,

IMG_20210815_163437

বঙ্গবন্ধু জরুরি ছিলেন, জরুরি থাকবেন

সুভাষ সিংহ রায়ঃ “ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর রৌদ্র ঝরে

চিরকাল, গান হয়ে
নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা; যাঁর নামের ওপর
কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া,
ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পাখা মেলে দেয়
জ্যোৎস্নার সারস,
ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পতাকার মতো
দুলতে থাকে স্বাধীনতা,
ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের ওপর ঝরে
মুক্তিাযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।”
[ধন্য সেই পুরুষ : শামসুর রাহমান]

কবি মোহাম্মদ রফিক কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেছিলেন এভাবে, ‘বাঙ্গালির শুদ্ধনাম শেখ মুজিবুর রহমান’। আরও ভালোভাবে বলেছিলেন প্রয়াত আহমদ ছফা। তিনি বলেছিলেন, ‘‘অনেকেই বলে থাকেন ‘গীতাঞ্জলি’ বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ; আমি বলি আমাদের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’।’’

একটা মানুষের মাত্র ৫৫ বছর ৫ মাস ২৯ দিনের জীবন। ৩৬ বছরের রাজনৈতিক জীবন, দিনের হিসাবে ১৩ হাজার ৪৬০ দিনের। সেই রাজনৈতিক জীবনের ৪০ শতাংশ তিনি জেলেই কাটিয়েছেন। ৪৮ শতাংশ সময় দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে গিয়েছেন মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য। মাত্র ১২ শতাংশ সময় নিজেকে ও তার পরিবারকে দিয়েছেন। তার মধ্যে মাত্র ১,৩১৪ দিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি আমাদের জন্য কি না রেখে গেছেন! আহমদ ছফা লিখেছেন: ‘আজ থেকে অনেক দিন পর হয়তো কোনো পিতা তার শিশু পুত্রকে বলবেন জানো, খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলেন যার দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালোবাসতে জানতো। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্নারাতে রূপালি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তুলে তাহলো তার ভালোবাসা। জানো খোকা তার নাম? শেখ মুজিবুর রহমান।’

তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন: ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানব জাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্ত সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’

সুতরাং সুখী সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁর জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে গভীর গবেষণা, নিবিড় অধ্যয়ন ও তা থেকে অর্জিত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের কোনো এক সময়ে ড. মাযহারুল ইসলাম, প্রয়াত কথাসাহিত্যিক রাহাত খান, প্রয়াত ফোকলোর গবেষক, অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি তো গ্রেপ্তার এড়াতে পারতেন? প্রশ্নোত্তরে বঙ্গবন্ধুর উত্তর ছিল একেবারেই স্পষ্ট। “২৫শে মার্চ (১৯৭১) রাতে আমি গ্রেপ্তার হবার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেই। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মাধ্যমে ওয়্যারলেসে সে ঘোষণা সব জেলা সদরে পাঠানো হয়। আমি বিভিন্ন চ্যানেলে ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ করে যাই। তা না হলে তোমরা অত সহজে অস্ত্র ও সাহায্য সহযোগিতা পেতে না।”

আমরা প্রশ্ন করলাম কিন্তু আপনি কেন ওদের হাতে ধরা দিলেন। তিনি বললেন, “এ ব্যাপারে আমার বেশ ক’টি চিন্তা কাজ করেছে। এক. আমাকে ধরতে না পারলে ওরা আরো বেশি লোককে খুন করতো; দুই. আন্তর্জাতিকভাবে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতের ক্রীড়নক বলে প্রমাণিত হতাম এবং এতে আন্তর্জাতিক সহমর্মিতা কমতো এবং আরো বেশি দেশ আমাদের আন্দোলন সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতো। আর একটা কথা বলি, তোমরা কিভাবে নেবে জানি না, প্রফেসর সাহেব আমার সঙ্গে একমত হবেন কি না তাও বলতে পারি না, তবে আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস আমি পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি থাকায় আমার দুঃখী বাঙালিদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ যেমন বেড়েছে তেমনি মানুষ আমার অনুপস্থিতিতে আমার একটা বিশাল প্রতীক মনে মনে তৈরি করে নিয়েছে। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের খুব বড়ো একটা শক্তি। আমি প্রবাসী সরকারে থাকলে শুধু প্রমাণ সাইজের মুজিবই থাকতাম। ওদের হাতে বন্দি থাকায় আমি এক মহাশক্তিধর ও বাংলাদেশের সকল মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতার ভূমিকায় স্থান পাই। মানুষ আমার নাম দিয়ে হেলায় হেসে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। কি অমোঘ অস্ত্র ছিল, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। ওরা যদি আমাকে মেরে ফেলতো, তাহলে আমি আরো বড়ো প্রতীকে পরিণত হতাম। বাংলার মানুষ আরো লড়াকু হয়ে যুদ্ধ করতো। তাছাড়া, আমার জাতি আমাকে যে মর্যাদা দিয়েছে তার প্রতি সম্মান রেখেই আমি আমার বুঝ মতো ব্যবস্থা নিয়েছি, আর আমার দেশবাসী ও যোগ্য সহকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছে।” [তথ্যসূত্র : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, লেখক : অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, প্রকাশক দি রয়েল পাবলিশার্স]


