণে কৃষকরা স্থানীয় জাতের ধান চাষের আগ্রহ হারিয়েছে। আমন মৌসুমে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ হতো বাদশাভোগ, রূপশাইল, বাঁশফুল, ক্ষীরাইজালি, রানী স্যালুট, চিনিকানাই, কুমড়াগোড়, কৈজুড়ি, মরিচশাইল, ঘুনশি, কাচড়া, চাপাল, কৈজুড়িসহ ২০টিরও বেশি স্থানীয় জাতের ধান।
বটিয়াঘাটার কৃষক বিকারুল ইসলাম ইনকিলাবকে জানান, দেশি জাতের বীজ সংকট এবং উৎপাদন কম হওয়ায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকরা হাইব্রিড চাষে আগ্রহী হয়েছে। হাইব্রিডের ফলন আশানারুপ। বিরি-৯৯ জাতের বীজের উৎপাদন আরো বেশি হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক-কৃষাণীরা বিভিন্ন জাতের ধানের বীজ দিয়ে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কৃষক-কৃষাণীরা এ বছর বিনা-১৭, বিরি-২৩, বিরি-৪৯, বিরি-৭৫, বিরি-৮৭, বিরি-১০৩ জাতের বীজ বপন করেন। তবে এর মধ্যে বিরি-৭৫, বিরি-৮৭, বিরি-৯৯ ও বিরি-১০৩ জাতের ধানের উৎপাদন বেশি হয়েছে। অথচ এসব অঞ্চলে এক সময় দেশীয় জাতের ধান চাষ হতো।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা গ্রামের কৃষক বাচ্চু শেখ ইনকিলাবকে জানান, দেশি ধান চাষাবাদ করতে কোনো বীজ বাজার থেকে কিনতে হতো না। বীজের জন্য কিছু ধান আলাদা করে ঘরে তুলে রাখলেই চলত। বর্তমানে আমরা যে ধান চাষাবাদ করছি তার বীজ রাখতে পারছি না। বছরে বছরে বাজার থেকে চড়াদামে বীজ কিনতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে ধান রোপণের পর জমিতে কীটনাশক, সার, সেচ প্রচুর পরিমাণ দিতে হচ্ছে। না হলে ফলন ভালো হচ্ছে না। এ অঞ্চলের কৃষকরা বেশি লাভের জন্য তাদের জমিতে উচ্চ ফলনশীল ধান রোপণ করেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বিলুপ্তির পথে দেশীয় ধান

আপডেট টাইম : ০১:১৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

‘নতুন ধানের গন্ধে ঘরভর্তি সোনা ঝরছে রে!’ যে গন্ধ মায়ের গায়ের গন্ধের মতো, আগুনে পোড়া ধোঁয়ার মতো। কিন্তু বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে মাঠ ভরা ধান থাকলেও, নেই শুধু সেই ধানের ঘ্রান। বর্তমানে হাইব্রিড আর বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি জাতের ঐতিহ্যবাহী ধান। বেশি ফলনের আশায় কৃষকরা ঝুঁকছেন হাইব্রিড ধান চাষাবাদের দিকে।
এক সময় উৎসব মানেই ছিল বিন্নি, কালোজিরা, নাজিরশাইল, কাটারিভোগ, তুলশীমালা, ইন্দ্রশাইল, পাটনাই। যেন একটি মৌসুম জুড়ে খাবার নয়, একটি সংস্কৃতির জন্ম নিত। অথচ সেই পিঠা পার্বন উৎসব সবই চলে গেছে বিশেষ অনুষ্ঠানে, কমিউনিটি সেন্টারে আর পিঠা মেলায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এ অঞ্চলে দেশীয় ধানের জাত সংরক্ষণ জীবন ও জীবিকা রক্ষার এক অপরিহার্য লড়াই। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ধান চাষকে এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। একসময় এ অঞ্চল বহু স্থানীয় ধানের বৈচিত্রে সমৃদ্ধ ছিলো, বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল হাইব্রিড এবং উফশী (উচ্চ ফলনশীল) জাতের উপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের ঐতিহ্যের প্রতীক বহু স্থানীয় জাত এখন বিলুপ্তির পথে। খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্যে স্থানীয় জাত রক্ষা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ দেশীয় জাতগুলো হাজার বছর ধরে এ প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করেছিল। জলাবদ্ধতা সহনশীলতা, লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা, রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধ এবং কম সার প্রয়োজনÑএগুলোই স্থানীয় ধানের সবচেয়ে বড় গুনাগুন।
