ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়লো রাজধানীর সবচেয়ে বড় ঘনবসতিপূর্ণ কড়াইল বস্তি। মহাখালী-গুলশানের আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর কড়াইলের টিনের চালের জরাজীর্ণ খুপড়ি ঘরের মাঝখানে ব্যবধান শুধু একটি লেকের। তবে এই সামান্য ব্যবধানের আড়ালে লুকিয়ে আছে জীবনমানের আসমান-জমিন পার্থক্য। ক্ষমতার অশুভ আঁতাত ও বেঁচে থাকার স্বপ্ন বেচা এই বস্তির মানুষগুলো বারবার জ্বলে-পুড়ে নিঃস্ব হন। কড়াইলের মানুষদের কাছে এই অগ্নিকাণ্ড যেন আরেকবার জীবনের বিরুদ্ধে ফিরতি আঘাত।
কড়াইল বস্তির আগুন যেন এক পুরনো অতিথি, অপ্রত্যাশিত সত্ত্বেও ঘুরে ফিরে আসে, রেখে যায় ছাই, কান্না আর ক্ষত। সঙ্গত কারণে কড়াইল বস্তির নিম্নআয়ের মানুষদের হৃদয়ে আঁকড়ে থাকা আতঙ্কের নাম ‘আগুন’। আগুন যেন তাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত শত্রু, যে কখনো সতর্ক করে আসে না, শুধু সবকিছু কেড়ে নেয়। বারবার আসে এ আগুন, কিন্তু কেন আসে, কীভাবে আসে—তা থেকে যায় অজানা।
বারবার কড়াইল বস্তিতে কেন আগুন?
এই কড়াইল বস্তিতে কেন বারবার আগুন লাগে? কারণ কী? কে বা কারা দায়ী? আগুনের খবর পেয়েও কেন ফায়ার সার্ভিস বারবার আটকে যায় পথে? আগুনের নেপথ্যে কারও কোনো গোপন উদ্দেশ্য থাকাও কি অমূলক? সরকারেরই বা কী উদ্যোগ? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না কখনোই।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর শুধু মোটাদাগে কারণগুলো উঠে আসে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের তদন্তে। কিন্তু তাতে আগুন লাগা বন্ধ হয়নি, নিঃস্ব হওয়া বাসিন্দারা কোমড় সোজা করে দাঁড়াতেই আবারো নিঃস্ব হন। তাদের এ করুণ পরিণতি শেষ হয়েও হয় না। এ যেন প্রশ্নের পর প্রশ্ন, কিন্তু কোনো উত্তরই শেষমেশ আগুনের কালো ছাই থেকে উঠে আসে না।
মহাখালী-বনানী-গুলশানের মতো বাণিজ্যিক-অভিজাত এলাকার মাঝখানে প্রায় ৯০ একর জায়গাজুড়ে ঘনবসতিপূর্ণ এক বস্তি কড়াইল। প্রায় লাখখানেক মানুষের বসবাস এই বস্তিতে। এখানকার বাসিন্দাদের জীবিকা দিনমজুরি, ড্রাইভিং, ভাঙারি ব্যবসা, গার্মেন্টসে কাজ, রিকশা চালানো, ছোট ব্যবসা ও হকারি ঘিরে। কর্মজীবী নারী বাসিন্দাদের অধিকাংশই ছোট দোকানি, পোশাককর্মী বা বাসা-বাড়িতে কাজ করেন।
কোনো বছর দু-তিনবারও লাগে আগুন
যেখানে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় একজন মানুষের ন্যূনতম থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত প্রধান প্রায়োরিটি, সেখানে কড়াইল বস্তিতে গড়ে প্রতি ৪০-৫০ বর্গফুটে একজন মানুষের বসবাস শুধু মানবিক সংকটই নয়, অগ্নিকাণ্ডের জন্যও যেন প্রস্তুত এক মঞ্চ। একা একা দাঁড়ানো সেই ছোট্ট খুপড়িগুলো যেন অপেক্ষায় থাকে কখন দপ করে জ্বলে উঠবে। তারই যেন প্রমাণ দিতে হয় প্রতিবছর আগুনে। কখনো কখনো তো বছরে দু-তিনবারও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এখানকার বস্তিবাসীর এমন একটি বছরও কাটে না বেদনাহীন।
Reporter Name 























