ঢাকা ০১:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দুরন্ত শৈশব এবং শহুরে বাস্তবতা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:৫১:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৬
  • ৫২২ বার

অনেকের মতো আমিও বড় হয়েছি গ্রামে। একেবারে অজপাড়াগাঁয়। চারদিকে সবুজ বনানী আর পাকপাখালির কলকাকলিতে ভরা সেই গ্রাম। সন্ধ্যায় বাঁশঝাড়ে দূরদূরান্ত থেকে পাখিরা এসে জটলা পাকাত। গোধূলিলগ্নে সেখানে বিচিত্র পাখির কিচিরমিচির ডাক আর ঝিঁঝি পোকার বিরামহীন ডাকে সন্ধ্যায় আবহ তৈরি হতো। একটু রাত হলে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে অগুনতি জোনাকির আলো জ্বালাত। সেখানে নিয়ন বাতির আলো জ্বলত না। অমাবস্যার রাত যে কতটা অন্ধকারের, তা গ্রামে বাস করলেই কেবল ধারণা করা যায়।

গ্রামের অমাবস্যার রাত যেমন অন্ধকারের, পূর্ণিমার রাত ঠিক বিপরীত। জ্যোৎস্নায় আলোকিত চারদিক। আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে জ্যোৎস্নায় ভাসত মাঠঘাট, প্রান্তর। আমাদের বাড়িটি মাঠের কাছাকাছি হওয়ায় এবং বাড়িতে বিশাল আঙিনা থাকায় জ্যোৎস্নার মোহনীয় রূপ আলাদাভাবে ধরা পড়ত। আমার বাবা-চাচারা একসঙ্গে পৈতৃক ভিটায় বাস করতেন। সেই সূত্রে আমরা চাচাতো ভাই-বোনরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। এ ছাড়া সারা বছরই ফুফুতো ভাই-বোনরা আমাদের বাড়িতে থাকত। অনেকে এখানে থেকে আমাদের গ্রামের স্কুলে পড়ত। ফলে ছোট-বড় মিলিয়ে অনেকগুলো ভাই-বোনের সঙ্গে কেটেছে আমাদের ছোট বেলা।

সন্ধ্যায় আমাদের নিয়মিত দায়িত্ব ছিল হারিকেনের চিবনিটা মেজে পরিষ্কার করে আলো জ্বালানো এবং পড়তে বসা। প্রতিটা ঘরের বারান্দায় একাধিক হারিকেন ঘিরে এক-দুজন করে বসতাম। এরপর চলত স্কুলের পড়া তৈরি করা। বড়দের নির্দেশ ছিল জোরে জোরে উচ্চারণ করে পড়তে হবে। তাদের ধারণা ছিল, জোরে জোরে না পড়লে পড়া মুখস্থ হবে না। এতে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত- কে কত স্পষ্ট উচ্চারণে পড়তে পারে। কার পড়াটা বড়দের কানে পৌঁছাবে, তাহলে বাহবা পাওয়া যাবে। এতে পড়া মুখস্থ হতো কি না জানি না, তবে পড়া ফাঁকি দিতে পারতাম না। পড়ার ভান করে মুখ বুজে বসে থাকার সুযোগ থাকত না।

সন্ধ্যায় পড়তে বসে স্কুলের পড়া তৈরি করতে হতো, কিন্তু কানটা খাড়া করে রাখতাম। কখন ঈশার আজান দেয়। আজান দিলে মুক্তির ঘণ্টা বাজবে। আজানের কিছুক্ষণ পরে মা ভাত খেতে ডাকবেন। ভাত খেতে পারলেই ঘুম। পুরো রাত গভীর ঘুম শেষে ফজরের আজানের পরপরই সবাইকে উঠতে হতো। একইভাবে সকালে দু-তিন ঘণ্টা পড়ে গোসল সেরে স্কুলে যেতে হতো। সকাল-সন্ধ্যায় পড়ার রুটিন নিয়মিতভাবে সবাইকে মেনে চলতে হতো।

