শীত এখনও পুরোপুরি না এলেও বাতাসে টের পাওয়া যাচ্ছে তার ইশারা। এই সময়টায় ত্বক দ্রুত আর্দ্রতা হারায়, ফলে মুখে টান পড়ে, ঠোঁট ফাটে, হাত-পা রুক্ষ হয়ে যায়। ত্বকের সমস্যাগুলো শীতের আগেভাগে সামলানো সম্ভব। শুধু নিয়মিত যত্ন আর কিছু সচেতন অভ্যাসই আপনার ত্বককে পুরো মৌসুমে রাখতে পারে মসৃণ, উজ্জ্বল ও সুস্থ। লিখেছেন তাসলিমা নীলু
শীতেও নিন ত্বকের যত্ন ত্বক পরিষ্কার রাখা
শীতের শুরুতে বাতাসে ধুলো ও ময়লা বেড়ে যায়, যা ত্বকের গভীরে জমে ত্বককে নিষ্প্রাণ করে তোলে। তাই প্রতিদিন ত্বক পরিষ্কার রাখা জরুরি। মুখ পরিষ্কার করার জন্য সকাল ও রাতে দুবার ফেসওয়াশ ব্যবহার করুন। বাইরে থেকে ফিরে মুখে পানি ছিটিয়ে দিলে ত্বক সতেজ থাকে। গোসলও নিয়মিত করতে হবে, কারণ শরীরের ত্বকও এই সময়ে শুষ্কতা ও ময়লা জমার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সঠিক ক্লিনজার বাছাই
শীতে অতিরিক্ত ফোমযুক্ত ক্লিনজার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কেড়ে নেয়। ফলে ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে পড়ে। এ সময় সবচেয়ে ভালো হয় সিটাইল সমৃদ্ধ হালকা অ্যালকোহল এবং নন-ফোমিং ক্লিনজার ব্যবহার করলে। এগুলো ত্বক পরিষ্কার করার পাশাপাশি আর্দ্রতাও ধরে রাখে।
রাতে ডাবল ক্লিনজিং করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে ক্লিনজিং অয়েল দিয়ে মুখে হালকা ম্যাসাজ করলে জমে থাকা ময়লা ও মৃত কোষ নরম হবে। এরপর ফেসওয়াশ দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিলে ত্বক নিখুঁতভাবে পরিষ্কার হবে।
চাইলে ঘরে বসে কাঁচা দুধে তুলা ভিজিয়ে মুখ পরিষ্কার করতে পারেন—এটি খুবই কোমলভাবে ত্বক পরিষ্কার করে। শরীরের ত্বকের জন্য সাবানের বদলে সোপ-ফ্রি বডি ওয়াশ ব্যবহার করাই ভালো।
মৃত কোষ দূর করে ত্বকের উজ্জ্বলতা ফেরান
শীতকালে ত্বকে মৃত কোষ বেশি জমে দ্রুত রুক্ষ হয়। তাই নিয়মিত এক্সফোলিয়েশন প্রয়োজন। তবে অতিরিক্ত ঘষামাজা করলে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই হালকা এক্সফোলিয়েট ব্যবহার করুন। তৈলাক্ত ত্বকে সপ্তাহে দুই-তিনবার এবং শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বকে মাসে ১-২ বার এক্সফোলিয়েট ব্যবহার করা যেতে পারে।
ল্যাকটিক অ্যাসিড, গ্লাইকোলিক অ্যাসিড বা স্যালিসিলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্ট এই সময়ে ভালো ফল দেয়। এগুলো ত্বকে জ্বালাপোড়া না করে মৃত কোষ আলতোভাবে সরিয়ে দেয়।
শীতের ত্বক রক্ষা করার ঢাল ময়েশ্চারাইজার
শীতে ত্বক ফেটে যাওয়া বা খোসা ওঠার প্রধান কারণ হলো আর্দ্রতার ঘাটতি। তাই এখন থেকেই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা শুরু করুন। অয়েল-বেসড ময়েশ্চারাইজার এ সময় বেশি উপকারী। অ্যাভোকাডো অয়েল, আমন্ড অয়েল, রোজ অয়েল, মিনারেল অয়েল বা শিয়া বাটারসমৃদ্ধ ক্রিম ত্বককে দীর্ঘসময় কোমল রাখে।
রাতে ঘুমানোর আগে অয়েলযুক্ত নাইটক্রিম লাগালে ত্বক সারা রাত আর্দ্র থাকে। ত্বকের গভীরে আর্দ্রতা ধরে রাখতে চাইলে ময়েশ্চারাইজারের আগে হায়াল-রোনিক অ্যাসিড সিরাম ব্যবহার করতে পারেন—এটি পানি ধরে রেখে ত্বককে নরম রাখে। এ ছাড়া সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভুলবেন না। শীতের রোদ জ্বালা না করলেও অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের জন্য সমান ক্ষতিকর।
ফাটা ঠোঁট মেরামতের সহজ উপায়
