চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসাপন্থি দলগুলো রাজনৈতিক ময়দানে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে ধারণা ছিল জনমনে। সে ধারণা থেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কওমি অঙ্গনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তেমন ভালো করতে পারেনি দলগুলো।
বিএনপি জোটের শরিক হিসেবে চারটি আসনে নির্বাচন করে একটিতেও জয় পায়নি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। অন্যদিকে ২৫৮ আসনে এককভাবে নির্বাচন করে একটিতে জয় পেয়েছে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের শরিক হিসেবে নির্বাচন করে মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে দুটি আসন। আব্দুল বাসিত আজাদের খেলাফত মজলিস পেয়েছে একটি। কওমি অঙ্গন থেকে নির্বাচিত এ চারজন সংসদ সদস্য দৈনিক কালবেলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তাদের আগামীর চিন্তাভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। আলাদাভাবে তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু তালহা রায়হান।
সংসদে সুদি ব্যবস্থার বিকল্প রূপরেখা তুলে ধরব
মুফতি আবুল হাসান
সংসদ সদস্য (সিলেট-৫)
একজন মুফতি হিসেবে আপনি সংসদে গিয়ে প্রচলিত আইন প্রণয়নে কতটা দক্ষ হতে পারবেন বলে মনে করেন?
মুফতি আবুল হাসান: যারা ইসলামী আইনে বিশেষজ্ঞ থাকে, তাদের জন্য প্রচলিত আইন প্রণয়নে কোনো সমস্যা আছে বলে মনে করি না। কারণ, যেসব প্রচলিত আইন আছে, ইসলামী আইনে বিশেষজ্ঞদের জন্য সেগুলো প্রণয়ন করা অতীব সহজ। সেজন্য আমি এটাকে কঠিন মনে করি না। ইসলামী বিশেষজ্ঞরা মানতেক শাস্ত্র পড়ে, লজিক শেখে। তাই এগুলো সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের জন্য প্রচলিত আইন প্রণয়ন করা কঠিন নয়।
জকিগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের গুলিবর্ষণ এবং চোরাচালান বড় সমস্যা। এ জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে সংসদে আপনার কণ্ঠ কতটা সোচ্চার হবে?
মুফতি আবুল হাসান: এ ব্যাপারে আমার কণ্ঠ খুবই বেশি সোচ্চার থাকবে। এ বিভাগে যারা আছেন, তাদের আমি জিরো টলারেন্সে যেতে অনুরোধ করব। যেন বিএসএফ অন্যায়ভাবে বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে হত্যা করতে না পারে। আর মাদক চোরাচালান যেগুলো আছে, এগুলোর ব্যাপারে তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি আমার ইশতেহারেই বলেছি, মাদক ও চোরাচালানমুক্ত জকিগঞ্জ-কানাইঘাট গড়া আমার অন্যতম লক্ষ্য।
সিলেটের বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতি বাঁচিয়ে রেখেছে, কিন্তু বিমানবন্দরে তারা হয়রানির শিকার হয়। এ হয়রানি বন্ধে আপনার ভূমিকা কী হবে?
মুফতি আবুল হাসান: সিলেটের বিশাল একটি অংশ বিদেশে অবস্থান করে। তাদের টাকাই দেশের চালিকাশক্তি। অথচ যখন তারা দেশে আসে, তখন বিমানবন্দরে তাদের অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়। এ হয়রানি বন্ধের জন্য আমি কর্তৃপক্ষ যারা আছে, এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যারা আছে, তাদের সঙ্গে আমি সরাসরি আলোচনা করব। প্রয়োজনে আমি সংসদে দাবি উত্থাপন করব। তারা দেশের জন্য এত ঘাম ঝরাচ্ছে আর তারা দেশে আসবে, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হবে, এটা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। এ পর্যন্ত শেষ না। আমরা দেখি, অনেক সময় আমার এই বিদেশি যেসব ভাইয়েরা আছে, মারা গেলে তাদের লাশটা মাতৃভূমিতে নিয়ে আসতে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আমি চেষ্টা করব, জাতীয় সংসদে দাবি উত্থাপন করতে, যাতে এমন কেউ বিদেশের ভূমিতে মারা গেলে তার লাশ যেন রাষ্ট্রীয় খরচে বাংলাদেশে তার জন্মভূমিতে এনে দাফন করা হয়।
ইমাম-মুয়াজ্জিনরা অনেক ক্ষেত্রে অসহায়। কোরআন-হাদিসের আলোকে তারা বক্তব্য দেন, কিন্তু সেই বক্তব্য যদি মসজিদ কমিটির কোনো দায়িত্বশীলের বিপরীত চলে যায়, তখন ইমামকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তারা অসহায় অবস্থায় পড়েন, যা মুসলিম জাতির জন্য লজ্জার
মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো কারিকুলাম পরিবর্তন হয়নি। আপনি কি মনে করেন এই কারিকুলাম দিয়ে কোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব?
