ঢাকা ০২:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তরাঞ্চল হতে যাচ্ছে তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
  • ২৬ বার

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি বিকল্প নেই। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রচলিত প্রবাদটি যথার্থই। কৃষিই পারে দেশের অর্থনৈতিক চাকা ঘুড়িয়ে দিতে। এ জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকি। দেশের অর্থনৈতিক খাতের অন্যতম অংশীদার শিল্প ও সেবা খাত বাদে একমাত্র কৃষিখাতই নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদনমুখী খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে এবং থাকবে।

২০২৪-২৫ সালে জিডিপিতে পৌনে ১৩ শতাংশ অবদান রেখেছে কৃষি খাত। চলতি শুষ্ক মৌসুমে দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চল থেকে ন্যূনতম দশ হাজার কোটি টাকার বেশি ফসল উৎপাদিত হবে। যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দিনাজপুরের প্রসিদ্ধ লিচু ও গোপালভোগ, মিশ্রিভোগ আম, জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম, পঞ্চগড়ের তরমুজ, লাল শুকনো মরিচ, ঠাকুরগাঁওয়ের বৃন্দা বনি আম বাজার রাঙ্গাতে শুরু করবে। ইতোমধ্যেই আম-লিচু আর মৌসুমী ফল ব্যবসাকে ঘিরে কুরিয়ার, কোচসহ পরিবহন খাত ও খাচা বানানোর কাজে নিয়োজিত নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের নারী-পুরুষরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে একরের পর একর জুড়ে দোল খাচ্ছে ইরি-বোরো ধান, গম ও ভুট্টার শীষ ও দানাযুক্ত গাছ দেখে কৃষকের বছরের অর্থনৈতিক চাহিদাপত্রের খাতা সাজাতে শুরু করেছে। এর বাহিরেও দিনাজপুরের সাদা সোনা খ্যাত রসুনসহ শত শত ট্রাক বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। ক্রমাগতভাবে আলোকিত হচ্ছে বিভাগের পড়ে থাকা চরাঞ্চলের জমিসহ পতিত জমিসমূহ। যা আগামীতে কৃষিখাতের ভূমিকাকে আরো শক্তিশালী করে তুলবে। অপর একটি সূত্র মতে, উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

কৃষির পাশাপাশি শিল্পেও এগিয়ে যেতে শুরু করেছে উত্তরাঞ্চলের জেলাসমূহ নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে একাধিক ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি ইপিজেডের বাহিরে একাধিক পড়চুলা কারখানা, মিনি গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যার ৮০ শতাংশই চায়না অংশীদারিত্ব ও সরাসরি অংশগ্রহণে কৃষির পাশাপাশি এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের কারণে উন্নত ঢাকা চট্টগ্রামের পর তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে আবির্ভূত হবে। যা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার দিনাজপুর অঞ্চলে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেদেনাসহ দিনাজপুরে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের লিচু থেকেই আয় হবে এক হাজার কোটি টাকা। জেলায় ৫ হাজার ৪৮৪ হেক্টর জমি থেকে লিচু উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৩৬ হাজার মেট্রিক টন লিচু। যদিও বেসরকারি হিসাবে আবাদ, উৎপাদন এবং বিক্রির পরিমাণ আরো অনেক বেশি হবে। ১৫ মে থেকে দিনাজপুর অঞ্চলে মাদ্রাজী জাতের লিচু বাজারে উঠতে শুরু করেছে। এরপরই ক্রমান্বয়ে আসবে বেদানা, বোম্বাই, চায়না-থ্রি কাঁঠালি জাতের লিচু। এদিকে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও রফতানির পথ সুগম হয়েছে। লিচু মৌসুমে কেবলমাত্র বাগান রক্ষণাবেক্ষণ, ভাঙা, প্যাকেজিং এবং পরিবহনে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে থাকে বলে কৃষি বিভাগের সূত্রে জানা গেছে।

