ঢাকা ১২:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

উত্তরের মিষ্টি আলুচাষিদের ‘নীরব কান্না’

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৩২:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার

উত্তরের আলুচাষীদের কান্না, দুঃখ, বেদনা আজ উপেক্ষিত রাজনীতিতে। আলু চাষ করে কৃষকদের পথে বসার উপক্রম। আলু চাষ করে খরচ উঠছে না। ঋণ করে যারা আলু চাষ করেছেন তারা পড়েছেন বিপাকে। এমনিতে আলুর দাম নেই; অন্যদিকে সংরক্ষণের নেই পর্যাপ্ত হিমাগার। নির্বাচনের আগে তারেক রহমান আলু চাষিদের স্বার্ত দেখার প্রতিশ্রুতি দিলেও কেউ আলু চাষীদের দিকে তাকাচ্ছেন না। এমনকি উত্তরাঞ্চলে যারা মন্ত্রী এমপি হয়েছেন তারাও যেন জেগে জেগে ঘুমাচ্ছেন। ভুক্তোভোগীদের দাবি আলু চাষ করে বিপন্ন কৃষকদের দিকে দ্রুত নজর দেয়া হোক। না হলে আগামীতে কৃষকরা আলুচাষে নিরুস্বাহিত হবেন।

২০২৬ এর এই বদলে যাওয়া পৃথিবীতে দেশেদেশে ক্ষমতায়, রাজনীতিতে মুখ্য বিষয় এখন অর্থনীতি। ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েলের ট্রায়াঙ্গুল ওয়ার বা ত্রিমুখি যুদ্ধ আবার ইসলামাবাদ কেন্দ্রিক সন্ধি সবকিছুর মুলে পেট্রোডলার পলিটিক্স। সোজাসাপ্টায় অর্থনৈতিক আধিপত্যের যুদ্ধ। কিন্তু হায় আমাদের দেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক কালচারে উপেক্ষিত কৃষি/কৃষি অর্থনীতি। এটা প্রমান আমাদের কৃষি অর্থনীতি যতটা এগিয়েছে। রাজনীতি সেই অর্থে অনগ্রসর।

নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেছিলেন ‘আলুচাষীদের স্বার্থ দেখাটা জরুরি। তাঁর ওই বক্তব্যে অনেকে খুশি হয়েছিলেন এই ভেবে যে, এবার হয়তো দেশের ৭০/৮০ শতাংশ মানুষ যারা কৃষির সাথে জড়িত। তারা হয়তো উপকৃত হবে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে উন্নতি হবে কৃষি অর্থনীতির। বাংলাদেশ হবে স্বনির্ভর।
আলু নিয়ে তারেক রহমানের এ বক্তব্যের জন্য তিনি ট্রলেরও শিকার হন। যারা ট্রল করেন তাদের রাজনৈতিক বোধের গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে ওই সময়। সময়ের প্ররিক্রমায় দেশে নির্বাচন হল। ক্ষমতায় আসিন হল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হলেন তারেক রহমান। ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হল মওশুমি ফসল আলু উত্তোলনের কাজ। চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ বেশি হওয়ায় পড়ে গেল আলুর বাজার।

আলুচাষীদের মাথায় হাত। চোখে অশ্রু। বোবা কান্নায় অস্থির কৃষক। মনে প্রশ্ন- কে তাদের আশা ও ভরসা দেবে?
সামনে নির্বাচন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন। হয়তো প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ, পরে উপজেলা বা পৌরসভা নির্বাচন। ইউনিয়ন ও উপজেলা নির্বাচনের ভোটার কিন্তু কৃষক। সরকার যদি কৃষকের পক্ষে না দাঁড়ায় তাহলে উপজেলা ও
গ্রাম পর্যায়ের ভোটার কী করবে।

স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম একাধিকবার বলেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে হয়তো দলীয় প্রতীক থাকবেনা। ফলে ধানের শীষ প্রতীক ছাড়া ইউনিয়ন ও উপজেলা নির্বাচন করতে গেলে বিএনপির প্রার্থীরা কিছুটা হলেও অসুবিধায় পড়বে বৈকি!

