ঢাকা ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
মহিষারকান্দি গ্রামের পাকা রাস্তা কবে হবে ? দুর্ভোগে দিন কাটছে বাসিন্দাদের বাগদান সম্পন্ন, বিয়ে হবে দেশের আইন মেনে : লুবাবা ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না: প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনে যাচ্ছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে সাক্ষাৎ : ফটিকছড়িতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০০ মার্কিন পাইলটের আবাসন গুঁড়িয়ে দিলো ইরান, বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস আওয়ামী লীগের আমলে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার : প্রধানমন্ত্রী বাসস এমডি মাহবুব মোর্শেদের নিয়োগ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন সরকারি চাকরিতে শূন্যপদ ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০ তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার! জেনে নিন তরমুজের ইতিহাস, পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং পাকা তরমুজ চেনার উপায়

মানুষের সংগ্রামই আমার পুঁজি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০২:২৯:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ জুন ২০১৯
  • ২৯৮ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তার গল্প উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংকটের সামগ্রিকতা। বাঙালির অহংকার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তার লেখায় নতুনমাত্রা যোগ করেছে। ৭২তম জন্মদিন। শুভেচ্ছা জানিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন শিমুল জাবালি।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা

তোমাকেও শুভেচ্ছা।

আপনার শৈশব কেটেছে করতোয়ার তীরে

করতোয়া শুধু আমার শৈশবই নয়। জীবনের অস্তিত্বও। করতোয়া আমার কাছে কেবল নদী নয়। লেখালেখির সঞ্চয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে সে। আমার লেখালেখির শুরুটা সেই করতোয়ার স্মৃতি সঞ্চয় থেকেই।

শৈশব-কৈশোরে খুব ‘দস্যিপনা’ করতেন। গাছে ওঠা-লম্পঝম্প সব। যা তখনকার সামাজিক দৃষ্টিতে দৃষ্টিকটু ছিল। নানা বদ মন্তব্য শুনতে হতো। আপনি কীভাবে সামাল দিয়েছেন?

আমি খুবই ভাগ্যবান ছিলাম। বয়ঃসন্ধি কাল হলেও আমার উচ্চতার কারণে দুষ্টুমিগুলো কারও চোখে খুব আটকাত না। কারও কাছে কখনো বকা শুনিনি। এমনকি পরিবার থেকেও বাধা-নিষেধ আসেনি। যার কারণে আমি উন্মুক্তভাবে প্রকৃতি দেখতে পেরেছি।

১৯৬১ সালে কলেজজীবনে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ওই সময়ে এ রোগ সম্পর্কে কারও ধারণাও ছিল না। সেরে উঠলেন কীভাবে?

এক দিন হুট করে রাতের বেলায় বাথরুমে পরে গেলাম। ওঠার কোনো শক্তি পাইনি। বড় বোন এসে কোলে করে বিছানায় নিয়ে গেলেন। সারা রাত অসহ্য যন্ত্রণায় কেঁদেছি। আমার বাবা মশারির ভেতর সারা রাত বসে ছিলেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের কেউই রোগটা ধরতে পারেনি। সেখান থেকে আমাকে নেওয়া হলো মিশন হাসপাতাল। মিশন হাসপাতালের ডা. মালাকর (নমস্য এখনো) আমাকে নিবিড় চিকিৎসা প্রদান করলেন, না হয় আজও আমার পঙ্গু নারী হিসেবে বাঁচতে হতো। দুই মাস আমাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এরপর সুস্থ হলেও দীর্ঘদিন বাম পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছি।

এবার একটু লেখালেখির দিকে আসি, যদি আপনার গল্পের কথা বলি, আপনি ফিদেল, ম্যান্ডেলা, নেরুদা, এবং চে কে নিয়ে গল্প লিখেছেন। এর উদ্দেশ্য কি ছিল?