মুফতি আবুল হাসান: বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের একজন দায়িত্বশীল আমি। এই সুবাদে বিষয়গুলো (কারিকুলাম) নিয়ে ইতোপূর্বে আমি বেফাকের বৈঠকে আলোচনা করেছি। ভবিষ্যতেও আমি মুরুব্বিদের সঙ্গে আলোচনা করে এটার উন্নয়নে কীভাবে কী করা যায় এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী কী থাকতে পারে বা কীভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।
অনেকে বলছেন, কওমি শিক্ষার সিলেবাস পরিমার্জন বা সংস্কার করতে চান। এ বিষয়ে আপনার চিন্তাধারা কী?
মুফতি আবুল হাসান: এ বিষয়েও আমি আমাদের মুরুব্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেব।
আপনার এলাকায় নদীভাঙন একটি স্থায়ী অভিশাপ। ড্রেজিংয়ের নামে যে লুটপাট হয়, তা বন্ধে আপনার সরাসরি হস্তক্ষেপ কীভাবে নিশ্চিত করবেন?
মুফতি আবুল হাসান: জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটে যে নদীভাঙন, এটা এ জনপদের জন্য একটি বড় অভিশাপ। ক্ষেত্রবিশেষ এটা বাংলাদেশের মানচিত্র ছোট হতে যাচ্ছে। এই নদীভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি জাতীয় সংসদে দাবি উত্থাপন করব। পাশাপাশি নদী শাসনেরও ব্যবস্থা গ্রহণ করব। বিভিন্ন উন্নত দেশে আমরা দেখতে পাই, নদীর পানি বয়ে যাচ্ছে এবং তার যে দুটি পাড় আছে, তা এমনভাবে রাখা হয়েছে যে, নদীভাঙনের আর কোনো সুযোগ নেই। কাজেই এরকম পরিকল্পনা নিয়ে আমিও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
ইসলামী আদর্শ কি অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বাধা দেয়? আপনার এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপনি কী পদক্ষেপ নেবেন?
মুফতি আবুল হাসান: বাংলাদেশ একটি সম্প্রীতির দেশ। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা খুব চমৎকারভাবে মিলেমিশে বসবাস করেন। আমরা দেখি, হোটেলে বসলে একজন হিন্দু যে গ্লাসে পানি পান করেন, একজন মুসলিমও সেই একই গ্লাসে পানি পান করেন। অতএব রাষ্ট্রীয় অধিকার একজন মুসলিম যেভাবে ভোগ করবেন, একজন হিন্দু বা খ্রিষ্টানও একই সুবিধা পাবেন। এখানে কোনো বৈষম্যের সুযোগ নেই। আর জকিগঞ্জ-কানাইঘাটও একটি সম্প্রীতির এলাকা। এখানে এর আগে তেমন কোনো দুর্ঘটনা দেখা যায়নি। আগামী দিনেও জকিগঞ্জ-কানাইঘাটে হিন্দু-মুসলিম কোনো বৈষম্য দেখা যাবে না। অধিকারের বিষয়ে কোনো বৈষম্যের সুযোগ দেওয়া হবে না।
তাবলিগ নিয়ে দেশে দুটি পক্ষ দেখা যায়। তাদের একীভূত করতে আপনার পরিকল্পনা কী?
মুফতি আবুল হাসান: এটা খুবই দুঃখজনক। ইসলামের খেদমত করছেন এমন অবস্থায় দুটি গ্রুপ হয়ে গেছেন। এটা সুন্দর না। কারণ, ইসলাম এক, কোরআন এক, রাসুলও (সা.) এক। অতএব আমরা সবাই একই ধর্মের অনুসারী। কাজেই এ ব্যাপারে আমি মুরুব্বিদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব, যাতে দুটি পক্ষকে একীভূত করা যায়। ঐক্যবদ্ধ হওয়া যায়।
একজন কওমি ঘরানার আলেম হিসেবে এ ঘরানার বাইরে ইসলামপন্থি যেসব ধারা আছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করবেন কীভাবে?
মুফতি আবুল হাসান: আমরা তো মৌলিক নীতির ব্যাপারে কোনো ব্যতিক্রম নেই। মৌলিক বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ আছি, সবাই চায় বাংলায় ইনসাফ কায়েম হোক। আমরা এ চিন্তাধারায় এগিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।
কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস করা অনেক তরুণ বেকার। তাদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সরকারি অর্থায়নে বিশেষ কোনো প্রকল্প আপনি গ্রহণ করবেন কি?