স্কুল থেকে আসার পর দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। এরপর বিকেলটা ছিল একেবারে আমাদের। তখন আমরা সবাই রাজা আমাদের রাজত্বে। আমাদের চোখের সামনে ছিল দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর, সবুজ বনানী আর খোলা মাঠে অবাধে দৌড়-ঝাঁপ করার সুযোগ। কত দিন যে সুতা-কাটা ঘুড়ির পেছনে ছুটতে ছুটতে দূরের গ্রামে চলে গেছি, তার হিসাব নেই।

বিকেলে গ্রামের স্কুল মাঠে বন্ধুরা মিলে মৌসুমভেদে ফুটবল, ক্রিকেট বা ভলিবল খেলায় মেতে উঠতাম।। যারা দাঁড়িয়াবান্ধা বা হা-ডু-ডু খেলায় পারদর্শী ছিল, তাদের জন্য গ্রামের বাজারসংলগ্ন মাদ্রাসার মাঠে সেই সুযোগ ছিল। বর্ষাকালে এবং চৈত্র-বৈশাখ মাসে খেলার মাঠ জমে উঠত না। বর্ষাকালে পানি যখন পুকুর ছাপিয়ে মাছ খাল-বিলে বেরিয়ে যেত, কপোতাক্ষ নদে তখন প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। তখন বড়দের সঙ্গে জাল দিলে মাছ ধরার আনন্দে মেতে উঠতাম। সারা দিন পানিতে ভিজে মাছ ধরতাম।

চৈত্র-বৈশাখ মাসে গ্রামে ছিল উদাম বাতাস। প্রকৃতিতে তখন বসন্ত শেষে গ্রীষ্মের আনাগোনা। মাঠে ধান কাটা হয়ে গেছে। চারদিকে ধু ধু প্রান্তর। বিকেলে বন্ধুরা মিলে মাঠে মিলতাম। মেতে উঠতাম ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতায়। আকাশে শোভা পেত নানান রঙের ঘুড়ি। কার ঘুড়িটা কত ওপরে উঠছে তাই নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। কারো ঘুড়ির সুতা কেটে গেলে তার পেছনে দল বেঁধে ছুটতাম। ঘুড়িটা ঘুরতে ঘুরতে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়ে পড়ত। আর আমরা ছুটতাম পিছু পিছু। পেরিয়ে যেত গ্রাম। এভাবে পথ হারিয়ে বুকের মধ্যে চাপা উত্তেজনা আর শঙ্কা নিয়ে পথ খুঁজতে খুঁজতে বাড়ি ফিরে আসতাম।

যে দিন ঘুড়ি ওড়ানোর উপযোগী বাতাস থাকত না, সেদিন দল বেঁধে চলত পাখি তাড়ানো। আমাদের এই অসাধ্য খেয়ালের শিকার হতো দোয়েল পাখি। কারণ পাখিটি তেমন উড়তে পারে না। ঢিল খেয়ে কিছু দূর উড়ে আরেক গাছে বসে। ঢিল খেতে খেতে একসময় হয়রান হয়ে যেত। কখনো কখনো ধরতে পারতাম।

বৈশাখ মাসে পাশের গ্রামে বৈশাখী মেলা বসত। সেই বৈশাখী মেলায় মিলত পিস্তল, বন্দুক, ফুটবলসহ নানান খেলনা। এ মেলা নিয়ে আমাদের প্রস্তুতিও থাকত আগে থেকে। দীর্ঘদিন ধরে পয়সা জমাতাম। দুই-তিন জন বন্ধু মিলে মেলায় যেতাম। সেটা ছিল দুরন্ত অ্যাডভেঞ্জার। চেনা-অচেনা মেঠোপথ পেরিয়ে, গ্রাম ছাড়িয়ে অদেখাকে দেখার চাপা উত্তেজনায় একসময় মেলায় পৌঁছাতাম। মিঠায় আর আইসক্রিম খেতাম। কম দামের সেই সব খেলনা কিনতাম দোকান ঘুরে ঘুরে। বিপত্তি বাধত ভিড়ের মধ্যে বন্ধুরা হারিয়ে একা হলে গেলে। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসত, আবার একা। বাড়ি ফিরতে হবে সন্ধ্যার আগে। বাড়ি যেতে না পারলে রাতে কী হবে, থাকব কোথায় সেই ভয় পেয়ে বসত। বন্ধুদের ওপর জিদ চাপত, কেন তারা হারিয়ে গেল। তখন ভরসা- এলাকার পরিচিত কারোর যদি দেখা মেলে। তাও না মিললে ফিরতে হতো একা একা। গা ছম ছম করা ভয়ে, চেনা-অচেনা মেঠোপথে একা একা ছুটতাম ডুবন্ত সূর্যটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। আগের রাতে দাদির কাছে যে ভূতের গল্প শুনেছি, সেটাও কেন জানি মনে পড়ে যেত তখন। ছুটতে ছুটতে একসময় দূরে আমাদের বাড়িটার দেখা মিলাত, তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম। তখন নিজের মধ্যে বিজয়ের গর্ব অনুভাব করতাম।

এমনই বিচিত্র অভিজ্ঞতায়, আনন্দে-ভয়ে সাহসিকতায়, মুক্ত সবুজ-প্রান্তরের নির্মল বাতাসে, চাচাতো-ফুফাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে মিলে কেটেছে- আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি, তাদের ছোট বেলা। সেখানে প্রতিদিনের পড়ার রুটিন ছিল, কিন্তু পড়ার চাপে রুদ্ধশ্বাস অবস্থা ছিল না। ক্লাসে প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা প্রতিদিনের খেলার আনন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি কখনো। যে সবুজ প্রান্তরে আমরা খেলেছি, যে বিস্তীর্ণ নীল আকাশে প্রতিদিন গোধূলিলগ্নে সূর্য ডোবা দেখেছি, যে সহপাঠী-বন্ধুদের সঙ্গে অভিমানে-অনুরাগে জীবনের সেই স্বপ্নিল সময় কাটিয়েছি, তাদের প্রতি, সেই জন্মভূমির প্রতি একটা অজানা ভালোবাসা, মনের মধ্যে টান অনুভাব করি।

আজ ঢাকা শহরের চার দেয়ালে বন্দি শিশুদের দেখলে বড্ড কষ্ট লাগে। এদের শৈশব, কৈশোরের প্রায় প্রতিটি দিন কাটে চার দেয়ালের মধ্যে। এদের সামনে সবুজ প্রান্তর নেই। এরা কখনো দূর গ্রামে গিয়ে পথ হারিয়ে পথ খোঁজে না। দুরু দুরু বুকে রোমাঞ্চকর পথ চলার অভিজ্ঞতা এরা অর্জন করে না। এরা বৃষ্টি দেখে তুলতুলে বিছানায় বসে কাচের গ্লাসের ভেতর দিয়ে। কালো মেঘের আকাশে ঝুম ঝুম বৃষ্টির মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে দস্যিপনা- এরা শুধু গল্পে পড়ে। ঝড়ের মধ্যে আম কুড়ানোর যে আনন্দ তা এদের জানা নেই। এদের শৈশব-কৈশোরের আনন্দ চাপা পড়ে গাদি গাদি বইয়ে। এদের কাছে খেলা মানে কম্পিউটারে স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে থাকা। এরা ভীষণ নিঃসঙ্গ। ভাই-বোনদের সঙ্গে খুনসুটি করতে এরা শেখে না। দাদা-দাদির কোলে শুয়ে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে রাজকন্যা উদ্ধার করতে যায় না।

যখন ব্যালকুনিতে কোনো নিঃসঙ্গ শিশুকে উদাস নয়নে বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখি, নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কত নিষ্ঠুরভাবে দমন করে ওদের সম্ভাবনাকে ‘বিকলাঙ্গ’ করে দিচ্ছি আমরা। যান্ত্রিক সভ্যতার বাস্তবতায় আমরাও যে অসহায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