বঙ্গবন্ধু যা বিশ্বাস করতেন তাই অকপটে বলতে পারতেন; সত্য উচ্চারণে সব সময় নির্ভীক ছিলেন। আর যেটা ওয়াদা করতেন তা প্রতিপালন করতেন। আমরা সবাই মনে করতে পারি, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর যারা মা-বোনের ইজ্জত নিয়েছে, হত্যা করেছে তারা কিছুতেই ক্ষমা পাবে না। তাই মাত্র ১৪ দিনের মাথায় দালাল আইনে সেই সব নরঘাতক, পাপিষ্ঠদের বিচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৭২ সালের দালাল আদেশ ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকেই কার্যকর হবার আইনি নির্দেশনা থাকায় দেশব্যাপী দালাল আটক অভিযান শুরু হয় এবং ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির ৩৭ হাজার ৪৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৬ হাজার ৮৩৫ জনকে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে আটক করা হয়। এতসব আইনগত বিধান, ছাড় ও ক্ষমতা দেওয়া সত্ত্বেও গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ২ হাজার ৮৪৮টি মামলার নিষ্পত্তি হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিল ৭৫২ জন। এর মধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ অভিযোগকৃত ও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের তিন-চতুর্থাংশই অভিযোগ হতে অব্যাহতি পেয়েছিল। যদিও সরকার আইনগত ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। তারপরও ২২ মাসে ২ হাজার ৮৪৮টি মামলার বিচারকাজ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ এবং শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের নীতির ফলে বাংলাদেশ বিশ্বসভায় একটি ন্যায়ানুগ দেশের মর্যাদা লাভ করে। সবার প্রতি বন্ধুত্বের ভিত্তিতে বৈদেশিক নীতি ঘোষণা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, “পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তি যে অর্থ ব্যয় করে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করছে, সেই অর্থ গরিব দেশগুলোকে সাহায্য দিলে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।” বঙ্গবন্ধুর সৃজনশীল কূটনৈতিক দক্ষতায় ১৯৭৪ সালে ১৭ সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। এবং ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বিশ্বশান্তির কথা স্পষ্ট করে বলেছিলেন। “আমাদেরকে সক্ষম করিয়া তুলিবে এবং সক্ষম করিয়া তুলিবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারির বিরুদ্ধে লড়াই করিবার জন্য আমাদের সকল শক্তি ও সম্পদকে সমাবেশ ও কেন্দ্রীভূত করিতে। এই ধারণা হইতে জন্ম নিয়াছে শান্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি। এই জন্য সমঝোতার অগ্রগতি, উত্তেজনা প্রশমন, অস্ত্র সীমিতকরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান নীতির সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা- বিশ্বের যে কোনো অংশে যে কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হউক না কেন, আমরা তাহাকে স্বাগত জানাই। এই নীতির প্রতি অবিচল থাকিয়া আমরা ভারত মহাসাগরীয় এলাকা সম্পর্কে শান্তি এলাকার ধারণা, যাহা এই পরিষদ অনুমোদন করিয়াছে, তাহাকে সমর্থন করি।”

’৭৪-এ সদস্যপদ প্রাপ্তির ঠিক এক সপ্তাহ পর ২৫ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যা বাংলায় ছিল। ৪৭ বছর আগের সেই ভাষণে বিশ্বকে মানবিক ঐক্যবোধ ও ভ্রাতৃত্ববোধের পুনর্জাগরণে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার স্বীকৃতি প্রদান করে মানব সভ্যতাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার যুক্তিপূর্ণ সমাধান ও জরুরি কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন জাতির পিতা। তার ভাষায়, “শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য, তা এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে যে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হব।”