এদের নিয়ে গল্প লেখার ঠিক উদ্দেশ্য ওইভাবে ছিল না। শুধু পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষকে গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করার তাগিদ ছিল। আঙ্গিকগত দিক থেকে, শিল্পের জায়গা থেকে এবং সে মানুষটির দার্শনিক বোধের জায়গা থেকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তাদের হাজির করতে চেয়েছি। কারণ অনেক সময় বড় গবেষণালব্ধ কাজ হয়তো তরুণরা ওইভাবে পড়তে আগ্রহী হয় না। কিন্তু একটা গল্প পেলে চট করে পড়ার জন্য আগ্রহী হয়।

এসব মহান মানুষদের নিয়ে গল্প লেখার পাশাপাশি উপন্যাসও লিখেছেন। গালিবকে নিয়ে ‘যমুনা নদীর মুশায়রা’ লিখেছেন। নামকরণে এ ‘মুশায়রা’ কেন?

রাজদরবারে কবিতা পাঠের আসরকে বলা হতো মুশায়রা। গালিব একজন কবি, তার কবিসত্তার কারণেই আমি এ শব্দটি ব্যবহার করেছি। এ জন্য অনেকেই বলেছেন, এই শব্দটি নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এই উপন্যাসের নামকরণে।

আদিবাসীদের জীবনযাপন নিয়েও অনেক লিখেছেন। বিশেষ করে গল্প ও প্রবন্ধ। কিন্তু আদিবাসী গল্পে রিছিলিকে আবিষ্কার করলেন কীভাবে?

আদিবাসীদের প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধাবোধ থেকেই রিছিলকে আবিষ্কার করতে পেরেছি। পত্রিকার খবরের মাধ্যমে রিছিলকে পেয়েছি। রিছিলকে মেরে ফেলা হয়েছে তার অ-কোষ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এ ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়েছে। আমি গল্পটা ওখান থেকে নিয়েছি। মানুষ হয়ে এত নিষ্ঠুর হবে কেন একটা মানুষের প্রতি? সে তার অধিকারের কথা বলতে পারবে না? সে তার নিজের গোষ্ঠীর কথা স্মরণও করতে পারবে না? এ জন্যই তাকে গল্পের মধ্যে এনেছি। এবং তার স্ত্রীকে দিয়ে বলেছি ‘আমরা পুরো মানুষটাকে চাই। আমরা যে তাকে দাহ করব তার জন্য পুরো মানুষ চাই’।

আমার মনে হয়, ‘কাঠকয়লার ছবি’ আপনার অন্যতম উপন্যাস। যদি কেউ আমাকে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসের কথা বলে, আমি সবার আগে এ উপন্যাসের কথাই বলি। আমার বাড়ি চাঁদপুর, অথচ চা শ্রমিকের সঙ্গে চাঁদপুরেরও যে ইতিহাস আছে তা জানতাম না। চা বাগান, চা শ্রমিক, যুদ্ধশিশু এবং হাহাকার-আর্তনাদ আমাকে এখনো ভাবায়। এর ভিত্তিটা কীভাবে নির্মাণ করলেন?

কাঠকয়লার ছবি উপন্যাসটা একটা যুদ্ধশিশুকে নিয়ে। ছেলেটি এসছিল তার মাকে খুঁজতে। লারার (সেলিনা হোসেনের সন্তান, যে বেঁচে নেই) সঙ্গে পরিচয় হয় তার। লারাও গিয়েছিল তার সঙ্গে মাকে খুঁজতে। বিদেশে পালক পিতামাতার কাছে যে ঠিকানা ছিল সে ঠিকানা নিয়ে এল সে। ঠিকানায় কামরাঙ্গীরচর বস্তির কথা লেখা ছিল। কিন্তু তারা কামরাঙ্গীরচরে গিয়ে ওই বস্তি খুঁজে পায়নি, তার মাকেও খুঁজে পায়নি।

আমার বাসায় এসে ছেলেটি খুব কাঁদছিল। তখন মনে হয়েছিল, এই যুদ্ধশিশু যে তার মাকে খুঁজতে এসেছে তাকে নিয়ে আমি আমার উপন্যাস লিখব। তারপরে আমার পাশাপাশি এটাও মনে হয়েছিল, এই মা একজন চা শ্রমিকও হতে পারে! কাজেই এই চা শ্রমিকদের যেভাবে এ দেশে আনা হলো যেভাবে নির্যাতিত হলো, বিশেষ করে ১৯২১ সালে যখন তারা চাঁদপুর হয়ে যাবে তখন তাদের লঞ্চে উঠতে দিচ্ছিল না, লঞ্চটা ছেড়ে দিল। ওরা লঞ্চের কার্নিশ ধরে ঝুলে পড়ল। এরপর তাদের গুলি করে টুপটুপ করে পানিতে ফেলে দিল।