মুফতি আবুল হাসান: শুধু কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররাই বেকার, বিষয়টি এমন নয়। জেনারেলপড়ুয়া অসংখ্য তরুণও বেকারত্বে দিন পার করছে। আমি এ বেকারত্ব দূরীকরণে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। অর্থাৎ, তাদের কর্মসংস্থানের অন্ততপক্ষে একটা ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
সিলেট-৫ আসনে অবকাঠামো উন্নয়নে আপনি আগে কোন কাজ শুরু করবেন— রাস্তাঘাট নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?
মুফতি আবুল হাসান: একটা দেশ স্থিতিশীল রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হয়। আর রাস্তাঘাটের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ অবস্থায় আমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাস্তাঘাট সংস্কারের দিকে দৃষ্টি দেব। কারণ, প্রথমে দেশকে রক্ষা করতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা খাতের দিকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেব।
ইসলামে সুদভিত্তিক অর্থনীতি হারাম। কিন্তু বাংলাদেশের পুরো বাজেট ও ব্যাংক ব্যবস্থা সুদের ওপর দাঁড়িয়ে। সংসদে গিয়ে এ সিস্টেমের বিকল্প কী প্রস্তাব করবেন আপনি?
মুফতি আবুল হাসান: এটা আমাদের জন্য বলতে গেলে অভিশাপ। আর সুদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে হবে। আমাদের সংসদে কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলামী দল নেই। এজন্য আমি ইসলামী অর্থনীতির সুন্দর রূপরেখা যেগুলো আছে, সেগুলো তুলে ধরব। যাতে ধাপে ধাপে মানুষ এদিকে অগ্রসর হয়, সেই চিন্তা-চেতনা নিয়ে আমি এগিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।
খেলাফত মজলিস তো খেলাফত কায়েমের কথা বলে। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত, যার সঙ্গে খেলাফত ব্যবস্থার মিল নেই। তাহলে আপনারা কীভাবে খেলাফত কায়েম করবেন?
মুফতি আবুল হাসান: সংসদে খেলাফত মজলিসের প্রতিনিধি আমি একজনই। আর একজনের মাধ্যমে এগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কাজেই আমি খেলাফতে রাশেদার সুন্দর আদর্শগুলো সংসদে তুলে ধরার চেষ্টা করব, যাতে ধাপে ধাপে মানুষ এদিকে অগ্রসর হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে প্ল্যাটফর্ম গঠন হয়ে বাংলাদেশে ইসলামী নেজাম কায়েম হয়।
তরুণ আলেমদের রাজনীতিতে আসার ঝোঁক বেড়েছে। তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
মুফতি আবুল হাসান: তরুণদের আগমন আমাদের জন্য সুসংবাদ। তাদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে, তারা যেন শুধু আবেগনির্ভর রাজনীতি না করে বাস্তবমুখী পথে এগিয়ে যায়।
ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মূল্যায়নে সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার পরিকল্পনা কী?
মুফতি আবুল হাসান: আসলে আমাদের দেশে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। কারণ, পাঁচ বা দশ হাজার বেতন বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনোভাবেই মানানসই না। আমি এজন্য সরকারের কাছে দাবি জানাব, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মানসম্মত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা হোক। যাতে করে তারা মোটামুটি সচ্ছলভাবে চলতে পারে। আরেকটি দুঃখজনক বিষয় হলো, ইমাম-মুয়াজ্জিনরা অনেক ক্ষেত্রে অসহায়। কোরআন-হাদিসের আলোকে তারা বক্তব্য দেন, কিন্তু সেই বক্তব্য যদি মসজিদ কমিটির কোনো দায়িত্বশীলের বিপরীত চলে যায়, তখন ইমামকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তারা অসহায় অবস্থায় পড়েন, যা মুসলিম জাতির জন্য লজ্জার। আমি এত গুরু দায়িত্বপালনকারী ইমাম-মুয়াজ্জিনদের এ অসহায়ত্ব দেখতে চাই না আর। ইনশাআল্লাহ ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আলোচনা করব। কাজ করার চেষ্টা করব।
কালবেলার মাধ্যমে দেশ-জাতির উদ্দেশে কী বার্তা দিতে চান?