দুরন্ত শৈশব এবং শহুরে বাস্তবতা

আপডেট টাইম : ০৯:৫১:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

অনেকের মতো আমিও বড় হয়েছি গ্রামে। একেবারে অজপাড়াগাঁয়। চারদিকে সবুজ বনানী আর পাকপাখালির কলকাকলিতে ভরা সেই গ্রাম। সন্ধ্যায় বাঁশঝাড়ে দূরদূরান্ত থেকে পাখিরা এসে জটলা পাকাত। গোধূলিলগ্নে সেখানে বিচিত্র পাখির কিচিরমিচির ডাক আর ঝিঁঝি পোকার বিরামহীন ডাকে সন্ধ্যায় আবহ তৈরি হতো। একটু রাত হলে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে অগুনতি জোনাকির আলো জ্বালাত। সেখানে নিয়ন বাতির আলো জ্বলত না। অমাবস্যার রাত যে কতটা অন্ধকারের, তা গ্রামে বাস করলেই কেবল ধারণা করা যায়।

গ্রামের অমাবস্যার রাত যেমন অন্ধকারের, পূর্ণিমার রাত ঠিক বিপরীত। জ্যোৎস্নায় আলোকিত চারদিক। আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে জ্যোৎস্নায় ভাসত মাঠঘাট, প্রান্তর। আমাদের বাড়িটি মাঠের কাছাকাছি হওয়ায় এবং বাড়িতে বিশাল আঙিনা থাকায় জ্যোৎস্নার মোহনীয় রূপ আলাদাভাবে ধরা পড়ত। আমার বাবা-চাচারা একসঙ্গে পৈতৃক ভিটায় বাস করতেন। সেই সূত্রে আমরা চাচাতো ভাই-বোনরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। এ ছাড়া সারা বছরই ফুফুতো ভাই-বোনরা আমাদের বাড়িতে থাকত। অনেকে এখানে থেকে আমাদের গ্রামের স্কুলে পড়ত। ফলে ছোট-বড় মিলিয়ে অনেকগুলো ভাই-বোনের সঙ্গে কেটেছে আমাদের ছোট বেলা।

সন্ধ্যায় আমাদের নিয়মিত দায়িত্ব ছিল হারিকেনের চিবনিটা মেজে পরিষ্কার করে আলো জ্বালানো এবং পড়তে বসা। প্রতিটা ঘরের বারান্দায় একাধিক হারিকেন ঘিরে এক-দুজন করে বসতাম। এরপর চলত স্কুলের পড়া তৈরি করা। বড়দের নির্দেশ ছিল জোরে জোরে উচ্চারণ করে পড়তে হবে। তাদের ধারণা ছিল, জোরে জোরে না পড়লে পড়া মুখস্থ হবে না। এতে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত- কে কত স্পষ্ট উচ্চারণে পড়তে পারে। কার পড়াটা বড়দের কানে পৌঁছাবে, তাহলে বাহবা পাওয়া যাবে। এতে পড়া মুখস্থ হতো কি না জানি না, তবে পড়া ফাঁকি দিতে পারতাম না। পড়ার ভান করে মুখ বুজে বসে থাকার সুযোগ থাকত না।

সন্ধ্যায় পড়তে বসে স্কুলের পড়া তৈরি করতে হতো, কিন্তু কানটা খাড়া করে রাখতাম। কখন ঈশার আজান দেয়। আজান দিলে মুক্তির ঘণ্টা বাজবে। আজানের কিছুক্ষণ পরে মা ভাত খেতে ডাকবেন। ভাত খেতে পারলেই ঘুম। পুরো রাত গভীর ঘুম শেষে ফজরের আজানের পরপরই সবাইকে উঠতে হতো। একইভাবে সকালে দু-তিন ঘণ্টা পড়ে গোসল সেরে স্কুলে যেতে হতো। সকাল-সন্ধ্যায় পড়ার রুটিন নিয়মিতভাবে সবাইকে মেনে চলতে হতো।