এমন মন্তব্য আলোচনা কিন্তু শুরু হয়েছে রাজনীতির গ্রামীন আড্ডায়। সেখানে আলোচিত হচ্ছে উত্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, নীলফামারি, গাইবান্ধা অঞ্চলে গত সংসদ নির্বাচনে একচেটিয়া ভালো ফলাফল পেয়েছে। যেখানে জেতেনি সেখানেও তারা বিপুল সংখ্যায় ভোট পেয়েছে। যেমন বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৯ টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৮ টিতেই হেরেছে জামাত। তবে প্রত্যেকটি আসনেই তাদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীদের কাছাকাছি। একই চিত্র রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, পঞ্চগড়, ঠাকুর গাঁও, দিনাজপুর অঞ্চলের।

শনিবার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায়। উত্তরের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের মানুষ এখনো অনেক সরল। রাজনীতির ঘোর প্যাঁচে অভ্যস্ত না। ফলে এখানে ধর্ম কার্ড প্লে করে ভোটের চিত্র বদলে দেওয়া খুব একটা কঠিন কিছু। গত সংসদ নির্বাচনে উত্তরাঞ্চল জামায়াতের বহু সংখক আসন লাভ নিশ্চয়ই এলার্মিং বলে মনে করেন তারা।

তারা মনে করেন উত্তরাঞ্চলের রুট লেভেলে ক্ষমতাসীন দলের ভাবমুর্তি নষ্টের জন্য বিএনপি বিরোধীদের প্রপাগান্ডা মেশিন অনেক শক্তিশালী। তাই এই অঞ্চলের কৃষি, কৃষি অর্থনীতি এবং কৃষকের পক্ষে দৃষ্টি গ্রাহ্য কাজ করতে হবে। শুধু ফ্যামিলী ও কৃষি কার্ড রাজনৈতিক সাফল্যের জন্য যথেষ্ট নয়।

উত্তরের বহু প্রবীন কৃষিজীবীর মনে সফল শাসক হিসেবে জিয়াউর রহমান ও এরশাদের একটি বিশেষ ও জ্বলজ্বলে ভাবমূর্তি আছে।
তবে এই জেনারেশন চলে গেলে নতুনরা শহীদ জিয়া বা মরহুম এরশাদের স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকবে না। এক্ষেত্রে তারেক রহমান যদি উত্তরের জনমানসে কৃষি ও কৃষক বান্ধব রুপে একটা ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারেন সেটা হবে দেশের জন্য মঙ্গলজনক। শাসকদল বিএনপির জন্য এটা ভালো হবে। উত্তরের বিশিষ্ট বাম ফ্রন্ট নেত্রী অ্যাডভোকেট দিলরুবা নুরি এ প্রসঙ্গে বলেন, কৃষি নির্ভর উত্তরাঞ্চলে সেচ, ডিজেল ও সার নিয়ে কেবল বামেরাই কথা বলে। ফারাক্কা ভারতের পানি আগ্রাসন সম্পর্কে বামেরা যত সোচ্চার। বড়ো দলগুলো যদি সোচ্চার বা আগ্রহী হত তাহলে
উত্তরের কৃষি অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী হতো বলে মনে করেন তিনি। তার মতে স্টেপল ফুড বা প্রধানতম খাদ্যপণ্য হিসেবে আলুর স্থান ধান, গমের সম পর্যায়ভুক্ত। দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণে আলু উৎপাদন হয় তা চাহিদার তুলনায় গড়ে ২০/২৫ লাখ টন বেশি। এ পরিমাণে আলুকে সংরক্ষণ বা রুপান্তরের আওতায় আনতে পারলেই আলুচাষীদের ভাগ্যের আক্ষরিক অর্থেই উন্নতি হবে বলে মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে কাতার ও আরব আমিরাতের খেজুর চাষের উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রবাসীদের কাছে শুনেছি, সরকার সব সময় খেজুর চাষীদের উৎপাদন খরচ জেনে নিয়ে লাভ সহ তাদের কাছ থেকে খেজুর কিনে নেয়। এরপর ওই খেজুর গরিব দেশগুলোতে দান সদকা হিসেবে বিলিলিয়ে দেয়। এখানেও সরকার চাইলে উৎপাদিত অতিরিক্ত আলু সরকার ধান চাল গমের মত ন্যায্য মুলে কিনে নিয়ে ভিজিএফ কার্যক্রম চালাতে পারে। সরকার দুর্গত ফিলিস্তিনে বা রোহিঙ্গা শিবিরে আলু সরবরাহ বা বিতরণ করে আলুচাষীদের রক্ষা করতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অর্থনীবিদ আফগানিস্তানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, নতুন তালেবান আফগানিস্তানে বিশালাকারে সেচ্ছাশ্রমে খাল কেটে সেচের ব্যবস্থা করে ডালিম ও আংগুর চাষের সুবিধা করে দিয়েছে।

সেখানে উৎপাদিত ডালিমের রস দিয়ে কেমিক্যাল মুক্ত হালাল পানীয় তৈরি করে বাজিমাত করে দিয়েছে। এ কৌশল বাংলাদেশেও এপ্লাই করা যেতে পারে বাংলাদেশী আম, লিচু বা আলুকে নিয়ে।

এদিকে কৃষি তথ্য সার্ভিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে গত ৩ বছর ধরে দেশে বার্ষিক ৯০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে প্রতিবছর ২০/৩০ লাখ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। বর্ধিত এই উৎপাদনই এখন কৃষক ও হিমাগার মালিকদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেটা কেবল রাজনৈতিক সরকারের আগ্রহ বা সদিচ্ছা থাকলে সমস্যাটির সহজ সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। উত্তরবঙ্গের একজন আলু রফতানিকারক ও হিমাগার মালিক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, সরকারকে আলু রফতানিকারকদের সাথে বসে রফতানি সমস্যার কারনগুলো শুনতে হবে। সেগুলো শুনলেই হবে না শুনে প্রতিকারও করতে হবে। হিমাগারগুলো যাতে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করে র‍্যানডম বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বিদ্যুৎ বিলে কিছু রেয়াতের ব্যবস্থা করতে হবে।

এছাড়াও আলু প্রসেস শিল্পের বিকাশের জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। তিনি আরো বলেন, রাজনীতি মঞ্চে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের চর্চায় এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব দিতে হবে অর্থনীতিকে। তানাহলে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে রাশিয়া যা করেছে। ইরাক, আফগানিস্তান, ভেনিজুয়েলা ও
ইরানের ক্ষেত্রে আমেরিকা যেটা করেছে বাংলাদেশকে টার্গেট করে ভারত এই কাজটাই করতে পারে। আবার ইরান যেভাবে আমেরিকাকে রুখে দিয়েছে সেটা থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। মানে রাজনীতিতে এখন অর্থনৈতিকবিষয়কে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেয়ার সময় এসেছে।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জনগণের অধিকার আদায়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না: জামায়াত আমির

উত্তরের মিষ্টি আলুচাষিদের ‘নীরব কান্না’

আপডেট টাইম : ১১:৩২:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

উত্তরের আলুচাষীদের কান্না, দুঃখ, বেদনা আজ উপেক্ষিত রাজনীতিতে। আলু চাষ করে কৃষকদের পথে বসার উপক্রম। আলু চাষ করে খরচ উঠছে না। ঋণ করে যারা আলু চাষ করেছেন তারা পড়েছেন বিপাকে। এমনিতে আলুর দাম নেই; অন্যদিকে সংরক্ষণের নেই পর্যাপ্ত হিমাগার। নির্বাচনের আগে তারেক রহমান আলু চাষিদের স্বার্ত দেখার প্রতিশ্রুতি দিলেও কেউ আলু চাষীদের দিকে তাকাচ্ছেন না। এমনকি উত্তরাঞ্চলে যারা মন্ত্রী এমপি হয়েছেন তারাও যেন জেগে জেগে ঘুমাচ্ছেন। ভুক্তোভোগীদের দাবি আলু চাষ করে বিপন্ন কৃষকদের দিকে দ্রুত নজর দেয়া হোক। না হলে আগামীতে কৃষকরা আলুচাষে নিরুস্বাহিত হবেন।

২০২৬ এর এই বদলে যাওয়া পৃথিবীতে দেশেদেশে ক্ষমতায়, রাজনীতিতে মুখ্য বিষয় এখন অর্থনীতি। ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েলের ট্রায়াঙ্গুল ওয়ার বা ত্রিমুখি যুদ্ধ আবার ইসলামাবাদ কেন্দ্রিক সন্ধি সবকিছুর মুলে পেট্রোডলার পলিটিক্স। সোজাসাপ্টায় অর্থনৈতিক আধিপত্যের যুদ্ধ। কিন্তু হায় আমাদের দেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক কালচারে উপেক্ষিত কৃষি/কৃষি অর্থনীতি। এটা প্রমান আমাদের কৃষি অর্থনীতি যতটা এগিয়েছে। রাজনীতি সেই অর্থে অনগ্রসর।

নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেছিলেন ‘আলুচাষীদের স্বার্থ দেখাটা জরুরি। তাঁর ওই বক্তব্যে অনেকে খুশি হয়েছিলেন এই ভেবে যে, এবার হয়তো দেশের ৭০/৮০ শতাংশ মানুষ যারা কৃষির সাথে জড়িত। তারা হয়তো উপকৃত হবে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে উন্নতি হবে কৃষি অর্থনীতির। বাংলাদেশ হবে স্বনির্ভর।
আলু নিয়ে তারেক রহমানের এ বক্তব্যের জন্য তিনি ট্রলেরও শিকার হন। যারা ট্রল করেন তাদের রাজনৈতিক বোধের গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে ওই সময়। সময়ের প্ররিক্রমায় দেশে নির্বাচন হল। ক্ষমতায় আসিন হল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হলেন তারেক রহমান। ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হল মওশুমি ফসল আলু উত্তোলনের কাজ। চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ বেশি হওয়ায় পড়ে গেল আলুর বাজার।

আলুচাষীদের মাথায় হাত। চোখে অশ্রু। বোবা কান্নায় অস্থির কৃষক। মনে প্রশ্ন- কে তাদের আশা ও ভরসা দেবে?
সামনে নির্বাচন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন। হয়তো প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ, পরে উপজেলা বা পৌরসভা নির্বাচন। ইউনিয়ন ও উপজেলা নির্বাচনের ভোটার কিন্তু কৃষক। সরকার যদি কৃষকের পক্ষে না দাঁড়ায় তাহলে উপজেলা ও
গ্রাম পর্যায়ের ভোটার কী করবে।

স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম একাধিকবার বলেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে হয়তো দলীয় প্রতীক থাকবেনা। ফলে ধানের শীষ প্রতীক ছাড়া ইউনিয়ন ও উপজেলা নির্বাচন করতে গেলে বিএনপির প্রার্থীরা কিছুটা হলেও অসুবিধায় পড়বে বৈকি!

এমন মন্তব্য আলোচনা কিন্তু শুরু হয়েছে রাজনীতির গ্রামীন আড্ডায়। সেখানে আলোচিত হচ্ছে উত্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, নীলফামারি, গাইবান্ধা অঞ্চলে গত সংসদ নির্বাচনে একচেটিয়া ভালো ফলাফল পেয়েছে। যেখানে জেতেনি সেখানেও তারা বিপুল সংখ্যায় ভোট পেয়েছে। যেমন বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ৯ টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৮ টিতেই হেরেছে জামাত। তবে প্রত্যেকটি আসনেই তাদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীদের কাছাকাছি। একই চিত্র রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, পঞ্চগড়, ঠাকুর গাঁও, দিনাজপুর অঞ্চলের।

শনিবার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায়। উত্তরের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের মানুষ এখনো অনেক সরল। রাজনীতির ঘোর প্যাঁচে অভ্যস্ত না। ফলে এখানে ধর্ম কার্ড প্লে করে ভোটের চিত্র বদলে দেওয়া খুব একটা কঠিন কিছু। গত সংসদ নির্বাচনে উত্তরাঞ্চল জামায়াতের বহু সংখক আসন লাভ নিশ্চয়ই এলার্মিং বলে মনে করেন তারা।

তারা মনে করেন উত্তরাঞ্চলের রুট লেভেলে ক্ষমতাসীন দলের ভাবমুর্তি নষ্টের জন্য বিএনপি বিরোধীদের প্রপাগান্ডা মেশিন অনেক শক্তিশালী। তাই এই অঞ্চলের কৃষি, কৃষি অর্থনীতি এবং কৃষকের পক্ষে দৃষ্টি গ্রাহ্য কাজ করতে হবে। শুধু ফ্যামিলী ও কৃষি কার্ড রাজনৈতিক সাফল্যের জন্য যথেষ্ট নয়।

উত্তরের বহু প্রবীন কৃষিজীবীর মনে সফল শাসক হিসেবে জিয়াউর রহমান ও এরশাদের একটি বিশেষ ও জ্বলজ্বলে ভাবমূর্তি আছে।
তবে এই জেনারেশন চলে গেলে নতুনরা শহীদ জিয়া বা মরহুম এরশাদের স্মৃতি নিয়ে পড়ে থাকবে না। এক্ষেত্রে তারেক রহমান যদি উত্তরের জনমানসে কৃষি ও কৃষক বান্ধব রুপে একটা ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারেন সেটা হবে দেশের জন্য মঙ্গলজনক। শাসকদল বিএনপির জন্য এটা ভালো হবে। উত্তরের বিশিষ্ট বাম ফ্রন্ট নেত্রী অ্যাডভোকেট দিলরুবা নুরি এ প্রসঙ্গে বলেন, কৃষি নির্ভর উত্তরাঞ্চলে সেচ, ডিজেল ও সার নিয়ে কেবল বামেরাই কথা বলে। ফারাক্কা ভারতের পানি আগ্রাসন সম্পর্কে বামেরা যত সোচ্চার। বড়ো দলগুলো যদি সোচ্চার বা আগ্রহী হত তাহলে
উত্তরের কৃষি অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী হতো বলে মনে করেন তিনি। তার মতে স্টেপল ফুড বা প্রধানতম খাদ্যপণ্য হিসেবে আলুর স্থান ধান, গমের সম পর্যায়ভুক্ত। দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণে আলু উৎপাদন হয় তা চাহিদার তুলনায় গড়ে ২০/২৫ লাখ টন বেশি। এ পরিমাণে আলুকে সংরক্ষণ বা রুপান্তরের আওতায় আনতে পারলেই আলুচাষীদের ভাগ্যের আক্ষরিক অর্থেই উন্নতি হবে বলে মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে কাতার ও আরব আমিরাতের খেজুর চাষের উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রবাসীদের কাছে শুনেছি, সরকার সব সময় খেজুর চাষীদের উৎপাদন খরচ জেনে নিয়ে লাভ সহ তাদের কাছ থেকে খেজুর কিনে নেয়। এরপর ওই খেজুর গরিব দেশগুলোতে দান সদকা হিসেবে বিলিলিয়ে দেয়। এখানেও সরকার চাইলে উৎপাদিত অতিরিক্ত আলু সরকার ধান চাল গমের মত ন্যায্য মুলে কিনে নিয়ে ভিজিএফ কার্যক্রম চালাতে পারে। সরকার দুর্গত ফিলিস্তিনে বা রোহিঙ্গা শিবিরে আলু সরবরাহ বা বিতরণ করে আলুচাষীদের রক্ষা করতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অর্থনীবিদ আফগানিস্তানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, নতুন তালেবান আফগানিস্তানে বিশালাকারে সেচ্ছাশ্রমে খাল কেটে সেচের ব্যবস্থা করে ডালিম ও আংগুর চাষের সুবিধা করে দিয়েছে।

সেখানে উৎপাদিত ডালিমের রস দিয়ে কেমিক্যাল মুক্ত হালাল পানীয় তৈরি করে বাজিমাত করে দিয়েছে। এ কৌশল বাংলাদেশেও এপ্লাই করা যেতে পারে বাংলাদেশী আম, লিচু বা আলুকে নিয়ে।

এদিকে কৃষি তথ্য সার্ভিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে গত ৩ বছর ধরে দেশে বার্ষিক ৯০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে প্রতিবছর ২০/৩০ লাখ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। বর্ধিত এই উৎপাদনই এখন কৃষক ও হিমাগার মালিকদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেটা কেবল রাজনৈতিক সরকারের আগ্রহ বা সদিচ্ছা থাকলে সমস্যাটির সহজ সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। উত্তরবঙ্গের একজন আলু রফতানিকারক ও হিমাগার মালিক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, সরকারকে আলু রফতানিকারকদের সাথে বসে রফতানি সমস্যার কারনগুলো শুনতে হবে। সেগুলো শুনলেই হবে না শুনে প্রতিকারও করতে হবে। হিমাগারগুলো যাতে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করে র‍্যানডম বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বিদ্যুৎ বিলে কিছু রেয়াতের ব্যবস্থা করতে হবে।

এছাড়াও আলু প্রসেস শিল্পের বিকাশের জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। তিনি আরো বলেন, রাজনীতি মঞ্চে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের চর্চায় এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব দিতে হবে অর্থনীতিকে। তানাহলে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে রাশিয়া যা করেছে। ইরাক, আফগানিস্তান, ভেনিজুয়েলা ও
ইরানের ক্ষেত্রে আমেরিকা যেটা করেছে বাংলাদেশকে টার্গেট করে ভারত এই কাজটাই করতে পারে। আবার ইরান যেভাবে আমেরিকাকে রুখে দিয়েছে সেটা থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। মানে রাজনীতিতে এখন অর্থনৈতিকবিষয়কে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেয়ার সময় এসেছে।