নির্বাহী আদেশে কোন দলকে নিষিদ্ধ করা সমাধান নয়। বরং সমস্যা। সমাধানের পথ রিকনসিলিয়েশন। বিচার, অনুশোচনা প্রকাশের সুযোগ এবং ক্ষমা- এটাই রিকনসিলিয়েশনের পথ।
ধরুন, সরকার দাবি মেনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করল। কিন্তু দলটির নেতাকর্মী, সমর্থকদের কী করবেন? সবাইকে ধরে নিয়ে জেলে নেওয়া সমাধান নয়। তাদেরকে সেদিকে ঠেলে দিলে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগে জমায়েত হওয়া তরুণরা এই বিপদটি হয়ত ভেবে দেখছেন না। যেসব রাজনৈতিক দল তাদেরকে সমর্থন দিচ্ছে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে, কী কারণে দিচ্ছে তাও হয়ত ভাবছেন না।
মানেন আর না মানেন, আওয়ামী লীগের সারাদেশে সারা চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের ৪০ হাজার ওয়ার্ড এবং সাড়ে তিনশ’ পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের হাজারখানেক ওয়ার্ডে পাঁচ লাখের বেশি পদধারী নেতা আছে। অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের মিলিয়ে পদধারী নেতার সংখ্যা ২০ লাখের বেশি হবে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করলে, এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে কীভাবে ডিল করবেন?
দল নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে আরও কোনঠাসা হয়ে এই মানুষগুলোর একাংশও যদি আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সে ইনভলব হয়, অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, তাদের কীভাবে মোকাবেলা করবেন? তাদেরকে সহায়তা করার জন্য প্রতিবেশি দেশ তো আছেই। এই একটি কারণেই ধুম করে নিষিদ্ধ করা সমস্যার সমাধান নয়।
আওয়ামী লীগের তুলনায় জামায়াত ছোট দল। রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ভারতের সম্মিলিত শক্তি দিয়েও, জামায়াতকে মোকাবেলা করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ১ আগস্ট নিষিদ্ধ করার পর, জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা বউ বাচ্চাসহ রাস্তায় নেমেছিল। ওই সময়ে সরকারের পতন ছাড়া তাদের সামনে পথ খোলা ছিল না। বিপদ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। যেমন বিএনপির ওপর আওয়ামী লীগ আমলে যত অত্যচার হয়েছে, দলটি তত ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। জামায়াতের ক্ষেত্রেও তাই। আওয়ামী লীগের ওপর অলআউট ক্র্যাকডাউন হলে, তারাও অস্তিত্ব বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ হবে।
শত্রুকে আত্মসমর্পন করাতে চাইলে চারদিক থেকে ঘিরে আক্রমণ করতে হয় না। এতে মরিয়া শত্রু জীবন বাঁচাতে পাল্টা আক্রমণ করে অবিশ্বাস্য কিছু করে ফেলতে পারে। তিন দিক থেকে আক্রমণ করে, আত্মসমর্পনের পথ খোলা রাখতে হয়। এই পথটিই রিকনসিলিয়েশন।
শাহবাগে জমায়েতকারীরা হয়ত আওয়ামী লীগের ‘আদর্শকে’ বুঝতে পারছেন না। তিন চারদিন আগে চায়ের দোকানে শুনি দুইজন মানুষ নীচুস্বরে কথা বলছেন। একজন বললেন, ‘ছাত্ররা স্লোগান দিচ্ছিল, ঢাকা না দিল্লী’? আমি মনে কইছি, ‘দিল্লী, দিল্লী। খুব শান্তি লাগছে’। এই আদর্শকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধের মাধ্যমে ডিল করার চিন্তা ভুল।
শেখ হাসিনা ১৫ বছরে এবং জুলাইয়ে জঘন্য অপরাধ করার পরও তার সমর্থকদের চোখে তিনি নির্দোষ। এরা স্টকহোম সিনড্রোম এবং ‘আওয়ামী শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ সিনড্রোমে আক্রান্ত। এই সিনড্রোমের চিকিৎসাও নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধে নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা ২১৮ বছর কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর জঘন্য অত্যাচার করেছিল। ম্যান্ডেলা রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমেই সমাধান করেছিলেন। ধরে ধরে প্রত্যেক শ্বেতাঙ্গকে জেলে নিলে, দক্ষিণ আফ্রিকা ভেঙে পড়ত। রিকনসিলিয়েশনের মাধ্যমে জাতি এবং সমাজে পুনর্গঠন করেছিলেন।
বাংলাদেশেও তা করা যায়। প্রত্যেক উপজেলায় বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি, নাগরিক এবং প্রশাসনের সমন্বয়ে রিকনসিলিয়েশন কমিশনে করা যেতে পারে। আওয়ামী লীগ আমলে যারা অত্যাচার নিপীড়ন করেছে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা রিকনসিলিয়েশন কমিশনে অভিযোগ জানাতে পারবে। উন্মুক্ত শুনানী হবে। নিয়ম থাকবে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দায় স্বীকার করে অনুশোচনা জানিয়ে ক্ষমা পাবে। অভিযুক্ত কমিশনে না এলে কিংবা অনুশোচনা না জানালে, ক্ষমা পাবেন না। তার বিরুদ্ধে আদালতে কার্যক্রম চলবে। অভিযোগকারী আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, প্রতিকার পাবেন।
প্রত্যেক উপজেলায় গড়ে ১০০-২০০ জনের বেশি আওয়ামী লীগারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসার কারণ নেই। তাই চাইলে, এক-দুই মাসের মধ্যে রিকনসিলিয়েশন প্রসেস শেষ করা সম্ভব।
আওয়ামী লীগ আমলে যে সরকারি কর্মকর্তার জনবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন, ভোট চুরি, মানুষকে নাজেহাল করা, বিরোধী দলকে কর্মসূচিতে পেটানোর অপরাধ করেছিলেন, তাদেরকেও ক্ষমা প্রার্থনার বিনিময়ে রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ দিলে ক্ষতি নেই।
বিএনপি ৩১ দফায় রিকনসিলিয়েশনের কথা বলেছে। যদিও স্পষ্ট করেনি, কারা রিকনসিলিয়েশনের আওতায় পড়বে। আর রিকনসিলিয়েশনের বিধিবিধান ও পদ্ধতি কী হবে। বিএনপি রিকনসিলিয়েশনে রাজি থাকায়, জামায়াত ও এনসিপি সমর্থন করলে, সরকারকে তা করতেই হবে।
বলছি না, শেখ হাসিনাকেও রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ দিতে হবে। তিনি এবং যারা গুম, খুন, বিচার বহির্ভূত, ভোট ডাকাতি (রাতের ভোটের এমপি), বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংক লুটের মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন, তারা রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ পাবে না- এমন বিধান থাকলে মূলহোতাদের বিনাবিচারে ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। তাদের আদালতে প্রসিকিউট করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগের বিচারের পথ খুলতে শাহবাগ থেকে দাবি জানানো হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের বিচার করে আখেড়ে কিছু অর্জিত হয় না। আবারও আইনটিও মানবাধিকার বিরোধী। ন্যায়বিচারের সুযোগ নেই।
এই কথা বলার কারণে ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে নাজেহাল করেছিল। সে কথা এক যুগ পর বলতে চাই না।
একটা কথাই মিল, শাহবাগ একবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। আরেকটা শাহবাগ আরেকটা ফ্যাসিবাদেরই জন্ম দেবে। একে মার, ওকে ধর, এসব করে গণতন্ত্র হয় না। প্রতিশোধ নিয়ে ন্যায়বিচার হয় না।
সাংবাদিক, রাজির আহসান
ফেইসবুক থেকে নেওয়া
Reporter Name 

