মুফতি আবুল হাসান: কালবেলার মাধ্যমে আমার বার্তা হলো, জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের জন্য। তাই নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশকে আমি বৈষম্যমুক্ত দেখতে চাই। এখানে সরকারি দল যেটুকু পাবে, বিরোধী দলও সেটুকু পেতে হবে। না হয় জুলাই চেতনা থাকবে না।
সংসদে ‘ব্লাসফেমি’ আইনের জন্য জোর দাবি জানাব
মাওলানা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা
সংসদ সদস্য (মাদারীপুর-১)
ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ আপনি কীভাবে দেখছেন?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে খুব চমৎকার দেখছি। হয়তো একটু সময়ের প্রয়োজন। এ দেশের মাটিতে ইসলামী রাজনীতি নিয়ে আমরা যে স্বপ্ন দেখছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা পূর্ণ হবে ইনশাআল্লাহ।
আপনার পূর্বপুরুষ তো ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ওই আন্দোলন এখনো অব্যাহত আছে কি না?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: ফরায়েজি আন্দোলন এখন পর্যন্ত কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হয়নি। তবে রাজনীতিক দলের বাইরে সেটা নিয়ে কাজ চলছে।
শেষদিকে এসে আপনাকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রার্থিতা দিয়েছে। দলের সঙ্গে আপনি সমন্বয় করেছেন কীভাবে?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: আমি রাজনীতি সক্রিয়ভাবে প্রথমে আসতে চাইনি। আমার এরকম কোনো ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের চাপে আমাকে রাজনীতির মাঠে আসতে হয়। যখন আসব তখন চিন্তা করলাম কোনো দলীয়ভাবে করব কি না, তখন ‘হ্যাঁ’-‘না’ দুটোরই পরামর্শ পেয়েছিলাম। তখন খুব একটা চাপের মধ্যে পড়ে যাই। এ সময় মোটামুটি প্রত্যেকটি দলই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল তাদের নমিনেশন নেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত না থাকায় কারও নমিনেশন গ্রহণ করতে পারিনি। তবে শেষ মুহূর্তে এসে মনে হলো, যদি নির্বাচন করতেই হয় তাহলে ১১-দলীয় যে জোট হয়েছে, সেই জোটের মাধ্যমেই করব— জোট থেকেও এরকম একটা সিদ্ধান্ত হয়।
কওমি মাদ্রাসার যে নারীরা আছে, তাদের এ শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যেই কাজগুলো একদম করা দরকার, আমরা মুরুব্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সেগুলো করার চেষ্টা করব।
কওমি মাদ্রাসায় তো নারীদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কেউ কেউ বলে থাকেন, মানের দিক থেকে সেটি দুর্বল। এর মানোন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কী?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: যারা নিউ জেনারেশন আছে বা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে, তাদের অভিযোগ থাকবে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি যে, আমাদের কওমি মাদ্রাসার যে নারীরা আছে, তাদের এ শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যেই কাজগুলো একদম করা দরকার, আমরা মুরুব্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সেগুলো করার চেষ্টা করব। যদি কোনো কিছু পরিবর্তন করতে হয়, আলোচনার ভিত্তিতে সেটা করব ইনশাআল্লাহ।
আপনি কি মনে করেন বর্তমান সংবিধানের সঙ্গে ইসলামের মূলনীতিগুলোর কোনো সরাসরি সংঘর্ষ আছে? থাকলে তা নিরসনে আপনার পদক্ষেপ কী হবে?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: যে বিষয়গুলো সাংঘর্ষিক থাকবে, আমরা সে বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা করব। আলোচনার মাধ্যমে সেই জায়গাগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করব।
আপনার এলাকায় তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য কী ধরনের ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগ নেবেন?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: আমার দেশের ছেলেরা কর্মসংস্থান না পেয়ে খুব কষ্ট করে বিদেশে যায়। তারা জীবনবাজি রেখে লিবিয়া হয়ে ইতালি যায়। এতে কত তরুণের প্রাণ সাগরপথেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, তার কোনো হিসাব নেই। আমি চাই যে, এমন সুন্দর কিছু কর্মসংস্থান গড়ে তোলা, যাতে তরুণরা দেশে বসেই কাজ করে নিজেদের জীবন চালাতে পারে। পরিবারের হাল ধরতে পারে।
আপনি কি সংসদে গিয়ে ‘ব্লাসফেমি আইন’ বা মহানবী (সা.)-এর অবমাননার বিরুদ্ধে কোনো কড়া আইন প্রণয়নের দাবি জানাবেন?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, এ দেশে কয়েক দিন পরপরই বিশ্বমানবের আইডল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইজ্জত-সম্মানে আঘাত করা হয়। একজন মুসলিম হিসেবে জাতীয় সংসদ থেকে আমার প্রথম বক্তব্যের মধ্যে ব্লাসফেমি আইনের জন্য জোরদার দাবি জানাব।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার সংকোচন নিয়ে আলেমদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সংসদে গিয়ে আপনি কি কারিকুলাম পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেবেন?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: যেহেতু আমাদের সবকিছুর আলাদা আলাদা সেক্টর আছে, তাই যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রয়োজনের খাতিরে আলোচনার মাধ্যমে আমি প্রস্তাব দেব।
