,

বোলিং ব্যর্থতার দায় কার

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ যতটা অগ্রগামী, টেস্টে যেন ততটাই পশ্চাৎপদ। ওয়ানডে ক্রিকেটে যে কোন দলকে হারাতে পারে বাংলাদেশ। সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপ ও পাকিস্তান সিরিজে সেটির প্রমাণও করেছে। কিন্তু টেস্টে এক পা এগুলে আরেক পা পিছিয়ে যায়, সেটিরও প্রমাণ পাকিস্তান সিরিজ। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে ব্যাটিং-বোলিংয়ে যতটা দুর্বার টাইগাররা, ততটাই অনুজ্জ্বল টেস্টে। ১৬ বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে জয় না পাওয়ার ক্ষোভ মিটিয়েছে একেবারে সিরিজ হোয়াইট করেই। টি-২০ তে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৮ বছরে প্রথম জয়টিও ছিল দুর্দান্ত। এমন জয়ে স্বপ্ন ডানায় উড়ছিল বাংলাদেশ। এমনকি ১৪ বছর পর প্রথম টেস্ট ড্র করে ভড়কে দিয়েছিল পাকিস্তানকে। কিন্তু সিরিজের শেষ টেস্ট ম্যাচে ধপাস। চুপসে গেল আশার বেলুন। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও নির্বাচক হাবিবুল বাশার এই সিরিজকে দেশের সেরা সাফল্য বললেও একটি জায়গাতে তিনি নিজের বিস্ময় লুকিয়ে রাখতে পারেননি। অন্যদিকে আরেক সাবেক ক্রিকেটার নিয়ামুর রশিদ রাহুলও এই সিরিজকে সেরা অর্জন বললেও টেস্ট নিয়ে তার কণ্ঠে ঝরলো অনেক আক্ষেপ। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ নিয়ে দুই সাবেক ক্রিকেটার আশা-হতাশার কথা তুলে ধরেন মানবজমিনের সঙ্গে।
হাবিবুল বাশার পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজকে দেশের সেরা প্রাপ্তি বলেই এক বাক্যে জানালেন। বিশেষ করে এই দলটি নিয়ে নির্বাচক হিসেবে তার গর্ব করারই কথা। তিনি বলেন, ‘আমি তো বলবো এটি আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা সিরিজ। পাকিস্তান কতটা শক্তিশালী দল সেটি শেষ টেস্টই প্রমাণ করেছে। কিন্তু ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতে আমরা ওদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী বলেই হারাতে পেরেছি। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং সব বিভাগেই ভাল করেছে দল। এই সিরিজে আমাদের অনেক অর্জন অনেক প্রাপ্তি। টেস্টেও যে খারাপ খেলেছি তা নয়। তবে শেষ টেস্টে কিছুটা হতাশা আছে। কিন্তু আপনি পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সব ম্যাচই জিতে যাবেন তা কি করে হয়! পাকিস্তানতো দুর্বল কোন দল নয়।’
এই সিরিজে সাবেক অধিনায়ক ও নির্বাচক হিসেবে ভাল-মন্দ দুটিই দেখেছেন তিনি। তার দেখা নিয়ে বলেন, ‘আসলে আমরা ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতে বেশ ভাল করেছি। আর মন্দ বলবো টেস্টে আমাদের বোলিংটা ঠিকমতো হয়নি। এই জায়গাতে আমাদের আরও জোর দিতে হবে।’ অন্যদিকে ওয়ানডে ও  টি-২০ অধিনায়ক মাশরাফি নির্বাচকদের ধন্যবাদ দিয়েছিলেন সেরা দল দেয়ার জন্য। কিন্তু শেষ ম্যাচে বাজে পারফরম্যান্সের পর অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম দায় চাপিয়েছেন সবার উপর। বাশার বলেন, ‘এখানে দায় বিষয়টা আসে না। একটি টেস্ট খারাপ হতেই পারে। পাকিস্তানতো আর দুর্বল দল ছিল না যে আমরা ওদেরকে এক টানা হারিয়ে যাব। আমি মনে করি, দায়টায় এসব নিয়ে আলোচনা বাদ দিয়ে ভুলগুলো শুধরানো উচিত।’
