হাওর বার্তা ডেস্কঃ আমাদের সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে, হাজী মানেই সাচ্চা-পাক্কা ঈমানদার খাঁটি একজন মানুষ। হাজী মানেই নিষ্কলুষ, নির্ভেজাল, নিষ্পাপ একজন কামেল ইনসান। এ ধারণা আর প্রত্যাশার কারণেই হাজী সাহেব কোনো অসঙ্গত বা গর্হিত কাজকর্মে জড়িয়ে পড়লে মানুষ তাকে একহাত নেয়, নেহাত বাজে রকমের ভর্ৎসনা দেয় এমনকি ইসলামের অন্যতম ভিত্তিমূল হজকেই দোষারোপ করতে শুরু করে কেউ কেউ
মহান আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে, তিনি হজের মতো একটি সর্বকল্যাণকর ইবাদত সামর্থ্যবানদের ওপর ফরজ করেছেন, যা হজব্রত পালনকারী হাজীকে ধারাবাহিক পুণ্যবান হতে সাহায্য করে। প্রকৃতপক্ষে ১২ মাসের একটি মাস রমজানুল মোবারকে সিয়াম সাধনাকে ফরজ করে আল্লাহ তায়ালা যেমনিভাবে মানবজাতিকে ধৈর্য, সংযম ও খোদাভীতির এক অনন্য অনুশীলন শিখিয়েছেন, তদ্রপ সামর্থ্যবানদের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ করে দয়াময় তাঁর বান্দাদের প্রভুপ্রেমের এক মহান প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন।
মুসলমানদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সম্মিলন, সেতুবন্ধ ও পারস্পরিক সৌহার্দ প্রতিষ্ঠায় হজ এক অদ্বিতীয় মাধ্যম, অনন্য ইবাদত। হজের মাধ্যমে হাজীদের মাঝে একদিকে আসে রবের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার মাহেন্দ্রক্ষণ, অন্যদিকে হজ মৌসুমের পুরো সময়কালে ভ্রাতৃত্ব ও আত্মত্যাগের এক সুমহান সবক পান প্রত্যেক হাজী। বাইতুল্লাহর হাজরে আসওয়াদ, মুলতাজাম, জমজম কূপ ও মাতাফসহ কাবার প্রতিটা স্থানই হাজীকে আল্লাহর নৈকট্যলাভে উৎসাহিত করে। আরাফা, মুজদালিফা, মিনা, জাবালে রহমত ও হেরা গুহাসহ আল্লাহকে চিনিয়ে দেয়ার এসব পবিত্র স্থান হাজীর কলবে এনে দেয় এক আধ্যাত্মিক কল্লোল। আল্লাহকে চেনার এসব নিদর্শনাবলিকে যে কেউ পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাভরে অবলোকন ও প্রদক্ষিণ করবে, আল্লাহ তার হৃদয়কে খোদাভীতি দিয়ে প্রাচুর্যপূর্ণ করে দেবেন। (সূরা হজ : ৩২)।
আমাদের সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে, হাজী মানেই সাচ্চা-পাক্কা ঈমানদার খাঁটি একজন মানুষ। হাজী মানেই নিষ্কলুষ, নির্ভেজাল, নিষ্পাপ একজন কামেল ইনসান। এ ধারণা আর প্রত্যাশার কারণেই হাজী সাহেব কোনো অসঙ্গত বা গর্হিত কাজকর্মে জড়িয়ে পড়লে মানুষ তাকে একহাত নেয়, নেহাত বাজে রকমের ভর্ৎসনা দেয় এমনকি ইসলামের অন্যতম ভিত্তিমূল হজকেই দোষারোপ করতে শুরু করে কেউ কেউ।
এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বড় কথা হলো, হাজীকে যে মানুষ নিষ্পাপ ভাবে, এ ভাবনাটা এমনি এমনি আসেনি মানুষের ভেতর, বরং এটি হাদিস থেকে আহরিত ও প্রাপ্ত ধারণা। এরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি হজ করল আর যৌনতা বা নিষিদ্ধ (হজ মৌসুমে) কোনো গোনাহের কাজে জড়িত হলো না, সে হজ থেকে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে বাড়ি ফেরে।’ (বোখারি : ১৫২১, মুসলিম : ১৩৫০)। এছাড়া সূরা বাকারার ১৯৭নং আয়াতেও একই কথা বলা হয়েছে, রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজের মৌসুমে হজ করার নিয়ত করে অর্থাৎ ইহরাম বেঁধে ফেলে, তার জন্য যৌনকার্য, অশোভন কাজ ও ঝগড়াবিবাদ জায়েজ নেই।’