রাজনীতিতে আলেমদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনেক নেতিবাচক প্রচারণা আছে। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন যে, আলেমরাই সেরা শাসক হতে পারেন?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: কারণ, আলেমরা কখনো দুর্নীতি করবে না। কারও ওপর অন্যায় বা জুলুম করবে না। চাঁদাবাজি করবে না। আজকে আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। এই সংসদ সদস্য হওয়ার পথে গিয়ে দেখেন কত জায়গায় এটাকে ব্যবহার করে কত অন্যায় করা হয়েছে, কত জুলুম করা হয়েছে। কিন্তু আমার মতো হানজালারা যখন জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছে, তখন আমাদের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদা নিতে পারবে না। অবিচার করতে পারবে না। জুলুম করতে পারবে না। এজন্য আলেমরাই দেখিয়ে দিতে পারবে যে, তাদের হাতে দেশ ও জাতি কত নিরাপদ।
মাদারীপুরের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় যে ডাক্তার সংকট এবং দালাল চক্রের কথা শোনা যায়, তা দমনে আপনার নজরদারি কেমন হবে?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা: আমার উল্লেখযোগ্য প্ল্যানগুলোর মধ্যে এ স্বাস্থ্যব্যবস্থা অন্যতম একটা প্ল্যান। কারণ, আমার এলাকার মানুষের কিছু হলেই তাদের ঢাকামুখী হতে হয়। এটা চরম দুর্ভোগের। সে ক্ষেত্রে আমার টার্গেট আছে, আমার শিবচরে আইসিউ বেড একটা-দুইটা হলেও চালু করব এবং আমার এলাকার কাউকে যেন প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে না হয়, পরিপূর্ণ একটা ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা আমি শিগগিরই চালু করব ইনশাআল্লাহ। আর দালাল চক্রের বিষয়ে যে কথা বলছেন, আমি বিশ্বাস করি এখন থেকে কেউ সেখানে দালালি করতে পারবে না। আমি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
আগামী পাঁচ বছরে আপনি আপনার সংসদীয় এলাকাকে কি একটি ‘মডেল ইসলামী টাউন’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, নাকি সাধারণ আধুনিক নগরী?
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা : আমি চাই একটা মডেল ইসলামী টাউন হোক। কারণ, ওই মাটি হাজি শরীয়তুল্লাহর পবিত্র মাটি। আর ইসলামী মডেল টাউন মানেই তো আধুনিক নগরী।
সংসদে ইসলামবিরোধী আইন উঠলে প্রতিবাদ করব
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ
সংসদ সদস্য (বরগুনা-১)
আপনি এমন এক দল থেকে এসেছেন যারা ‘ইসলামী বিপ্লব’ বা ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বলে। বর্তমান সংসদীয় কাঠামো ও সংবিধানের অধীনে থেকে আপনি কি আসলেই সেই পরিবর্তন আনতে পারবেন, নাকি আপনিও ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাবেন?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিপ্লবের চেয়ে ক্রমান্বয়ে সংস্কারে বেশি গুরুত্ব দেয়। আমাদের দলের নামেই ‘আন্দোলন’ আছে। আমরা শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করি, একই সঙ্গে সমাজের ভেতরে শরিয়াহ ও ইসলাম পালনে মানুষকে প্রস্তুত করি। বর্তমান সংসদীয় কাঠামো আর ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করানো যথার্থ না। ফলে আমি মনে করি, আমরা যে সামগ্রিক সংস্কারের কাজ করি তার মাধ্যমেই ইনশাআল্লাহ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারব।
বরগুনা-১ আসনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরূকরণ ছিল। ইসলামী আন্দোলনের হয়ে আপনি সেই বলয় কীভাবে ভাঙলেন? এটি কি আদর্শিক জয় নাকি নেতিবাচক ভোটের প্রভাব?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: এটা অবশ্যই আদর্শিক জয়। আপনি জানেন, আমার বাবা মাওলানা আব্দুল রশিদ (পীর সাহেব বরগুনা) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির ছিলেন। দলের শুরুর দিককার একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। তিনি চরমোনাই ধারার একজন পীরও ছিলেন। ফলে এ অঞ্চলে ইসলামের পক্ষে অনেক কাজ হয়েছে। মানুষের অন্তরে ইসলামের প্রতি আকাঙ্ক্ষা তৈরি করার কাজ হয়েছে। তাই প্রতিফলন আমার জয়।
