সার্বিক এই অবস্থায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সোমবার সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এই আশা প্রকাশ করেন যে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতেই অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের আয়োজন করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই আশাবাদী যে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ-জাতি গণতন্ত্রে ফিরে যাবে। জনগণের যে গণতন্ত্রের অধিকার, সেটা প্রতিষ্ঠিত হবে। যেটাকে আমরা বলি রাইট ট্র্যাক, দেশ সেখানে উঠবে বলে মনে করি।’
মির্জা ফখরুল আরো বলেন, শত্রু অনেক, বাধা দিতে চায়, আটকাতে চায়, দেরি করতে চায়। আমাদের সেগুলো পাড়ি দিতে হবে। নির্বাচনের যত দেরি হবে, তত বাংলাদেশ পিছিয়ে যাবে। বিনিয়োগ আসবে না, ইনভেস্টমেন্ট হবে না। আমাদের ছেলেদের কর্মসংস্থান বাড়বে না, আমার মায়েরা, মেয়েরা আরো বেশি নিরাপত্তা হারাবে। মব জাস্টিস বাড়বে। জুরিশিয়াল সিস্টেম আরো ভেঙে পড়বে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো ভেঙে পড়বে।’ সে জন্য একটা নির্বাচিত সরকার দরকার। নির্বাচিত সরকারের চেয়ে শক্তিশালী আর কোনো সরকার হতে পারে না।’
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তিনি আমাদের নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে কথা বলেছেন। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটা সময় নির্ধারণ করেছেন।’
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে আপত্তি নেই জামায়াতের : একটি নির্বাচিত সরকার অনেক সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হলে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। তবে যেনতেন একটি নির্বাচন তাঁরা চান না।
গত রবিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস) আয়োজিত ওই সংলাপে আবদুল্লহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘যেনতেন নির্বাচন চাই না মানে আমরা নির্বাচন চাই না—বিষয়টা তা নয়। এ নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে এবং সন্দেহ তৈরি করা হচ্ছে। আর যেনতেন ইলেকশন যদি কেউ চান, আমরা তাদেরও চাই না। যেনতেন নির্বাচন যারা করেছে, আমরা তাদের বিতাড়িত করেছি।’
পাঁচ-ছয় মাস পর নির্বাচন ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রস্তুতি : পাঁচ-ছয় মাস পর জাতীয় নির্বাচন হবে ধরে নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গত রবিবার রাজধানীর উত্তরায় শিল্পাঞ্চল পুলিশ সদর দপ্তর ও উত্তরা পূর্ব থানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই—বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমন পর্যবেক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে অনেকে অনেক কথা বলেন, এটা তাঁদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, আমি উনাদের প্রশ্নের উত্তর দেব না। আমাদের প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি। যেহেতু আরো সময় আছে পাঁচ-ছয় মাসের মতো। আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছি।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, নির্বাচনটা শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে না। নির্বাচনে প্রশাসনে যাঁরা কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, তাঁরা ছাড়াও নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবার দায়িত্ব রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রস্তুতি দরকার যাঁরা ইলেকশনে পার্টিসিপেট করছেন। আমাদের প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি নেই।’
ঐকমত্যের আলোচনা দ্রুত শেষ করতে সহযোগিতার আহবান : এদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংস্কার বিষয়ে আলোচনা শেষ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানিয়েছেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি জানিয়েছেন, আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যে আসার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের দশম আলোচনায় বিচারব্যবস্থা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সমপ্রসারণে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থানে যেসব উপজেলা জেলা সদরের নিকটবর্তী, সেখানে আদালত স্থাপনের বিপক্ষে দলগুলো। একইভাবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জরুরি অবস্থা জারির নতুন বিধান কী হবে তা নিয়ে নানা প্রস্তাব থাকলেও বিদ্যমান বিধান পরিবর্তনে সবাই একমত।
জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) নিয়ে অধিকাংশ দলের আপত্তি থাকায় সংশোধনী এনে ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। প্রাথমিক প্রস্তাবে সংবিধানের মূলনীতিতে বহুত্ববাদ নিয়ে দলগুলোর আপত্তি থাকায় সংশোধিত প্রস্তাবে তা নেই। একইভাবে চার প্রদেশে ভাগের প্রস্তাবে দলগুলোর দ্বিমতের কারণে উপস্থাপন করা হয়নি।