২০০০ সাল থেকে হাবিবুল বাশার দেশের হয়ে খেলেছেন ৫০টি টেস্ট। ২০০৮ সালে টেস্ট ছেড়েছেন তখন তার নামের পাশে যোগ হয়েছে ৩ হাজার ২৬ রান। এরপর আরও ৭টি বছর কেটে গেছে। বাশার অপেক্ষায় ছিলেন কবে ৩ হাজারি ক্লাবে তার সঙ্গী পাবেন। অবশেষে তামিম ইকবালই তার সঙ্গী হলেন। কিন্তু মাত্র ৬ রানের জন্য তিনি এ সিরিজে ছাড়িয়ে যেতে পারলেন না বাশারকে। তামিমকে পেয়ে বাশার ভীষণ খুশি হলেও বলেন, ‘আমি আসলে বিস্মিত হয়েছি, ৩ হাজার রান পেতে এত সময় লাগবে ভাবিনি। তামিমকে অনেক অনেক অভিনন্দন। তবে আমি তামিমের কাছে আরও রান চাই।’
বোলার সংকটের দায় দেশেরই
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজকে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সব চেয়ে সেরা অর্জনই মনে করেন সাবেক ক্রিকেটার নিয়ামুর রশিদ রাহুল। তিনি বলেন, ‘আসলে শুরু থেকে যদি বলি ওয়ানডেতে ও টি-টোয়েন্টিতে আমরা পাকিস্তানের তুলনায় সেরা দল হিসেবেই জিততে পেরেছি। প্রথম টেস্টে শুরুটা খারাপ হলে তামিম-ইমরুলের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে জয় পেয়েছি। আর শেষ টেস্টের কথা বললে যে বিষয়টি চলে আসে তাহলো বোলিং নিয়ে আমাদের পরিকল্পনার অভাব। বিশেষ করে আমাদের টেস্ট ক্রিকেটে পেস বোলারদের যে সংকট তা থেকে বের হতে হবে। নয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে না।’ শুধু যে বোলিং তা নয়, টেস্টে যে আমাদের ব্যাটিংটা ভাল ছিল না মনে করেন তিনি। নিয়ামুর রশিদ বলেন, ‘ওয়ানডে আর টি- টোয়েন্টি দেখেন ব্যাটে বলে সবার আবদান ছিল। এমনকি তরুণ সৌম্য সরকার ও পেস বোলার মুস্তাফিজ পর্যন্ত। কিন্তু টেস্টে তামিম-ইমরুলের সেই ইনিংস ছাড়া মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ, সাকিব কি দলের জন্য ব্যাট হাতে অবদান রাখতে পেরেছে। কিংবা ব্যাটসম্যানরা কি ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পেরেছে? বোলিংটাতে আমাদের ঘাটতি ছিলই। ব্যাটিংটাও আমাদের গোটা দলের সেরকম কোন অবদান ছিল না। এখানে হতে পারে খুলনা ঢাকা টেস্টের মাঝে যে সময়ের পার্থক্য তাতে দুই রকম উইকেটের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেয়া সহজ ছিল না। আবার জিম্বাবুয়ে সিরিজের পাঁচ মাস পর আমরা টেস্ট খেলতে নেমেছি সেটিও হতে পারে ঘাটতি। তবে আমাদের উন্নতি করার অনেক জায়গা আছে। যেভাবে খেলছে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আরও ভাল হবে।’
টেস্টে বোলিং নিয়ে রাহুল বলেন, ‘আসলে আমাদের পেস বোলারদের সংকট খুব বেশি। এই জন্য আমাদের দেশেরই দায়টা নিতে হবে। এখানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে আরও সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজন। কারণ আমরা যদি একটি পেস বোলিং একাডেমি করতে পারতাম তাহলে এই সংকটটা হতো না। এই দেশেই সারোয়ার ইমরানদের মতো কোচ আছেন যারা ভাল পেস বোলার তৈরি করতে পারেন। আসলে এই জায়গাতে আমাদের মনোযোগ দেয়া উচিত।’

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর