বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া টানা তিন দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি আছেন। শুক্রবার রাতে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ার খবরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। দলমতের ঊর্ধ্বে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তার জন্য দোয়া ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে দেখা যায়। খালেদা জিয়ার প্রার্থনায় তার নানা বক্তব্য ও কীর্তি উল্লেখ করা পোস্টে ছেয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও।
তবে তার শারীরিক অবস্থা বলার মতো উন্নতি হয়নি। নতুন করে অবনতিও হয়নি। চিকিৎসক ও বিএনপি নেতারা বলছেন, বিদেশ নেওয়ার মতো উন্নতি হয়নি খালেদা জিয়ার। তবে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে। এই অস্থায় স্থিতিশীল থাকাটা চিকিৎসকদের ভাষায় ইতিবাচক। কিছুটা উন্নতি হলেই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝে সিঙ্গাপুর কিংবা লন্ডন নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ইনফেকশনের (সংক্রমণ) শঙ্কায় খালেদা জিয়াকে সিসিইউতে নেওয়া হয়। তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য শনিবার সন্ধ্যায় সময়ের আলোকে বলেন, ম্যাডামের নতুন করে অবস্থার অবনতি হয়নি। এটাই আমাদের কাছে ইতিবাচক। নিউমোনিয়া হওয়ায় প্রথমদিকে ওনাকে কিছু অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল। সিঙ্গাপুর নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কন্ডিশন ট্রাভেল করার মতো হলে সিদ্ধান্ত হবে। সিসিইউতে একস্ট্রা কেয়ারে রাখা হয়েছে। শনিবার সিসিইউ থেকে অপারেশন থিয়েটার নেওয়া হয় আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত ফলোআপ করা হচ্ছে। মেডিকেল বোর্ডে নতুন করে লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও যুক্ত হয়েছেন। যেখানে তিনি গত জানুয়ারিতে চিকিৎসা নিয়েছেন। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড প্রতিদিন আলোচনা করে নতুন করণীয় ঠিক করছে। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি ডা. জুবাইদা রহমান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জনস হপকিনস হসপিটালের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বোর্ডের বৈঠকে অংশ নেন।
শনিবার সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ম্যাডামের অবস্থা শুক্রবারের চেয়ে ভালো। আমি হাসপাতালেই আছি। তাকে সিসিইউতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হবে। বিদেশে নেওয়া হবে কি না এখনও কিছু বলতে পারব না। এগুলোর সিদ্ধান্ত মেডিকেল বোর্ড নেবে। আমি নিয়মিত হাসপাতালে যাচ্ছি। চিকিৎসকদের পরামর্শে ম্যাডামের জন্য গুলশানের বাসা থেকেই খাবার পরিবেশেন করা হচ্ছে। ম্যাডামের সঙ্গে তার ছোট পুত্রবধূ সৈয়দা শামিলা রহমান সার্বক্ষণিক থাকছেন। এ ছাড়া গৃহপরিচারিকা ফাতেমা ও স্টাফ রূপা আক্তার সঙ্গে আছেন।
বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি সেরে রাখা হয়েছে : ফখরুল
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন। শনিবার বিকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব এই কথা জানান।
তিনি বলেন, দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসকবৃন্দ, বিদেশের আমেরিকার জন হপকিংস এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা করছেন। শুক্রবার রাতে তারা একটা বোর্ড মেডিকেল বোর্ডে সভা করেছেন প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টা ধরে। সেখানে তার চিকিৎসার ব্যাপারে সমস্ত চিকিৎসকদের মতামত নিয়ে তারা কথা বলেছেন। কীভাবে চিকিৎসা তারা করবেন এবং সেই চিকিৎসাটা কী ধরনের হবে সে বিষয়ে তারা মতামত দিয়েছেন। ম্যাডামকে হয়তো বিদেশে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তিনি বর্তমানে বিদেশে নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। শারীরিক অবস্থা আল্লাহর অশেষ রহমতে যদি স্টেবল হয় তখন চিন্তা করে দেখা হবে যে, তাকে বিদেশে নেওয়া সম্ভব হবে কি না।
মির্জা ফখরুল বলেন, তবে বিদেশে নেওয়ার জন্য যে প্রয়োজনীয় ভিসা, অন্যান্য দেশের সঙ্গে যেসব দেশে যাওয়ার সম্ভব হতে পারে সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের বিষয় নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে এবং সেগুলো মোটামুটি কাজ এগিয়ে আছে। অর্থাৎ, যদি প্রয়োজন হয় এবং যদি দেখা যায় শি ইজ রেডি টু ফ্লাই তখন তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়া এই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী এবং তার অসুস্থতায় সব মানুষই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত এবং অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ভিড় করছেন। এতে করে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকরা অত্যন্ত বিব্রতবোধ করছেন। ম্যাডামের সঙ্গে অন্য রোগীদের চিকিৎসায় বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অনুরোধ জানাতে চাই, আপনারা কেউ দয়া করে হাসপাতালে ভিড় করবেন না। অনুগ্রহ করে বিএনপি নেতাকর্মী, তার শুভাকাক্সক্ষী বা দেশের মানুষ দয়া করে হাসপাতালে হাসপাতালে ভিড় করবেন না। সময়মতো তার হেলথ বুলেটিন জানানো হবে।
উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় মোনাজাত
শনিবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন মোনাজাত পরিচালনা করেন।
এ ছাড়া বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ সালের খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্তভাবে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় অনুমোদন করা হয়। পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ সালের খসড়া বিশেষ সভায় উত্থাপিত হলে অধ্যাদেশটি আরও বিস্তারিতভাবে এবং সংশোধিত আকারে পরবর্তী পরিষদ সভায় উত্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
দলীয় আহ্বানের পরও এভারকেয়ার হাসপাতালে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কমছে না বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সকালে উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বিকালের দিকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
হাসপাতালে ভিড়
দলের নির্দেশনা অমান্য করে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ভিড় করছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বর্তমানে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার খোঁজখবর নিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সেখানে ছুটে আসছে।
শনিবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘দেশনেত্রীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকেই এ সমাগম তৈরি হয়েছে। তবে এ ভিড়ের কারণে হাসপাতালের নিয়মিত চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দেশনেত্রীসহ অন্য রোগীদের চিকিৎসাসেবায় যাতে কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়, সে কারণে নেতাকর্মীদের ভিড় না করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
দলীয় এ আহ্বানের পরও এভারকেয়ার হাসপাতালে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কমছে না বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সকালে উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বিকেলের দিকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক ছাড়াও বহু উৎসুক মানুষও সেখানে ভিড় করছে। এতে হাসপাতাল এলাকার আশপাশে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা চালালেও জনসমাগম কমার কোনো লক্ষণ নেই।
প্রার্থনায় সাধারণ মানুষ : গত ২৩ নভেম্বর রাতে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে কেবিনে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এভারকেয়ার হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। গত দুই দিন ধরে তার অবস্থা খারাপ হলে বিএনপির পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে শুক্রবার ও শনিবার সারা দেশে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠান চলছে।
শনিবার নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ওলামা দলের আয়োজন বিএনপির খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন কার হয়। তার সুস্থতা কামনা করে দোয়া মাহফিল করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় মজসিদে কুরআন খতম ও মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করে সাধারণ মানুষ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা।
ওদিকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতা কামনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা মন্তব্য লিখেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অনেকে স্বৈরাচার আমলের খালেদা জিয়ার আপসহীন নানা বক্তব্য ফেসবুক শেয়ার করে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন।
Reporter Name 

























