ঢাকা ১০:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সার, সেচ ও ফসল সংরক্ষণ নিয়ে সংকট কৃষকরা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:০৬:২৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
  • ৩ বার

দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদন মৌসুম ইরি-বোরোর চাষাবাদ চলছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সার ও সেচের সংকটের বড় শঙ্কায় পড়েছেন কৃষক। দেশের বহু এলাকায় এরই মধ্যে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি হয়েছে। বেড়ে গেছে দাম। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিকমতো না মেলায় ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম।

যদিও সরকার বলছে, ইরি-বোরো মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সারের মজুত রয়েছে দেশে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট হলে সেচ কার্যক্রমে কৃষক ও পাম্প মালিকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তারপরেও বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা মতো সার ও জ্বালানি তেল না পেয়ে চাষাবাদ নিয়ে এরই মধ্যে অনেক কৃষক সমস্যায় পড়েছেন। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে তাদের। অনেকে ডিজেল না পেয়ে সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না বলে খবর মিলছে।

যা বলছেন কৃষক

নওগাঁ সদরের হোগলবাড়ি গ্রামের কৃষক বজলুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে ডিজেল সংকটের কারণে ক্ষেতে ঠিকমতো পানি দিচ্ছেন না পাম্প মালিকরা। শুধু আল্লাহর রহমতে এর মধ্যে কয়েকদিন বৃষ্টির কারণে সমস্যা প্রকট হয়নি। কিন্তু আবহাওয়া বিরূপ হলে এ পরিস্থিতির কারণে ক্ষেতের ক্ষতি হতো।’

ওই এলাকার একজন পাম্প মালিক আইয়ুব মিয়া বলেন, ‘এ এলাকায় কোনো পাম্প ও দোকানে তেল নেই। মাঝে মধ্যে সামান্য কিছু তেল মিললেও সেটা পর্যাপ্ত নয়। আমরা সঠিকভাবে সেচ পরিচালনা করতে পারছি না।’

তিনি জানান, গত কয়েকদিন তেলের জন্য তিনি বিভিন্ন পাম্প ও খোলা দোকানে ধরনা দিচ্ছেন। উপজেলা বদলগাছি ও জেলা শহর নওগাঁর এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরে ডিজেল কিনছেন। এতে খরচও বাড়ছে। তারপরও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ার কারণে অনেক বোরো ধানের জমিতে এখনো সেচের পানি দিতে পারেননি। ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কায় তিনি।

সরকার সারের দাম না বাড়ালেও যুদ্ধের অজুহাতে বিভিন্ন এলাকায় সারের কৃত্রিম সংকটের কথা বলছেন ডিলাররা। বেড়ে গেছে দামও। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারের ধরনভেদে এখন সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষকরা বলছেন, ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম রাখছেন। নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার অনেক এলাকায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা যায়।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের নরৎপুর গ্রামের কৃষক কাজল মিয়া বলেন, ‘নেই জানিয়ে ডিলার প্রতি কেজি সার তিন থেকে পাঁচ টাকা দাম বেশি নিচ্ছে। আমরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনছি। না হলে পর্যাপ্ত সার মিলছে না।’

সদর উপজেলার মালিবাড়ি ইউনিয়নের কচুয়ার খামার গ্রামের কৃষক মামুন মিয়া বলেন, ‘আমার ৩০ থেকে ৩৫ বস্তা ইউরিয়া সারসহ অন্য সার কিনতে হয়েছে। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকে এক বস্তা সারও কিনতে পারিনি। বাইরের খুচরা দোকান থেকে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে এ বছর।’

সারের চাহিদা ও সরবরাহ কেমন?

মূলত সারের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া দেশের কারখানাগুলোতে যে সার উৎপাদন হয় সেখানেও বড় ভরসা আমদানি করা গ্যাস। কিন্তু উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

যদিও সরকারের দাবি, সার নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে দেশে যে পরিমাণ সার মজুত রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত এক বছর পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া যাবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও মিশরের মতো বিকল্প দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে সরকার।

সার সংকট

জানা যায়, যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া সংকটে ব্যাহত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এক লাখ টন করে দুটি দরপত্র আহ্বান করেও তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। পরবর্তীসময়ে ধরন পাল্টে নতুন দরপত্র দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি।

বেসরকারি সার সরবরাহকারীরাও বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহনের সংকট, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী সারের ব্যাপক দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সার সরবরাহকারীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে অনীহা।

