ঢাকা ১০:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বাগদান সম্পন্ন, বিয়ে হবে দেশের আইন মেনে : লুবাবা ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না: প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনে যাচ্ছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে সাক্ষাৎ : ফটিকছড়িতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০০ মার্কিন পাইলটের আবাসন গুঁড়িয়ে দিলো ইরান, বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস আওয়ামী লীগের আমলে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার : প্রধানমন্ত্রী বাসস এমডি মাহবুব মোর্শেদের নিয়োগ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন সরকারি চাকরিতে শূন্যপদ ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০ তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার! জেনে নিন তরমুজের ইতিহাস, পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং পাকা তরমুজ চেনার উপায় বুধবার শুরু ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো

তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার! জেনে নিন তরমুজের ইতিহাস, পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং পাকা তরমুজ চেনার উপায়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:১১:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার

চলছে তরমুজের মৌসুম। সবুজ আবরণের এই ফল না হলে গ্রীষ্ম ঠিক জমে না। অবশ্য তরমুজ এখন শুধু গ্রীষ্মকালেই মেলে না; প্রায় পুরো বছর বিভিন্ন আকার ও প্রজাতির দেখা যায় বাজারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এটি আসলে গরমের দিনের খাবার।

কতভাবে তরমুজ খাওয়া যায়? এখানে আমাদের হিসাবের খাতা খুলতে হবে। এক তো আছে, তরমুজ শুধু পরিষ্কার করে কেটে নিয়ে ভেতরের শাঁস খাওয়া। সেটাই আদি ও অকৃত্রিম তরমুজ খাওয়ার ধরন। এরপর আছে শরবত বানিয়ে একটু বিট লবণ ছিটিয়ে দিয়ে কিংবা তাতে হালকা গোলমরিচ অথবা শুকনো মরিচের গুঁড়া মিশিয়ে খেয়ে ফেলা। এর বাইরে আছে তরমুজ কেটে ফ্রিজে রেখে চিলড; মানে ঠান্ডা করে খাওয়া। এই তো। নাকি আরও কোনোভাবে তরমুজ খাওয়া হয় আমাদের দেশে? যা হোক, আপনারা সে হিসাব করতে থাকুন। আমরা তরমুজের ঠিকুজি খুঁজে আসি।

উৎপত্তির গল্প

তরমুজের উৎপত্তি কোথায়? লোকে তো বলেই, গবেষকেরাও বলেন, রসাল এই ফলের উৎপত্তি আফ্রিকার মরুভূমি। এর আদি নিবাস হিসেবে বলা হয় দক্ষিণ আফ্রিকার কথা। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তরমুজের বন্য প্রজাতি আজও দক্ষিণ আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমি অঞ্চলে পাওয়া যায়। উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের কোনো একসময় অভিযাত্রী ডেভিড লিভিংস্টোন এই বন্য তরমুজের দেখা পেয়েছিলেন। মজার বিষয় হলো, সেই বন্য তরমুজের রসাল অংশ ছিল বটে, কিন্তু তার স্বাদ ছিল খানিক তিতা। মোটকথা, তা আজকের মিষ্টি তরমুজের মতো ছিল না। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো মিষ্টি, হালকা মিষ্টি এবং তিতা—তিন ধরনের তরমুজের জিনগত বৈচিত্র্য দেখা যায়।

প্রাচীন মিসরে প্রথম চাষের ইতিহাস

তরমুজ চাষের ইতিহাসের প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায় নীল নদের উপত্যকায়, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মিসরের ১২তম রাজবংশের, যাদের ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব ১৯৮৫ থেকে ১৭৭৩, রাজত্ব থেকে তরমুজের বীজ আবিষ্কার করেছেন। মজার বিষয় হলো, ফারাও তুতেনখামেনের সমাধিতে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৩২৩) তরমুজের বীজ পাওয়া গেছে! মিসরীয়রা মরুভূমির পানিহীন কঠিন পরিবেশে তরমুজকে পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করত। প্রায় চার হাজার বছর আগের মিসরীয় সমাধিচিত্রে একটি বড় ডোরাকাটা তরমুজের ছবিও পাওয়া গেছে।

