নাদরিন বলেন, ‘সে ফুটবল আর খেলাধুলা খুব পছন্দ করত। আবদুল্লাহ স্থানীয় মুদি দোকানদারদের সঙ্গে কাজ করত, তাদের জন্য ফল ও সবজি বহন করত ও তার স্বপ্ন ছিল যুদ্ধ শেষ হলে নতুন ব্যবসা শুরু করার।’
এ ঘটনার বিষয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, তারা হামাসের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার জন্য কাজ করছে ও বেসামরিক ক্ষতি কমাতে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে।
হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা বলেছে, ওই দিন গাজাজুড়ে ইসরায়েলি গোলাগুলিতে মোট ৯৩ জন নিহত হয়েছে ও আহত হয়েছে আরো অনেকে। মূলত ত্রাণ বিতরণের পয়েন্টগুলোর কাছে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।সেলা মাহমুদ, বয়স ৮
সেলা মাহমুদের বয়স আট বছর। সে মঙ্গলবার ভোরে নিহত হয় বলে জানান তার মা আলা শেহাদা।
মা, বড় দুই বোন (যাদের বয়স ১৪ ও ১৩ বছর) ও এক ছোট ভাইয়ের (বয়স ছয়) সঙ্গে উত্তর গাজার আল-শাতি এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের জন্য একটি শরণার্থীশিবিরে থাকতো ছোট্ট এই মেয়েটি।
আলা জানিয়েছেন, বাকি তিন সন্তানকে রেখে তিনি ও তার ১৩ বছরের মেয়ে খাবারের জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরের জিকিম সাহায্যকেন্দ্রের দিকে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু রাত প্রায় পৌনে ২টায় তিনি দূরে গোলাগুলির শব্দ শুনে ভীষণ ভয় পেয়ে যান। তার মনে হতে থাকে খারাপ কিছু ঘটবে।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে একটা ঘা লাগে। মা হিসেবে আমার মনটা বলতে থাকে, আমার সন্তানরাও এই হামলার শিকার হবে।’
অপরিচিত কিছু মানুষের সাহায্যে আলা ক্যাম্পে থাকা তার বড় মেয়েকে ফোন করতে সক্ষম হন। তিনি নিশ্চিত হন, তারা হামলার শিকার হয়েছে ও সেলা মারা গেছে।
আলা বলেন, ‘আমার হৃদয় ভেঙে গেছে।’
বাকি দুই শিশু বেঁচে আছে, কিন্তু মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে ও তারা গাজার আল-শিফা হাসপাতালে আছে বলে জানান তিনি।
আলা বলেন, সেলা শেষ কয়েক দিনে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিল ও সে সমুদ্রের ধারে সময় কাটাতে খুব ভালোবাসত। তার মায়ের কাছে শেষ কথা ছিল, ‘পেট না ভরে যাওয়া পর্যন্ত পুরো এক বাটি ডাল খেতে চাই আমি।’
এ বিষয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বলেছে, ঘটনার সঠিক অবস্থান না জানাতে পারলে তারা এই ঘটনায় মন্তব্য করতে পারবে না। তারা দাবি করেছে, ‘বেসামরিক ক্ষতি কমানোর জন্য সম্ভাব্য সব সতর্কতা নেওয়া হয়।’
আহমেদ আলহাসানত, বয়স ৪১
৪১ বছর বয়সী আহমেদ আলহাসানত গত ২২শে জুলাই মঙ্গলবার মারা গেছেন।
তার ভাই ইয়াহিয়া আলহাসানত বলেন, ‘অপুষ্টি তাকে মেরে ফেলেছে – দিন দিন সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছিল।’
গত মার্চ মাসে ইসরায়েল গাজায় সাহায্য প্রবেশে অবরোধ দেওয়ার পর থেকেই তার ভাই অসুস্থ হতে শুরু করে বলে জানান ইয়াহিয়া। মে মাস থেকে ইসরায়েল কিছু সাহায্য গাজায় প্রবেশ করতে দিয়েছে, কিন্তু সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে- এটা মোটেও যথেষ্ট নয়।
আহমেদ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন ও তিন মাস ধরে তিনি পর্যাপ্ত খাবার বা পানীয় পাননি। ইয়াহিয়া বলেন, তিনি শুধু সামান্য রুটি আর মাঝে মাঝে ক্যান বা কৌটার খাবারের ওপর নির্ভর করতেন। ফলে তার ওজন ৮০ কেজি থেকে কমতে কমতে ৩৫ কেজি হয়ে যায় ও তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে।
আহমেদের চাচাতো ভাই রিফাত আলহাসানত জানান, তারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তাররা বলেছিল তার ওষুধ নয় খাবার দরকার। তাই তারা তাকে আবার বাড়ি নিয়ে আসে।
