ঢাকা ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অতিথি পাখিতে বদলে গেছে কিশোরনগর গ্রামের নিস্তরঙ্গ রূপ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৫৮:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • ৫ বার

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা সদর থেকে আগানগর সড়ক ধরে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ছোট্ট কিশোরনগর গ্রাম। মাত্র তিনটি বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা গ্রামটির চারপাশে রয়েছে সবুজ ধানক্ষেত, ছোট ছোট পুকুর এবং গাছগাছালি। এলাকাজুড়ে কোথাও বকের ঝাঁক, কোথাও পানকৌড়ির দল। পাখিদের অবিরাম ওড়াউড়ি, ছানাদের ডাক এবং বাসা বদলের ব্যস্ততায় পুরো এলাকা এক জীবন্ত পাখির রাজ্যে পরিণত হয়েছে। পাখির কলতান বদলে দিয়েছে গ্রামের চিরাচরিত নিস্তরঙ্গ রূপ।

তবে এ দৃশ্য সারা বছরের নয়। বর্ষার মেঘ কিংবা ঝুম বৃষ্টিই কেবল এই পাখিদের এখানে ডেকে আনে। তাই স্থানীয়রা এদের অতিথি পাখি বলে।

তাঁরা জানান, বর্ষা শুরু হলেই অতিথি পাখির আগমন ঘটে। শরৎ পেরিয়ে অনেক সময় হেমন্ত পর্যন্ত তারা এখানে অবস্থান করে। তবে শীতের আগেই আবার ফিরে যায় সুদূরে। গত চার বছর ধরে নিয়মিতভাবে পাখিরা এই গ্রামে আসছে। এবার আগের যেকোনো বছরের তুলনায় পাখির সংখ্যা বেশি।

পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের কিশোরনগর গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, হাজার হাজার অতিথি পাখির নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে গ্রামটি। সিরাজুল ইসলাম মাস্টারের বাড়ির পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়, তেঁতুল, কদম, আম ও নারিকেল গাছের প্রায় প্রতিটি ডালেই পাখির বাসা। বক, পানকৌড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি সেখানে ডিম পাড়ছে, ছানা ফুটাচ্ছে এবং বড় করে তুলছে।

পাখিদের নিরাপদ আবাসের খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। শ্যামপুর, সাধকপুর, জগতপুর, গোপীনাথপুর, কণ্ঠনগর, গোসাইপুর, বাহেরচর, শ্রীপুর, শিবরামপুর ও গোবিন্দপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে এই দৃশ্য দেখছেন। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন, কেউ কেউ সময় কাটাচ্ছেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে।

পাখির কলকাকলিতে নিত্য সকাল হয় এখানে। সন্ধ্যা নামে পাখির ডানায় ভর করে। ছবি: আজকের পত্রিকা

সিরাজুল ইসলাম মাস্টারবাড়ির বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন, প্রতিবেশী মনির হোসেন ও আরাফাত বলেন, প্রথম দিকে হাতে গোনা কয়েকটি পাখি আসত। বছর যেতে যেতে তাদের সংখ্যা বেড়েছে। গ্রামের মানুষ পাখিদের বিরক্ত করে না। তাঁরা চান, গ্রামটি পাখিদের জন্য অভয়াশ্রম হোক। আশপাশের বিল, পুকুর ও জলাশয়ে সহজে খাবার পাওয়ায় পাখিরা নিশ্চিন্তে এখানে থাকে। তবে মাঝে মাঝে কিছু অসাধু ব্যক্তি পাখির ছানা ধরে নেওয়ার চেষ্টা করে। এমন খবর পেলেই গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে তাদের বাধা দেন।

পাশের উপজেলা ব্রাহ্মণপাড়া থেকে পাখি দেখতে আসা পাখিপ্রেমী মো. ফারুক আহামেদ বলেন, ‘এত কাছ থেকে একসঙ্গে এত বক আর পানকৌড়ি আগে কখনো দেখিনি। পুরো জায়গাটি যেন প্রকৃতির তৈরি এক জীবন্ত পাখির উদ্যান। এটি সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে কুমিল্লার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে।’

বুড়িচং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তারেক মাহমুদ বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরনগরে অতিথি পাখির এই অভয়াশ্রমের বিষয়টি জেনেছি। খুব শিগগিরই এলাকাটি পরিদর্শন করে পাখি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগে এলাকাটি সংরক্ষণ করা হলে পাখিরা নিরাপদ আশ্রয় পাবে এবং প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্যও এটি একটি অনন্য আকর্ষণে পরিণত হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

