হাওর এলাকায় বোরো মৌসুম অনিশ্চয়তায়, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে ?
কিশোরগঞ্জের হাওর-বেষ্টিত অষ্টগ্রাম উপজেলায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর কৃষিজমি এখনো পানির নিচে। এর ফলে বোরো মৌসুমের বীজতলা তৈরি করতে পারছেন না স্থানীয় কৃষকেরা। প্রতিদিনই সময় ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু পানি কমছে না—এ অবস্থায় সামনে বোরো মৌসুম নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
হাওরাঞ্চলে তিন সপ্তাহ ধরে পানি নামছে না:
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কয়েক দফা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি নামতে না পারায় পুরো হাওরাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। অষ্টগ্রামের বিভিন্ন গ্রাম—আগানগর, কালারমারী, ব্রাহ্মণখলা, কুড়িগ্রাম, গোপদিঘীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো হাঁটু থেকে কোমর–সমান পানি।
মাঠের আগাম ধান কাটলেও জমি শুকাতে না পারায় কৃষকেরা জায়গামতো প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। অনেক জায়গায় জমি চাষযোগ্য হতে আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগবে বলে আশঙ্কা।
বোরো মৌসুম পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা:
অষ্টগ্রামের কৃষকেরা বলছেন, ডিসেম্বরের শুরুতেই বীজতলা প্রস্তুত করে বোরো মৌসুমের ধান রোপণ শুরু করার কথা। কিন্তু এবার জমি প্রস্তুত তো দূরের কথা, বীজতলার জন্য খালি জায়গাই মিলছে না।
অনেকে প্লাস্টিক শিট বা টিনের ওপরে বীজতলা তৈরি করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু তা ব্যয়বহুল ও অপ্রতুল।
কৃষক আব্দুল খালেক বলেন,
“এই সময় বীজতলা না করলে মৌসুমটাই হাতছাড়া হয়ে যাবে। পানি এমনভাবে আটকে আছে যে কিছুই করার উপায় নেই।”
ফসল উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা:
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বীজতলা তৈরিতে বিলম্ব হলে বোরো ধানের রোপণ সময়মতো শুরু করা সম্ভব হবে না। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়বে—তেমনি ফলনও কমে যেতে পারে। বিশেষত হাওরাঞ্চলে বোরোই বছরের প্রধান ফসল, তাই এটি বিলম্ব হলে কৃষকের বার্ষিক আয়ে বড় ধাক্কা লাগবে।
কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য,
“অষ্টগ্রামের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল এখনো পানিতে ডুবে আছে। পানি না নামলে প্রচলিত পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি করা সম্ভব নয়। বিকল্প উঁচু-বেড পদ্ধতি বা চারা সংরক্ষণ পদ্ধতির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
প্রকৃতি ও অবকাঠামোগত সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব:
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেবল প্রাকৃতিক কারণে নয়—অপরিকল্পিত বাঁধ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বলতা এবং জলধারার মুখে নানা প্রতিবন্ধকতাও জলাবদ্ধতা বাড়িয়ে তুলেছে।
কিছু এলাকায় খাল ও নদীর মুখ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে অষ্টগ্রাম-নিকলী এলাকার সংযোগ খালগুলো নিয়মিত খনন না হওয়ায় পানি আটকে যাচ্ছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগের দাবি:
কৃষকেরা বলছেন, পানি দ্রুত নিষ্কাশনের উদ্যোগ না নিলে বিপদের মুখে পড়বে পুরো হাওরাঞ্চলের বোরো মৌসুম।
কৃষক রমজান মিয়া বলেন,
“সারাবছর আমরা বোরো ধান বিক্রি করে সংসার চালাই। এই ধান না হলে ঘরে সারা বছর অভাব লেগেই থাকবে।”
স্থানীয় কৃষকসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন দ্রুত পাম্প স্থাপন, খাল খনন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
হাওরের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি:
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওর অঞ্চলের বিশেষ প্রকৃতির কারণে এখানকার পানি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও সমন্বিত রূপ দিতে হবে।
ঋতুভিত্তিক পানি ওঠানামার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাঁধ সংস্কার, খাল পুনঃখনন এবং জলাধার সংরক্ষণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান সম্ভব নয়।
অষ্টগ্রামের কৃষকেরা এখন তাকিয়ে আছেন পানি কমার অপেক্ষায়। বোরো মৌসুমই যেখানে হাওরবাসীর জীবন-জীবিকার কেন্দ্র, সেখানে জলাবদ্ধতা দ্রুত না কাটলে কৃষকের বছরজুড়ে কষ্টের দিন আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করছেন সবাই।
Reporter Name 























