,

image-439585-1625516295

করোনা চিকিৎসায় সংকট দৈনিক ৩০ টন অক্সিজেন ঘাটতি

হাওর বার্তা ডেস্কঃ দেশে করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউ চলছে। সংক্রমণের ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দিতে বাড়ানো হয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউ শয্যা, সাধারণ শয্যা ও অক্সিজেন সরবরাহ। কিন্তু এরপরও দৈনিক প্রায় ৩০ টন অক্সিজেন ঘাটতি শুরু হয়েছে।

রোগী বাড়লে ঘাটতি আরও বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। রাজধানীর ১৬টি সরকারি হাসপাতালের ৮টিতে আইসিইউ শয্যা এবং ২টিতে সাধারণ শয্যায় রোগী পূর্ণ । শয্যা তুলনায় আইসিইউ বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে ১৪শ। ফলে সব হাসপাতালে আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দেশের করোনা পরিস্থিতি বিধ্বস্ত করে ফেলেছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যু বাড়ছে। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব জেলার বাতাস অ্যাম্বুলেন্সের করুণ কান্নায় ভারি হয়ে উঠছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেক জেলায় সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হয়নি।

অন্তত অর্ধেক জেলা হাসপাতালে নেই আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) সুবিধা। অনেক জেলার হাসপাতালে নামমাত্র আইসিইউ শয্যা থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স।

রাজধানীর বাইরে অক্সিজেনের সংকট ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে অক্সিজেনের অভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর তথ্য এসেছে। বিশেষ করে, সাতক্ষীরা ও বগুড়ায় অক্সিজেন মজুত থাকলেও প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

অধিকাংশ হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বাভাবিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি সরবরাহ করতে হচ্ছে। কিন্তু রোগীকে অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্রে জটিলতা থাকায় প্রয়োজন অনুসারে রোগীকে সেটি দেওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে সারা দেশে বাসা-বাড়িতে ঠিক কত মানুষ অক্সিজেন সিলেন্ডার ব্যবহার করছে তার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।

ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন রোগীর মিনিটে ১৫ লিটারের মতো অক্সিজেন দরকার পড়লে তা সিলিন্ডার থেকে সরবরাহ করা যায়। সিলিন্ডার না থাকলে বিকল্প হিসাবে এ চাহিদা পূরণ করতে পারে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর।

এটি বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে রোগীকে সরবরাহ করে। মিনিটে ৩০ লিটারের মতো অক্সিজেন দিতে প্রয়োজন হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা। এটির জন্য কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা থাকতে হয়।

তবে দেশে অক্সিজেনের যে উৎপাদন সক্ষমতা তা অনেক কম। তাতে হঠাৎ সংক্রমণ বাড়লে অক্সিজেন ও আইসিইউয়ের প্রাপ্যতা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হয়ে পড়বে।

খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে অক্সিজেন মজুত থাকলেও সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি দেখা দেবে।

রোগীর সংখ্যা ৭ হাজারের ওপরে উঠলে অক্সিজেনের চাহিদা দাঁড়াবে ২৫০ টনের ওপরে। আমাদের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৭০ টন।

আগে ভারত থেকে আমদানি করা হতো, বর্তমানে তা বন্ধ। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে জেলা পর্যায়ে অক্সিজেনর ঘাটতি শুরু হয়েছে। রাজধানীতে সরবরাহ ঠিক রাখা হলেও ঢাকার বাইরে প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে না।

একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান এর আগে অক্সিজেন দেওয়ার কথা বললেও তারা লিকুইড অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে দৈনিক প্রায় ৩০ টন অক্সিজেনের ঘাটতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহে এই ঘাটতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

গত বছর করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলে দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন প্লান্ট বসানোর উদ্যোগ নেয় সরকার।

গত মে মাস পর্যন্ত ৩০টি হাসপাতালে প্লান্ট বসানো সম্পন্ন হয় এবং ৩১টি বাকি ছিল। ইউনিসেফ সূত্রে জানা গেছে, ৩০টি হাসপাতালে প্লান্ট বসানোর কাজ করছেন তারা। ইতোমধ্যে পাঁচটির কাজ শেষ হয়েছে।

এর মধ্যে দুটি চালু হয়েছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমতি পেলে বাকি তিনটি এ সপ্তাহে চালু হবে। আর ১১টির কাজ প্রায় শেষের দিকে। আরও ১৪টির পাইপলাইন বসানোর কাজ হয়েছে।