কর্মসংস্থান হয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং পরিবহন খাতের সাথে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক ও পরিবারের। দিনাজপুরে চলতি ২০২৬ মৌসুমে দিনাজপুরে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০ মেট্রিক টন। বেসরকারিভাবে এর পরিমাণ ৮.৫ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের আশা প্রকাশ করা হয়েছে। বছরের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত ইরি-বোরো ধান থেকেই আয় হবে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। ইরি-বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল শত শত অটো রাইস মিল, রাইস মিল এবং এর সাথে জড়িত হাজার হাজার পরিবারের বাৎসরিক খরচ যোগান হয়ে থাকে এই আবাদ থেকেই। হালে কৃষি ক্ষেত্রে যোগ হয়েছে ভুট্টার আবাদ। এই আবাদ শুধু দিনাজপুর নয় রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, গাইবান্ধা লালমনিরহাটসহ উত্তরের প্রতিটি জেলায় এর আবাদ বিস্তার লাভ করেছে। ভুট্টার ব্যাপক আবাদকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বড় বড় ফিড মিল।
একইভাবে হাড়িভাঙা আম পাল্টে দিয়েছে রংপুরের কৃষি অর্থনীতি। গত কয়েকবছর ধরে এই আম রংপুরের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ইতোমধ্যে এই আম জিআই পণ্য (ভৌগোলিক নির্দেশক) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এই আম রংপুরের ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত। চলতি মৌসুমে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করে রংপুর অঞ্চলে ৩শ’ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন আম চাষিরা। এক সময় রংপুর অঞ্চলের মানুষ কাজের অভাবে অলস সময় কাটাতো। কাজ ও খাদ্যাভাবের কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় এখানে মঙ্গা বিরাজ করতো। এখন সেই মঙ্গাকে জয় করেছে এ অঞ্চলের মানুষ ও প্রকৃতি। এক ফসলা জমি এখন তিন অবস্থান ভেদে চার ফসলা জমিতে পরিণত হয়েছে। বাড়ির উঠান কিংবা আশপাশের পরিত্যক্ত জমিগুলো এখন আমের বাগানে ভরে গেছে। এতটুকু জমিও এখন আর পরিত্যক্ত নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বছর ২৫০ কোটিরও বেশি টাকার বাণিজ্য হবে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করে। এবার হাঁড়িভাঙা আমের গাছে প্রচুর আম ধরেছে। গত বছরের চেয়ে বেশি জমিতে হাঁড়িভাঙা ও অন্যান্য আরো বেশ কয়েক জাতের আম চাষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১০-১২ টন হিসাবে মোট বাজারমূল্য ৩শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর হাঁড়িভাঙার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বেড়েছে। দেশের ভেতরে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহ বেড়েছে। বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। তবে হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে চাষিদের কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। হিমাগার থাকলে চাষিরা আম সংরক্ষণ করে তা বিক্রি করতে পারতেন। এতে লাভ বেশি হতো।
এদিকে, আম ছাড়াও ভুট্টার বাম্পার ফলন রংপুর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকার উঁচু জমি ছাড়াও তিস্তা, ধরলা, দুধকুমোর ও যমুনেশ্বরী নদীর রূপালী চরগুলোতে এখন ভুট্টা, কাউন, বাদাম, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়ার ব্যাপক ফলন হচ্ছে। এক সময়কার পরিত্যক্ত রূপালী চর এখন এ অঞ্চলে সোনার খনিতে পরিণত হয়েছে। চরাঞ্চলের মানুষ ছাড়াও নদী তীরবর্তী মানুষ এসব চরে উল্লেখিত ফসলের পাশাপাশি রবিশস্য চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন এবং এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছেন। তাছাড়া গত কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলের সর্বত্রই আলুর বাম্পার ফলন হচ্ছে। রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার বিভিন্ন নদীর চরে বিশেষ করে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছাসহ গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলায় ভুট্টা চাষ হলেও সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলার ১৬৫টি ছোট-বড় চরে সবচেয়ে বেশি ভুট্টা চাষ হচ্ছে। একইভাবে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী জেলার প্রায় আড়াই শতাধিক নদীর চরে ভুট্টা চাষ করছেন কৃষকরা।

কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, এবার ভুট্টা চাষের জন্য রংপুর কৃষি অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমি। সে হিসাব ছাড়িয়ে কৃষকরা অতিরিক্ত ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। ভুট্টা বর্তমানে হাজারো কৃষকের প্রধান জীবিকা হয়ে উঠেছে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত মহানন্দা নদীর ভাটিতে অবস্থিত ভেসে আসা নূড়ী পাথরের কারণে সেরকম কোনো আবাদই হতো না। সেই পঞ্চগড় এখন দেশের দ্বিতীয় চা উৎপাদনকারী জেলায় নাম লিখিয়েছে। হাজার হাজার একর জুড়ে পঞ্চগড়ের চা বাগান এখন ভারতের দার্জিলিং ও শিলিগুড়িতে চোখ রাঙ্গাচ্ছে। আবাদ হচ্ছে ইরি-বোরো ধানের পাশাপাশি মরিচ। মৌসুমের শুরুতে এখন পঞ্চগড়ের যত্র-তত্র শুকোতে দেয়া লাল মরিচের গালিচা শোভা পাচ্ছে। চলতি মৌসুমে বোরো ধান রোপণ হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩২ হেক্টর, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৭৪৩ মেট্রিকটন। এছাড়াও বাদাম, গম, আলু, মরিচসহ বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন হচ্ছে। দুই যুগ আগে ২ হাজার টাকা মূল্যের এক একর জমি এক কোটি টাকাতেও পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চা বাদে কেবলমাত্র মৌসুম ভিত্তিক ফসল শুকনা মরিচ থেকে ৭০০ কোটি, গম থেকে ২০০ কোটি, ভুট্টা থেকে ৭০০ কোটি, আলু থেকে ৩০০ কোটি টাকাসহ অন্যান্য মওসুমি ফসল থেকেই দেড় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।