যখন এ ঘটনা পেয়েছি তখন আমার মনে হলো, এই উপন্যাসকে আরও বিস্তরভাবে ভাবতে লাগলাম। আরও জানলাম পাকিস্তানিদের দ্বারা কীভাবে চা শমিকরা নির্যাতিত হলো, গর্ভবতী হলো, সন্তানকে দত্তক দিতে বাধ্য হলো তারা। মূলত, মাদার তেরেসার কথায় তারা এ দত্তক নেওয়ার কাজটা করল। তেরেসা এখানে এসেছিলেন ’৭২-৭৩ সালে। তিনি বলেছিলেন, ‘এরা সব মানবশিশু। এদের তোমরা যদি রাখতে না চাও, মেরে ফেলো না। দত্তক দিয়ে দাও।

অনেক বিদেশি আছে যারা দত্তক নিতে চায়। তারা লালন-পালন করবে।’ তখন কোনো আইন ছিল না দত্তক দেওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে দুইটা অর্ডিন্যান্স করে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। এটা একদম রেয়ার ঘটনা। তখন আমি বললাম, এটাও আমার উপন্যাসে আসুক। এটাই এখন দিল্লিতে ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে। এরপর যা করেছি সেটা আমার বানানো গল্প। এটা সত্যিই আমার অন্যরকম উপন্যাস।

‘আমি ছিটের স্বাধীনতা চাই, আমাদের বন্দি রাখতে পারবা না’ এটা আপনার ‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসের শক্তিশালী বক্তব্য। সম্প্রতি ছিটের স্বাধীনতা আসছে এবং ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহলবিষয়ক চুক্তি করেছে। আপনার জায়গা থেকে ছিটমহলবাসীদের নিয়ে যে স্বপ্ন-কল্পনা দেখেছেন এখন সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে। নিজেকে কতটুকু সফল মনে হয়?

হ্যাঁ অবশ্যই। শেখ হাসিনাকে এ জন্য আমি স্যালুট করি, এই সমস্যাটার সমাধান করার জন্য। রাষ্ট্রক্ষমতায় তো অনেকেই ছিল, এভাবে গণমানুষের জন্য কেউ ভাবতে পারেনি। আমি তো গিয়েছি ছিটে, ওষুধ নাই, চিকিৎসা নাই, স্কুল নাই, কিছুই নাই। আমি যেখানে গিয়েছি সে গ্রামটার না ‘দহগ্রাম’। নিজ চোখে দেখেছি তাদের কষ্ট। তাদের স্বপ্ন আমি বুঝতে পেরেছি। ‘ভূমি ও কুসুম’ যে স্বপ্ন নিয়ে লিখেছে, সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে আনন্দে কেঁদেছিলাম।

সবসময়ই নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপন্যাস তৈরি করেছেন। নানা চরিত্রকে কেন্দ্র করে উপন্যাস তৈরি করেছেন। কিন্তু নিছক নিটোল প্রেমের কোনো উপন্যাস আমরা পাইনি। এটার কারণ কি হতে পারে বা পাব কি না? প্রেম যেটা এনেছি সেটা সামগ্রিক জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে এনেছি। কিন্তু নিটোল প্রেম নিয়ে ওইভাবে ভাবিনি, যে কারণে হয়নি। যেমন ভালোবাসার প্রীতিলতা যখন লিখি, ভেবেছিলাম প্রেমের উপন্যাস লিখব। কিন্তু আমাকে চারদিক থেকে হইচই করে লিখতে বারণ করা হলো। কারণ ও তো বিপ্লবী!

কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, প্রীতিলতা রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে ভালোবাসত। কলকাতা টাউন হল মোড়ে ওর বড় ছবির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম কেন প্রীতিলতা তার প্রেমে পড়েছিল, একজন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও। অপূর্ব সুন্দর ওই ছবিটা দেখে, একটা মেয়ের ভালোলাগার জায়গা তৈরি হতেই পারে।

ছেলেটাকে দেখে তার মুগ্ধতার জায়গা তৈরি হবে না? যতই সে বিপ্লবী হোক, স্বদেশী হোক, তার মানবিক আবেগগুলো থাকবে না? আমি এই জায়গাটা দেখাতে চেয়েছিলাম। আবার তার পাশাপাশি ওর বৈপ্লবিক যা কিছু ছিল তার সবই দেখিয়েছি। কিন্তু সেখানটায় শুধু প্রেম রাখতে পারিনি। আমাকে লিখতে দিতে চায়নি এখানকার বিপ্লবীরা।

এবার একটু অন্যদিকে যাই। আপনার উপন্যাস নিয়ে সিনেমা হয়েছে। যেমন ‘হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড’। এবং পুরস্কারও পেয়েছে। সিনেমা নিয়ে আপনার কোনো চিন্তা ছিল? না। সিনেমা নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না। কিংবা আমার উপন্যাস নিয়ে কেউ কিছু করতে পারে তাও কখনো ভাবিনি।

এমন ঘটনাকে চলচ্চিত্রে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া কঠিন। সেটা একেবারে দক্ষ পরিচালক ছাড়া সম্ভব না। ‘দক্ষ পরিচালক’ শব্দটাই যথার্থ। কারণ এটা একটা ভিন্ন শিল্প। ভিন্ন আঙ্গিকে এটাকে তৈরি করতে হয়। আমি যখন লিখছি তখন এককভাবে আমি করছি কিন্তু চলচ্চিত্র কেউ এককভাবে করতে পারে না। পরিচালককে একজন ভালো গাইড হতে হবে, তার মধ্যে অভিনয়শিল্পী থাকবে, ক্যামেরাম্যান থাকবে, সংগীতের লোক থাকবে, কতকিছু থাকবে, এটা একটা সমন্বিত শিল্প। সবমিলিয়ে এটা হয়। আমার দুটি সিনেমাতেই এসবের খুব একটা হেরফের হয়নি।

শেষদিকে চলে আসছি। একজন লেখকের প্রথম কাজ লেখা। এবং সমাজ নিয়ে ভাবা। এটাই মনে হয়। কিন্তু তর্ক থাকে, একজন লেখকের সমাজে অ্যাক্টিভিটি কেমন থাকবে। বা কায়িকভাবে সমাজের পাশে কতটুকু থাকতে হয়?
আমি তো মনে করি, একজন লেখককে পুরোপুরি সমাজ উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া উচিত। শুধু লেখালেখিই তার কাজ নয়, সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে তার অবদান থাকা জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

মহিষারকান্দি গ্রামের পাকা রাস্তা কবে হবে ? দুর্ভোগে দিন কাটছে বাসিন্দাদের

মানুষের সংগ্রামই আমার পুঁজি

আপডেট টাইম : ০২:২৯:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ জুন ২০১৯

হাওর বার্তা ডেস্কঃ অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তার গল্প উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে সমকালের সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংকটের সামগ্রিকতা। বাঙালির অহংকার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তার লেখায় নতুনমাত্রা যোগ করেছে। ৭২তম জন্মদিন। শুভেচ্ছা জানিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন শিমুল জাবালি।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা

তোমাকেও শুভেচ্ছা।

আপনার শৈশব কেটেছে করতোয়ার তীরে

করতোয়া শুধু আমার শৈশবই নয়। জীবনের অস্তিত্বও। করতোয়া আমার কাছে কেবল নদী নয়। লেখালেখির সঞ্চয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে সে। আমার লেখালেখির শুরুটা সেই করতোয়ার স্মৃতি সঞ্চয় থেকেই।

শৈশব-কৈশোরে খুব ‘দস্যিপনা’ করতেন। গাছে ওঠা-লম্পঝম্প সব। যা তখনকার সামাজিক দৃষ্টিতে দৃষ্টিকটু ছিল। নানা বদ মন্তব্য শুনতে হতো। আপনি কীভাবে সামাল দিয়েছেন?

আমি খুবই ভাগ্যবান ছিলাম। বয়ঃসন্ধি কাল হলেও আমার উচ্চতার কারণে দুষ্টুমিগুলো কারও চোখে খুব আটকাত না। কারও কাছে কখনো বকা শুনিনি। এমনকি পরিবার থেকেও বাধা-নিষেধ আসেনি। যার কারণে আমি উন্মুক্তভাবে প্রকৃতি দেখতে পেরেছি।

১৯৬১ সালে কলেজজীবনে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ওই সময়ে এ রোগ সম্পর্কে কারও ধারণাও ছিল না। সেরে উঠলেন কীভাবে?