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, হাজী সাহেবের হজ পরিপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হলেই তিনি পাপমুক্ত হবেন। সুতরাং যেমনিভাবে সব হাজীর হজ ত্রুটিমুক্ত নয়, তেমনিভাবে সব হাজীর হজ-পরবর্তী জীবনও ত্রুটিমুক্ত হয় না।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যক মানুষ তার আমলের ইহকালীন ও পরকালীন ফায়দা তখনই পাবে, যখন সংশ্লিষ্ট আমলের জন্য তার নিয়ত বিশুদ্ধ হবে। সুতরাং শুধু আল্লাহর হুকুম পালন ও তাকে সন্তুষ্ট করার নিয়ত ছাড়া যে হজ হবে, সে হজ নিয়তে গলদ থাকার কারণে হাজীকে ধারাবাহিক পুণ্যবান হতে সাহায্য করবে না। এরশাদ হয়েছে ‘প্রত্যেক আমলই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বোখারি, খ- ১, পৃ. ১)। শুধু হজই নয়, সব আমলকে আল্লাহ তায়ালা বিশুদ্ধ নিয়তে সম্পাদন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘মানুষকে শুধু খালেছ আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ নিয়তে ইবাদত করার হুকুম দেয়া হয়েছে।’ (সূরা বাইয়িনাহ : ০৫)।
তৃতীয়ত, অনেকেই হাজীদের দোষারোপ করতে গিয়ে পুরো হজের বিধানটাকেই খাটো করা শুরু করে দেন, এটা নিছক অজ্ঞতা থেকেই মানুষ করে। কারণ কোনো একজন মানুষের ব্যক্তিগত কাজকর্ম বা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের কর্মকা-ের কারণে একটা খোদায়ি বিধানকে খাটো করা অযৌক্তিক। বিষয়টি বোঝানোর জন্য সহজ একটা উদাহরণ দেয়া যাক ধরুন আপনি আপনার শারীরিক কোনো সমস্যার কারণে ‘হেলথকেয়ার’ কোম্পানির ওষুধ সেবন করলেন, সেটা আপনার রোগ কমাতে ব্যর্থ হলো। অথচ একই ওষুধ একই রোগের জন্য হাজারো রোগীকে সুস্থ করে তুলতে সহায়ক হচ্ছে। সুতরাং আপনি একটি ট্যাবলেট কাজ না করার কারণে পুরো কোম্পানিকেই দোষ দিতে পারেন না। কারণ, হতে পারে আপনার রোগের ধরন আলাদা, আপনাকে ওই ওষুধের সঙ্গে আরও কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তদ্রপ সব হাজীর রিপুর গতি ও অবস্থা একইরকম থাকে না। হজ ছাড়াও আরও কিছু বিশেষ আমলের প্র্যাকটিস নিয়মিত করলে, কিছু নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করলে হাজী পাপমুক্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে পারবেন বলে আশা রাখি।
চতুর্থত, নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত সবগুলো ইবাদতই ফরজ। আর সব ফরজ ইবাদত পালন করারই দাবি হলো গোনাহমুক্ত হয়ে যাওয়া। শুধু হজের পর গোনাহমুক্ত হতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। নামাজের ব্যাপারে তো সরাসরি কোরআনেই ঘোষণা আছে যে, ‘নামাজ যাবতীয় মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে নামাজিকে বাঁচিয়ে রাখে।’ (সূরা আনকাবুত : ৪৪)। তারপরও তো আমরা অনেক পাক্কা নামাজিকে পাপকর্মে লিপ্ত দেখি। এখানেও ওই একই কারণ, নামাজিকে তার নামাজ তখনই যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখবে, যখন তার নামাজ ইসলামী শরিয়ত কর্তৃক আরোপিত সব শর্তাবালি ঠিক রেখে, খালেছ নিয়তে পড়া হবে। কেউ অসম্পূর্ণ নামাজ পড়ে যদি অবৈধ কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে না পারে, আর নামাজকে দোষ দেয়, তাহলে সে অযৌক্তিক ও অবাস্তব বিষয়ের চর্চা করে। তেমনিভাবে কেউ হারাম মাল দ্বারা বা পাপযুক্ত অথবা লোকদেখানোর নিয়তে হজ করলে সে ধারাবাহিক পুণ্যবান হবে না, এটাই স্বাভাবিক।
সবশেষ কথা হলো, আল্লাহর হুকুম মানার সম্পর্ক হলো ঈমানের সঙ্গে। যেমন আমি হজ করেছি, এ জন্যই আমাকে ভালো থাকতে হবে, আর অন্যরা যা খুশি তাই করে বেড়াবে, বিষয়টি কখনোই এমন নয়। আমি মুসলমান, আমি ঈমানদার এই মুসলিম হওয়া আর ঈমানদার হওয়ার দাবিই হলো পাপমুক্ত জীবনযাপন করা। হজ করার তৌফিক হলেও আমাকে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে আর হজ করার তৌফিক না হলেও আমাকে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতে হবে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘হে ইমানদাররা তোমরা আল্লাহকে যথার্থরূপে ভয় করো এবং পরিপূর্ণ মুসলিম না হয়ে কবরে এসো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০২)।
Reporter Name 

