তবে এটা সত্য যে, চলমান ইরি-বোরো মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সারের মজুত দেশে রয়েছে। যদি সরবরাহ বিঘ্নিত হয় তবে এরপর আমন মৌসুম নিয়ে থাকছে শঙ্কা।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে সাড়ে পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া, তিন লাখ ২১ হাজার টন টিএসপি, পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিএপি এবং এমওপি মজুত রয়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার টন।

কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহাম্মদ বলেন, ‘চলতি বোরো মৌসুম নিয়ে কোনো সমস্যা আমরা দেখছি না। এজন্য পর্যাপ্ত সার রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সার নিয়ে পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় দেশে বন্ধ সার কারখানাগুলো খোলা, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

সার সংকট কাটাতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বিসিআইসিও

সার সংকট কাটাতে দেশের বন্ধ কারখানা চালু ও বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বিসিআইসির মাধ্যমে। বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যুদ্ধে প্রভাবিত রুট ছাড়া বাকি সম্ভাব্য সব ধরনের বিকল্প উৎসগুলো থেকে আমদানি করা যায় কি না সেটা পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া দুবাইয়ের সঙ্গে একটি বড় জিটুজি চুক্তি রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই তারা বাংলাদেশে তিন লাখ টন সার সরবরাহ করবে। একইভাবে রাশিয়া থেকে আমদানিতে আমেরিকার যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেটা দূর করা যায় কি না তা নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

বিসিআইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছি, যাতে এখন যে কোনো সরবরাহকারী অংশ নিতে পারেন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে। তারাও যাতে এখানে আসতে পারে।’

এছাড়া সম্প্রতি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক সভায় গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া কারখানা চালু করা হবে বলে একমত হওয়া গেছে।

সেচ পরিস্থিতি কী?

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের আঁচ লেগেছে সেচেও। ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের লম্বা লাইন। সেচের জন্য ডিজেলও ঠিকমতো পাচ্ছে না পাম্প মালিকরা।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ফিলিং স্টেশন থেকে চাহিদামতো জ্বালানি মিলছে না, অনেক পাম্প বন্ধ। যেগুলো খোলা সেসব পাম্প থেকে ডিজেল বিক্রির পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।

এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকেও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে নানান পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কথাও জানিয়েছেন জ্বালানি মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনা। এছাড়া সেচ কার্যক্রমে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। কারণ দেশের বিদ্যুৎখাতও জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর বড় মাত্রায় নির্ভরশীল।

সার সংকট

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ ও এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে। এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ প্রায় অসম্ভব। এছাড়া বিদ্যুতে চলছে বাকি এলাকার একটি উল্লেখযোগ্য সেচ কার্যক্রম।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের বোরো আবাদের ৬০ শতাংশের বেশি ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এখন ডিজেল সরবরাহ ও এতে ভর্তুকি দেওয়া জরুরি। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।’

তথ্য বলছে, এ বছর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে।

ডিজেল সংকটে এরই মধ্যে বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে ডিজেল কেনা শুরু করেন চাষিরা। বর্তমানে বিধিনিষেধের কারণে একজন ক্রেতা মাত্র দুই লিটার জ্বালানি কিনতে পারছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি লিটারে বাড়তি পাঁচ থেকে ১০ টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।

দাম বেড়ে যাওয়ায় বোরো আবাদের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন প্রান্তিক কৃষকরা। ডিজেল তেলের দাম লিটারে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে। এতে প্রতি হেক্টরে চাষিদের সেচ ও মাড়াইয়ের জন্য অতিরিক্ত খরচ গুনতে হবে ৩শ থেকে ৫শ টাকার বেশি।

তবে সরকার বলছে, দেশে সেচের জ্বালানির সংকট নেই। তেলের অভাবে এখনো কোথাও সেচ কাজ ব্যাহত হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিনে উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘কোথাও তেলের সমস্যা নেই। ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে কি না— কৃষকের মধ্যে এমন আতঙ্ক কাজ করছে। তাই পাম্পগুলোতে ভিড় করছে। তবে তেলের অভাবে দেশের কোনো জমিতে সেচ দেওয়া যায়নি এমন নজির নেই।’

ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানান, মাঠ পর্যায়ে সেচের জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সক্রিয় আছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম জানান, প্রয়োজনে কৃষক ও পাম্প মালিকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সার, সেচ ও ফসল সংরক্ষণ নিয়ে সংকট কৃষকরা