এক দিন হুট করে রাতের বেলায় বাথরুমে পরে গেলাম। ওঠার কোনো শক্তি পাইনি। বড় বোন এসে কোলে করে বিছানায় নিয়ে গেলেন। সারা রাত অসহ্য যন্ত্রণায় কেঁদেছি। আমার বাবা মশারির ভেতর সারা রাত বসে ছিলেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের কেউই রোগটা ধরতে পারেনি। সেখান থেকে আমাকে নেওয়া হলো মিশন হাসপাতাল। মিশন হাসপাতালের ডা. মালাকর (নমস্য এখনো) আমাকে নিবিড় চিকিৎসা প্রদান করলেন, না হয় আজও আমার পঙ্গু নারী হিসেবে বাঁচতে হতো। দুই মাস আমাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এরপর সুস্থ হলেও দীর্ঘদিন বাম পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছি।

এবার একটু লেখালেখির দিকে আসি, যদি আপনার গল্পের কথা বলি, আপনি ফিদেল, ম্যান্ডেলা, নেরুদা, এবং চে কে নিয়ে গল্প লিখেছেন। এর উদ্দেশ্য কি ছিল?

এদের নিয়ে গল্প লেখার ঠিক উদ্দেশ্য ওইভাবে ছিল না। শুধু পৃথিবীর বিখ্যাত মানুষকে গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করার তাগিদ ছিল। আঙ্গিকগত দিক থেকে, শিল্পের জায়গা থেকে এবং সে মানুষটির দার্শনিক বোধের জায়গা থেকে তরুণ প্রজন্মের সামনে তাদের হাজির করতে চেয়েছি। কারণ অনেক সময় বড় গবেষণালব্ধ কাজ হয়তো তরুণরা ওইভাবে পড়তে আগ্রহী হয় না। কিন্তু একটা গল্প পেলে চট করে পড়ার জন্য আগ্রহী হয়।

এসব মহান মানুষদের নিয়ে গল্প লেখার পাশাপাশি উপন্যাসও লিখেছেন। গালিবকে নিয়ে ‘যমুনা নদীর মুশায়রা’ লিখেছেন। নামকরণে এ ‘মুশায়রা’ কেন?

রাজদরবারে কবিতা পাঠের আসরকে বলা হতো মুশায়রা। গালিব একজন কবি, তার কবিসত্তার কারণেই আমি এ শব্দটি ব্যবহার করেছি। এ জন্য অনেকেই বলেছেন, এই শব্দটি নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এই উপন্যাসের নামকরণে।

আদিবাসীদের জীবনযাপন নিয়েও অনেক লিখেছেন। বিশেষ করে গল্প ও প্রবন্ধ। কিন্তু আদিবাসী গল্পে রিছিলিকে আবিষ্কার করলেন কীভাবে?

আদিবাসীদের প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধাবোধ থেকেই রিছিলকে আবিষ্কার করতে পেরেছি। পত্রিকার খবরের মাধ্যমে রিছিলকে পেয়েছি। রিছিলকে মেরে ফেলা হয়েছে তার অ-কোষ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এ ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়েছে। আমি গল্পটা ওখান থেকে নিয়েছি। মানুষ হয়ে এত নিষ্ঠুর হবে কেন একটা মানুষের প্রতি? সে তার অধিকারের কথা বলতে পারবে না? সে তার নিজের গোষ্ঠীর কথা স্মরণও করতে পারবে না? এ জন্যই তাকে গল্পের মধ্যে এনেছি। এবং তার স্ত্রীকে দিয়ে বলেছি ‘আমরা পুরো মানুষটাকে চাই। আমরা যে তাকে দাহ করব তার জন্য পুরো মানুষ চাই’।

আমার মনে হয়, ‘কাঠকয়লার ছবি’ আপনার অন্যতম উপন্যাস। যদি কেউ আমাকে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসের কথা বলে, আমি সবার আগে এ উপন্যাসের কথাই বলি। আমার বাড়ি চাঁদপুর, অথচ চা শ্রমিকের সঙ্গে চাঁদপুরেরও যে ইতিহাস আছে তা জানতাম না। চা বাগান, চা শ্রমিক, যুদ্ধশিশু এবং হাহাকার-আর্তনাদ আমাকে এখনো ভাবায়। এর ভিত্তিটা কীভাবে নির্মাণ করলেন?