ইয়াহিয়া বলেন, আহমেদ, যিনি আগে টেলিভিশনের স্যাটেলাইট ডিশ বসানোর কাজ করতেন এবং ফুটবলের ভক্ত ছিলেন, “গাজার মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহ শহরের নিজের বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবে মারা গেছেন”।
মোহাম্মদ কুল্লাব, বয়স ২৯
মোহাম্মদ কুল্লাব। ২৯ বছর বয়সী এই তরুণ গত ২২শে জুলাই এক বিমান হামলায় নিহত হন বলে জানিয়েছেন তার ভগ্নিপতি আমার রাগাইদা।
রাগাইদা জানান, পশ্চিম খান ইউনিসের আল-কাদিসিয়া এলাকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য তৈরি একটি ক্যাম্প এলাকায় বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে যখন বিমান হামলা হয়, তখন নিজের তাঁবুতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কুল্লাব।
তিনি বলেন, ‘‘সে তখন তাঁবুতে একা ছিল। বোমা হামলার কয়েক ঘণ্টা পর কিছু মানুষ তার বোনকে ফোন করে তার মৃত্যুর খবর জানায়। কুল্লাবের মৃত্যুর আগের দিন ত্রাণের খোঁজে বের হলে তার সাথে হঠাৎ দেখা ও কথা হয়েছিলো। সে আমাকে বলেছিল, ‘একা যেও না, আমি চেষ্টা করব তোমার জন্য কিছু ময়দা আনতে’। পরের দিনই সে মারা গেলো।’’
কুল্লাব তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল একটি বোন ও একটি ছোট ভাই রেখে গেছে জানিয়ে আমার আরো বলেন, ‘কুল্লাব ছিল ভদ্র, প্রাণবন্ত একজন তরুণ। সে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে নিজেকে জড়াত না ও আশেপাশের সবাই তাকে ভালোবাসত।’
এই ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিএফ আবদুল্লাহর জন্য দেওয়া বক্তব্যের মতোই একই রকম জবাব দেয়, যেখানে বলা হয় তারা ‘নাগরিক ক্ষতি কমাতে যথাযথ সতর্কতা নেয়’, ঘটনাস্থলের অবস্থান জানা না গেলে এ বিষয়ে আর কিছু বলা সম্ভব নয়।
মোহানাদ কাফিনা, বয়স ২২
২০ জুলাই ভোরে গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকার বাসিন্দা মোহানাদ কাফিনা তার চাচা নাসিমের সঙ্গে খাবারের সন্ধানে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু মোহানাদ আর ফিরে আসেননি।
মোহানাদ সকালে নাসিমকে বলেছিলেন, ‘তার খুব মিষ্টি চা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে।’
কথা বলার সময় তারা দেখতে পান, একটি খালি ত্রাণবাহী ট্রাক পুনরায় মালামাল আনতে যাচ্ছে। তাই তারা ঠিক করেন, জিকিমের ত্রাণকেন্দ্রে গিয়ে অপেক্ষা করবেন ট্রাকটি ফেরার জন্য, যাতে ট্রাক ফিরে এলে তারা কিছু খাবার পান। কিন্তু তারা যখন পৌঁছান তখন সেখানে ভিড় ছিল ও ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালাচ্ছিল। ওই সময় তারা দুজন আলাদা হয়ে যান।
নাসিম বাসায় ফিরে ভেবেছিলেন মোহানাদ সেখানে থাকবেন, কিন্তু তিনি ছিলেন না। তারা স্থানীয় হাসপাতালে খুঁজতে থাকেন ও শেষ পর্যন্ত শেখ রাদওয়ানের একটি ক্লিনিকে আরো অনেক অজ্ঞাত লাশের সঙ্গে মোহানাদের মরদেহ পাওয়া যায়।
নাসিম জানিয়েছেন, তার ভাগ্নের মাথায় গুলি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘সব গাজাবাসীর মতো ক্ষুধার্ত আর সাহায্যের আশায় মরিয়া হয়ে সে মারা গেছে।’
তিনি আরো জানান, মোহানাদ তার কাছে ছেলের মতো ছিল। তারা সব জায়গায় একসঙ্গে যেতেন, কখনো কোনো কিছু গোপন রাখতেন না। তিনি বলেন, ‘মোহানাদের স্মৃতি পৃথিবীর সব কলম দিয়ে লিখেও শেষ করা যাবে না। এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন আমাদের কোনো স্মৃতি তৈরি হয়নি। আমি ভেঙে পড়েছি।’
নাসিম জানান, মোহনাদ প্রযুক্তি, সফটওয়্যার আর ইন্টারনেট নিয়ে ভীষণ আগ্রহী ছিলেন এবং একদিন ভালো জীবন পাওয়ার জন্য বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
আইডিএফ এই ঘটনার বিষয়ে বলেছে, ঘটনাস্থলের সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় ঘটেছে তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা মন্তব্য করতে পারবে না। তাদের দাবি, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে ও বেসামরিক ক্ষতি কমাতে ‘যথাসম্ভব পদক্ষেপ’ নেয়।