তরমুজের বিশ্বভ্রমণ

মানুষের মতো তরমুজও তার জন্মস্থান আফ্রিকা থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষকেরা এই ছড়িয়ে পড়ার একটি টাইমলাইনও তৈরি করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, খ্রিষ্টপূর্ব যুগে প্রাচীন গ্রিস ও রোমে তরমুজের প্রচলন ছিল। গ্রিকেরা একে ‘পেপন’ এবং রোমানরা ‘পেপো’ নামে ডাকত।

৭ শতকে ভারতবর্ষে এবং ১০ শতকে চীনে তরমুজের চাষ শুরু হয়। আর এখন চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরমুজ উৎপাদনকারী দেশ। ১৩ শতকে মুর বা মুসলিমদের মাধ্যমে তরমুজ ইউরোপে প্রবেশ করে। ১৬ শতকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক এবং আফ্রিকান ক্রীতদাসদের মাধ্যমে তরমুজ আমেরিকায় পৌঁছায়। ১৫৭৬ সালে স্পেনীয়রা ফ্লোরিডায় তরমুজ চাষ শুরু করে। ১৬২৯ সালে ম্যাসাচুসেটসে তরমুজের চাষ শুরু হয়। ১৬৬৪ সালে ফ্লোরিডার নেটিভ আমেরিকানরা তরমুজ চাষ করত বলে জানা যায়। আর ১৭ শতকে ইউরোপে তরমুজ একটি সাধারণ বাগানের ফলে পরিণত হয়।

আধুনিক যুগে তরমুজ

১৯৫৪ সালে মার্কিন কৃষিবিদ চার্লস ফ্রেডরিক অ্যান্ড্রাস চার্লস্টন গ্রে নামের একটি রোগপ্রতিরোধী তরমুজের জাত উদ্ভাবন করেন। এর আকৃতি ছিল লম্বাটে আর খোসা ছিল শক্ত। এটি সহজে সংরক্ষণ ও পরিবহন করা যেত।

এদিকে জাপানের জেনসুজি অঞ্চলের কৃষকেরা কাচের বাক্সে তরমুজ বড় করে চার কোনাকৃতির তরমুজের জন্ম দিয়েছেন! এ ছাড়া দেশটির হোক্কাইডো দ্বীপে উৎপাদিত তরমুজের খোসা কালো রঙের। জানা যায়, ২০০৮ সালের জুনে একটি ডেনসুকে তরমুজ সাড়ে ছয় হাজার ডলারে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছিল। এটিই এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে দামি তরমুজ।

তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার

আধুনিক যুগে অনেক প্রজাতির তরমুজ পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রজাতির তরমুজ বেশ জনপ্রিয়। মজার বিষয় হলো, অস্ট্রেলীয় জাতের একটি তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার! এটি বড় আকারের তরমুজ।

বিভিন্ন প্রজাতির তরমুজ

বড় অস্ট্রেলীয় তরমুজ: রেড টাইগার, বেঙ্গল টাইগার, ফ্যান্টম, ফ্যারাও, রেড ড্রাগন, জেঙ্গিস, হারকিউলিস ইত্যাদি।

ক্ষুদ্র অস্ট্রেলীয় তরমুজ: জেমিনি, মিনিলি (ওপি), বেবি লি, বেবি টাইগার, সুগার বেবি

জনপ্রিয় বীজহীন (ট্রিপ্লয়েড) অস্ট্রেলীয় জাত:হানি হার্ট (হলুদ), রেভেন (লাল), ড্রাগন হার্ট (লাল), ট্রিপল হার্ট (লাল), ব্যাংকুয়েট (লাল), গোল্ডেন একর (হলুদ) এবং সিড লেস (১৬০০)

অন্যান্য প্রজাতির মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড ব্ল্যাকিটা এফ১, হাইব্রিড মারিটা এফ১, হাইব্রিড আর্লি মারা এফ১, হাইব্রিড ফ্লোরিডা সুইট এফ১, হাইব্রিড রয়্যাল পিকক এফ১, হাইব্রিড সামান্তা এফ১ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বেশ কিছু জনপ্রিয় প্রজাতির তরমুজ চাষ হয়। এগুলোর মধ্যে আছে ব্ল্যাক সুপার। এর খোসা গাঢ় সবুজ এবং আকার লম্বা। এগুলো সাধারণত খুলনা অঞ্চলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চাষ হয়। এই অঞ্চলে আরও চাষ হয় কন্যা। এটিও লম্বা ও মাঝারি আকারের তরমুজ। খুলনা ও নড়াইলের কালিয়ায় চাষ হয় হাইব্রিড জাতের তৃপ্তি। ভোলায় চাষ হয় গ্লোরি, জাম্বু ও ড্রাগন এবং ড্রাগন সুপার। ভোলা, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনা, নোয়াখালী অঞ্চলে চাষ হয় বাংলালিংক নামের একটি হাইব্রিড জাতের তরমুজ। খুলনা, বাগেরহাটের চিংড়িঘের এলাকায় চাষ হয় থাইল্যান্ড-২, উপকূলীয় অঞ্চলে চাষ হয় বিগ টাচ নামের তরমুজ। নড়াইল ও পাবনার আটঘরিয়ায় ব্ল্যাক বেবি এবং নড়াইলের কালিয়ায় চাষ হয় এশিয়ান-২ নামের হাইব্রিড জাতের তরমুজ। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সারা দেশে চাষের উপযোগী প্রজাতি উদ্ভাবন করেছে। তার নাম বারি তরমুজ-১ ও বারি তরমুজ-২।

তরমুজ শুধু রসেই নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। প্রতি ১০০ গ্রাম তরমুজে আছে—

পানি ৯১ থেকে ৯২ শতাংশ, ক্যালরি ৩০ থেকে ৪৬ কিলোক্যালরি, শর্করা ৭ দশমিক ৫ থেকে ১২ গ্রাম, আঁশ শূন্য দশমিক ৪ থেকে ১ গ্রাম, ভিটামিন ‘সি’ ৮ থেকে ১২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ‘এ’ ২৮ থেকে ২৮৭ মাইক্রোগ্রাম, পটাশিয়াম ১১২ থেকে ১৭০ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১০ মিলিগ্রাম। এতে কোনো চর্বি নেই!

  • তরমুজ শরীরের হাইড্রেশন ও তরল ভারসাম্য রক্ষা করে। এ ছাড়া শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট লাইকোপিন থাকায় এটি ক্যানসার; বিশেষ করে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়।
  • হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়, বয়সজনিত চোখের রোগ প্রতিরোধ করে এবং শরীরের প্রদাহ কমায়। সিট্রুলিন থাকে বলে এটি হৃদ্‌রোগ ও ব্যায়ামের সহায়ক।
  • নিয়মিত তরমুজ খেলে উচ্চ রক্তচাপ কমে, ব্যায়ামের পর পেশির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে, অর্ধ-ম্যারাথন দৌড়ের আগে ৫০০ মিলিলিটার সিট্রুলিন সমৃদ্ধ তরমুজের রস পান করলে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত পেশির ব্যথা কমে যায় এবং ল্যাকটেটের মাত্রা কম থাকে।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। তরমুজে ক্যালরি কম, চর্বি নেই এবং পানি ও আঁশের পরিমাণ বেশি। তরমুজ খেলে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত পেট ভরা অনুভূতি থাকে, নিয়মিত তরমুজ খাওয়ার সঙ্গে কম শরীরের ওজন ও বিএমআইয়ের সম্পর্ক রয়েছে।
  • রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং হজমশক্তি উন্নত করে। ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘সি’ কোলাজেন উৎপাদনে সাহায্য করে, ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করে এবং সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বক রক্ষা করে।

তরমুজ বীজের পুষ্টিগুণ

তরমুজের বীজ ফেলে না দিয়ে ভাজা করে খাওয়া যায়। ভাজা বীজে থাকে ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, জিংক, মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট।

তরমুজের বীজ ভাজার নিয়ম

৩৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় অল্প তেল দিয়ে তরমুজের বীজ ১৫ থেকে ২০ মিনিট ভেজে লবণ বা মসলা মিশিয়ে খাওয়া যায়।

