মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বহুল আলোচিত বৈঠকের দিকে গভীর নজর রাখছে ইরান। তেহরানের মূল দৃষ্টি এখন ওয়াশিংটনের দিকে—যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনার পথ বেছে নেবে, নাকি পুনরায় সামরিক সংঘাতের দিকে হেঁটে অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলবে?
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর প্রথম সরাসরি বৈঠক। যুদ্ধ সাময়িকভাবে ঝিমিয়ে পড়লেও পরবর্তী পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে—তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে হোয়াইট হাউসের এই বৈঠকের সিদ্ধান্তের ওপর। ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতি-নির্ধারকরা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও সামরিক চাপের কৌশলে ফিরে যাবে নাকি কূটনীতির সুযোগ বজায় রাখবে।
কেন এই বৈঠক নিয়ে সন্দিহান ইরান?
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি নেতাদের এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসন ঘটতে দেখা গেছে। ফলে তেহরানের নীতি-নির্ধারকরা এই বৈঠককে চরম সন্দেহের চোখে দেখছেন।
ইরানের বিচারমন্ত্রীর উপদেষ্টা মজিদ সাজ্জাদি পানাহ স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলে—এ ধরনের বৈঠক মূলত সামরিক হামলার আগে একটি কূটনৈতিক আড়াল বা অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তিনি ইতিহাস থেকে একাধিক উদাহরণ টেনে বলেন, ১৯৮১ সালে ইরাকের ‘ওসিরাক’ পারমাণবিক চুল্লিতে ইসরাইলি হামলার আগে কূটনৈতিক যোগাযোগ, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের পর ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সমন্বয় এবং সর্বশেষ ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর আগে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা বৈঠকগুলোর ধরন একই রকম ছিল।
তাই বর্তমান বৈঠকের টাইমিং বা সময় নিয়ে দুটি প্রধান আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—হয় এই শীর্ষ বৈঠকের আগে কোনো পক্ষই নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, অথবা ইতিমধ্যেই সামরিক হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে যা বৈঠক শেষের পরপরই বাস্তবায়ন করা হতে পারে।
পুনরায় কি যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে?
ইরান এখনই নিশ্চিত করে বলছে না যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী, তবে তারা মনে করে এই বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা ঠিক করে দেবে।
হোয়াইট হাউসের এই আলোচনা এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন নেপথ্যে পর্দার আড়ালে অপ্রত্যক্ষ কূটনীতি সচল রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, উভয় পক্ষকে গত মাসের সমঝোতা স্মারক মেনে চলার জন্য মধ্যস্থতাকারীরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৈঠকে ইরান প্রসঙ্গটিই সবচেয়ে বড় জায়গা জুড়ে থাকবে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখার পক্ষে যুক্তি দিলেও, ট্রাম্প এ বছরের শুরুতে হওয়া ব্যয়বহুল সংঘাতের পর পুনরায় আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখতে আগ্রহী বলে জানা গেছে।বৈঠকে যেসব বিষয় প্রাধান্য পাবে
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার শীর্ষ তালিকায় থাকলেও তেহরানের বিশ্বাস, আলোচনা শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ইরানি সূত্রটি জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান ওয়াশিংটনকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে—যুক্তরাষ্ট্রকে আগে তাদের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে, গত মাসের সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে এবং লেবাননে সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধসহ দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে সরে আসার প্রথম শর্তটি ইসরাইলকে মেনে চলতে হবে। এই শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরান কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
এছাড়া হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো, যেখানে তৃতীয় কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পক্ষকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে—তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই বিষয়ে যেকোনো আলোচনা কেবল ওমানের সাথেই অনুষ্ঠিত হবে, কারণ ওমানকেই তারা এ বিষয়ে একমাত্র বৈধ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গণ্য করে।
ইরান ছাড়াও লেবানন সংকট, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কথা হতে পারে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে কোনো মতপার্থক্য আছে?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, যুদ্ধপরবর্তী ইরান কৌশল নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। নেতানিয়াহু যেখানে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি ধরে রাখার পক্ষে, ট্রাম্প সেখানে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এছাড়া লেবানন পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবের সাথে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি নিয়েও দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
তবে তেহরানের বিশ্লেষকরা মনে করেন না যে এই মতপার্থক্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অক্ষের মূল সম্পর্কে কোনো ফাটল ধরাবে। বরং তেহরান এটি দেখতে চায় যে—যে যুদ্ধ কোনো সিদ্ধান্তমূলক ফল আনতে পারেনি এবং সব পক্ষেরই বিশাল সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছে, সেটির পর ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার তালিকায় কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না।
সমান্তরালভাবে চলা এই কূটনৈতিক প্রয়াসগুলো টিকবে কি না, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটন থেকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বৈঠক শেষে কী বার্তা আসে তার ওপর।
Reporter Name 
