ভারত থেকে ট্যাংক এলেই তা স্থাপনের কাজ শেষ হবে। বর্তমানে ৩০টি হাসপাতালে আধুনিক সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট রয়েছে। যেখানে লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংকের সঙ্গে মডিফাই কন্ট্রোল সিসটেম আছে।

এর মধ্যে ১১টিই ঢাকায়। ৩১টি হাসপাতালে শুধু মডিফাই কন্ট্রোল ব্যবস্থা আছে। এর মধ্যেও দুটি ঢাকায়। এছাড়া শুধু সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয় এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৫টি। যার মধ্যে ৫টি ঢাকায়।

তবে দেশের সব উপজেলা হাসপাতালে সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। শুক্রবারের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে ২৮৩৩৪টি।

হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ১৫৮৬টি, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ১৭২১টি। সারা দেশে মটো কোভিড শয্যা রয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৮টি, এর মধ্যে খালি আছে ৬৫৯৭টি। আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১২০৩টি, যার মধ্যে খালি আছে ৩৭০টি।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিয়োলজি অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড পেইন ফিজিশিয়ানসের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. কায়সার সরদার যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে সারা দেশে ১২০৩টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে।

প্রতি ১০ শয্যা আইসিইউয়ের জন্য ১৬ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন। অর্থাৎ ১৯২৪ জন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে সব মিলিয়ে ৫শর কিছু বেশি, যা দিয়ে রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করোনা রোগীর সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেকটাই দুর্বল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে ব্যাপক হারে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

এমনকি টিকা নেওয়ার পরেও আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই ডিউটি শেষে বাড়িতে যাচ্ছেন এবং হাসপাতালে অন্যান্য দায়িত্ব পালন করছেন।

এতে সংক্রমণ আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর কোভিড শুরুর পরে রোগীদের শনাক্তকরণে শতাধিক বুথ স্থাপন করা হয়। এমনকি বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহে যে ব্যবস্থা ছিল এবার সেটিও নেই বললেই চলে।

এমনকি রোগটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ায় রাজধানীর পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। অন্যদিকে ঢাকার চিকিৎসা সুবিধা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।

প্রতিদিন যে হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে, এভাবে আর এক সপ্তাহ চললে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ চলছে।

এবারের সংক্রমণের প্রধান কারণ অধিক সংক্রমণশীল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণশীলতা যেমন বেশি, তেমনি আক্রান্তের শরীরে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আগে যেখানে আলফা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সংক্রমণ নিয়ে আসত, এখন আসছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ সংক্রমণ নিয়ে। ফলে অন্যান্য মৃত্যুঝুঁকি সম্পন্ন রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা দিয়েও বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, দেশে ৭ থেকে ৮ হাজার কোভিড রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এখন প্রতিদিনই ৮ হাজারের ওপর রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে দ্রুত হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা ফুরিয়ে আসবে।

ভারত থেকে অক্সিজেন আমদানি শুরু : আড়াই মাস পর ফের ভারত থেকে অক্সিজেন আমদানি শুরু হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারিতে ভারতে অক্সিজেন সংকটের ফলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল।

সোমবার বেনাপোল স্থলবন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার আমদানি শুরুর তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, লিন্ডে বাংলাদেশ নামে এক প্রতিষ্ঠান গত দুদিনে ভারত থেকে ১৯০ মেট্রিক টন অক্সিজেন আমদানি করেছে।

লিন্ডের প্রতিনিধি জিল্লুর রহমান বলেন, এখন থেকে প্রতিদিনই ভারত থেকে অক্সিজেন আসবে। এর আগে ভারতে করোনার প্রকোপে অক্সিজেন সংকট দেখা দেওয়ায় সেদেশের সরকার অক্সিজেনের রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।

২১ এপ্রিলের পরে কোনো অক্সিজেনের চালান দেশে আসেনি। এখন সেখানে চাহিদা কমে যাওয়ায় আবার ভারতীয় সরকার অক্সিজেন রপ্তানিতে সম্মতি দিয়েছে।

অক্সিজেনের চালানটি বন্দর থেকে ছাড় করানোর দায়িত্বে ছিল বেনাপোলের সারথি এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মতিয়ার রহমান বলেন, সোমবার সকালে ভারত থেকে ৯০ টন অক্সিজেনের একটি চালান বেনাপোল বন্দরে এসে পৌঁছায়।

অক্সিজেন জরুরি পণ্য সরবরাহের তালিকায় থাকায় দ্রুত কাস্টমসের কার্যাদি সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট মালিকের কাছে পৌঁছানো হবে।

এদিকে কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্রুত অক্সিজেনের চালান খালাস দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেনাপোল শুল্কভবনের কমিশনার আজিজুর রহমান।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর