চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার টংকাবতী খাল খননে শাহাদাত হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) দিয়েছেন জামায়াত নেতা ও সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। গত মাসে (মে) এই চিঠি দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হয়ে চিঠিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে গেলে বিষয়টি জানাজানি হয়।
শাহাদাত হোসেন লোহাগাড়া উপজেলার কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা। তিনি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মো. নেজাম উদ্দিন নদভীসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আছে। ইতোপূর্বে স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে তাকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে শাহাদাত তার পুরোনো বন্ধু আরমান উদ্দিনকে ব্যবসায়িক পার্টনার বানান, যিনি জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ)। স্থানীয়দের অভিযোগ, আরমানের সহযোগিতায় আড়ালে থেকে টংকাবতী খালের বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন করছেন শাহাদাত। সম্প্রতি এটিকে বৈধ করার চেষ্টা হিসেবে খাল খনন বা সংস্কারের বিষয় সামনে আনা হয়েছে।
নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, ব্যক্তিগত অর্থায়নে টংকাবতী খাল খননের অনুমতি চেয়ে শাহজাহান চৌধুরীর কাছে আবেদন করেন শাহাদাত হোসেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর আমিরাবাদ ও আমির খান চৌধুরী পাড়ার পাশ দিয়ে প্রবাহিত টংকাবতী খালটি দীর্ঘদিন ধরে পলি ও বালুতে ভরাট হয়ে গেছে। এতে খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে বর্ষা মৌসুমে প্রায় ১ হাজার পরিবারের বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খালে জমে থাকা পলি ও বালু তিনি অপসারণ করে খালের স্বাভাবিক নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে চান।’
তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর টংকাবতী খাল খননের অনুমতি প্রদানের অনুরোধ জানিয়ে ডিও লেটার দেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয় হয়ে চিঠিটি লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে পৌঁছে। বর্তমানে লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দপ্তরে আবেদনটি তদন্তাধীন রয়েছে।
শাহাদাতের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এমপি শাহজাহান চৌধুরীর ডিও লেটারে উল্লেখ করা হয়, ‘টংকাবতী খাল দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। এতে বর্ষা মৌসুমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়ে আশপাশের কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে শাহাদাত হোসেনকে এলাকাবাসীর পক্ষে নিজস্ব অর্থায়নে খাল খননের সুযোগ দেওয়া হোক।’
শাহাদাত হোসেনের স্বেচ্ছায় খাল খননের আবদারের বিষয়টির খোঁজ নিতে সরেজমিন লোহাগাড়া উপজেলার উত্তর আমিরাবাদ ও আমির খান চৌধুরী পাড়ায় যান এই প্রতিবেদক। সেখানকার অন্তত অর্ধশত লোকের সঙ্গে কথা বলে ঢাকা পোস্ট। তাদের বেশিরভাগই বালু উত্তোলনের বিষয়ে পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাননি।
তাদের অভিযোগ, টংকাবতী খাল সংস্কারের নামে মূলত শাহাদাত-আরমানের নেতৃত্বে চক্রটিকে বালু উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই এলাকায় নিকট অতীতে বন্যার কোনো রেকর্ড নেই। উল্টো তাদের আশঙ্কা, খালটি সংস্কারের নামে অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন হলে পরিবেশ, কৃষি ও স্থানীয় জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। শাহাদাতের হয়ে টংকাবতী খালের বালু লুটের উদ্দেশ্যে এমপির পিএস আরমান উদ্দিন এই ডিও লেটারের ব্যবস্থা করেছেন বলে তাদের অভিযোগ।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, শাহাদাত হোসেন ও আরমান উদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, এলাকাবাসীর পক্ষে আবেদন করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে অবগত নন। খাল খননের অনুমতির আড়ালে যাতে চক্রটিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া না হয়, প্রশাসনের কাছে সে দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা যায়, লোহাগাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং এ সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের একটি অডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে একপ্রান্তে শাহজাহান চৌধুরীর পিএস আরমান এবং অপর প্রান্তে তারেকুল নামে আরেকজনকে কথা বলতে শোনা যায়। কথোপকথনের একপর্যায়ে ‘লোহাগাড়ার এমপি আরমান’ বলে দাবি করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় শাহজাহান চৌধুরীর সাম্রাজ্যের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন আরমান। সরকারের পতনের পর আরমান জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন। শাহজাহান চৌধুরীর পক্ষ হয়ে প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে আরমানই সমন্বয় করেন। এ সম্পর্কের সুবাদে চট্টগ্রামে তার প্রভাব বাড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মোরশেদ আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আগে এটি ইজারা দেওয়া হতো। কিন্তু ৫–৬ বছর আগে সেই ইজারা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যের তত্ত্বাবধানে এটি আবারও ইজারা দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। যা এলাকার জন্য বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যারা এখান থেকে বালু তুলবে, তাদের কোনো ক্ষতি হবে না; বরং আমাদের মতো যারা পাশে বসবাস করে, ক্ষতি হবে তাদের।’
তিনি আরও দাবি করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের একান্ত সচিব (পিএস) আরমানের এজেন্ট হিসেবে ওই এলাকায় একজন কাজ করছেন। তাকে দিয়েই মূলত এসব করোনো হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাদাত হোসেন প্রথমে ভুল নম্বরে ফোন করা হয়েছে বলে দাবি করেন। পরে বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সেখান থেকে বালু না তোলার কারণে রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। এখন বালু তোলা না হলে পুরো এলাকা আবার প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত আরমান উদ্দিন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাদাত হোসেনকে চেনেন না বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘কোথায় এসব করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমার নাম ব্যবহার করে ইজারার অনুমোদন দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। এলাকায় বৃষ্টির কারণে রাস্তার ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে, মানুষকে ইট বিছিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। আমি নিজে সরকারি ইজারা পর্যন্ত বন্ধ রেখেছি। এর পরও যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তবে আমাকে জানাবেন। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
বিষয়টি নিয়ে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ-বিন আখন্দ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘শাহাদাত হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে নিজস্ব অর্থায়নে খাল খননের অনুমতি দিয়ে এমপি মহোদয় ডিও লেটার দিয়েছেন। যেটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হয়ে আমার দপ্তরে পৌঁছেছে। এরপর এটি এসিল্যান্ডের দপ্তরে তদন্ত করতে পাঠানো হয়েছে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে নিজস্ব অর্থায়নে যাতে কাউকে বালু উত্তোলন করতে অনুমতি না দেওয়া হয়, এরকম একটি আবেদনও করা হয়েছে। এটিও এসিল্যান্ডের দপ্তরে রয়েছে।’
ইতোমধ্যে বালু উত্তোলনের বিষয়ে অবহিত করা হলে তিনি বলেন, ‘খাল খননের নামে কোনোভাবেই বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই।’
Reporter Name 

























