ঢাকা ০৪:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মাছের ভাণ্ডার হাওর মাছশূন্য

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪০:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • ৩২৬ বার

মাছের ভাণ্ডার বলে খ্যাত কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে দেশী প্রজাতির অনেক মাছ। কৃষি জমিতে যত্রতত্র এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, অবাধে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন এসব মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, জলাশয় ভরাট, মাছের অভয়াশ্রম কমে যাওয়া, ইঞ্জিনচালিত নৌকার অবাধ চলাচল ইত্যাদি কারণে দেশী প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে ২৬০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪২ প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তপ্রায়। এর মধ্যে রয়েছে চিতল, টাকি, ফলি, অ্যালোং, টাটকিনি, খোকশা, কুকশা, কানাবাটা, নান্দিনা, ঘোড়া খুইখ্যা, সরপুঁটি, বোল, দারকিনা, মহাশোল, পিপলা শোল, রানী, আইড়, রিটা, মধু পাবদা, কাজলি, বাচা, শিলং, পাঙ্গাশ, বাঘাইর, সিসর, চেকা, গাং মাগুর, কুচিয়া, চান্দা, ভেদা, নাপিত কৈ, তারা বাইম, শাল বাইম, তেলো টাকি ইত্যাদি।
স্থানীয়রা জানান, মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে যেসব জলমহাল ইজারা নেয়া হয়, সেসব সমিতির ৮০ ভাগই অপেশাদার বা নামধারী জেলে। সরকারি জলমহালগুলো সঠিক নীতিমালা অনুযায়ী ইজারা বা বন্দোবস্ত না দেয়ায় একদিকে যেমন পেশাদার জেলেরা বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে জেলেদের নামে প্রভাবশালী লোকজন জলমহাল ইজারা নিয়ে যথেচ্ছাচার করছে। ফলে মাছের অভয়াশ্রম নষ্ট হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে মাছের বংশ বৃদ্ধি। জেলার হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল প্রাকৃতিকভাবেই মাছের অভয়াশ্রম ছিল। কিন্তু এখন ইঞ্জিনচালিত ট্রলার পুরো হাওরাঞ্চল জুড়ে যেভাবে চলাচল করছে, তাতে এসব ট্রলারের তেল নিঃসরণ ও ইঞ্জিনের শব্দে মাছের স্বাভাবিক চলাফেরা ও প্রজনন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

এছাড়া, ইজারাপ্রাপ্ত জলমহালে ব্রুড ফিশ বা মা মাছ শিকার না করার আইন থাকলেও কেউ তা মানছে না। জলমহাল ইজারা নিয়ে ইজারাদাররা মুনাফার লোভে মাতৃমাছ বা ডিমওয়ালা মাছ এবং পোনামাছ বিবেচনায় না নিয়ে নির্বিচারে মাছ আহরণ করেন। এর ফলে স্থানীয় জাতের মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. মজিবুর রহমান জানান, জাতীয়ভাবে আমাদের দেশে মৎস্য উৎপাদন হয় বছরে ৩৪ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জে উৎপাদন হয় ৬৭ হাজার ৫৩৫ টন। জেলায় উৎপাদিত মাছের মধ্যে আহরিত মাছের পরিমাণ ৩৫ হাজার ৫৩৫ টন এবং চাষকৃত মাছের পরিমাণ ৩২ হাজার টন। তবে মিঠা পানির মাছের মধ্যে ২৮টি প্রজাতি বিপন্ন পর্যায়ে এবং ১৪টি প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তবে অনেক বিপন্ন প্রজাতির প্রাপ্যতা এখন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাছের উৎপাদন আরও বাড়ানোর জন্য অপরিকল্পিত মৎস্য আহরণ বন্ধ করে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির উদ্যোগ নেয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, হাওরাঞ্চলে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ২০১০ সালে ১৮টি উপজেলা নিয়ে হাওরাঞ্চলে মৎস্যচাষ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প শুরু হয়। পরে আরও ৩০টি উপজেলাকে এর আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া আরও ২১টি উপজেলাকে এর আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ চলছে। ফলে হাওরাঞ্চল সহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বাড়বে।
তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, যে হারে মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কিশোরগঞ্জে মাছের আকাল পড়বে। চাষাবাদের মাধ্যমে বড় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও ছোট মাছ কমে যাচ্ছে। স্থানীয় জাতের এসব ছোট মাছ রক্ষার জন্য কার্যকর কোন উদ্যোগও নেই। এব্যাপারে সঠিক নীতিমালা অনুযায়ী জলমহালের ইজারা বন্দোবস্ত, জলমহাল সংস্কার, প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় তদারকি, মাছের অভয়াশ্রম নির্মাণ, অবাধে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন বন্ধ করা জরুরি বলেও তারা অভিমত দেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