কাঠকয়লার ছবি উপন্যাসটা একটা যুদ্ধশিশুকে নিয়ে। ছেলেটি এসছিল তার মাকে খুঁজতে। লারার (সেলিনা হোসেনের সন্তান, যে বেঁচে নেই) সঙ্গে পরিচয় হয় তার। লারাও গিয়েছিল তার সঙ্গে মাকে খুঁজতে। বিদেশে পালক পিতামাতার কাছে যে ঠিকানা ছিল সে ঠিকানা নিয়ে এল সে। ঠিকানায় কামরাঙ্গীরচর বস্তির কথা লেখা ছিল। কিন্তু তারা কামরাঙ্গীরচরে গিয়ে ওই বস্তি খুঁজে পায়নি, তার মাকেও খুঁজে পায়নি।

আমার বাসায় এসে ছেলেটি খুব কাঁদছিল। তখন মনে হয়েছিল, এই যুদ্ধশিশু যে তার মাকে খুঁজতে এসেছে তাকে নিয়ে আমি আমার উপন্যাস লিখব। তারপরে আমার পাশাপাশি এটাও মনে হয়েছিল, এই মা একজন চা শ্রমিকও হতে পারে! কাজেই এই চা শ্রমিকদের যেভাবে এ দেশে আনা হলো যেভাবে নির্যাতিত হলো, বিশেষ করে ১৯২১ সালে যখন তারা চাঁদপুর হয়ে যাবে তখন তাদের লঞ্চে উঠতে দিচ্ছিল না, লঞ্চটা ছেড়ে দিল। ওরা লঞ্চের কার্নিশ ধরে ঝুলে পড়ল। এরপর তাদের গুলি করে টুপটুপ করে পানিতে ফেলে দিল।

যখন এ ঘটনা পেয়েছি তখন আমার মনে হলো, এই উপন্যাসকে আরও বিস্তরভাবে ভাবতে লাগলাম। আরও জানলাম পাকিস্তানিদের দ্বারা কীভাবে চা শমিকরা নির্যাতিত হলো, গর্ভবতী হলো, সন্তানকে দত্তক দিতে বাধ্য হলো তারা। মূলত, মাদার তেরেসার কথায় তারা এ দত্তক নেওয়ার কাজটা করল। তেরেসা এখানে এসেছিলেন ’৭২-৭৩ সালে। তিনি বলেছিলেন, ‘এরা সব মানবশিশু। এদের তোমরা যদি রাখতে না চাও, মেরে ফেলো না। দত্তক দিয়ে দাও।

অনেক বিদেশি আছে যারা দত্তক নিতে চায়। তারা লালন-পালন করবে।’ তখন কোনো আইন ছিল না দত্তক দেওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে দুইটা অর্ডিন্যান্স করে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। এটা একদম রেয়ার ঘটনা। তখন আমি বললাম, এটাও আমার উপন্যাসে আসুক। এটাই এখন দিল্লিতে ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে। এরপর যা করেছি সেটা আমার বানানো গল্প। এটা সত্যিই আমার অন্যরকম উপন্যাস।

‘আমি ছিটের স্বাধীনতা চাই, আমাদের বন্দি রাখতে পারবা না’ এটা আপনার ‘ভূমি ও কুসুম’ উপন্যাসের শক্তিশালী বক্তব্য। সম্প্রতি ছিটের স্বাধীনতা আসছে এবং ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহলবিষয়ক চুক্তি করেছে। আপনার জায়গা থেকে ছিটমহলবাসীদের নিয়ে যে স্বপ্ন-কল্পনা দেখেছেন এখন সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে। নিজেকে কতটুকু সফল মনে হয়?