খোসার ব্যবহার

তরমুজের খোসা ফেলে না দিয়ে বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। যেমন—

  • বিভিন্ন সবজির সঙ্গে মিশিয়ে আমাদের দেশের কোথাও কোথাও এটি খাওয়া হয়।
  • আচার হিসেবে। এটি দক্ষিণ আমেরিকার জনপ্রিয় পদ।
  • ভাজি হিসেবে। এটি চীনে জনপ্রিয়।

ভালো তরমুজ চেনার উপায়

আকৃতি এবং ওজন: তরমুজ মজবুত, প্রতিসম এবং আকারের তুলনায় ভারী হতে হবে।

হলুদ দাগ: এর শরীরের নিচের দিকে একটি হলুদ দাগ থাকতে হবে। এটি মাটিতে থেকে পাকার লক্ষণ। দাগ যদি সাদা বা খুব ফ্যাকাশে হয়, তবে বুঝতে হবে তা অপরিপক্ব।

আওয়াজ: আঙুল দিয়ে টোকা দিলে ‘ডুম-ডুম’ বা ফাঁপা আওয়াজ পেলে বুঝতে হবে, সেটি ভালো তরমুজ।

সংরক্ষণ পদ্ধতি

  • কাটা তরমুজ ২৪ ঘণ্টা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা যায়।
  • কাটার সময় পরিষ্কার ছুরি ও বোর্ড ব্যবহার করতে হবে।
  • পুরো তরমুজ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়।

তরমুজ খাওয়ায় সতর্কতা

তরমুজে প্রাকৃতিক চিনি থাকে। তাই এটি ডায়াবেটিস রোগীদের পরিমিত খাওয়া উচিত। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর চর্বির সঙ্গে তরমুজ খাওয়া ভালো।

সূত্র: ওইউসিআই ডট ডিএনটিবি ডট জিওভি ডট ইউএ, সার্চওয়ার্কস ডট স্ট্যামফোর্ড ডট ইডিইউ, ইন্টারন্যাশনাল ট্রপিক্যাল ফ্রটস নেটওয়ার্ক (আইটিএফএনইটি ডট ওআরজি), এজিআরআইএস ডট এফএও ডট ওআরজি, লুক অ্যান্ড লার্ন ডট কম, ভেরি ওয়েল হেলথ ডট কম, নিউজ-মেডিকেল ডট নেট ও অন্যান্য

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বাগদান সম্পন্ন, বিয়ে হবে দেশের আইন মেনে : লুবাবা

তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার! জেনে নিন তরমুজের ইতিহাস, পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং পাকা তরমুজ চেনার উপায়

আপডেট টাইম : ১০:১১:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

চলছে তরমুজের মৌসুম। সবুজ আবরণের এই ফল না হলে গ্রীষ্ম ঠিক জমে না। অবশ্য তরমুজ এখন শুধু গ্রীষ্মকালেই মেলে না; প্রায় পুরো বছর বিভিন্ন আকার ও প্রজাতির দেখা যায় বাজারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এটি আসলে গরমের দিনের খাবার।

কতভাবে তরমুজ খাওয়া যায়? এখানে আমাদের হিসাবের খাতা খুলতে হবে। এক তো আছে, তরমুজ শুধু পরিষ্কার করে কেটে নিয়ে ভেতরের শাঁস খাওয়া। সেটাই আদি ও অকৃত্রিম তরমুজ খাওয়ার ধরন। এরপর আছে শরবত বানিয়ে একটু বিট লবণ ছিটিয়ে দিয়ে কিংবা তাতে হালকা গোলমরিচ অথবা শুকনো মরিচের গুঁড়া মিশিয়ে খেয়ে ফেলা। এর বাইরে আছে তরমুজ কেটে ফ্রিজে রেখে চিলড; মানে ঠান্ডা করে খাওয়া। এই তো। নাকি আরও কোনোভাবে তরমুজ খাওয়া হয় আমাদের দেশে? যা হোক, আপনারা সে হিসাব করতে থাকুন। আমরা তরমুজের ঠিকুজি খুঁজে আসি।