আলী রীয়াজ বলেন, ‘যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয়, সেদিকে কমিশন নজর রাখছে। সবার মতামতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই অগ্রসর হচ্ছে কমিশন। অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে। আমাদের সময়স্বল্পতার বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে।’ দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিন, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি করুন : ফখরুল
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাচনের যত দেরি হবে, বাংলাদেশ তত পিছিয়ে যাবে।’ দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিন, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি করুন।’
গতকাল সোমবার সিলেট নগরের পাঠানটুলা এলাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত জনসভা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব এসব কথা বলেন।
যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী প্রমুখ।
দোয়া মাহফিলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রুহের মাগফিরাত, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য কামনা করা হয়। যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিকের আমন্ত্রণে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা সিলেট আসেন।
গণতন্ত্রে ফেরা সহজ হবে না মন্তব্য করে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘শত্রু অনেক, তারা বাধা দিতে চায়, আটকাতে চায়, দেরি করাতে চায়। আমাদের সেগুলো পাড়ি দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, সরকারকে বলতে চাই, অন্যান্য রাজনৈতিক দলকেও বলতে চাই, নির্বাচনের যত দেরি হবে, তত বাংলাদেশ পিছিয়ে যাবে। বিনিয়োগ আসবে না, ইনভেস্টমেন্ট হবে না। আমাদের ছেলেদের কর্মসংস্থান বাড়বে না, আমার মায়েরা মেয়েরা আরো বেশি নিরাপত্তা হারাবে। মব জাস্টিস বাড়বে। জুডিশিয়াল সিস্টেম আরো ভেঙে পড়বে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো ভেঙে পড়বে।’
সে জন্য একটা নির্বাচিত সরকার দরকার জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘যে সরকারের পেছনে মানুষ আছে, যে সরকারের পেছনে জনসমর্থন আছে, বন্ধুগণ মনে রাখবেন, নির্বাচিত সরকারের চেয়ে শক্তিশালী আর কোনো সরকার হতে পারে না।’
তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তিনি আমাদের নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে কথা বলেছেন। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটা সময় নির্ধারণ করেছেন।’
বিএনপির ৩১ দফাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই। আমরা আমাদের তরুণ, যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। আমরা বাংলাদেশকে একটা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাই। সে জন্য আমরা বিএনপি থেকে ৩১ দফা দিয়েছি। এই ৩১ দফার মধ্যেই আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। যে স্বপ্ন আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘হাসিনার দোসররা এখনো ষড়যন্ত্র করছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে শেখ হাসিনার লোক এখনো রয়ে গেছে। তারা চাচ্ছে না বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। চাচ্ছে না দেশে গণতন্ত্র ফিরুক। আর আরেক শ্রেণির লোক আছে, ক্ষমতায় বসে তারা নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে। নির্বাচন না দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চাইছে।’
ভোটাধিকারের দাবিতে আবারও আন্দোলনে নামার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের অনেক আমলা যা বলছে, তাতে নির্বাচন করতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন আদায় করে ছাড়বে। প্রয়োজনে ভোটের অধিকারের জন্য আবার আমরা আন্দোলনে নামব।’
খালেদা জিয়ার অসুস্থতার জন্যও আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় এই দোয়া মাহফিল।’
পিআর পদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যাঁরা পিআর পদ্ধতির কথা বলছেন, তাঁরা এই বিষয়ে ভালোভাবে জেনে আসেন। বাংলাদেশের মানুষ যে পদ্ধতিতে নির্বাচনে অভ্যস্ত, সেই পদ্ধতিতেই নির্বাচন হবে।’ তিনি বলেন, ‘তাঁরা বলছেন পিআর পদ্ধতি। এর কথা বাংলাদেশের মানুষ কখনো শোনেনি। আজ আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, যাঁরা পিআর পদ্ধতির কথা বলছেন, তাঁরাও পিআর পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিকভাবে জানেন না।’
অনুষ্ঠানে স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ডা. জাহিদ হোসেন, সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউস, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, ডা. এনামুল হক চৌধুরী, সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, জেলার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকীসহ বিএনপির ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
Reporter Name 

























