ঢাকা ১১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ জিততে দেখতে চান শোয়েব আখতার মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে পুলিশের ট্রাফিক নির্দেশনা আইজিপি বাহারুল আলমের অপসারণ চেয়ে রিট খারিজ হাদির ওপর গুলি নিয়ে সিইসির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন ৩০০ কর্মকর্তার সমন্বয়ে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি গঠন করল ইসি সুদানে সন্ত্রাসী হামলায় হতাহত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পরিচয় জানাল আইএসপিআর সুষ্ঠু ভোটে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেশেই আছেন ওসমান হাদির ওপর হামলাকারী মূল আসামি: ডিএমপি ‘মনে হলো মাথায় বাজ পড়েছে’, হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া নিয়ে প্রতিক্রিয়া সিইসি’র এবার রাজধানীতে যাত্রীবাহী বাসে আগুন

ইউনূস-তোবগে বৈঠক ঢাকা-থিম্পু সম্পর্ক উন্নয়নে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় জোর

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৬:৪১:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
  • ২৮ বার
ভুটানের সফররত প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন।

দুই নেতা বাংলাদেশ-ভুটান সম্পর্কের বিস্তৃত পরিসরে, বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, পর্যটন, ইন্টারনেট সহযোগিতা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, পানিসম্পদ, বিনিয়োগ ও উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা করেন।

বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তোবগে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পৌঁছেন। এরপর দুই নেতা প্রথমে ৩০ মিনিটের একান্ত বৈঠক করেন এবং পরে প্রায় এক ঘণ্টার আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

ভুটানকে ‘বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু’ বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ভুটান ঢাকার দৃষ্টিভঙ্গির একটি মূল অংশ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ একই সুতায় গাঁথার মতো। ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতি আমাদের এক করেছে। আমাদের নিয়তি ভবিষ্যেক একসঙ্গে নির্মাণ করা।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও চমৎকার সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি বাংলাদেশকে ভুটানের ‘আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের উৎস’ হিসেবে উল্লেখ করে জানান, মধ্যযুগে বাংলার ভিক্ষুরা বৌদ্ধ ধর্ম হিমালয় এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

সফররত প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো গভীর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের যদি উন্নতি করতে হয়, তবে আমাদের একসঙ্গে উন্নতি করতে হবে।’উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করেছে। বাংলাদেশ ও ভুটান ২০২০ সালে একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর  করে।

প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, থিম্পু যত দ্রুত সম্ভব এফটিএ স্বাক্ষর করতে চায় এবং আশা করছে, ভুটানই হবে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিবদ্ধ দেশ। তিনি বলেন, এফটিএ দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াবে।

প্রধান উপদেষ্টা জানান, ভুটানের পণ্য পরিবহনকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভুটানি কনটেইনার দ্রুত ছাড় করানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

দুই দেশ পারস্পরিক পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে একমত হয়। বাংলার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবদান স্মরণ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তিনি আশা করেন—আরো বেশি ভুটানি পর্যটক বাংলাদেশে এসে বৌদ্ধ ঐতিহ্য অন্বেষণ করবেন।

অধ্যাপক ইউনূস আরো জানান, বাংলাদেশ নীলফামারীতে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল এবং একটি মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণ করছে। তিনি ভুটানের নাগরিকদের ভবিষ্যতে এই স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।

আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও ভুটান দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে।

প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, এখন থেকে আরো বেশি বাংলাদেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ভুটানে কাজ করতে পারবেন, বিশেষ করে ভুটানের নির্মীয়মাণ নতুন অর্থনৈতিক নগরী গেলেফুতে।

ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ চুক্তির আওতায় ভুটান বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইডথ আমদানি করবে। বৈঠকে উপস্থিত পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ঢাকা আশা করে, এই রপ্তানি ভুটানের ডিজিটাল সংযোগকে শক্তিশালী করবে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমাবে।

বাংলাদেশ ভুটানি শিক্ষার্থীদের জন্য মেডিক্যাল কলেজে আসনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বুয়েটে আসন বরাদ্দের ঘোষণা দেয়। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জানান, ভুটানের অনেক শীর্ষ চিকিৎসকই বাংলাদেশের মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী।

প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, ভুটান গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি নামের একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলছে এবং বাংলাদেশের সহযোগিতা চেয়েছে, যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ভুটানি কার্গোর লোড-আনলোড সুবিধার জন্য জায়গা অন্তর্ভুক্ত।

দুই নেতা ভুটান থেকে বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনা এবং বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।

বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইদুর রহমান এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক সই

বাংলাদেশ ও ভুটানের শীর্ষ নেতাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর গতকাল শনিবার উভয় দেশ স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে।

প্রথম সমঝোতা স্মারকটি ‘স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ’ সংক্রান্ত, যা সই করে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং ভুটানের রয়াল সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দলিলে সই করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান।

দ্বিতীয় সমঝোতা স্মারকটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ এবং অন্যান্য টেলিযোগাযোগসেবা বাণিজ্য সম্পর্কিত। বাংলাদেশ সরকার ও ভুটানের রয়াল সরকারের মধ্যে এটি সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দলিলে সই করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আব্দুন নাসের খান।

প্রধান উপদেষ্টার আমন্ত্রণে গতকাল সকালে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তোবগে ঢাকায় পৌঁছেন। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ড্রুকএয়ারের ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান।

বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে দুই নেতার মধ্যে সংক্ষিপ্ত বৈঠক হয়। এ সময় তোবগে শুক্রবারের ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খোঁজ নেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান, বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে একটি গাছ রোপণ করেন।

দুপুরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

গতকাল বিকেলে তেজগাঁও এলাকায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগেকে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সন্ধ্যায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে সরকারের পক্ষ থেকে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন

গতকাল শনিবার ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় এসে পৌঁছার পরপরই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা বীরপ্রতীক ফারুক-ই-আজম, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

পরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সেখানে রাখা দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর এবং স্মৃতিসৌধের প্রাঙ্গণে একটি বকুলের চারা রোপণ করেন।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সাক্ষাৎ

পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন গতকাল ঢাকায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।

সাক্ষাৎকালে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করে এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জেরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ জিততে দেখতে চান শোয়েব আখতার

ইউনূস-তোবগে বৈঠক ঢাকা-থিম্পু সম্পর্ক উন্নয়নে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় জোর

আপডেট টাইম : ০৬:৪১:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
ভুটানের সফররত প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন।

দুই নেতা বাংলাদেশ-ভুটান সম্পর্কের বিস্তৃত পরিসরে, বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, পর্যটন, ইন্টারনেট সহযোগিতা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, পানিসম্পদ, বিনিয়োগ ও উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা করেন।

বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তোবগে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পৌঁছেন। এরপর দুই নেতা প্রথমে ৩০ মিনিটের একান্ত বৈঠক করেন এবং পরে প্রায় এক ঘণ্টার আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

ভুটানকে ‘বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু’ বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ভুটান ঢাকার দৃষ্টিভঙ্গির একটি মূল অংশ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ একই সুতায় গাঁথার মতো। ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতি আমাদের এক করেছে। আমাদের নিয়তি ভবিষ্যেক একসঙ্গে নির্মাণ করা।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও চমৎকার সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি বাংলাদেশকে ভুটানের ‘আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের উৎস’ হিসেবে উল্লেখ করে জানান, মধ্যযুগে বাংলার ভিক্ষুরা বৌদ্ধ ধর্ম হিমালয় এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

সফররত প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো গভীর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের যদি উন্নতি করতে হয়, তবে আমাদের একসঙ্গে উন্নতি করতে হবে।’উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করেছে। বাংলাদেশ ও ভুটান ২০২০ সালে একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর  করে।

প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, থিম্পু যত দ্রুত সম্ভব এফটিএ স্বাক্ষর করতে চায় এবং আশা করছে, ভুটানই হবে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিবদ্ধ দেশ। তিনি বলেন, এফটিএ দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াবে।

প্রধান উপদেষ্টা জানান, ভুটানের পণ্য পরিবহনকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভুটানি কনটেইনার দ্রুত ছাড় করানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

দুই দেশ পারস্পরিক পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে একমত হয়। বাংলার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবদান স্মরণ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তিনি আশা করেন—আরো বেশি ভুটানি পর্যটক বাংলাদেশে এসে বৌদ্ধ ঐতিহ্য অন্বেষণ করবেন।

অধ্যাপক ইউনূস আরো জানান, বাংলাদেশ নীলফামারীতে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল এবং একটি মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণ করছে। তিনি ভুটানের নাগরিকদের ভবিষ্যতে এই স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।

আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও ভুটান দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে।

প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, এখন থেকে আরো বেশি বাংলাদেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ভুটানে কাজ করতে পারবেন, বিশেষ করে ভুটানের নির্মীয়মাণ নতুন অর্থনৈতিক নগরী গেলেফুতে।

ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ চুক্তির আওতায় ভুটান বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইডথ আমদানি করবে। বৈঠকে উপস্থিত পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ঢাকা আশা করে, এই রপ্তানি ভুটানের ডিজিটাল সংযোগকে শক্তিশালী করবে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমাবে।

বাংলাদেশ ভুটানি শিক্ষার্থীদের জন্য মেডিক্যাল কলেজে আসনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বুয়েটে আসন বরাদ্দের ঘোষণা দেয়। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী জানান, ভুটানের অনেক শীর্ষ চিকিৎসকই বাংলাদেশের মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী।

প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, ভুটান গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি নামের একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলছে এবং বাংলাদেশের সহযোগিতা চেয়েছে, যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ভুটানি কার্গোর লোড-আনলোড সুবিধার জন্য জায়গা অন্তর্ভুক্ত।

দুই নেতা ভুটান থেকে বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনা এবং বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।

বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইদুর রহমান এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক সই

বাংলাদেশ ও ভুটানের শীর্ষ নেতাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর গতকাল শনিবার উভয় দেশ স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে।

প্রথম সমঝোতা স্মারকটি ‘স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ’ সংক্রান্ত, যা সই করে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং ভুটানের রয়াল সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দলিলে সই করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান।

দ্বিতীয় সমঝোতা স্মারকটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ এবং অন্যান্য টেলিযোগাযোগসেবা বাণিজ্য সম্পর্কিত। বাংলাদেশ সরকার ও ভুটানের রয়াল সরকারের মধ্যে এটি সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দলিলে সই করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আব্দুন নাসের খান।

প্রধান উপদেষ্টার আমন্ত্রণে গতকাল সকালে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তোবগে ঢাকায় পৌঁছেন। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ড্রুকএয়ারের ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান।

বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে দুই নেতার মধ্যে সংক্ষিপ্ত বৈঠক হয়। এ সময় তোবগে শুক্রবারের ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খোঁজ নেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান, বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে একটি গাছ রোপণ করেন।

দুপুরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

গতকাল বিকেলে তেজগাঁও এলাকায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগেকে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সন্ধ্যায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে সরকারের পক্ষ থেকে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন

গতকাল শনিবার ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় এসে পৌঁছার পরপরই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা বীরপ্রতীক ফারুক-ই-আজম, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

পরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী সেখানে রাখা দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর এবং স্মৃতিসৌধের প্রাঙ্গণে একটি বকুলের চারা রোপণ করেন।

ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সাক্ষাৎ

পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন গতকাল ঢাকায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।

সাক্ষাৎকালে দুই পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করে এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জেরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।