শীতের শুরুতে ঠোঁট দ্রুত শুকিয়ে যায়। এ সময় পেট্রোলিয়াম জেলি বা লিপবাম সবচেয়ে কার্যকর। লিপস্টিক ব্যবহার করলে আগে লিপবাম লাগিয়ে নিন—এতে ঠোঁট নরম থাকবে এবং রং বেশি সময় টিকবে। রাতে শোবার আগে ভ্যাসলিন লাগিয়ে রাখলে ঠোঁটের ফাটা দ্রুত সারবে। যাদের ঠোঁট কালচে হয়ে যায়, তারা এসপিএফযুক্ত লিপবাম ব্যবহার করতে পারেন।
ত্বকের আর্দ্রতায় তেল ও লোশন
গোসলের পর ত্বকে হালকা তেল বা বডি লোশন লাগালে শুষ্কতা কমে যায়। অলিভ অয়েল ত্বকের জন্য সবচেয়ে ভালো প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার, কারণ এতে কোনো রাসায়নিক থাকে না। নারকেল তেলও ত্বক নরম রাখতে সাহায্য করে। তবে শীতে সরিষার তেল ব্যবহার না করাই ভালো—এটি অনেকের ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।
চুলকানি বা খোসপাঁচড়া হলে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
গ্লিসারিন ত্বকের যত্ন নেয়
গ্লিসারিন শীতে ত্বক বাঁচানোর অন্যতম সেরা উপাদান। একটি স্প্রে বোতলে ৫ অংশ গোলাপ জল ও ১ অংশ গ্লিসারিন মিশিয়ে নিন। মুখ ধোয়ার পর এই স্প্রে ব্যবহার করুন। শুকিয়ে গেলে ময়েশ্চারাইজার লাগান। এটি শরীরের ত্বকেও ব্যবহার করা যায়। ফেসপ্যাকেও সামান্য গ্লিসারিন মেশালে আর্দ্রতা অনেক বেশি সময় ধরে থাকে।
ফেস প্যাক নিয়ে ঘরোয়া উপায়ে উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনুন
শীতের শুরুতে সপ্তাহে দুবার ময়েশ্চারাইজিং ফেস প্যাক ব্যবহার করলে ত্বক নরম থাকবে। দুধের সর, বেসন ও মধুর মিশ্রণ ত্বকের আর্দ্রতা বাড়ায় ও প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনে। এ ছাড়া টকদই, হলুদ ও বেসনের প্যাক ত্বকের রং উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত পানি পান করলে ত্বক ভেতর থেকে সতেজ থাকে
শীত এলেই তৃষ্ণা কমে যায়। কিন্তু পানি কম খেলেই ত্বক বেশি রুক্ষ হয়ে পড়ে। প্রতিদিন নিয়ম করে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন। সকালে এক গ্লাস কুসুম গরম লেবু পানি শরীরে আর্দ্রতা ফেরায়। ডাবের পানি, ফলের রস বা জুস শরীরকে ভেতর থেকে পুষ্টি দেয় ও টক্সিন দূর করে।
ভিটামিন ডি থেরাপি নিন
প্রতিদিন ন্যূনতম ১৫ মিনিট হালকা রোদে থাকলে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, যা ত্বকের বার্ধক্য রোধ করে ও ত্বক মসৃণ রাখে। সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টার মধ্যে রোদে থাকা সবচেয়ে উপকারী।
ত্বক বাঁচাতে পোশাক নির্বাচন
টাইটফিট বা সিনথেটিক পোশাক ত্বকের শুষ্কতা বাড়ায় ও অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে। শীতে তুলা বা প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক সবচেয়ে আরামদায়ক ও ত্বকবান্ধব। পলিয়েস্টার, নাইলন ইত্যাদি এড়িয়ে চলাই ভালো।
ডায়েট ও ব্যায়াম করবে ভেতর থেকে ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি
ত্বক সুন্দর রাখতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস জরুরি। শাকসবজি, সালাদ, লেবু, টমেটো, গাজর, বিট ও ফল ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত তেল-চর্বি কমিয়ে পুষ্টিকর খাবার বাড়ান। প্রতিদিন ১৫-৩০ মিনিট ব্যায়াম করলে রক্তসঞ্চালন বাড়ে, যা ত্বকে বাড়তি অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। যোগব্যায়ামও ত্বকের জন্য খুব উপকারী।
Reporter Name 

