একইভাবে গমের জন্য বিখ্যাত ঠাকুরগাঁও জেলার বৃন্দাবনি আম ব্যাপক জনপ্রিয়, ঠাকুরগাঁওতে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ কমলা ও মাল্টার বাগান। জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই বাগানের কমলা ও মাল্টা বিদেশি ফলগুলোকেও হার মানিয়েছে। চাহিদাও ব্যাপক। বাগান থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এখানকার মাল্টা ও কমলা। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনা থেকে ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি থেকে এখন বাণিজ্যিক ও শিক্ষা নগরীতে উন্নীত হতে যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের কৃতি সন্তান বিএনপির মহাসচিব এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাত্র আড়াই মাসে ঠাকুরগাঁও জন্য যা এনে দিয়েছেন সম্ভবত অন্য কোনো সরকারের সময় একেবারে অবহেলিত একটি জেলা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আস্থাভাজন মির্জা ফখরুল আজিবন কাজ করেছেন ঠাকুরগাঁওবাসীর জন্য। ইতোমধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিক্যাল কলেজ পেয়েছে ঠাকুরগাঁওবাসী। পেতে যাচ্ছে পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের মর্যাদা, নার্সিং কলেজসহ আরো অনেক কিছু। ফলে ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষার পাশাপাশি কৃষিতেও আরো বেশি ভূমিকা রাখবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

উত্তরাঞ্চল হতে যাচ্ছে তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল

আপডেট টাইম : ১০:৪৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি বিকল্প নেই। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রচলিত প্রবাদটি যথার্থই। কৃষিই পারে দেশের অর্থনৈতিক চাকা ঘুড়িয়ে দিতে। এ জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকি। দেশের অর্থনৈতিক খাতের অন্যতম অংশীদার শিল্প ও সেবা খাত বাদে একমাত্র কৃষিখাতই নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদনমুখী খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে এবং থাকবে।

২০২৪-২৫ সালে জিডিপিতে পৌনে ১৩ শতাংশ অবদান রেখেছে কৃষি খাত। চলতি শুষ্ক মৌসুমে দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চল থেকে ন্যূনতম দশ হাজার কোটি টাকার বেশি ফসল উৎপাদিত হবে। যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দিনাজপুরের প্রসিদ্ধ লিচু ও গোপালভোগ, মিশ্রিভোগ আম, জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম, পঞ্চগড়ের তরমুজ, লাল শুকনো মরিচ, ঠাকুরগাঁওয়ের বৃন্দা বনি আম বাজার রাঙ্গাতে শুরু করবে। ইতোমধ্যেই আম-লিচু আর মৌসুমী ফল ব্যবসাকে ঘিরে কুরিয়ার, কোচসহ পরিবহন খাত ও খাচা বানানোর কাজে নিয়োজিত নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের নারী-পুরুষরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে একরের পর একর জুড়ে দোল খাচ্ছে ইরি-বোরো ধান, গম ও ভুট্টার শীষ ও দানাযুক্ত গাছ দেখে কৃষকের বছরের অর্থনৈতিক চাহিদাপত্রের খাতা সাজাতে শুরু করেছে। এর বাহিরেও দিনাজপুরের সাদা সোনা খ্যাত রসুনসহ শত শত ট্রাক বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। ক্রমাগতভাবে আলোকিত হচ্ছে বিভাগের পড়ে থাকা চরাঞ্চলের জমিসহ পতিত জমিসমূহ। যা আগামীতে কৃষিখাতের ভূমিকাকে আরো শক্তিশালী করে তুলবে। অপর একটি সূত্র মতে, উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