হ্যাঁ অবশ্যই। শেখ হাসিনাকে এ জন্য আমি স্যালুট করি, এই সমস্যাটার সমাধান করার জন্য। রাষ্ট্রক্ষমতায় তো অনেকেই ছিল, এভাবে গণমানুষের জন্য কেউ ভাবতে পারেনি। আমি তো গিয়েছি ছিটে, ওষুধ নাই, চিকিৎসা নাই, স্কুল নাই, কিছুই নাই। আমি যেখানে গিয়েছি সে গ্রামটার না ‘দহগ্রাম’। নিজ চোখে দেখেছি তাদের কষ্ট। তাদের স্বপ্ন আমি বুঝতে পেরেছি। ‘ভূমি ও কুসুম’ যে স্বপ্ন নিয়ে লিখেছে, সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে আনন্দে কেঁদেছিলাম।

সবসময়ই নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপন্যাস তৈরি করেছেন। নানা চরিত্রকে কেন্দ্র করে উপন্যাস তৈরি করেছেন। কিন্তু নিছক নিটোল প্রেমের কোনো উপন্যাস আমরা পাইনি। এটার কারণ কি হতে পারে বা পাব কি না? প্রেম যেটা এনেছি সেটা সামগ্রিক জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে এনেছি। কিন্তু নিটোল প্রেম নিয়ে ওইভাবে ভাবিনি, যে কারণে হয়নি। যেমন ভালোবাসার প্রীতিলতা যখন লিখি, ভেবেছিলাম প্রেমের উপন্যাস লিখব। কিন্তু আমাকে চারদিক থেকে হইচই করে লিখতে বারণ করা হলো। কারণ ও তো বিপ্লবী!

কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, প্রীতিলতা রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে ভালোবাসত। কলকাতা টাউন হল মোড়ে ওর বড় ছবির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম কেন প্রীতিলতা তার প্রেমে পড়েছিল, একজন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও। অপূর্ব সুন্দর ওই ছবিটা দেখে, একটা মেয়ের ভালোলাগার জায়গা তৈরি হতেই পারে।

ছেলেটাকে দেখে তার মুগ্ধতার জায়গা তৈরি হবে না? যতই সে বিপ্লবী হোক, স্বদেশী হোক, তার মানবিক আবেগগুলো থাকবে না? আমি এই জায়গাটা দেখাতে চেয়েছিলাম। আবার তার পাশাপাশি ওর বৈপ্লবিক যা কিছু ছিল তার সবই দেখিয়েছি। কিন্তু সেখানটায় শুধু প্রেম রাখতে পারিনি। আমাকে লিখতে দিতে চায়নি এখানকার বিপ্লবীরা।

এবার একটু অন্যদিকে যাই। আপনার উপন্যাস নিয়ে সিনেমা হয়েছে। যেমন ‘হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড’। এবং পুরস্কারও পেয়েছে। সিনেমা নিয়ে আপনার কোনো চিন্তা ছিল? না। সিনেমা নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না। কিংবা আমার উপন্যাস নিয়ে কেউ কিছু করতে পারে তাও কখনো ভাবিনি।

এমন ঘটনাকে চলচ্চিত্রে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া কঠিন। সেটা একেবারে দক্ষ পরিচালক ছাড়া সম্ভব না। ‘দক্ষ পরিচালক’ শব্দটাই যথার্থ। কারণ এটা একটা ভিন্ন শিল্প। ভিন্ন আঙ্গিকে এটাকে তৈরি করতে হয়। আমি যখন লিখছি তখন এককভাবে আমি করছি কিন্তু চলচ্চিত্র কেউ এককভাবে করতে পারে না। পরিচালককে একজন ভালো গাইড হতে হবে, তার মধ্যে অভিনয়শিল্পী থাকবে, ক্যামেরাম্যান থাকবে, সংগীতের লোক থাকবে, কতকিছু থাকবে, এটা একটা সমন্বিত শিল্প। সবমিলিয়ে এটা হয়। আমার দুটি সিনেমাতেই এসবের খুব একটা হেরফের হয়নি।

শেষদিকে চলে আসছি। একজন লেখকের প্রথম কাজ লেখা। এবং সমাজ নিয়ে ভাবা। এটাই মনে হয়। কিন্তু তর্ক থাকে, একজন লেখকের সমাজে অ্যাক্টিভিটি কেমন থাকবে। বা কায়িকভাবে সমাজের পাশে কতটুকু থাকতে হয়?
আমি তো মনে করি, একজন লেখককে পুরোপুরি সমাজ উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া উচিত। শুধু লেখালেখিই তার কাজ নয়, সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে তার অবদান থাকা জরুরি।