ইরানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ সমাপ্তির অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির শর্তগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর চরম হতাশা, অবিশ্বাস ও স্তব্ধতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে ইসরায়েল। দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিতে ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন উদ্দেশ্যের কোনো প্রতিফলনই ঘটেনি। বরং এটি ইসরায়েলকে আগের চেয়েও বেশি নিরাপত্তাহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের।
চুক্তির কড়া সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন ‘চ্যানেল ১২ নিউজের’ রাজনৈতিক বিশ্লেষক নির দ্বোরি। তিনি একে ইসরায়েলের জন্য একটি ‘কূটনৈতিক ৭ অক্টোবর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটি এমন এক বিপর্যয় যার জন্য তেল আবিব একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। অন্যদিকে ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের’ সম্পাদক ডেভিড হরোভিৎস তার কলামের শিরোনামে এই চুক্তিকে ‘লজ্জাজনক আত্মসমর্পণ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মহলের মতে, ট্রাম্পের এই চুক্তিতে ইরানের পক্ষেই বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে-
আঞ্চলিক আধিপত্য : চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আগামী ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন বাহিনীকে ইরানের ‘নিকটবর্তী অঞ্চল’ থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। এর ফলে ইরান এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে তাড়ানোর কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের শুরুতে শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পরও তেহরান এই চুক্তি দিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হলো।
মিসাইল ও প্রক্সি মিলিশিয়া : এই চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিদের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধের বিষয়ে কোনো শর্ত রাখা হয়নি। উল্টো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ও অবরুদ্ধ তহবিল ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে ইরান যে শত শত কোটি ডলার পাবে, তা হিজবুল্লাহর পকেটেই যাবে বলে ইসরায়েলের আশঙ্কা।
লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার : সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে লেবানন ফ্রন্টে। চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে, যা যুদ্ধের আগে ইসরায়েলের ওপর থাকা সামরিক স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের বাধ্যবাধকতা বা ‘হ্যান্ডকাফ’ পরানোর শামিল।
পরমাণু ইস্যু : যে পারমাণবিক কর্মসূচিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকট মনে করেন এবং যা ট্রাম্পের এই যুদ্ধে জড়ানোর প্রধান কারণ ছিল, সেই মূল পরমাণু ইস্যুটিকে আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য তুলে রাখা হয়েছে।
‘কাগুজে প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে নগদ অর্থ দিলেন ট্রাম্প’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাবেক কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইয়াকভ আমিদ্রিওর এক সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি একটি অত্যন্ত খারাপ চুক্তি। যেখানে আমেরিকানরা নগদ অর্থ দিয়ে কেবল একটি কাগুজে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে।
সাবেক উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চাক ফ্রেইলিচ বলেন, আমরা নাকি এই অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিচ্ছিলাম! অথচ ইরান এখন আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলো। তারা বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, মিসাইলও রাখছে ও পরমাণু ইস্যু নিয়ে কেবল ‘পরে কথা হবে’ বলা হয়েছে। এটি আসলে আমেরিকা ও ইসরায়েলের ওপর ইরানের বড় বিজয়।
সার্বিক পরিস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, সামনে আমাদের আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার জন্য আমাদের শান্ত থাকা, নিরাপত্তার স্বার্থে শক্ত অবস্থান নেওয়া ও মার্কিন বন্ধুদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েল তার মূল লক্ষ্য ‘ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়া’ থেকে সরবে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের বাফার জোন থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
তবে ফ্রান্সের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুকে নিয়ে প্রকাশ্য উপহাস করেছেন, তা ইসরায়েলিদের আরও বেশি মর্মাহত করেছে। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘ভেরি স্মল পার্টনার’ (খুবই ছোট অংশীদার) বলে খাটো করেছেন। দাবি করেছেন ট্রাম্প না থাকলে ইসরায়েল এতদিনে ধ্বংস হয়ে যেত। এমনকি ইসরায়েলে লাখ লাখ মানুষকে বাঙ্কারে পাঠাতে বাধ্য করা ইরানি মিসাইল হামলাকে ট্রাম্প এক প্রকার বৈধতা দিয়ে বলেছেন, অন্য দেশের থাকলে ইরানের মিসাইল থাকাটা অন্যায্য কিছু নয়।
এই ঘটনায় নেতানিয়াহুর নিজস্ব দল লিকুদ পার্টির ভেতরেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দলটির আইনপ্রণেতা হ্যানোচ মিলউইডস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করে তার মাথা থেকে ট্রাম্পের লাল হ্যাটটি ছুড়ে ফেলে হিব্রু ভাষায় ‘টোটাল ভিক্টরি’ (পূর্ণাঙ্গ বিজয়) লেখা নীল টুপি মাথায় পরেন। ইসরায়েলের বৃহত্তম সংবাদপত্র ‘ইয়েদিওত আহরোনতের’ কলামিস্ট বেন-ড্রোর ইয়েমিনি লিখেছেন, নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতনের দিকে নিয়ে গেছেন। ট্রাম্প তার সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন, ইরানকে শক্তিশালী করেছেন। সবশেষে ইসরায়েলকে লাথি ও অপমান উপহার দিয়েছেন।
Reporter Name 
