উৎপত্তির গল্প

তরমুজের উৎপত্তি কোথায়? লোকে তো বলেই, গবেষকেরাও বলেন, রসাল এই ফলের উৎপত্তি আফ্রিকার মরুভূমি। এর আদি নিবাস হিসেবে বলা হয় দক্ষিণ আফ্রিকার কথা। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তরমুজের বন্য প্রজাতি আজও দক্ষিণ আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমি অঞ্চলে পাওয়া যায়। উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের কোনো একসময় অভিযাত্রী ডেভিড লিভিংস্টোন এই বন্য তরমুজের দেখা পেয়েছিলেন। মজার বিষয় হলো, সেই বন্য তরমুজের রসাল অংশ ছিল বটে, কিন্তু তার স্বাদ ছিল খানিক তিতা। মোটকথা, তা আজকের মিষ্টি তরমুজের মতো ছিল না। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো মিষ্টি, হালকা মিষ্টি এবং তিতা—তিন ধরনের তরমুজের জিনগত বৈচিত্র্য দেখা যায়।

প্রাচীন মিসরে প্রথম চাষের ইতিহাস

তরমুজ চাষের ইতিহাসের প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায় নীল নদের উপত্যকায়, খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মিসরের ১২তম রাজবংশের, যাদের ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব ১৯৮৫ থেকে ১৭৭৩, রাজত্ব থেকে তরমুজের বীজ আবিষ্কার করেছেন। মজার বিষয় হলো, ফারাও তুতেনখামেনের সমাধিতে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৩২৩) তরমুজের বীজ পাওয়া গেছে! মিসরীয়রা মরুভূমির পানিহীন কঠিন পরিবেশে তরমুজকে পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করত। প্রায় চার হাজার বছর আগের মিসরীয় সমাধিচিত্রে একটি বড় ডোরাকাটা তরমুজের ছবিও পাওয়া গেছে।

তরমুজের বিশ্বভ্রমণ

মানুষের মতো তরমুজও তার জন্মস্থান আফ্রিকা থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষকেরা এই ছড়িয়ে পড়ার একটি টাইমলাইনও তৈরি করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, খ্রিষ্টপূর্ব যুগে প্রাচীন গ্রিস ও রোমে তরমুজের প্রচলন ছিল। গ্রিকেরা একে ‘পেপন’ এবং রোমানরা ‘পেপো’ নামে ডাকত।

৭ শতকে ভারতবর্ষে এবং ১০ শতকে চীনে তরমুজের চাষ শুরু হয়। আর এখন চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরমুজ উৎপাদনকারী দেশ। ১৩ শতকে মুর বা মুসলিমদের মাধ্যমে তরমুজ ইউরোপে প্রবেশ করে। ১৬ শতকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক এবং আফ্রিকান ক্রীতদাসদের মাধ্যমে তরমুজ আমেরিকায় পৌঁছায়। ১৫৭৬ সালে স্পেনীয়রা ফ্লোরিডায় তরমুজ চাষ শুরু করে। ১৬২৯ সালে ম্যাসাচুসেটসে তরমুজের চাষ শুরু হয়। ১৬৬৪ সালে ফ্লোরিডার নেটিভ আমেরিকানরা তরমুজ চাষ করত বলে জানা যায়। আর ১৭ শতকে ইউরোপে তরমুজ একটি সাধারণ বাগানের ফলে পরিণত হয়।

আধুনিক যুগে তরমুজ

১৯৫৪ সালে মার্কিন কৃষিবিদ চার্লস ফ্রেডরিক অ্যান্ড্রাস চার্লস্টন গ্রে নামের একটি রোগপ্রতিরোধী তরমুজের জাত উদ্ভাবন করেন। এর আকৃতি ছিল লম্বাটে আর খোসা ছিল শক্ত। এটি সহজে সংরক্ষণ ও পরিবহন করা যেত।

এদিকে জাপানের জেনসুজি অঞ্চলের কৃষকেরা কাচের বাক্সে তরমুজ বড় করে চার কোনাকৃতির তরমুজের জন্ম দিয়েছেন! এ ছাড়া দেশটির হোক্কাইডো দ্বীপে উৎপাদিত তরমুজের খোসা কালো রঙের। জানা যায়, ২০০৮ সালের জুনে একটি ডেনসুকে তরমুজ সাড়ে ছয় হাজার ডলারে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছিল। এটিই এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে দামি তরমুজ।

তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার

আধুনিক যুগে অনেক প্রজাতির তরমুজ পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রজাতির তরমুজ বেশ জনপ্রিয়। মজার বিষয় হলো, অস্ট্রেলীয় জাতের একটি তরমুজের নাম বেঙ্গল টাইগার! এটি বড় আকারের তরমুজ।

বিভিন্ন প্রজাতির তরমুজ

বড় অস্ট্রেলীয় তরমুজ: রেড টাইগার, বেঙ্গল টাইগার, ফ্যান্টম, ফ্যারাও, রেড ড্রাগন, জেঙ্গিস, হারকিউলিস ইত্যাদি।

ক্ষুদ্র অস্ট্রেলীয় তরমুজ: জেমিনি, মিনিলি (ওপি), বেবি লি, বেবি টাইগার, সুগার বেবি

জনপ্রিয় বীজহীন (ট্রিপ্লয়েড) অস্ট্রেলীয় জাত:হানি হার্ট (হলুদ), রেভেন (লাল), ড্রাগন হার্ট (লাল), ট্রিপল হার্ট (লাল), ব্যাংকুয়েট (লাল), গোল্ডেন একর (হলুদ) এবং সিড লেস (১৬০০)

অন্যান্য প্রজাতির মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড ব্ল্যাকিটা এফ১, হাইব্রিড মারিটা এফ১, হাইব্রিড আর্লি মারা এফ১, হাইব্রিড ফ্লোরিডা সুইট এফ১, হাইব্রিড রয়্যাল পিকক এফ১, হাইব্রিড সামান্তা এফ১ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বেশ কিছু জনপ্রিয় প্রজাতির তরমুজ চাষ হয়। এগুলোর মধ্যে আছে ব্ল্যাক সুপার। এর খোসা গাঢ় সবুজ এবং আকার লম্বা। এগুলো সাধারণত খুলনা অঞ্চলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চাষ হয়। এই অঞ্চলে আরও চাষ হয় কন্যা। এটিও লম্বা ও মাঝারি আকারের তরমুজ। খুলনা ও নড়াইলের কালিয়ায় চাষ হয় হাইব্রিড জাতের তৃপ্তি। ভোলায় চাষ হয় গ্লোরি, জাম্বু ও ড্রাগন এবং ড্রাগন সুপার। ভোলা, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনা, নোয়াখালী অঞ্চলে চাষ হয় বাংলালিংক নামের একটি হাইব্রিড জাতের তরমুজ। খুলনা, বাগেরহাটের চিংড়িঘের এলাকায় চাষ হয় থাইল্যান্ড-২, উপকূলীয় অঞ্চলে চাষ হয় বিগ টাচ নামের তরমুজ। নড়াইল ও পাবনার আটঘরিয়ায় ব্ল্যাক বেবি এবং নড়াইলের কালিয়ায় চাষ হয় এশিয়ান-২ নামের হাইব্রিড জাতের তরমুজ। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সারা দেশে চাষের উপযোগী প্রজাতি উদ্ভাবন করেছে। তার নাম বারি তরমুজ-১ ও বারি তরমুজ-২।

তরমুজ শুধু রসেই নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। প্রতি ১০০ গ্রাম তরমুজে আছে—

পানি ৯১ থেকে ৯২ শতাংশ, ক্যালরি ৩০ থেকে ৪৬ কিলোক্যালরি, শর্করা ৭ দশমিক ৫ থেকে ১২ গ্রাম, আঁশ শূন্য দশমিক ৪ থেকে ১ গ্রাম, ভিটামিন ‘সি’ ৮ থেকে ১২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ‘এ’ ২৮ থেকে ২৮৭ মাইক্রোগ্রাম, পটাশিয়াম ১১২ থেকে ১৭০ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১০ মিলিগ্রাম। এতে কোনো চর্বি নেই!

  • তরমুজ শরীরের হাইড্রেশন ও তরল ভারসাম্য রক্ষা করে। এ ছাড়া শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট লাইকোপিন থাকায় এটি ক্যানসার; বিশেষ করে প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়।
  • হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়, বয়সজনিত চোখের রোগ প্রতিরোধ করে এবং শরীরের প্রদাহ কমায়। সিট্রুলিন থাকে বলে এটি হৃদ্‌রোগ ও ব্যায়ামের সহায়ক।
  • নিয়মিত তরমুজ খেলে উচ্চ রক্তচাপ কমে, ব্যায়ামের পর পেশির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে, অর্ধ-ম্যারাথন দৌড়ের আগে ৫০০ মিলিলিটার সিট্রুলিন সমৃদ্ধ তরমুজের রস পান করলে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত পেশির ব্যথা কমে যায় এবং ল্যাকটেটের মাত্রা কম থাকে।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। তরমুজে ক্যালরি কম, চর্বি নেই এবং পানি ও আঁশের পরিমাণ বেশি। তরমুজ খেলে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত পেট ভরা অনুভূতি থাকে, নিয়মিত তরমুজ খাওয়ার সঙ্গে কম শরীরের ওজন ও বিএমআইয়ের সম্পর্ক রয়েছে।
  • রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং হজমশক্তি উন্নত করে। ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘সি’ কোলাজেন উৎপাদনে সাহায্য করে, ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করে এবং সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বক রক্ষা করে।

তরমুজ বীজের পুষ্টিগুণ

তরমুজের বীজ ফেলে না দিয়ে ভাজা করে খাওয়া যায়। ভাজা বীজে থাকে ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, জিংক, মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট।

তরমুজের বীজ ভাজার নিয়ম

৩৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় অল্প তেল দিয়ে তরমুজের বীজ ১৫ থেকে ২০ মিনিট ভেজে লবণ বা মসলা মিশিয়ে খাওয়া যায়।

খোসার ব্যবহার

তরমুজের খোসা ফেলে না দিয়ে বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। যেমন—

  • বিভিন্ন সবজির সঙ্গে মিশিয়ে আমাদের দেশের কোথাও কোথাও এটি খাওয়া হয়।
  • আচার হিসেবে। এটি দক্ষিণ আমেরিকার জনপ্রিয় পদ।
  • ভাজি হিসেবে। এটি চীনে জনপ্রিয়।

ভালো তরমুজ চেনার উপায়

আকৃতি এবং ওজন: তরমুজ মজবুত, প্রতিসম এবং আকারের তুলনায় ভারী হতে হবে।

হলুদ দাগ: এর শরীরের নিচের দিকে একটি হলুদ দাগ থাকতে হবে। এটি মাটিতে থেকে পাকার লক্ষণ। দাগ যদি সাদা বা খুব ফ্যাকাশে হয়, তবে বুঝতে হবে তা অপরিপক্ব।

আওয়াজ: আঙুল দিয়ে টোকা দিলে ‘ডুম-ডুম’ বা ফাঁপা আওয়াজ পেলে বুঝতে হবে, সেটি ভালো তরমুজ।

সংরক্ষণ পদ্ধতি

  • কাটা তরমুজ ২৪ ঘণ্টা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা যায়।
  • কাটার সময় পরিষ্কার ছুরি ও বোর্ড ব্যবহার করতে হবে।
  • পুরো তরমুজ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়।

তরমুজ খাওয়ায় সতর্কতা

তরমুজে প্রাকৃতিক চিনি থাকে। তাই এটি ডায়াবেটিস রোগীদের পরিমিত খাওয়া উচিত। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর চর্বির সঙ্গে তরমুজ খাওয়া ভালো।

সূত্র: ওইউসিআই ডট ডিএনটিবি ডট জিওভি ডট ইউএ, সার্চওয়ার্কস ডট স্ট্যামফোর্ড ডট ইডিইউ, ইন্টারন্যাশনাল ট্রপিক্যাল ফ্রটস নেটওয়ার্ক (আইটিএফএনইটি ডট ওআরজি), এজিআরআইএস ডট এফএও ডট ওআরজি, লুক অ্যান্ড লার্ন ডট কম, ভেরি ওয়েল হেলথ ডট কম, নিউজ-মেডিকেল ডট নেট ও অন্যান্য