কৃষির পাশাপাশি শিল্পেও এগিয়ে যেতে শুরু করেছে উত্তরাঞ্চলের জেলাসমূহ নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে একাধিক ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি ইপিজেডের বাহিরে একাধিক পড়চুলা কারখানা, মিনি গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যার ৮০ শতাংশই চায়না অংশীদারিত্ব ও সরাসরি অংশগ্রহণে কৃষির পাশাপাশি এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের কারণে উন্নত ঢাকা চট্টগ্রামের পর তৃতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে আবির্ভূত হবে। যা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার দিনাজপুর অঞ্চলে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেদেনাসহ দিনাজপুরে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের লিচু থেকেই আয় হবে এক হাজার কোটি টাকা। জেলায় ৫ হাজার ৪৮৪ হেক্টর জমি থেকে লিচু উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৩৬ হাজার মেট্রিক টন লিচু। যদিও বেসরকারি হিসাবে আবাদ, উৎপাদন এবং বিক্রির পরিমাণ আরো অনেক বেশি হবে। ১৫ মে থেকে দিনাজপুর অঞ্চলে মাদ্রাজী জাতের লিচু বাজারে উঠতে শুরু করেছে। এরপরই ক্রমান্বয়ে আসবে বেদানা, বোম্বাই, চায়না-থ্রি কাঁঠালি জাতের লিচু। এদিকে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও রফতানির পথ সুগম হয়েছে। লিচু মৌসুমে কেবলমাত্র বাগান রক্ষণাবেক্ষণ, ভাঙা, প্যাকেজিং এবং পরিবহনে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে থাকে বলে কৃষি বিভাগের সূত্রে জানা গেছে।

কর্মসংস্থান হয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং পরিবহন খাতের সাথে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক ও পরিবারের। দিনাজপুরে চলতি ২০২৬ মৌসুমে দিনাজপুরে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০ মেট্রিক টন। বেসরকারিভাবে এর পরিমাণ ৮.৫ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের আশা প্রকাশ করা হয়েছে। বছরের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত ইরি-বোরো ধান থেকেই আয় হবে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। ইরি-বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল শত শত অটো রাইস মিল, রাইস মিল এবং এর সাথে জড়িত হাজার হাজার পরিবারের বাৎসরিক খরচ যোগান হয়ে থাকে এই আবাদ থেকেই। হালে কৃষি ক্ষেত্রে যোগ হয়েছে ভুট্টার আবাদ। এই আবাদ শুধু দিনাজপুর নয় রংপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, গাইবান্ধা লালমনিরহাটসহ উত্তরের প্রতিটি জেলায় এর আবাদ বিস্তার লাভ করেছে। ভুট্টার ব্যাপক আবাদকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বড় বড় ফিড মিল।
একইভাবে হাড়িভাঙা আম পাল্টে দিয়েছে রংপুরের কৃষি অর্থনীতি। গত কয়েকবছর ধরে এই আম রংপুরের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ইতোমধ্যে এই আম জিআই পণ্য (ভৌগোলিক নির্দেশক) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এই আম রংপুরের ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত। চলতি মৌসুমে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করে রংপুর অঞ্চলে ৩শ’ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন আম চাষিরা। এক সময় রংপুর অঞ্চলের মানুষ কাজের অভাবে অলস সময় কাটাতো। কাজ ও খাদ্যাভাবের কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় এখানে মঙ্গা বিরাজ করতো। এখন সেই মঙ্গাকে জয় করেছে এ অঞ্চলের মানুষ ও প্রকৃতি। এক ফসলা জমি এখন তিন অবস্থান ভেদে চার ফসলা জমিতে পরিণত হয়েছে। বাড়ির উঠান কিংবা আশপাশের পরিত্যক্ত জমিগুলো এখন আমের বাগানে ভরে গেছে। এতটুকু জমিও এখন আর পরিত্যক্ত নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বছর ২৫০ কোটিরও বেশি টাকার বাণিজ্য হবে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করে। এবার হাঁড়িভাঙা আমের গাছে প্রচুর আম ধরেছে। গত বছরের চেয়ে বেশি জমিতে হাঁড়িভাঙা ও অন্যান্য আরো বেশ কয়েক জাতের আম চাষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১০-১২ টন হিসাবে মোট বাজারমূল্য ৩শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর হাঁড়িভাঙার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বেড়েছে। দেশের ভেতরে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহ বেড়েছে। বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। তবে হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে চাষিদের কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। হিমাগার থাকলে চাষিরা আম সংরক্ষণ করে তা বিক্রি করতে পারতেন। এতে লাভ বেশি হতো।
এদিকে, আম ছাড়াও ভুট্টার বাম্পার ফলন রংপুর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকার উঁচু জমি ছাড়াও তিস্তা, ধরলা, দুধকুমোর ও যমুনেশ্বরী নদীর রূপালী চরগুলোতে এখন ভুট্টা, কাউন, বাদাম, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়ার ব্যাপক ফলন হচ্ছে। এক সময়কার পরিত্যক্ত রূপালী চর এখন এ অঞ্চলে সোনার খনিতে পরিণত হয়েছে। চরাঞ্চলের মানুষ ছাড়াও নদী তীরবর্তী মানুষ এসব চরে উল্লেখিত ফসলের পাশাপাশি রবিশস্য চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন এবং এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছেন। তাছাড়া গত কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলের সর্বত্রই আলুর বাম্পার ফলন হচ্ছে। রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার বিভিন্ন নদীর চরে বিশেষ করে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছাসহ গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলায় ভুট্টা চাষ হলেও সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলার ১৬৫টি ছোট-বড় চরে সবচেয়ে বেশি ভুট্টা চাষ হচ্ছে। একইভাবে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী জেলার প্রায় আড়াই শতাধিক নদীর চরে ভুট্টা চাষ করছেন কৃষকরা।

কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, এবার ভুট্টা চাষের জন্য রংপুর কৃষি অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমি। সে হিসাব ছাড়িয়ে কৃষকরা অতিরিক্ত ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। ভুট্টা বর্তমানে হাজারো কৃষকের প্রধান জীবিকা হয়ে উঠেছে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত মহানন্দা নদীর ভাটিতে অবস্থিত ভেসে আসা নূড়ী পাথরের কারণে সেরকম কোনো আবাদই হতো না। সেই পঞ্চগড় এখন দেশের দ্বিতীয় চা উৎপাদনকারী জেলায় নাম লিখিয়েছে। হাজার হাজার একর জুড়ে পঞ্চগড়ের চা বাগান এখন ভারতের দার্জিলিং ও শিলিগুড়িতে চোখ রাঙ্গাচ্ছে। আবাদ হচ্ছে ইরি-বোরো ধানের পাশাপাশি মরিচ। মৌসুমের শুরুতে এখন পঞ্চগড়ের যত্র-তত্র শুকোতে দেয়া লাল মরিচের গালিচা শোভা পাচ্ছে। চলতি মৌসুমে বোরো ধান রোপণ হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩২ হেক্টর, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৭৪৩ মেট্রিকটন। এছাড়াও বাদাম, গম, আলু, মরিচসহ বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন হচ্ছে। দুই যুগ আগে ২ হাজার টাকা মূল্যের এক একর জমি এক কোটি টাকাতেও পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চা বাদে কেবলমাত্র মৌসুম ভিত্তিক ফসল শুকনা মরিচ থেকে ৭০০ কোটি, গম থেকে ২০০ কোটি, ভুট্টা থেকে ৭০০ কোটি, আলু থেকে ৩০০ কোটি টাকাসহ অন্যান্য মওসুমি ফসল থেকেই দেড় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।

একইভাবে গমের জন্য বিখ্যাত ঠাকুরগাঁও জেলার বৃন্দাবনি আম ব্যাপক জনপ্রিয়, ঠাকুরগাঁওতে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ কমলা ও মাল্টার বাগান। জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই বাগানের কমলা ও মাল্টা বিদেশি ফলগুলোকেও হার মানিয়েছে। চাহিদাও ব্যাপক। বাগান থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এখানকার মাল্টা ও কমলা। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনা থেকে ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি থেকে এখন বাণিজ্যিক ও শিক্ষা নগরীতে উন্নীত হতে যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের কৃতি সন্তান বিএনপির মহাসচিব এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাত্র আড়াই মাসে ঠাকুরগাঁও জন্য যা এনে দিয়েছেন সম্ভবত অন্য কোনো সরকারের সময় একেবারে অবহেলিত একটি জেলা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আস্থাভাজন মির্জা ফখরুল আজিবন কাজ করেছেন ঠাকুরগাঁওবাসীর জন্য। ইতোমধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিক্যাল কলেজ পেয়েছে ঠাকুরগাঁওবাসী। পেতে যাচ্ছে পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের মর্যাদা, নার্সিং কলেজসহ আরো অনেক কিছু। ফলে ঠাকুরগাঁও জেলা শিক্ষার পাশাপাশি কৃষিতেও আরো বেশি ভূমিকা রাখবে।