মাছের ভাণ্ডার হাওর মাছশূন্য

আপডেট টাইম : ১১:৪০:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫

মাছের ভাণ্ডার বলে খ্যাত কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে দেশী প্রজাতির অনেক মাছ। কৃষি জমিতে যত্রতত্র এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, অবাধে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন এসব মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, জলাশয় ভরাট, মাছের অভয়াশ্রম কমে যাওয়া, ইঞ্জিনচালিত নৌকার অবাধ চলাচল ইত্যাদি কারণে দেশী প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে ২৬০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪২ প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তপ্রায়। এর মধ্যে রয়েছে চিতল, টাকি, ফলি, অ্যালোং, টাটকিনি, খোকশা, কুকশা, কানাবাটা, নান্দিনা, ঘোড়া খুইখ্যা, সরপুঁটি, বোল, দারকিনা, মহাশোল, পিপলা শোল, রানী, আইড়, রিটা, মধু পাবদা, কাজলি, বাচা, শিলং, পাঙ্গাশ, বাঘাইর, সিসর, চেকা, গাং মাগুর, কুচিয়া, চান্দা, ভেদা, নাপিত কৈ, তারা বাইম, শাল বাইম, তেলো টাকি ইত্যাদি।
স্থানীয়রা জানান, মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে যেসব জলমহাল ইজারা নেয়া হয়, সেসব সমিতির ৮০ ভাগই অপেশাদার বা নামধারী জেলে। সরকারি জলমহালগুলো সঠিক নীতিমালা অনুযায়ী ইজারা বা বন্দোবস্ত না দেয়ায় একদিকে যেমন পেশাদার জেলেরা বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে জেলেদের নামে প্রভাবশালী লোকজন জলমহাল ইজারা নিয়ে যথেচ্ছাচার করছে। ফলে মাছের অভয়াশ্রম নষ্ট হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে মাছের বংশ বৃদ্ধি। জেলার হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল প্রাকৃতিকভাবেই মাছের অভয়াশ্রম ছিল। কিন্তু এখন ইঞ্জিনচালিত ট্রলার পুরো হাওরাঞ্চল জুড়ে যেভাবে চলাচল করছে, তাতে এসব ট্রলারের তেল নিঃসরণ ও ইঞ্জিনের শব্দে মাছের স্বাভাবিক চলাফেরা ও প্রজনন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

এছাড়া, ইজারাপ্রাপ্ত জলমহালে ব্রুড ফিশ বা মা মাছ শিকার না করার আইন থাকলেও কেউ তা মানছে না। জলমহাল ইজারা নিয়ে ইজারাদাররা মুনাফার লোভে মাতৃমাছ বা ডিমওয়ালা মাছ এবং পোনামাছ বিবেচনায় না নিয়ে নির্বিচারে মাছ আহরণ করেন। এর ফলে স্থানীয় জাতের মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. মজিবুর রহমান জানান, জাতীয়ভাবে আমাদের দেশে মৎস্য উৎপাদন হয় বছরে ৩৪ লাখ ১০ হাজার টন। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জে উৎপাদন হয় ৬৭ হাজার ৫৩৫ টন। জেলায় উৎপাদিত মাছের মধ্যে আহরিত মাছের পরিমাণ ৩৫ হাজার ৫৩৫ টন এবং চাষকৃত মাছের পরিমাণ ৩২ হাজার টন। তবে মিঠা পানির মাছের মধ্যে ২৮টি প্রজাতি বিপন্ন পর্যায়ে এবং ১৪টি প্রজাতি ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তবে অনেক বিপন্ন প্রজাতির প্রাপ্যতা এখন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাছের উৎপাদন আরও বাড়ানোর জন্য অপরিকল্পিত মৎস্য আহরণ বন্ধ করে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির উদ্যোগ নেয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, হাওরাঞ্চলে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ২০১০ সালে ১৮টি উপজেলা নিয়ে হাওরাঞ্চলে মৎস্যচাষ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প শুরু হয়। পরে আরও ৩০টি উপজেলাকে এর আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া আরও ২১টি উপজেলাকে এর আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ চলছে। ফলে হাওরাঞ্চল সহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বাড়বে।
তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, যে হারে মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কিশোরগঞ্জে মাছের আকাল পড়বে। চাষাবাদের মাধ্যমে বড় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও ছোট মাছ কমে যাচ্ছে। স্থানীয় জাতের এসব ছোট মাছ রক্ষার জন্য কার্যকর কোন উদ্যোগও নেই। এব্যাপারে সঠিক নীতিমালা অনুযায়ী জলমহালের ইজারা বন্দোবস্ত, জলমহাল সংস্কার, প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় তদারকি, মাছের অভয়াশ্রম নির্মাণ, অবাধে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন বন্ধ করা জরুরি বলেও তারা অভিমত দেন।