বঙ্গবন্ধুর জেলখানায় বসে লেখা খাতাগুলো থেকে আমরা ৩টা বই পেয়েছি। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়াচীন’-  এই ৩টি বই থেকে আমরা কিছু জানতে পেরেছি। ‘কারাগারের রোজনামচা’ থেকে জানতে পারি বিশ্ব রাজনীতি ও তার সাথে বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনা কতটা গভীরে বিস্তৃত ছিল। আমরা কি ভেবে দেখেছি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে কতটা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে গেছেন। আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা বলেছিল বাংলাদেশ কখনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্বের সম্মোহনী শক্তি দিয়ে ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন ২৮৮ দিন। দেশে ফিরে এসে মাত্র ৩২৫ দিনের মধ্যে সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই সরকারের মূল ভিত্তি ছিল চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ। একদিক দিয়ে বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে এগিয়ে ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা হলেও সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সংযোজন করেছিল ১৯৭৭ সালে। এ বিষয়ে ভারতের সাবেক কূটনীতিক শঙ্কর এস ব্যানার্জি তার এক বইয়ে চমৎকারভাবে উল্লেখ করেছেন:  “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মিটিংয়ের শেষ প্রান্তে এসে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মিসেস গান্ধীর সামনে বিনয়ের সাথে একটি প্রশ্ন তুললেন যে তিনি কি অবগত আছেন যে, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দ দুটি প্রকৃতপক্ষে ভারতের সংবিধানে নেই! বুদ্ধিতে হার মানতে নারাজ মিসেস গান্ধী উত্তর দিলেন যে তিনি বিষয়টি জানেন এবং পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই তিনি ভারতীয় পার্লামেন্টিয়ারি সিস্টেমের মধ্যে থেকেই এটি সংশোধনের চেষ্টা করবেন। মিসেস গান্ধীর প্রায় পাঁচ বছর লেগেছিল ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ, লোকসভায় ভারতীয় সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দ দুটি উপস্থাপন করতে। এ দুটি জটিল শব্দ কার্যকরী হয় ১৯৭৭ সাল থেকে। বিচারপতি চৌধুরীর সেই কথাটি হয়তো ভারতীয় সংবিধানে ব্যক্তিগত সহায়তার মতোই বিবেচিত হবে। আমাকে যখন ইন্দিরা গান্ধী এবং আবু সাঈদ চৌধুরীর মিটিংয়ের রেকর্ডস রাখার জন্য উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তখন আমি অতটা আঁচ করতে পারিনি যে এটি এমন একটি ঐতিহাসিক মিটিং হবে।”


১৩৬তম দেশ হিসেবে জাতিসংঘের সদস্যপদ পাই আমরা। যদিও এই প্রাপ্তির পথটা মসৃণ ছিল না। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রধানত চ্যালেঞ্জ ছিল এটি। জুলফিকার আলী ভুট্টোর সময়ে পাকিস্তান সরকারের প্ররোচনায় নিরাপত্তা পরিষদে চীনের ভেটো প্রয়োগের কারণে পরপর দুবার জাতিসংঘের সদস্য হতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে  বঙ্গবন্ধু অসাধারণ দক্ষতায় এ সমস্যা মোকাবিলা করেন। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য চীন বাংলাদেশকে প্রথমত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনানুষ্ঠানিকভাবে সেদেশের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সরকার সম্প্রীতিমূলক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিলেন, যার জন্য চীনের ‘ভেটো’ প্রত্যাহার করিয়ে বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে যোগদান করে।


বঙ্গবন্ধু আজীবন কল্যাণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন। বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে কাজ করেছেন। একটি গণমুখী শিক্ষানীতির জন্য তার লড়াই ছিল সারাজীবনের। তিনি যখন শিক্ষানীতি করলেন তখন একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানীকে তার প্রধান করেছিলেন। খ্যাতনামা শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ও অধ্যাপক এআর মল্লিককে মন্ত্রণালয়ের সচিব নিযুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে সমুদ্র আইন করেছিলেন আর জাতিসংঘ সেই আইন করেছে ১৯৮২ সালে। তাহলে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু সময়ের চেয়ে কতটা অগ্রসরমান ছিলেন। তার কৃষি-ভাবনা ছিল একবারেই কল্যাণমুখী এবং তার সমবায় ভাবনাও ছিল আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনের জন্য সময়োচিত পদক্ষেপ। কৃষি ধ্বংস হওয়ায় ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ৪০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি হয়। এমনই সংকটময় পরিস্থিতিতে সরকারকে ৯০ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি, আটককৃত ৩৭ হাজার রাজাকার ও দালাল এবং সোয়া লাখ ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর খাদ্য সরবরাহের এক কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয়। পাকিস্তানি বাহিনী সারা বাংলাদেশে প্রায় ৪৩ লাখ বসতবাড়ি, ১৯ হাজার গ্রাম্য হাটবাজার, ৩ হাজার অফিস ভবন, ৬ হাজার প্রাইমারি স্কুল ও মাদ্রাসা এবং ৯০০ কলেজ পুড়িয়ে দেয়।