সূত্রমতে, উপকূল বিধৌত বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের ঐতিহ্য ছিল আমন আবাদে। দেশি জাতের ধান রোপণের পর তেমন কোনো যতœ করতে হতো না। এমনকি সার ও কীটনাশকও দেওয়া হতো না। মাঠ ভরা গবাদি পশুর অবাধ বিচারণ ছিল। যে কারণে ফসলের মাঠে পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব্য সারের যোগান থাকতো। তাছাড়া দেশি জাতের সবকটি ধান জলবায়ু সহিষ্ণু ছিল। জমিতে সেচেরও প্রয়োজন হতো না। এদিকে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীল হাইব্রিড জাতের ধান চাষাবাদের কারণে মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।
খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ফসলী মাঠ এখন এগ্রো, ধানীগোল্প, আগমনী, এরাইজ-৭০০৬, সুরচী-১, ব্র্যাক হাইব্রিড, ব্রি-হাইব্রিড-৬ সহ উচ্চ ফলনশীল বহু জাতের ধানের দখলে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে আমন মৌসুমে।
সূত্রমতে, চলতি রোপা আমন মৌসুমে খুলনার নয়টি উপজেলা ও খুলনা মেট্রোতে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ করা হয়েছে। অর্জিত হয়েছে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে রূপসা উপজেলায় চার হাজার হেক্টর, তেরখাদায় এক হাজার হেক্টর, দিঘলিয়ায় দেড় হাজার হেক্টর, বটিয়াঘাটায় ১৮ হাজার ৫২০ হেক্টর, দাকোপে ২০ হাজার হেক্টর, পাইকগাছায় ১৮ হাজার হেক্টর, ডুমুরিয়ায় ১৫ হাজার ৯০০ হেক্টর, কয়রায় ১৬ হাজার ২৩৫ হেক্টর, ফুলতলায় এক হাজার ৪৩০ হেক্টর, দৌলতপুরে ৪৫ হেক্টর ও লবনচরায় ৪৭০ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ করা হয়। এ পর্যন্ত ৯০ পার্সেন্ট ধান কর্তন করা হয়েছে। হাইব্রিড জাতের ধান হেক্টর প্রতি সাত থেকে সাড়ে সাত টন পর্যন্ত ফলন হয়েছে এবং উপসী জাতের ধান হেক্টর প্রতি সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় মেঃ টন ফলন হয়েছে। স্থানীয় জাতের ধানে ফলন কম হওয়ায় এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির কারণে কৃষকরা স্থানীয় জাতের ধান চাষের আগ্রহ হারিয়েছে। আমন মৌসুমে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ হতো বাদশাভোগ, রূপশাইল, বাঁশফুল, ক্ষীরাইজালি, রানী স্যালুট, চিনিকানাই, কুমড়াগোড়, কৈজুড়ি, মরিচশাইল, ঘুনশি, কাচড়া, চাপাল, কৈজুড়িসহ ২০টিরও বেশি স্থানীয় জাতের ধান।
বটিয়াঘাটার কৃষক বিকারুল ইসলাম ইনকিলাবকে জানান, দেশি জাতের বীজ সংকট এবং উৎপাদন কম হওয়ায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকরা হাইব্রিড চাষে আগ্রহী হয়েছে। হাইব্রিডের ফলন আশানারুপ। বিরি-৯৯ জাতের বীজের উৎপাদন আরো বেশি হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক-কৃষাণীরা বিভিন্ন জাতের ধানের বীজ দিয়ে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কৃষক-কৃষাণীরা এ বছর বিনা-১৭, বিরি-২৩, বিরি-৪৯, বিরি-৭৫, বিরি-৮৭, বিরি-১০৩ জাতের বীজ বপন করেন। তবে এর মধ্যে বিরি-৭৫, বিরি-৮৭, বিরি-৯৯ ও বিরি-১০৩ জাতের ধানের উৎপাদন বেশি হয়েছে। অথচ এসব অঞ্চলে এক সময় দেশীয় জাতের ধান চাষ হতো।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা গ্রামের কৃষক বাচ্চু শেখ ইনকিলাবকে জানান, দেশি ধান চাষাবাদ করতে কোনো বীজ বাজার থেকে কিনতে হতো না। বীজের জন্য কিছু ধান আলাদা করে ঘরে তুলে রাখলেই চলত। বর্তমানে আমরা যে ধান চাষাবাদ করছি তার বীজ রাখতে পারছি না। বছরে বছরে বাজার থেকে চড়াদামে বীজ কিনতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে ধান রোপণের পর জমিতে কীটনাশক, সার, সেচ প্রচুর পরিমাণ দিতে হচ্ছে। না হলে ফলন ভালো হচ্ছে না। এ অঞ্চলের কৃষকরা বেশি লাভের জন্য তাদের জমিতে উচ্চ ফলনশীল ধান রোপণ করেন।