আপডেট টাইম : ১০:০৬:২৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদন মৌসুম ইরি-বোরোর চাষাবাদ চলছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সার ও সেচের সংকটের বড় শঙ্কায় পড়েছেন কৃষক। দেশের বহু এলাকায় এরই মধ্যে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি হয়েছে। বেড়ে গেছে দাম। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিকমতো না মেলায় ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম।

যদিও সরকার বলছে, ইরি-বোরো মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সারের মজুত রয়েছে দেশে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট হলে সেচ কার্যক্রমে কৃষক ও পাম্প মালিকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তারপরেও বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা মতো সার ও জ্বালানি তেল না পেয়ে চাষাবাদ নিয়ে এরই মধ্যে অনেক কৃষক সমস্যায় পড়েছেন। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে তাদের। অনেকে ডিজেল না পেয়ে সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না বলে খবর মিলছে।

যা বলছেন কৃষক

নওগাঁ সদরের হোগলবাড়ি গ্রামের কৃষক বজলুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে ডিজেল সংকটের কারণে ক্ষেতে ঠিকমতো পানি দিচ্ছেন না পাম্প মালিকরা। শুধু আল্লাহর রহমতে এর মধ্যে কয়েকদিন বৃষ্টির কারণে সমস্যা প্রকট হয়নি। কিন্তু আবহাওয়া বিরূপ হলে এ পরিস্থিতির কারণে ক্ষেতের ক্ষতি হতো।’

ওই এলাকার একজন পাম্প মালিক আইয়ুব মিয়া বলেন, ‘এ এলাকায় কোনো পাম্প ও দোকানে তেল নেই। মাঝে মধ্যে সামান্য কিছু তেল মিললেও সেটা পর্যাপ্ত নয়। আমরা সঠিকভাবে সেচ পরিচালনা করতে পারছি না।’

তিনি জানান, গত কয়েকদিন তেলের জন্য তিনি বিভিন্ন পাম্প ও খোলা দোকানে ধরনা দিচ্ছেন। উপজেলা বদলগাছি ও জেলা শহর নওগাঁর এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরে ডিজেল কিনছেন। এতে খরচও বাড়ছে। তারপরও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ার কারণে অনেক বোরো ধানের জমিতে এখনো সেচের পানি দিতে পারেননি। ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কায় তিনি।

সরকার সারের দাম না বাড়ালেও যুদ্ধের অজুহাতে বিভিন্ন এলাকায় সারের কৃত্রিম সংকটের কথা বলছেন ডিলাররা। বেড়ে গেছে দামও। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারের ধরনভেদে এখন সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম দিতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষকরা বলছেন, ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম রাখছেন। নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার অনেক এলাকায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা যায়।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের নরৎপুর গ্রামের কৃষক কাজল মিয়া বলেন, ‘নেই জানিয়ে ডিলার প্রতি কেজি সার তিন থেকে পাঁচ টাকা দাম বেশি নিচ্ছে। আমরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনছি। না হলে পর্যাপ্ত সার মিলছে না।’

সদর উপজেলার মালিবাড়ি ইউনিয়নের কচুয়ার খামার গ্রামের কৃষক মামুন মিয়া বলেন, ‘আমার ৩০ থেকে ৩৫ বস্তা ইউরিয়া সারসহ অন্য সার কিনতে হয়েছে। কিন্তু ডিলারের কাছ থেকে এক বস্তা সারও কিনতে পারিনি। বাইরের খুচরা দোকান থেকে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে এ বছর।’

সারের চাহিদা ও সরবরাহ কেমন?

মূলত সারের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া দেশের কারখানাগুলোতে যে সার উৎপাদন হয় সেখানেও বড় ভরসা আমদানি করা গ্যাস। কিন্তু উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

যদিও সরকারের দাবি, সার নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে দেশে যে পরিমাণ সার মজুত রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত এক বছর পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া যাবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও মিশরের মতো বিকল্প দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে সরকার।

সার সংকট

জানা যায়, যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া সংকটে ব্যাহত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এক লাখ টন করে দুটি দরপত্র আহ্বান করেও তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। পরবর্তীসময়ে ধরন পাল্টে নতুন দরপত্র দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি।

বেসরকারি সার সরবরাহকারীরাও বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহনের সংকট, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী সারের ব্যাপক দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সার সরবরাহকারীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে অনীহা।