সে-সময় এসবের আসবাবপত্র, বেঞ্চ, টেবিল, চেয়ার সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকারকে তাৎক্ষণিক কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। যেমন : দেশের জনগণের আকাশচুম্বী আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করা, ১১-দফায় উল্লিখিত দাবিগুলো যেমন- অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ, ব্যাংক-বীমা, পাট ব্যবসা ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ করা, কৃষকদের খাজনা কমানো, বকেয়া খাজনা মওকুফ ইত্যাদি বাস্তবায়ন করা। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার ও মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন করা। শহিদ ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন করা। শহিদ ও আহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা। দালালদের আটক করে বিচারের সম্মুখীন করা। পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের ফিরিয়ে আনা। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ভারতে ফেরত পাঠানো। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করা। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধিজনিত প্রভাব, বাংলাদেশকে ঘিরে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনাশের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি মোকাবিলা করা বঙ্গবন্ধু সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।

কৃষকদের কল্যাণ সাধনে কৃষকের কল্যাণার্থে বঙ্গবন্ধু কতকগুলো সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন- ১. সকল বকেয়া খাজনা মওকুফসহ ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন (২৬.০৩.১৯৭২)। ২. পরিবার পিছু সর্বাধিক ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকানা সিলিং নির্ধারণ করেন। ৩. প্রায় ৩০ কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ করেন। ৪. কৃষকদের মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার গাভী বিতরণ করেন। ৫. ১৯৭৩-৭৪ সেশনে কৃষকদের জন্য ৪০ হাজার পাম্পের ব্যবস্থা করেন। ৬. সফল, নিষ্ঠাবান ও উৎসাহী কৃষকদের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু পুরস্কার’ নামে জাতীয় পুরস্কার প্রবর্তন করেন। ৭. ফারাক্কা বিষয়ে আলোচনার জন্য বিশিষ্ট পানিবিজ্ঞানী বিএম. আব্বাসকে দিল্লি পাঠান এবং শুকনো মৌসুমে পদ্মা নদীতে ৫৪ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তা লাভ করেন। ৮. বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প পুনোর্দ্যমে চালুর ব্যবস্থা করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বছরে ৭ শতাংশের বেশি অর্জিত হয়েছিল। তিনি ১১ হাজার কোটি টাকার ধ্বংস্তূপের ওপর আরও ১৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন স্তম্ভ দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিল। বেসরকারি হিসাবমতে তা ৩ গুণেরও বেশি ছিল। ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসেই পরিস্থিতি অনুকূলে চলে আসে। বঙ্গবন্ধুর সরকারের বিরুদ্ধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ক্রমাগতভাবে চলমান ছিল।


সর্বোপরি পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা অনেক। যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তান বাংলাদেশের আর্থিক কার্যক্রম ও সম্পদ বিনষ্টের উদ্দেশ্যে নানা পদক্ষেপ নেয়। এসবের ফলে বাংলাদেশের ঋণ শোধের ক্ষমতা নষ্ট হয়। বাংলাদেশের যে পরিমাণ ক্ষতিসাধন করা হয়, সেটি হিসাব করলে পাকিস্তানের ঋণের যে অংশ পরিশোধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর বর্তায়, তার পরিমাণ হতো খুবই সামান্য। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে দাতারা অবগত ছিলেন। বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের কাজে তারাই সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তৈরি একটি মোটামুটি হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামগ্রিক সম্পদে বাংলাদেশের অংশের পরিমাণ ৪ হাজার মিলিয়ন ডলার এবং এর সঙ্গে যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ১ হাজার থেকে দেড় হাজার মিলিয়ন ডলারের মতো যুক্ত করা হলে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের পাওনা ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ডলারে (১৯৭১-৭২-এর মূল্য অনুসারে)। অতএব, পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে পাওনাদার ছিল। পরবর্তীকালে এক হিসাব অনুসারে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ২১-২৩ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে অবকাঠামোগত পুঁজি দাঁড়ায় ২০ বিলিয়ন ডলার এবং মানব পুঁজি ৩ বিলিয়ন ডলার। [তথ্যসূত্র : এসএ চৌধুরী ও এসএ বাশার, দি এনডিওরিং সিগনিফিক্যান্স অব বাংলাদেশ’স ওয়াল অব ইনডিপেনডেন্টস : অ্যান অ্যানালাইসিস অব ইকনমিক কস্টস অ্যান্ড কন্সিকোয়েন্সস, ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি, কানাডা (অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি), ২০০১]