স্কুল থেকে আসার পর দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। এরপর বিকেলটা ছিল একেবারে আমাদের। তখন আমরা সবাই রাজা আমাদের রাজত্বে। আমাদের চোখের সামনে ছিল দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর, সবুজ বনানী আর খোলা মাঠে অবাধে দৌড়-ঝাঁপ করার সুযোগ। কত দিন যে সুতা-কাটা ঘুড়ির পেছনে ছুটতে ছুটতে দূরের গ্রামে চলে গেছি, তার হিসাব নেই।

বিকেলে গ্রামের স্কুল মাঠে বন্ধুরা মিলে মৌসুমভেদে ফুটবল, ক্রিকেট বা ভলিবল খেলায় মেতে উঠতাম।। যারা দাঁড়িয়াবান্ধা বা হা-ডু-ডু খেলায় পারদর্শী ছিল, তাদের জন্য গ্রামের বাজারসংলগ্ন মাদ্রাসার মাঠে সেই সুযোগ ছিল। বর্ষাকালে এবং চৈত্র-বৈশাখ মাসে খেলার মাঠ জমে উঠত না। বর্ষাকালে পানি যখন পুকুর ছাপিয়ে মাছ খাল-বিলে বেরিয়ে যেত, কপোতাক্ষ নদে তখন প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। তখন বড়দের সঙ্গে জাল দিলে মাছ ধরার আনন্দে মেতে উঠতাম। সারা দিন পানিতে ভিজে মাছ ধরতাম।

চৈত্র-বৈশাখ মাসে গ্রামে ছিল উদাম বাতাস। প্রকৃতিতে তখন বসন্ত শেষে গ্রীষ্মের আনাগোনা। মাঠে ধান কাটা হয়ে গেছে। চারদিকে ধু ধু প্রান্তর। বিকেলে বন্ধুরা মিলে মাঠে মিলতাম। মেতে উঠতাম ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতায়। আকাশে শোভা পেত নানান রঙের ঘুড়ি। কার ঘুড়িটা কত ওপরে উঠছে তাই নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। কারো ঘুড়ির সুতা কেটে গেলে তার পেছনে দল বেঁধে ছুটতাম। ঘুড়িটা ঘুরতে ঘুরতে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়ে পড়ত। আর আমরা ছুটতাম পিছু পিছু। পেরিয়ে যেত গ্রাম। এভাবে পথ হারিয়ে বুকের মধ্যে চাপা উত্তেজনা আর শঙ্কা নিয়ে পথ খুঁজতে খুঁজতে বাড়ি ফিরে আসতাম।

যে দিন ঘুড়ি ওড়ানোর উপযোগী বাতাস থাকত না, সেদিন দল বেঁধে চলত পাখি তাড়ানো। আমাদের এই অসাধ্য খেয়ালের শিকার হতো দোয়েল পাখি। কারণ পাখিটি তেমন উড়তে পারে না। ঢিল খেয়ে কিছু দূর উড়ে আরেক গাছে বসে। ঢিল খেতে খেতে একসময় হয়রান হয়ে যেত। কখনো কখনো ধরতে পারতাম।

বৈশাখ মাসে পাশের গ্রামে বৈশাখী মেলা বসত। সেই বৈশাখী মেলায় মিলত পিস্তল, বন্দুক, ফুটবলসহ নানান খেলনা। এ মেলা নিয়ে আমাদের প্রস্তুতিও থাকত আগে থেকে। দীর্ঘদিন ধরে পয়সা জমাতাম। দুই-তিন জন বন্ধু মিলে মেলায় যেতাম। সেটা ছিল দুরন্ত অ্যাডভেঞ্জার। চেনা-অচেনা মেঠোপথ পেরিয়ে, গ্রাম ছাড়িয়ে অদেখাকে দেখার চাপা উত্তেজনায় একসময় মেলায় পৌঁছাতাম। মিঠায় আর আইসক্রিম খেতাম। কম দামের সেই সব খেলনা কিনতাম দোকান ঘুরে ঘুরে। বিপত্তি বাধত ভিড়ের মধ্যে বন্ধুরা হারিয়ে একা হলে গেলে। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসত, আবার একা। বাড়ি ফিরতে হবে সন্ধ্যার আগে। বাড়ি যেতে না পারলে রাতে কী হবে, থাকব কোথায় সেই ভয় পেয়ে বসত। বন্ধুদের ওপর জিদ চাপত, কেন তারা হারিয়ে গেল। তখন ভরসা- এলাকার পরিচিত কারোর যদি দেখা মেলে। তাও না মিললে ফিরতে হতো একা একা। গা ছম ছম করা ভয়ে, চেনা-অচেনা মেঠোপথে একা একা ছুটতাম ডুবন্ত সূর্যটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। আগের রাতে দাদির কাছে যে ভূতের গল্প শুনেছি, সেটাও কেন জানি মনে পড়ে যেত তখন। ছুটতে ছুটতে একসময় দূরে আমাদের বাড়িটার দেখা মিলাত, তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম। তখন নিজের মধ্যে বিজয়ের গর্ব অনুভাব করতাম।

এমনই বিচিত্র অভিজ্ঞতায়, আনন্দে-ভয়ে সাহসিকতায়, মুক্ত সবুজ-প্রান্তরের নির্মল বাতাসে, চাচাতো-ফুফাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে মিলে কেটেছে- আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি, তাদের ছোট বেলা। সেখানে প্রতিদিনের পড়ার রুটিন ছিল, কিন্তু পড়ার চাপে রুদ্ধশ্বাস অবস্থা ছিল না। ক্লাসে প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা প্রতিদিনের খেলার আনন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি কখনো। যে সবুজ প্রান্তরে আমরা খেলেছি, যে বিস্তীর্ণ নীল আকাশে প্রতিদিন গোধূলিলগ্নে সূর্য ডোবা দেখেছি, যে সহপাঠী-বন্ধুদের সঙ্গে অভিমানে-অনুরাগে জীবনের সেই স্বপ্নিল সময় কাটিয়েছি, তাদের প্রতি, সেই জন্মভূমির প্রতি একটা অজানা ভালোবাসা, মনের মধ্যে টান অনুভাব করি।

আজ ঢাকা শহরের চার দেয়ালে বন্দি শিশুদের দেখলে বড্ড কষ্ট লাগে। এদের শৈশব, কৈশোরের প্রায় প্রতিটি দিন কাটে চার দেয়ালের মধ্যে। এদের সামনে সবুজ প্রান্তর নেই। এরা কখনো দূর গ্রামে গিয়ে পথ হারিয়ে পথ খোঁজে না। দুরু দুরু বুকে রোমাঞ্চকর পথ চলার অভিজ্ঞতা এরা অর্জন করে না। এরা বৃষ্টি দেখে তুলতুলে বিছানায় বসে কাচের গ্লাসের ভেতর দিয়ে। কালো মেঘের আকাশে ঝুম ঝুম বৃষ্টির মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে দস্যিপনা- এরা শুধু গল্পে পড়ে। ঝড়ের মধ্যে আম কুড়ানোর যে আনন্দ তা এদের জানা নেই। এদের শৈশব-কৈশোরের আনন্দ চাপা পড়ে গাদি গাদি বইয়ে। এদের কাছে খেলা মানে কম্পিউটারে স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে থাকা। এরা ভীষণ নিঃসঙ্গ। ভাই-বোনদের সঙ্গে খুনসুটি করতে এরা শেখে না। দাদা-দাদির কোলে শুয়ে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে রাজকন্যা উদ্ধার করতে যায় না।

যখন ব্যালকুনিতে কোনো নিঃসঙ্গ শিশুকে উদাস নয়নে বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখি, নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কত নিষ্ঠুরভাবে দমন করে ওদের সম্ভাবনাকে ‘বিকলাঙ্গ’ করে দিচ্ছি আমরা। যান্ত্রিক সভ্যতার বাস্তবতায় আমরাও যে অসহায়।