ঢাকা ১০:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িদের উপস্থিতিতে যে আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর বিতর্ক চর্চাকে শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আগ্রহী তথ্যমন্ত্রী বাংলাদেশ কোথায় যাবে, তা অন্য রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে না: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতায় ভিভো হরমুজ প্রণালি বন্ধে ইরানের ঘোষণার পর সতর্ক মার্কিন বাহিনী হাওরের কৃষকদের সাড়ে ৭ হাজার টাকা সহায়তা দেবে সরকার হাওরে দুর্যোগ : কী হবে বিচার চাহিয়া বন্ধু আর আব্বুকে নিয়ে ব্রাজিলের খেলা দেখতেই বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় এসেছি ৪৫ দিন কলা খেলে কী ঘটে শরীরে হেলথ কার্ড, বিশেষায়িত হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যখাতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা

মধুর ক্যান্টিন একটি ইতিহাস

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৭:৪২:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৭
  • ৫১৪ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা প্রতিটা আন্দোলনের স্মৃতির স্পর্শে নীরব সাক্ষী হয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিন। বাঙালির ইতিহাসের অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের স্থান পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ মধুর ক্যান্টিন।

মধুর স্টল, মধুর টি-স্টল, মধুর রেস্তোরাঁ থেকে সময়ের ব্যবধানে মধুর ক্যান্টিন নামটিই যেন একটি ইতিহাস। স্বাধীনচেতা বাঙালির প্রতিটা আন্দোলন সংগ্রামের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে মধুর ক্যান্টিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আসে এই ক্যান্টিন থেকেই। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সব আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক এই ক্যান্টিনটি। বাংলাদেশের রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ক্যান্টিনটির নাম- মধুর ক্যান্টিন।

আজকের মধুর ক্যান্টিনের ভবনটি ছিল শ্রীনগরের জমিদারের জলসাঘর বা বাগানবাড়ি। শ্রীনগর থেকে জমিদারের লোকজন এখানে এসে আনন্দফূর্তির মাধ্যমে সময় কাটাতেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এই বাগানবাড়ির দরবার ঘরেই হয় ক্যান্টিনটি। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের পাশে অবস্থিত। মধুর ক্যান্টিনের মূল প্রতিষ্ঠাতা মধুসূদন দের বাবা আদিত্য চন্দ্র। আদিত্য চন্দ্র প্রতিষ্ঠাতা হলেও তার ছোট ছেলে মধুসূদনের নামেই পরিচিতি লাভ করে ক্যান্টিনটি।

আদিত্য চন্দ্র হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্যান্টিনের দায়িত্ব পড়ে মধুসূদনের ওপর। মধুসূদন দের বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। যদিও তিনি ১৯৩৪ কিংবা ৩৫ সাল থেকেই বাবার সঙ্গে সেখানে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের ২০ বৈশাখ ডাকসুর উদ্যোগে এই ক্যান্টিনের নাম হয় ‘মধুর রেস্তোরাঁ’। এটি ‘মধুর স্টল, ‘মধুর টি-স্টল’ নামেও পরিচিত ছিল।

সততার জন্য মধুসূদন ছাত্র-শিক্ষকসহ সবার কাছে ছিলেন বিশ্বস্ত, যে কারণে ক্যান্টিনটি ক্রমেই ছাত্র রাজনীতির মূল খুঁটিতে রূপান্তরিত হয়। ঊনসত্তর থেকে একাত্তর পর্যন্ত বহু গোপন বৈঠক মধুর ক্যান্টিনে হয়েছে।

রাজনীতিবিদদের ভালো সম্পর্ক এবং ক্যান্টিনটি তৎকালীন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর রোষানলে পড়েন মধুসূদন। ২৫ মার্চ রাতে কামানের গোলায় জর্জরিত হয় মধুর ক্যান্টিন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে সপরিবারে নিহত হন সবার প্রিয় মধুদা। বেঁচে যাওয়া সদস্যরা চলে যান ভারতে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মধুদার ছেলে অরুণ কুমার দে দেশে ফিরে ফের মধুর ক্যান্টিনকে গতিময় করেন।

এটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামে পরিচিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীরা সংক্ষেপে ডাকেন ‘মধু’ বলে। ক্যান্টিনের সামনে যেতেই চোখে পড়ে শহীদ মধুদার স্মৃতি ভাস্কর্য।

মধুর ক্যান্টিনে উঠতি লেখক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, ক্রীড়াবিদ, সেরা ছাত্র, ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ভিড় ছিল সবসময়। অনেকেই দাম মেটাতেন, কেউ কেউ লিখে রাখতে বলতেন। মধুদার হিসাবের খাতাটি নিয়েও রঙ্গ-রসিকতার কম ছিল না। খাতাটির শিরোনাম ছিল `না দিয়া উধাও`। ওই খাতায় এককালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজ, শামসুর রহমান, আহমদ ফজলুর রহমানসহ অনেক কৃতী ব্যক্তিত্বের নাম ছিল। ষাটের দশকে অনেকেই `না দিয়া উধাও` খাতায় স্থান করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে মিজানূর রহমান শেলী, জিয়াউদ্দীন, কাজী জাফর আহমদ, মহীউদ্দীন, আতাউর রহমান কায়সার, রেজা আলী, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, ওয়ালীউল ইসলাম, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, রফিক আজাদ প্রমুখ।


মধুর ক্যান্টিনে রাজধানীর আড্ডার পাশাপাশি ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতির আড্ডাও। অনেক কবি, লেখকও জমিয়ে আড্ডা দিতেন মধুদার ক্যান্টিনে। কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূরসহ অসংখ্য গুণীজন পদচারণায় ধন্য করেছেন এ ক্যান্টিনকে। কবি নির্মলেন্দু গুণের মতো এখনও যারা জীবিত আছেন, তারা সময় পেলেই এখনো ঘুরে যান মধুর ক্যান্টিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িদের উপস্থিতিতে যে আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

মধুর ক্যান্টিন একটি ইতিহাস

আপডেট টাইম : ০৭:৪২:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা প্রতিটা আন্দোলনের স্মৃতির স্পর্শে নীরব সাক্ষী হয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিন। বাঙালির ইতিহাসের অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের স্থান পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ মধুর ক্যান্টিন।

মধুর স্টল, মধুর টি-স্টল, মধুর রেস্তোরাঁ থেকে সময়ের ব্যবধানে মধুর ক্যান্টিন নামটিই যেন একটি ইতিহাস। স্বাধীনচেতা বাঙালির প্রতিটা আন্দোলন সংগ্রামের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে মধুর ক্যান্টিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আসে এই ক্যান্টিন থেকেই। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সব আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক এই ক্যান্টিনটি। বাংলাদেশের রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ক্যান্টিনটির নাম- মধুর ক্যান্টিন।

আজকের মধুর ক্যান্টিনের ভবনটি ছিল শ্রীনগরের জমিদারের জলসাঘর বা বাগানবাড়ি। শ্রীনগর থেকে জমিদারের লোকজন এখানে এসে আনন্দফূর্তির মাধ্যমে সময় কাটাতেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এই বাগানবাড়ির দরবার ঘরেই হয় ক্যান্টিনটি। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের পাশে অবস্থিত। মধুর ক্যান্টিনের মূল প্রতিষ্ঠাতা মধুসূদন দের বাবা আদিত্য চন্দ্র। আদিত্য চন্দ্র প্রতিষ্ঠাতা হলেও তার ছোট ছেলে মধুসূদনের নামেই পরিচিতি লাভ করে ক্যান্টিনটি।

আদিত্য চন্দ্র হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্যান্টিনের দায়িত্ব পড়ে মধুসূদনের ওপর। মধুসূদন দের বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। যদিও তিনি ১৯৩৪ কিংবা ৩৫ সাল থেকেই বাবার সঙ্গে সেখানে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের ২০ বৈশাখ ডাকসুর উদ্যোগে এই ক্যান্টিনের নাম হয় ‘মধুর রেস্তোরাঁ’। এটি ‘মধুর স্টল, ‘মধুর টি-স্টল’ নামেও পরিচিত ছিল।

সততার জন্য মধুসূদন ছাত্র-শিক্ষকসহ সবার কাছে ছিলেন বিশ্বস্ত, যে কারণে ক্যান্টিনটি ক্রমেই ছাত্র রাজনীতির মূল খুঁটিতে রূপান্তরিত হয়। ঊনসত্তর থেকে একাত্তর পর্যন্ত বহু গোপন বৈঠক মধুর ক্যান্টিনে হয়েছে।

রাজনীতিবিদদের ভালো সম্পর্ক এবং ক্যান্টিনটি তৎকালীন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর রোষানলে পড়েন মধুসূদন। ২৫ মার্চ রাতে কামানের গোলায় জর্জরিত হয় মধুর ক্যান্টিন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে সপরিবারে নিহত হন সবার প্রিয় মধুদা। বেঁচে যাওয়া সদস্যরা চলে যান ভারতে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মধুদার ছেলে অরুণ কুমার দে দেশে ফিরে ফের মধুর ক্যান্টিনকে গতিময় করেন।

এটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামে পরিচিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীরা সংক্ষেপে ডাকেন ‘মধু’ বলে। ক্যান্টিনের সামনে যেতেই চোখে পড়ে শহীদ মধুদার স্মৃতি ভাস্কর্য।

মধুর ক্যান্টিনে উঠতি লেখক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, ক্রীড়াবিদ, সেরা ছাত্র, ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ভিড় ছিল সবসময়। অনেকেই দাম মেটাতেন, কেউ কেউ লিখে রাখতে বলতেন। মধুদার হিসাবের খাতাটি নিয়েও রঙ্গ-রসিকতার কম ছিল না। খাতাটির শিরোনাম ছিল `না দিয়া উধাও`। ওই খাতায় এককালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজ, শামসুর রহমান, আহমদ ফজলুর রহমানসহ অনেক কৃতী ব্যক্তিত্বের নাম ছিল। ষাটের দশকে অনেকেই `না দিয়া উধাও` খাতায় স্থান করে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে মিজানূর রহমান শেলী, জিয়াউদ্দীন, কাজী জাফর আহমদ, মহীউদ্দীন, আতাউর রহমান কায়সার, রেজা আলী, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, ওয়ালীউল ইসলাম, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, রফিক আজাদ প্রমুখ।


মধুর ক্যান্টিনে রাজধানীর আড্ডার পাশাপাশি ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতির আড্ডাও। অনেক কবি, লেখকও জমিয়ে আড্ডা দিতেন মধুদার ক্যান্টিনে। কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূরসহ অসংখ্য গুণীজন পদচারণায় ধন্য করেছেন এ ক্যান্টিনকে। কবি নির্মলেন্দু গুণের মতো এখনও যারা জীবিত আছেন, তারা সময় পেলেই এখনো ঘুরে যান মধুর ক্যান্টিন।