তবে এটা সত্য যে, চলমান ইরি-বোরো মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সারের মজুত দেশে রয়েছে। যদি সরবরাহ বিঘ্নিত হয় তবে এরপর আমন মৌসুম নিয়ে থাকছে শঙ্কা।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে সাড়ে পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া, তিন লাখ ২১ হাজার টন টিএসপি, পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিএপি এবং এমওপি মজুত রয়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার টন।

কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহাম্মদ বলেন, ‘চলতি বোরো মৌসুম নিয়ে কোনো সমস্যা আমরা দেখছি না। এজন্য পর্যাপ্ত সার রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সার নিয়ে পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় দেশে বন্ধ সার কারখানাগুলো খোলা, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

সার সংকট কাটাতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বিসিআইসিও

সার সংকট কাটাতে দেশের বন্ধ কারখানা চালু ও বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বিসিআইসির মাধ্যমে। বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যুদ্ধে প্রভাবিত রুট ছাড়া বাকি সম্ভাব্য সব ধরনের বিকল্প উৎসগুলো থেকে আমদানি করা যায় কি না সেটা পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া দুবাইয়ের সঙ্গে একটি বড় জিটুজি চুক্তি রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই তারা বাংলাদেশে তিন লাখ টন সার সরবরাহ করবে। একইভাবে রাশিয়া থেকে আমদানিতে আমেরিকার যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেটা দূর করা যায় কি না তা নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

বিসিআইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছি, যাতে এখন যে কোনো সরবরাহকারী অংশ নিতে পারেন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে। তারাও যাতে এখানে আসতে পারে।’

এছাড়া সম্প্রতি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক সভায় গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া কারখানা চালু করা হবে বলে একমত হওয়া গেছে।

সেচ পরিস্থিতি কী?

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের আঁচ লেগেছে সেচেও। ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের লম্বা লাইন। সেচের জন্য ডিজেলও ঠিকমতো পাচ্ছে না পাম্প মালিকরা।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ফিলিং স্টেশন থেকে চাহিদামতো জ্বালানি মিলছে না, অনেক পাম্প বন্ধ। যেগুলো খোলা সেসব পাম্প থেকে ডিজেল বিক্রির পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।

এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকেও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে নানান পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কথাও জানিয়েছেন জ্বালানি মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনা। এছাড়া সেচ কার্যক্রমে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। কারণ দেশের বিদ্যুৎখাতও জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর বড় মাত্রায় নির্ভরশীল।

সার সংকট

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ ও এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে। এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ প্রায় অসম্ভব। এছাড়া বিদ্যুতে চলছে বাকি এলাকার একটি উল্লেখযোগ্য সেচ কার্যক্রম।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের বোরো আবাদের ৬০ শতাংশের বেশি ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এখন ডিজেল সরবরাহ ও এতে ভর্তুকি দেওয়া জরুরি। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।’

তথ্য বলছে, এ বছর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে।

ডিজেল সংকটে এরই মধ্যে বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে ডিজেল কেনা শুরু করেন চাষিরা। বর্তমানে বিধিনিষেধের কারণে একজন ক্রেতা মাত্র দুই লিটার জ্বালানি কিনতে পারছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি লিটারে বাড়তি পাঁচ থেকে ১০ টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।

দাম বেড়ে যাওয়ায় বোরো আবাদের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন প্রান্তিক কৃষকরা। ডিজেল তেলের দাম লিটারে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে। এতে প্রতি হেক্টরে চাষিদের সেচ ও মাড়াইয়ের জন্য অতিরিক্ত খরচ গুনতে হবে ৩শ থেকে ৫শ টাকার বেশি।

তবে সরকার বলছে, দেশে সেচের জ্বালানির সংকট নেই। তেলের অভাবে এখনো কোথাও সেচ কাজ ব্যাহত হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিনে উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘কোথাও তেলের সমস্যা নেই। ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে কি না— কৃষকের মধ্যে এমন আতঙ্ক কাজ করছে। তাই পাম্পগুলোতে ভিড় করছে। তবে তেলের অভাবে দেশের কোনো জমিতে সেচ দেওয়া যায়নি এমন নজির নেই।’

ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানান, মাঠ পর্যায়ে সেচের জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সক্রিয় আছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম জানান, প্রয়োজনে কৃষক ও পাম্প মালিকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।