আপনার নির্বাচনী এলাকার জেলেরা জলদস্যু ও দাদনদারদের কাছে জিম্মি। এ মাফিয়াতন্ত্র ভাঙতে আপনার হাতে নির্দিষ্ট কোনো ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ আছে কি?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: জলদস্যুতার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মিলে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। আটককৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে আমি কাজ করব। অপরাধীরা যাতে কোনো প্রভাবশালীর ছত্রছায়া না পায়, তা নিশ্চিত করব। এটা করা গেলে জলদস্যুতার সমস্যার একটা সমাধান আসবে। আর দাদন একটি ভয়ংকর চক্র। এই চক্রে কেউ একবার প্রবেশ করলে তার জীবন শেষ। আমরা জেলেদের বিনাসুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করব, দ্বীনদার সম্পদশালীদের সঙ্গে সমন্বয় করে মুদারাবা ও মুশরাকা ব্যবস্থার প্রবর্তন করব। অফ সিজনে জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব। জেলে পরিবারগুলোকে শিক্ষিত করে তোলা, তাদের পরিবারে বহুমাত্রিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং মৌসুমে মাছের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ। আশা করি এর মাধ্যমে দাদনের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
আমরা নারী বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা মান্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেটা নেতিবাচক অর্থে রক্ষণশীলতা না, বরং দেশের হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। এখানে বলে রাখি, ইসলামের নীতিমালায় নারীর অধিকার নিশ্চিতভাবেই রক্ষা হবে এবং বিকশিত হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ‘পীর সাহেব চরমোনাই’-এর নেতৃত্বের ওপর অতিনির্ভরশীল বলে শোনা যায়। সংসদে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আপনি কি স্বাধীনভাবে আপনার এলাকার স্বার্থ দেখবেন, নাকি দলের হাইকমান্ডের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকবেন?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে এ ধারণা সঠিক নয়। বরং ইসলামী আন্দোলনে পরামর্শ খুবই প্রভাবশালী বিষয়। আমরা পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করি। আমি অবশ্যই আমার এলাকার স্বার্থসহ সামগ্রিকভাবে দেশ ও ইসলামের স্বার্থ দেখব। ইসলাম ও দেশবিরোধী কোনো আইন সংসদে উঠলে আমি তার প্রতিবাদ করাসহ যা যা করার, তাই করব ইনশাআল্লাহ। আমার দলের চাওয়াও সেটাই।
সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হয়। আপনি কি সংসদে এ ধারাটিকে আরও শক্তিশালী করতে কোনো বিল উত্থাপন করবেন?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: এটা বিএনপির প্রতিশ্রুতির মধ্যেই আছে। আশা করি এটা হয়ে যাবে। আমাদের প্রচেষ্টা ও সমর্থন তো থাকবেই।
আপনি কি মনে করেন বর্তমান প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা দিয়ে সাধারণ মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়া সম্ভব? আপনি কি সংসদে ‘ইসলামী বিচার ব্যবস্থা’র কোনো মডেল প্রস্তাব করবেন?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার সমস্যা স্বীকৃত। বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের অনেক কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। বিচার বিভাগের সচিবালয় আলাদা করা হয়েছে। ফলে সমস্যার কিছু সমাধান আসবে। এখানে মনে রাখতে হবে, একজন সংসদ সদস্যের কাজ ও ক্ষমতার পরিধি আইন দ্বারা নির্ধারিত। আমরা পর্যায়ক্রমে স্বপ্নের পথে চলতে চাই।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আপনার দলের বিরুদ্ধে রক্ষণশীলতার অভিযোগ আছে। বরগুনার হাজার হাজার নারী শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় আপনার ভূমিকা কী হবে?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: যারা অভিযোগ করে তারা যথার্থ বলে না। আমরা নারী বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা মান্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেটা নেতিবাচক অর্থে রক্ষণশীলতা না, বরং দেশের হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। এখানে বলে রাখি, ইসলামের নীতিমালায় নারীর অধিকার নিশ্চিতভাবেই রক্ষা হবে এবং বিকশিত হবে। নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা আরও নিবিড়ভাবে সমুন্নত করা হবে ইনশাআল্লাহ।
আপনার দলের ইশতেহারে ‘ইসলামী হুকুমত’-এর কথা বলা হয়। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আপনি কি গণতন্ত্র আর ইসলামী শাসনতন্ত্রের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক কিছু দেখেন?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: ইসলামী হুকুমত বলা হয়নি। শরিয়াহর প্রাধান্য বলা হয়েছে। এ দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য অনেক বড় তত্ত্বীয় বিষয়। এখানে সেটা আলোচনা করার সুযোগ নেই। আর প্রশ্নের শেষাংশের বিষয়ে বলব, আমি মীমাংসা অযোগ্য কোনো সাংঘর্ষিকতা দেখি না।
যদি সংসদে এমন কোনো বিল আসে, যা আপনার দলের আদর্শের সঙ্গে মেলে না কিন্তু জনগণের জন্য সাময়িকভাবে লাভজনক, আপনি কোন পক্ষ নেবেন?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: সত্যিকার অর্থেই জনগণের জন্য কল্যাণকর এমন কিছু আমাদের দলের আদর্শের বাইরে যাওয়ার কথা নয়। তবে এসব বিষয়ে পরিস্থিতিই অনেক কিছু বলে দেবে।
রাজনীতিতে আপনি ‘ব্যক্তি অলিউল্লাহ’ নাকি ‘ইসলামী আন্দোলনের প্রতিনিধি’— কোন পরিচয়ে মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হতে চান?
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: আমরা আত্মাকে বিলীন করার শিক্ষাই পেয়েছি। তাসাউফে সেটাই চর্চা করা হয়।
আগামী পাঁচ বছর পর বরগুনা-১-এর মানুষ আপনাকে কেন ভোট দেবে? দুটি বড় অর্জনের নাম বলুন যা আপনি করতে চান।
মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ: সুশাসন, ন্যায়বিচার, সাম্য ও উন্নয়নের জন্য (ইনশাআল্লাহ)।
সংখ্যালঘু-মুসলিম কোনো ভেদাভেদ করব না
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ
সংসদ সদস্য (ময়মনসিংহ-২)
ইসলামী রাজনীতির মূল শক্তি কোথায় বলে মনে করেন?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ: ইসলামী রাজনীতির মূল শক্তি হলো আল্লাহর ওপর ভরসা এবং আল্লাহর ভয়ভীতি। যদি কোনো ব্যক্তির আল্লাহর ওপর ভরসা এবং অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকে, তাহলে ওই ব্যক্তির দ্বারা ইসলামী সব কাজকর্ম করা সহজ হয়ে যায়। সেটা রাজনীতি হোক বা অন্য কোনো ভালো কাজ হোক।
কওমি সনদের স্বীকৃতি থাকলেও বেসরকারি চাকরিতে এর গ্রহণযোগ্যতা কম। আপনি কি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে কওমি গ্র্যাজুয়েটদের জন্য কোটা বা বিশেষ সুযোগের ব্যবস্থা করবেন?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ: আমি চেষ্টা করব কওমিতে যারা লেখাপড়া করেন, তাদের লেখাপড়ার মানোন্নয়ন করা। সরকারি-বেসরকারি সর্বক্ষেত্রেই যেন অন্যদের মতো তারাও চাকরিতে অংশগ্রহণ করতে পারে, বেফাক ও হাইয়াতুল উলইয়া এবং আমাদের ময়মনসিংহের ইত্তেফকুল উলামার মুরুব্বিদের সঙ্গে আলোচনা করে সেই পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করব।
আপনার এলাকার রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড আনতে আপনি লবিং করবেন কীভাবে?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ: ফুলপুর-তারাকান্দার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ রাস্তা কাঁচা এবং চলাচল অযোগ্য। নির্বাচনে আমার প্রতিশ্রুতি ছিল, আমি যদি আগামী পাঁচ বছর বেঁচে থাকি, এমপি থাকি, তাহলে বাকি রাস্তাগুলো আমি পাকা করে জনগণকে উপহার দেব। এটার জন্য যেভাবে লবিং করতে হয়, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
মানুষ আমাদের ইসলামের পক্ষে, কোরআন-হাদিসের পক্ষে কথা বলার অধিকার দিয়েছে। মানুষের বিশ্বাস ও ভরসা নষ্ট করে আমরা ডারউইনের মিথ্যা তথ্যের দিকে কীভাবে যাব? আমরা কোরআন-হাদিসের সঠিক তথ্যগুলোই সংসদে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
আপনার এলাকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ: জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার কাছে সংখ্যালঘু-মুসলিম কোনো পার্থক্য নেই। আমি মনে করি, আমার এলাকায় যারা বসবাস করে, তারা প্রত্যেকই সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করে। হিন্দু-মুসলিম কোনো পার্থক্য নেই। তাই সবার মানসম্মান রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। ইনশাআল্লাহ অধিকারের বিষয়ে আমি সংখ্যালঘু বা মুসলিম-অমুসলিম কোনো পার্থক্য করব না।
আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের সংসদীয় পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনা প্রয়োজন? যেমন আনুপাতিক হারে নির্বাচন বা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ: এ দেশে যে রাজনীতি চলছে, সেটা হলো গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র কতটা পরিবর্তনের সুযোগ হবে জানি না। তবে যে গণতন্ত্রের কথা আমরা বলি, সেটাও মাঠে-ময়দানে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয় না। বরং পেশিশক্তিই ব্যবহার হচ্ছে। তাই আমরা চেষ্টা করব, গণতন্ত্র যদি এভাবে চলে, তাহলে এটাকে পরিবর্তন করে পেশিশক্তি দমন করা। আর উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষ এটাও আমাদের সব দল মিলে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমার কাছে ভালো মনে হয়েছে। উচ্চকক্ষ বলতে আমরা মনে করি আমাদের অভিভাবক থাকবে, তারা আমাদের পরামর্শ দিয়ে পরিচালনা করবে। এটা গণতন্ত্রের জন্য উত্তম একটা রাস্তা।