১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে এক অসাধারণ ভাষণ দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে ওটাই তার সর্বশেষ ভাষণ। সেদিন তিনি আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের উদ্দেশ্যে এক দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য রেখেছিলেন : “সেদিন ছাত্ররা আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। তাদের বলেছিলাম, আত্মসমালোচনা কর। মনে রেখো, আত্মসমালোচনা করতে না পারলে নিজকে চিনতে পারবা না। তারপর আত্মসংযম কর, আর আত্মশুদ্ধি কর। তাহলেই দেশের জন্য মঙ্গল করতে পারব। আওয়ামী লীগ কর্মী ভাইয়েরা, কোনদিন তোমরা আমার কথা ফেলো নাই। জীবনে আমি কোনদিন কন্টেস্ট করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বা প্রেসিডেন্ট হই নাই। জীবনভর তোমরা আমাকে সর্বসম্মতিক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছো। তোমরা আমার কথায় রক্ত দিয়েছো, আজ শেষ দিনে- কেননা আমি সভাপতি পদ ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছি-  তোমরা আমার কথা মনে রেখ। আমার কথা ভুলো না। কোনদিন স্বার্থে অন্ধ হয়ে তোমাদের ডাক দেই নাই। কোনদিন কোন লোভের বশবর্তী হয়ে কোন শয়তানের কাছে মাথা নত করি নাই। কোনদিন ফাঁসির কাষ্ঠে বসেও বাংলার মানুষের সাথে বেঈমানি করি নাই। আমি বিশ্বাস করি তোমরা আমার কথা শুনবা, তোমরা আত্মসমালোচনা কর, আত্মসংযম কর। তোমরা আত্মশুদ্ধি কর। দুই চারটা পাঁচটা লোক অন্যায় করে, যার জন্য এতো বড় প্রতিষ্ঠান- যে প্রতিষ্ঠান ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, যে প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা এনেছে, যে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ কর্মী জীবন দিয়েছেন, যে প্রতিষ্ঠান ২৫ বছর পর্যন্ত ঐতিহাসিক সংগ্রাম করেছে তার বদনাম হতে দেয়া চলে না। আজ বাংলার নিভৃত কোণে আমার এক কর্মী পড়ে আছে, যার জামা নাই, কাপড় নাই। তারা আমার কাছে আসে না। আপনাদের অনেকেই এখানে। কিন্তু আমি যদি চর কুকরীমুকরী যাই, আমার ঐ ধরনের কর্মীকে আসে দেখি। এদের সাথে আমার রক্তের সম্বন্ধ। আজো আমি দেখি তার পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি। আজো দেখি, সেই ছেঁড়া পায়জামা, ছেঁড়া শার্ট, পায়ে জুতা নাই। বাংলাদেশে আমার এ ধরনের লক্ষ লক্ষ কর্মী পড়ে আছে। কিন্তু কিছু কিছু লোক যখন মধু-মক্ষিকার গন্ধ পায় তখন তারা এসে আওয়ামী লীগে ভিড় জমায়। আওয়ামী লীগের নামে লুটতরাজ করে। পারমিট নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা, আওয়ামী লীগ থেকে তাদের উৎখাত করে দিতে হবে- আওয়ামী লীগে থাকার তাদের অধিকার নাই।”

২০২১ সালের বঙ্গবন্ধুর মহাপ্রয়াণের ৪৬তম বার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুর সেই নির্দেশনামা কতটা প্রাসঙ্গিক তা স্পষ্ট করেই বোঝা যায়।
বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই জরুরি। তিনি জরুরি ছিলেন, জরুরি থাকবেন। তিনি অমর অব্যয় ও অক্ষয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সূএঃ রাইজিংবিডি.কম

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর