বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন নেতৃত্ব আসার জোরালো আলোচনা চলছে। যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে বলে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে বর্তমান সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির পৃথক বিদায়বার্তা দিয়েছেন।
দুই নেতার বক্তব্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব শেষ হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি তারা আসন্ন নতুন কমিটিকে স্বাগত জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ছাত্রদল সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব তার বিদায়বার্তায় মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার জন্য বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলসহ দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
একই সঙ্গে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের নেতাকর্মীদের প্রতিও ধন্যবাদ জানান রাকিব।
তিনি বলেন, তার নেতৃত্বাধীন সময়ের নেতাদের নামে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো খবরের শিরোনাম হয়নি। আর্থিক সংকটের মধ্যেও তারা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ নিজ ইউনিটের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নেতাকর্মীদেরও নীতি ও আদর্শের পথে চলতে উৎসাহিত করেছেন।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি বিকাশে কাজ করার কথা উল্লেখ করেন রাকিব। তার ভাষ্য, ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মীর কারণে যেন সাধারণ শিক্ষার্থী অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে তিনি বিশেষভাবে সতর্ক ছিলেন।
নিজ দলের বাইরের শিক্ষার্থীরাও সমস্যার কথা জানালে নিজের অবস্থান থেকে সমাধানের চেষ্টা করেছেন বলে জানান তিনি।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভ্রাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান ছাত্রদল সভাপতি।
রাকিব-নাছির নেতৃত্বাধীন কমিটির অন্যতম সাফল্য হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি পরিচালনা এবং রাজপথে ভূমিকা রাখার বিষয়টি তুলে ধরেছেন রাকিব।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের মব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক সমালোচনা ও বুলিং উপেক্ষা করে সংগঠনকে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে।
বিদায়বার্তার শেষ দিকে রাকিব বলেন, তিনি নতুন জীবন শুরু করতে চান এবং নিজেকে আরও পরিশুদ্ধ, মানবিক ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ভুল বা কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধও জানান তিনি।
আসন্ন ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে সবাই স্বাগত জানাবেন বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন রাকিব।
অন্যদিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে বিদায়বার্তা দিয়েছেন।
তিনি জানান, ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়ে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। এরপর প্রায় ১৭ বছরের নানা অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম, নির্যাতন, গুম ও খুনের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বর্তমান সময়ে এসে দাঁড়িয়েছেন তারা।
দীর্ঘ সময়ের এই পথচলায় নিহত, গুম ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন নাছির।
তিনি বলেন, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। তার ভাষায়, এটি একটি দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের অধ্যায়ের সমাপ্তি।
২০২৪ সালের ১ মার্চ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে বলে জানান নাছির। তবে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে তার দায়িত্বকালের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তার দাবি, ওই সময়ে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ ও চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন নাছির। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলনে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল বলে জানান তিনি।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর নোয়াখালী ও ফেনীতে বন্যার সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাও তুলে ধরেন নাছির।
তিনি জানান, ওই অঞ্চলের সন্তান হিসেবে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বেগম খালেদা জিয়া তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে তারেক রহমানও তাঁকে ফেনীতে গিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন।
এরপর তিনি ফেনীর উদ্দেশে রওনা হন এবং পরে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারাও বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত হন বলে জানান নাছির।
তার মতে, ওই অভিজ্ঞতা তাকে বুঝিয়েছে যে রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির বড় পরিচয়।
দায়িত্ব পালনকালে প্রায় দুই হাজারের বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান নাছির। তবে কয়েকটি কমিটি শেষ করতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারাকে নিজের অপূর্ণতা হিসেবে উল্লেখ করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক।
তিনি বলেন, যারা কমিটিতে পদ পেয়েছেন তাদের অনেকে যোগ্যতার স্বীকৃতি পেয়েছেন। আবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যারা সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি, তাদেরও হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একটি পদ কারও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয় বলেও মন্তব্য করেন নাছির।
ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার বিষয়টিও নিজের রাজনৈতিক জীবনের একটি আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
দায়িত্ব থেকে বিদায় নিলেও ছাত্রদল থেকে বিদায় নিচ্ছেন না বলে স্পষ্ট করেছেন নাছির।
তিনি বলেন, পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়, কিন্তু আদর্শ, ভালোবাসা ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া যায় না। আগামী দিনে যারা ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসবেন, তাদের নেতৃত্বে সংগঠন আরও শক্তিশালী, সংগঠিত ও গতিশীল হবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন হলে তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেন নাছির।
একই সঙ্গে সহযোদ্ধাদের কাছে কোনো আচরণে কষ্ট দিয়ে থাকলে বা কোনো সিদ্ধান্তে কারও প্রতি অন্যায় হয়ে থাকলে ক্ষমা চান তিনি। পরিবার, বন্ধু, সাংবাদিক এবং ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।
বিদায়বার্তার শেষে নাছির বলেন, দায়িত্ব থেকে বিদায় নিলেও সম্পর্ক, সংগ্রাম ও আদর্শ থেকে তিনি বিদায় নিচ্ছেন না। নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আরও শক্তিশালী হবে এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে সংগঠনটি ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
Reporter Name 
