আপনার এলাকায় শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে আপনি কী উদ্যোগ নেবেন? বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে যদি বলি কওমি মাদ্রাসাপড়ুয়া নারীদের বিষয়ে আপনার দল বা ব্যক্তিগত অবস্থান কী?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ: আমাদের এলাকায় প্রতিটি গ্রামে গ্রামে কওমি মাদ্রাসা ছড়িয়ে গেছে। মানুষ দ্বীনের পথে অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিটি মহিলা মাদ্রাসায় নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। যারা আগে স্কুলে পড়াশোনা করত, এখন তারা ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। আশা করি আমরা যদি মেহনত করি, মাদ্রাসার পরিবেশ সুন্দর করে, তাদের লেখাপড়ার মান উন্নত করে ইসলামী ঘরানার একটা জীবন আমরা তাদের উপহার দিতে পারব ইনশাআল্লাহ।
কওমি মাদ্রাসার সার্টিফিকেটের মানোন্নয়নে উচ্চতর গবেষণা কেন্দ্র বা ইউনিভার্সিটি অব কওমি স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার কোন দাবি আপনি সংসদে তুলবেন?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ : আমাদের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সম্মানিত আমির মাওলানা মামুনুল হক এরকম একটা চিন্তাভাবনা থেকে একটি বিশাল প্রতিষ্ঠান করার কাজে হাত দিয়েছেন। তার উদ্দেশ্য হলো, এটাকে একটা বিশাল ইউনিভার্সিটি লেভেলের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এবং কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের উচ্চ লেভেলের শিক্ষায় শিক্ষিত করা। আমরা শুরু থেকেই এটাকে পছন্দ করে উনার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছি। আমরা চেষ্টা করব, কওমি লেভেল থেকে এরকম বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান করে ছেলেদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার। বিদেশি শিক্ষার্থীরাও যেন এখানে আসে, সেই পথে এগোনোরও চেষ্টা করব আমরা।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘ডারউইন তত্ত্ব’ বা এ জাতীয় বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে আপনার প্রস্তাব কী হবে?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ: ডারউইন তত্ত্ব এগুলো তো ইসলামবিরোধী। আমরা প্রথমত মুসলমান, দ্বিতীয়ত আলেম। মানুষ আমাদের ইসলামের পক্ষে, কোরআন-হাদিসের পক্ষে কথা বলার অধিকার দিয়েছে। মানুষের বিশ্বাস ও ভরসা নষ্ট করে আমরা ডারউইনের মিথ্যা তথ্যের দিকে কীভাবে যাব? আমরা কোরআন-হাদিসের সঠিক তথ্যগুলোই সংসদে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
শিক্ষা বাজেটে কওমি শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকা উচিত কি? এ বিষয়ে আপনি কী করতে চান?
মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ: কওমি মাদ্রাসা জাতি দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে সরকারি কোনো অনুদান যায় না। কিছু কিছু এমপি বা চেয়ারম্যান তাদের বরাদ্দ থেকে মাদ্রাসায় বরাদ্দ দিতে দেখা যায়। আমরা কওমির মুরুব্বিদের সঙ্গে আলোচনা করব, এখানে সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার পর যদি সরকারি কোনো শক্তি বা নিয়মনীতি প্রয়োগ করা হয়, যেটা কওমি মাদ্রাসার আদর্শের খেলাফ হয়, তাহলে আমরা সে পথে যাব না। আর যদি আদর্শের খেলাফ না হয়, তাহলে মুরুব্বিদের পরামর্শের ভিত্তিতে আমরা কওমি মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
Reporter Name 

