অতিথি পাখিতে বদলে গেছে কিশোরনগর গ্রামের নিস্তরঙ্গ রূপ

আপডেট টাইম : ১১:৫৮:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা সদর থেকে আগানগর সড়ক ধরে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ছোট্ট কিশোরনগর গ্রাম। মাত্র তিনটি বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা গ্রামটির চারপাশে রয়েছে সবুজ ধানক্ষেত, ছোট ছোট পুকুর এবং গাছগাছালি। এলাকাজুড়ে কোথাও বকের ঝাঁক, কোথাও পানকৌড়ির দল। পাখিদের অবিরাম ওড়াউড়ি, ছানাদের ডাক এবং বাসা বদলের ব্যস্ততায় পুরো এলাকা এক জীবন্ত পাখির রাজ্যে পরিণত হয়েছে। পাখির কলতান বদলে দিয়েছে গ্রামের চিরাচরিত নিস্তরঙ্গ রূপ।

তবে এ দৃশ্য সারা বছরের নয়। বর্ষার মেঘ কিংবা ঝুম বৃষ্টিই কেবল এই পাখিদের এখানে ডেকে আনে। তাই স্থানীয়রা এদের অতিথি পাখি বলে।

তাঁরা জানান, বর্ষা শুরু হলেই অতিথি পাখির আগমন ঘটে। শরৎ পেরিয়ে অনেক সময় হেমন্ত পর্যন্ত তারা এখানে অবস্থান করে। তবে শীতের আগেই আবার ফিরে যায় সুদূরে। গত চার বছর ধরে নিয়মিতভাবে পাখিরা এই গ্রামে আসছে। এবার আগের যেকোনো বছরের তুলনায় পাখির সংখ্যা বেশি।

পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের কিশোরনগর গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, হাজার হাজার অতিথি পাখির নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে গ্রামটি। সিরাজুল ইসলাম মাস্টারের বাড়ির পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়, তেঁতুল, কদম, আম ও নারিকেল গাছের প্রায় প্রতিটি ডালেই পাখির বাসা। বক, পানকৌড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি সেখানে ডিম পাড়ছে, ছানা ফুটাচ্ছে এবং বড় করে তুলছে।

পাখিদের নিরাপদ আবাসের খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। শ্যামপুর, সাধকপুর, জগতপুর, গোপীনাথপুর, কণ্ঠনগর, গোসাইপুর, বাহেরচর, শ্রীপুর, শিবরামপুর ও গোবিন্দপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে এই দৃশ্য দেখছেন। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন, কেউ কেউ সময় কাটাচ্ছেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে।

পাখির কলকাকলিতে নিত্য সকাল হয় এখানে। সন্ধ্যা নামে পাখির ডানায় ভর করে। ছবি: আজকের পত্রিকা

সিরাজুল ইসলাম মাস্টারবাড়ির বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন, প্রতিবেশী মনির হোসেন ও আরাফাত বলেন, প্রথম দিকে হাতে গোনা কয়েকটি পাখি আসত। বছর যেতে যেতে তাদের সংখ্যা বেড়েছে। গ্রামের মানুষ পাখিদের বিরক্ত করে না। তাঁরা চান, গ্রামটি পাখিদের জন্য অভয়াশ্রম হোক। আশপাশের বিল, পুকুর ও জলাশয়ে সহজে খাবার পাওয়ায় পাখিরা নিশ্চিন্তে এখানে থাকে। তবে মাঝে মাঝে কিছু অসাধু ব্যক্তি পাখির ছানা ধরে নেওয়ার চেষ্টা করে। এমন খবর পেলেই গ্রামের মানুষ একজোট হয়ে তাদের বাধা দেন।

পাশের উপজেলা ব্রাহ্মণপাড়া থেকে পাখি দেখতে আসা পাখিপ্রেমী মো. ফারুক আহামেদ বলেন, ‘এত কাছ থেকে একসঙ্গে এত বক আর পানকৌড়ি আগে কখনো দেখিনি। পুরো জায়গাটি যেন প্রকৃতির তৈরি এক জীবন্ত পাখির উদ্যান। এটি সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে কুমিল্লার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে।’

বুড়িচং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তারেক মাহমুদ বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশোরনগরে অতিথি পাখির এই অভয়াশ্রমের বিষয়টি জেনেছি। খুব শিগগিরই এলাকাটি পরিদর্শন করে পাখি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগে এলাকাটি সংরক্ষণ করা হলে পাখিরা নিরাপদ আশ্রয় পাবে এবং প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্যও এটি একটি অনন্য আকর্ষণে পরিণত হবে।